Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ১৩ নভেম্বর, ২০১৯ , ২৮ কার্তিক ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.1/5 (104 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ১২-২৭-২০১৭

'কিশোর উপন্যাসে আমার কৈশোরের ছাপ পাওয়া যায়'

'কিশোর উপন্যাসে আমার কৈশোরের ছাপ পাওয়া যায়'

মুহম্মদ জাফর ইকবাল বাংলাদেশের শিক্ষা সাহিত্য ও মননজগতের এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। আগামীকাল প্রতিভা ও শুভবুদ্ধির অধিকারী এই মানুষটির ৬৫তম জন্মদিন। এ উপলক্ষে তার সঙ্গে কথোপকথন পত্রস্থ হলো। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিরাজুল ইসলাম আবেদ।

সিরাজুল ইসলাম আবেদ: উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েও ১৯৯৪ সালে দেশে ফিরে এসেছিলেন। শুরু করলেন নতুন জীবন- কোনো বিশেষ স্বপ্ন বা বোধ দ্বারা তাড়িত হয়েছিলেন কি?
 'কোনো বিশেষ স্বপ্ন-বোধ দ্বারা তাড়িত হয়ে' আমি দেশে ফিরে আসিনি। আমি দেশে ফিরে এসেছি, কারণ এটা আমার দেশ। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিস্কার হবে। একজন মানুষের মা যদি সাদাসিধে, অশিক্ষিতা, বৃদ্ধ একজন মহিলা হয়, তখন মানুষটি কিন্তু ফিটফাট সুন্দরী কমবয়সী একজন মহিলা খুঁজে বের করে না মা ডাকার জন্য! যখন মায়ের কাছে যেতে ইচ্ছে করে, সেই সাদাসিধে অশিক্ষিতা বৃদ্ধ মহিলার কাছে গিয়েই তার পায়ের কাছে বসে থাকে। এখানেও তাই। যুক্তরাষ্ট্রের হাই-ফাই পরিবেশে যত ভালো কিছুই থাকুক; সেটা তো আমার দেশ নয়। আমার যদি আকাশ কালো করে আসা মেঘ, ঝমঝম বৃষ্টি, ব্যাঙের ডাক আর কালো শ্যামলা মানুষ দেখার ইচ্ছা করে; আমি কী করব?

কাজেই আবার একবার বোঝানোর চেষ্টা করি, আমি কোনো বড় উদ্দেশ্য বা স্বপ্ন নিয়ে দেশে ফিরে আসিনি। নিজের দেশে থাকার জন্য ফিরে এসেছি। অত্যন্ত চমৎকার একটা জীবনের লোভে নিজের দেশে থাকার আনন্দটুকু হারাতে আমি রাজি নই। আমি এত বেশি বোকা না।
 
সিরাজুল ইসলাম আবেদ: স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর আমাদের অর্জন নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে; হতাশাও কম নেই। এমন বাস্তবতাতেও আমরা দেখি, আপনি অসম্ভব আশাবাদী একজন মানুষ। এবং যে তারুণ্যকে কেউ কেউ সমাজের ঘুণে ধরা অংশ হিসেবে দেখতে চায়; আপনার পদচারণা সেই তারুণ্যকে কেন্দ্র করে। লেখালেখি বা কর্মকা সব সময় তাদের সঙ্গে কেন?
আমি আলাদাভাবে যুক্তিহীন বাড়াবাড়ি আশাবাদী মানুষ- সেটি সত্যি নয়। আমি যে জীবনের ভেতর দিয়ে এসেছি, সেখানে অন্য রকম কিছু হওয়াটাই অস্বাভাবিক। ১৯৭১ সালে তাড়া খাওয়া পশুর মতো ছুটে বেড়িয়েছি। একটি দিন শেষ হওয়ার পর অন্য একটা দিন শুরু হবে কি-না জানতাম না! যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর উদ্বাস্তুর মতো ঘুরে বেড়িয়েছি। রক্ষীবাহিনী বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার পর রাস্তায় রাত কাটিয়েছি। পরের বেলা কোথা থেকে খাবার আসবে, জানতাম না! এমন দিন পার হয়েছে- বাসায় একটা শার্ট; সেটা পরে কখনও বড় ভাই বাইরে গেছে, সে ফিরে এলে সেই শার্ট পরে আমি বাইরে গেছি। আমাদের খুব সৌভাগ্য যে, আমরা একটা অসাধারণ মা পেয়েছি, যিনি আমাদের পুরো পরিবারকে ধরে রেখেছিলেন এবং আমরা টিকে গেছি। এই দেশে সেই দুঃসময়ে অসংখ্য পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে। সেই ভয়ঙ্কর পরিবেশে আমি কিংবা আমরা যারা বেঁচে এসেছি, তাদের কে ভয় দেখাবে? কে হতাশ করবে?

সব বুড়ো মানুষই তারুণ্যকে ঘুণে ধরা বলে। এখন যারা তরুণদের গালাগাল করেন, তারা যখন কম বয়সী ছিলেন, তখন তাদের বাবা-চাচারাও তাদের গালাগাল করেছেন! কাজেই এগুলোকে আমি সিরিয়াসলি নিই না। আমি বিশ্বাস করি, সবার ভেতরেই একজন ভালোমানুষ থাকে, তাকে ঠিকভাবে স্পর্শ করলেই সে বের হয়ে আসে।

আমার 'পদচারণা' বা কর্মকা সব সময় তারুণ্যকে কেন্দ্র করে। কারণ, আমার সেটাই ভালো লাগে। একজন বুড়ো মানুষকে নতুন করে শেখানো যায় না। কিন্তু কম বয়সী তরুণরা নতুন কিছু শিখতে রাজি আছে। স্বপ্ন দেখতে রাজি আছে।
 
সিরাজুল ইসলাম আবেদ: তরুণদের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আপনাকে দাঁড়াতে হয়েছে। দাঁড়িয়েছেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে; হুমকি-ধমকিও শুনতে হয়েছে; নিজেকে কখনও বিপন্ন মনে হয়েছে কি?
না, নিজেকে কখনোই বিপন্ন মনে হয়নি; প্রশ্নই ওঠে না। যখনই দুঃসময় এসেছে, তখন চারপাশে আরও বেশি মানুষ এসে আরও নতুনভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে। আজকাল ইন্টারনেটে তরুণরা অনেক বেশি সময় কাটায়। আমি শুনেছি, সেখানে কেউ যখন আমার বিরুদ্ধে [কিংবা আমার পরিবারের বিরুদ্ধে] একটা কুৎসিত কথা বলে, তখন অসংখ্য তরুণ সেটাকে তাদের মতো প্রতিবাদ করে। মানুষের ভালোবাসা একটি অসাধারণ বিষয়। আমি সেই ভালোবাসাটুকু অনুভব করতে পারি। আমি সব সময় সৃষ্টিকর্তাকে বলি, তিনি যেন আমাকে সেই শক্তিটুকু দেন, যেন আমি কখনও কারও ভালোবাসার অমর্যাদা না করি।
 
সিরাজুল ইসলাম আবেদ: এবার আপনার লেখালেখি প্রসঙ্গে আসা যাক। মাত্র ৭ বছর বয়সে সায়েন্স ফিকশন লেখা দিয়ে শুরু করেছিলেন লেখালেখি পর্ব। লেখক হওয়ার ইচ্ছেটা এলো কীভাবে?
মনে হয়, এটা জেনেটিক। বাবা লিখতেন, মাও লিখতেন, ভাইবোনেরাও লেখে। এখন তাদের ছেলেমেয়েরাও লেখে! আমরা বইয়ের মাঝে বড় হয়েছি। কাজেই বই পড়তে পড়তে লেখার ইচ্ছে করবে- সেটাই স্বাভাবিক। পরিবারে সেটা নিয়ে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে, তাই লেখালেখি করেছি। সত্যি কথা বলতে কি, লেখালেখি না করাটাই হয়তো অস্বাভাবিক হতো। তবে লেখালেখি করে লেখক হিসেবে পরিচিতি হবে- সেটা কখনোই মাথায় ছিল না। লেখালেখি করেছি মনের আনন্দে।
 
সিরাজুল ইসলাম আবেদ:  'দীপু নাম্বার টু'র দীপু বা 'কাজলের দিনরাত্রি'র কাজল কিংবা 'আমি তপু'র তপুর মধ্যে মুহম্মদ জাফর ইকবালের কৈশোরকে দেখার সুযোগ কতটুকু?
 
কিশোর উপন্যাসের প্রায় সবটাতেই আমার [কিংবা আমার প্রজন্মের] কৈশোরের ছাপ পাওয়া যেতে পারে। তবে 'কাজলের দিনরাত্রি' বা 'আমি তপু' একটু ব্যতিক্রম। এ বই দুটির চরিত্রগুলোর যে জটিলতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে; আমার জীবনে কখনোই সেই জটিলতা ছিল না।
 
সিরাজুল ইসলাম আবেদ: কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা রাখছেন, সে সময় শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। আপনার বাবা যুদ্ধে গেলেন; আপনি গেলেন না?
আমার বাবা যে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে অস্ত্র হাতে পাকিস্তানিদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন, তা নয়। পুলিশ অফিসার ছিলেন, সেই হিসেবে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করেছেন, যার জন্য পাকিস্তানি মিলিটারির হাতে তার প্রাণ দিতে হয়েছে। আমি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে অনেক চেষ্টা করেছিলাম, পারিনি। সবার কপালে সবকিছু থাকে না; আমার কপালে এটা ছিল না। সৃষ্টিকর্তা আমার সব ইচ্ছা পূরণ করেছেন; এটা করেননি। কেন করেননি, জানি না! [কে জানত- পাকিস্তানিরা এত ভীরু, কাপুরুষ আর দুর্বল যে, মাত্র ৯ মাসে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যাবে!]
 
সিরাজুল ইসলাম আবেদ: মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশ, ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে নতুন এক রাষ্ট্রের পথচলা এবং আপনি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ূয়া এক শহীদ পরিবারের সন্তান- সে সময়কার সংগ্রামের কথা বলবেন কি?
 
সেটি ছিল খুব কঠিন সময়; খানিকটা আগেই বলেছি। তখন বুঝতে পারিনি; যখন পেছন ফিরে তাকাই তখন মাঝেমধ্যে অবিশ্বাস্য মনে হয়- কেমন করে আমরা টিকে ছিলাম! দুঃখ-কষ্ট, ঝামেলা, দুর্বলতার কথা বলতে ভালো লাগে না। তাই সেগুলো আর নাই বললাম। কিন্তু কেউ যেন মনে না করে- সময়টুকু শুধু দুঃসময় ছিল। একই সঙ্গে সেটি ছিল আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের মাথা তুলে দাঁড়ানোর সময়। নাসির উদ্দীন ইউসুফ পরিচালিত, সেলিম আল দীনের লেখা নাটকে আমিও অভিনয় করেছিলাম, যেটি টিএসসিতে মঞ্চস্থ হয়েছিল। নির্মলেন্দু গুণের কবিতার বই 'প্রেমাংশুর রক্ত চাই' প্রকাশিত হলো; আমরা মুগ্ধ হয়ে সেই কবিতাগুলো পড়তাম। শাহাদত চৌধুরী সম্পাদিত 'বিচিত্রা' তখন একমাত্র সাময়িকী' কী আধুনিক পত্রিকা! আমার লেখা প্রথম ছোটগল্প 'ছেলেমানুষী' প্রকাশিত হলো। গর্বে মাটিতে আমার পা পড়ে না। গান, কবিতা, ছোটগল্প, নাটক, বিজ্ঞান- সবকিছু নিয়ে সত্যিকারের রেনেসাঁ।
 
সিরাজুল ইসলাম আবেদ: পত্রপত্রিকায় বিভিন্নাম বা নিবন্ধে সমাজ ও রাজনীতি সচেতন একজন প্রগতিশীল জাফর ইকবালকে আমরা পাই। এসব বিষয়কে উপজীব্য করে ঔপন্যাসিক হিসেবে আপনাকে আমরা পাই না।
 পাবেন না! ছোট বাচ্চারা আমাকে খুন করে ফেলবে। তারা আমাকে বলেছে, সবাই বড়দের জন্য লেখে। খবরদার আপনি বড়দের জন্য লিখতে পারবেন না। আমাদের দেশের সাহিত্যিকদের জন্য আমি অবশ্য একটু দুঃখ অনুভব করি, খুবই সীমিত কিছু বিষয়ে আরও সীমিত প্রকাশভঙ্গিতে তাদের লিখতে হয়। এই মুহূর্তে পৃথিবীর অন্য সাহিত্যিকরা যেভাবে লিখতে পারেন, তাদের যে অবিশ্বাস্য স্বাধীনতা আছে; আমাদের লেখকদের তার বিন্দুমাত্র নেই।
 
সিরাজুল ইসলাম আবেদ: প্রচুর সায়েন্স ফিকশন, কিশোর উপন্যাস, গল্প, এমনকি ভূতের গল্পও লিখেছেন। এর পর আপনাকে আমরা দেখি ইতিহাসকার হিসেবে। লিখলেন 'মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস'। মাত্র ২২ পৃষ্ঠায় এত বড় একটা ক্যানভাসকে ধারণ! ভেতরের গল্পটা বলবেন?
 ভেতরের গল্পটা সহজ। জোট সরকারের আমলের একটা শ্বাসরুদ্ধকর সময়- মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার, অবমাননা করার সব রকম চেষ্টা চলছে। আমরা সমমনা বেশ কিছু মানুষ বসেছি কী করা যায়, সেটা নিয়ে কথা বলতে। সুন্দর সুন্দর পরিকল্পনা এসেছে। আমি তার মাঝে বললাম, আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ। নতুন প্রজন্ম যদি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসটুকু জানে, তাহলে তারা দেশের জন্য যে ভালোবাসা অনুভব করবে, সেটি আর অন্য কোনোভাবে সম্ভব নয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসটুকু হবে ছোট, যেন এক কাপ চা খেতে খেতে পড়ে ফেলতে পারবে, বাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে পড়ে ফেলতে পারবে কিংবা দুই ক্লাসের বিরতির মাঝখানে পড়ে ফেলতে পারবে। প্রতিটি লাইনের রেফারেন্স থাকবে, যেন কেউ এর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে না পারে। ইতিহাসটি হবে এক ফর্মার নিউজপ্রিন্টের হ্যান্ডবিলের মতো। পড়ে ফেলে দিলেও ক্ষতি নেই। মূল্য হবে খুব কম, যেন পয়সা খরচ না হয়।

যারা উপস্থিত ছিলেন তারা আমার প্রস্তাবটি লুফে নিলেন, কিন্তু নিউজপ্রিন্টের হ্যান্ডবিল করতে রাজি হলেন না। সেটা যেন সংগ্রহ করে রাখা যায়, সেই রূপটি দেবেন বলে ঠিক করলেন। সেই ঘরটিতে একটি কম বয়সী বাচ্চা মেয়ে ছিল। সে ইতস্তত করে বলল, 'যদি সেই ইতিহাসটি জাফর ইকবাল স্যার লেখেন, তাহলে আমাদের বয়সী ছেলেমেয়েরাও সেটা পড়ে ফেলবে।' তার কথাটা মেনে নিয়ে আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হলো।

এই হচ্ছে ইতিহাস। এটা লিখতে আমাকে যে পরিশ্রম করতে হয়েছে, সেই পরিশ্রম করে ১০টা সায়েন্স ফিকশন লেখা যেত। শেষ পর্যন্ত এক ফর্মার মাঝে আটকানো যায়নি, একটু বড় হয়ে গেছে।
 
সিরাজুল ইসলাম আবেদ: আমরা অনেক কিছুতেই প্রভাবিত হই- ব্যক্তি, বিষয়, ঘটনা। আপনার জীবনে তেমন কিছু আছে কি?
অবশ্যই, অনেক কিছুই আছে। সেই ঘটনাগুলো আমি আমার লেখালেখিতে উল্লেখও করেছি। যেহেতু এই মুহূর্তে লেখালেখি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেই বিষয়েই বলি।

জাহানারা ইমাম নিউইয়র্ক গেছেন। তার সঙ্গে আমার পরিচিত হওয়ার খুব শখ। আমি তাই খুব কুণ্ঠিতভাবে তার কাছে গিয়ে বললাম, 'আপনি আমাকে চিনবেন না, আমার বড় ভাই হুমায়ূূন আহমেদ বাংলাদেশের খুব বড় লেখক। আমি তার ছোট ভাই মুহম্মদ জাফর ইকবাল।'

জাহানারা ইমাম আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, "আমি তোমাকেও চিনি। আমি তোমার সায়েন্স ফিকশন 'কপোট্রনিক সুখ দুঃখ' পড়েছি।" তার পর আমার লেখালেখি নিয়ে খুব দয়ার্দ্র কিছু কথা বললেন। শুনে আমি একেবারে হকচকিয়ে গেলাম।

আমি তখন আমেরিকায় থাকি। দুই-চারটা বই দেশে ছাপা হয়েছে, সেগুলো আমার হাত পর্যন্ত পৌঁছায় না। দেখতে কেমন, পড়তে কেমন জানি না! কেউ পড়ছে কি-না, তাও জানি না। জাহানারা ইমামের কথা শুনে আমার ভেতরে ম্যাজিকের মতো কিছু একটা ঘটে গেল। আমার মনে হলো, তার মতো একজন মানুষ যদি আগ্রহ নিয়ে আমার বই পড়ে থাকেন, তাহলে এখন থেকে আমি নিয়মিত লিখব। সেই থেকে আমি নিয়মিত লিখে আসছি। সব দায়দায়িত্ব শহীদ জননী জাহানারা ইমামের।
 
সিরাজুল ইসলাম আবেদ: আপনার নিজের রচনার মধ্যে কোনগুলো আপনার প্রিয়?
 আমি ঠিক জানি না, এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সম্ভব কি-না! আমার স্মৃতি খুব দুর্বল। তাই আগে কী লিখেছি মনে থাকে না। [খুব আশঙ্কা আছে, আগে লেখা কোনো একটা কাহিনী আবার লিখে ফেলব!] কিছুদিন আগে হঠাৎ আমার পুরনো একটা বই পড়তে পড়তে মনে হলো, 'আরে, ভালোই তো লিখেছিলাম!' কাজেই বলা যেতে পারে, যেসব লেখালেখি আমি ভুলে গেছি, সেগুলো যথেষ্ট প্রিয়।
 
সিরাজুল ইসলাম আবেদ: আপনি যতই বলুন- আপনি শুধু কিশোরদের জন্য লিখে থাকেন; তার পরও বড়দের জন্য লেখা 'একজন দুর্বল মানুষ' কিংবা 'রঙিন চশমা' ইত্যাদি গ্রন্থে আমরা পরিণত, বয়স্ক পাঠকের রচয়িতাকেই পাই। পরিণত পাঠকদের জন্য লিখতে আপনার দ্বিধা কেন?
 আমার কোনো দ্বিধা নেই, ভয় আছে। ছোট বাচ্চারা তাহলে আমাকে খুন করে ফেলবে। তারা যদি আমাকে অনুমতি দেয়, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের ওপর আমার একটা বড় উপন্যাস লেখার ইচ্ছা আছে। এটি হচ্ছে আমার জীবনের দ্বিতীয় ইচ্ছা। এটা যদি শেষ করতে পারি তাহলে আমি মনে করব, আমার দায়িত্বের একটা ধাপ শেষ হলো। তখন পরের ধাপ নিয়ে কাজ শুরু করব।
 
সিরাজুল ইসলাম আবেদ: আপনার প্রিয় লেখক কারা?
 এ প্রশ্নেরও মনে হয় উত্তর নেই। লেখকদের নাম বলে শেষ করা যাবে না। কোনো কোনো লেখক হয়তো শৈশবে বা কৈশোরে খুব প্রিয় ছিলেন, এখন বড় হয়ে গেছি বলে তার লেখা পড়ি না। কিন্তু আমার প্রিয় লেখকের তালিকায় অবশ্যই তার নাম থাকতে হবে। আবার এই মুহূর্তে যে লেখকের লেখা খুব আগ্রহ নিয়ে পড়ছি, তার নামটিও থাকতে হবে। কাজেই তালিকাটি শেষ করতে পারব না।

তবে প্রিয় কবির বেলায় কাজটি খুব সহজ। আমার প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশ। আগে সব সময় আমার ব্যাকপ্যাকে তার একটা বই থাকত। এখন আমি আমার করহফষব ই-বুক রিডারে তার বই রাখি! [যারা করহফষব ই-বুক রিডার বলতে কী বোঝায়, জানেন না তাদের জন্য বলছি :পৃথিবীতে বই প্রকাশনার যুগে একটা বিপ্লব ঘটেছে। মানুষ আজকাল কাগজের বই না পড়ে ই-বুক রিডারে বই পড়া শুরু করেছে। এর মাঝে সেটা প্রায় বইয়ের মতো হয়ে গেছে। একটু অভ্যাস হয়ে গেলে কোনো সমস্যাই হয় না। করহফষব একটি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড। তাদের ই-বুক রিডার থেকে যে কোনো সময় যে কোনো বই কিনে এক মিনিটের মাঝে পড়তে শুরু করা যায়। আগে বই কিনে রাখতাম পরে পড়ব বলে; পড়া হতো না। এখন বই কিনি আর পড়ি। কী মজা!]
 
সিরাজুল ইসলাম আবেদ: কোন কোন লেখকের লেখায় অনুপ্রাণিত হয়েছেন?
 যার লেখাই পড়ে আনন্দ পেয়েছি তার লেখাতেই অনুপ্রাণিত হয়েছি। একটি বই যদি আলাদা করে উল্লেখ করতে হয়, তাহলে সেটা মার্ক টোয়েনের লেখা টম সয়ার। কৈশোরে সেই বই পড়ে আমার মাথা ওলটপালট হয়ে গিয়েছিল। সেই থেকে আমি তার মতো করে লেখার চেষ্টা করে যাচ্ছি।
 
সিরাজুল ইসলাম আবেদ: প্রতিবেদককের পক্ষ থেকে আপনাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা।
 দিলেন তো মনে করিয়ে। মনে ছিল না, ভালোই ছিলাম! এই বয়সে কে জন্মদিনের কথা মনে করতে চায়!

সূত্র: সমকাল

আর/১২:১৪/২৭ ডিসেম্বর

সাক্ষাতকার

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে