Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ২৮ মে, ২০২০ , ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

গড় রেটিং: 3.6/5 (19 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০২-২৩-২০১৩

মূলধারার সন্ধানে রাষ্ট্র ও প্রজন্মের পদযাত্রা

ফকির ইলিয়াস



	মূলধারার সন্ধানে রাষ্ট্র ও প্রজন্মের পদযাত্রা

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম একটা নিয়মিত কলাম লিখতেন। শিরোনাম ছিল- 'মূলধারায় চলেছি'। ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক সময়’-এ তা ছাপা হতো। সময়-এর সম্পাদক ছিলেন ড. জাহেদা আহমদ। সম্পাদকম-লীর সভাপতি ছিলেন ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। আমি ছিলাম সেই কাগজের নিউইয়র্ক প্রতিনিধি। শহীদ জননী যে সংগ্রাম শুরু করেছিলেন, তা ছিল প্রজন্মকে মূলধারা জানানোর সংগ্রাম। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ- যে চার মূলনীতিতে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির অভ্যুদ্বয় হয়েছিল, সেই চেতনা উজ্জ্বল করার সংগ্রাম।

যখন এই দেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়, তখন জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল। সেদিন কোনো ভেদাভেদ ছিল না। আর এটাই ছিল স্বাধীনতার মূলমন্ত্র। খুবই আশার কথা ২০১৩ সালে আমরা সেই চেতনা প্রজন্মের মাঝে দেখছি। দেখছি গোটা দেশজুড়ে কিভাবে মানুষ দাঁড়িয়েছে একাত্তরের হায়েনাদের বিরুদ্ধে। গণজাগরণের দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় পার হয়েছে। এর মধ্যে আহমেদ রাজীব হায়দারকে কুপিয়ে হত্যা করেছে একাত্তরের নরঘাতকের উত্তরসূরিরা। কী ভয়ানক আক্রমণ! এর পরে রাজীব হায়দারকে ‘ইসলাম বিরোধী’ তকমা দিয়ে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহের চেষ্টা ওরা করেছে। কিন্তু সফল হতে পারেনি। কারণ গণজাগরণের পক্ষের সাইবার টিম ইতোমধ্যে ধরে ফেলতে পেরেছে রাজীব হায়দারের নামে যে ব্লগটি করা হরেছিল, তা তাকে খুনের উদ্দেশেই করা। কেমন জঘন্য মানসিকতা ওদের!
 
এ বিষয়ে কিছু কথা বলা খুবই জরুরি দরকার। তা হচ্ছে, একাত্তরেও এসব হায়েনা ‘ধর্মযুদ্ধ’ বলে চালাবার চেষ্টা করেছিল। তা এদেশের মানুষ ভুলে যাননি। এই ২০১৩ সালেও তারা একই কায়দা অনুসরণ করছে। কিন্তু এ সময়ের মানুষ যে আরো সচেতন, তা কি তারা জানে না? একাত্তরে কিভাবে গণহত্যা করা হয়েছিল, তা এখনো গুগল সার্চ দিলেই প্রজন্ম জানতে-দেখতে পারছে। মহান মুক্তিসংগ্রামের সমৃদ্ধ আর্কাইভ গড়ে উঠেছে। এসব দালিলিক প্রমাণ তো অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। আর বর্তমান প্রজন্ম দাঁড়াচ্ছে সেই সত্যের ওপর ভর করেই। এদেরকে দমানো যাবে না। কারণ সত্য সব সময়ই বিজয়ী হয়। এই গণজাগরণের মাঠেই আন্দোলনরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন ব্লগার, নাট্য পরিচালক তরিকুল ইসলাম শান্ত। এই যে আত্মদান তা ইতিহাসের অংশ হয়েই থাকবে। কারণ আমরা জানি শহীদ আসাদের রক্তের ধারা বহন করেই এসেছিল আমাদের বিজয়, আমাদের স্বাধীনতা। আর এর সূতিকাগার তৈরি করেছিলেন শহীদ বরকত-রফিক-জব্বার-রফিক প্রমুখ। আমাদের মনে রাখা দরকার, আমাদের বিজয় লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত। তা নিয়ে আপোস করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের জন্য কিছু হায়েনা সেই ১৯৭২ থেকেই তৎপর। জাতির জনককে নির্মমভাবে হত্যার পর মূলত এরা যে কাজটি করে তা হচ্ছে, ঘাতক দালালদের রাজনৈতিক পুনর্বাসন।
 
দুই. ২০১৩ সালে এসে বাংলাদেশে মূলধারা প্রতিষ্ঠার যে আন্দোলন চলছে সে বিষয়ে কিছু জরুরি আলোকপাত দরকার। বাংলাদেশের ব্লগার রাজীব হায়দারকে হত্যা করার পর উল্লাস করা হচ্ছে পাকিস্তানিদের ব্লগে। এর কারণ কি? বিএনপির চিফ হুইপ জয়নাল আবদিন ফারুক বলেছেন- জামাতের সঙ্গে বিএনপির ঐক্য অটুট থাকবে। বেগম খালেদা জিয়ার মনের কথাটিই বলে দিয়েছেন তিনি। এর বেশি আমাদের আর শোনার দরকার নেই। আমরা আগেও জানতাম, এখনো জানছি বিএনপিই বাংলাদেশে মৌলবাদ- জঙ্গিবাদের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। আমরা দেখছি আন্তর্জাতিক ওয়ার ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল আইনটি সংশোধিত আকারে পাস হয়েছে। আইনটি পাস হয়েছে এক সপ্তাহের মাঝেই। এটা অত্যন্ত শুভ লক্ষণ। দেশ-প্রজন্ম-জাতি মূলধারার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। যে স্বপ্ন আমার প্রজন্ম ২১ বছর আগে দেখেছিল, সেই স্বপ্নের আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছে এই সাইবার প্রজন্ম। শাহবাগের এই উত্তাল ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বিশ্বে। দুটো বিষয়ে খেয়াল রাখা জরুরি ১। কোনোভাবেই আমরা কেউ যেন কোনো ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরুদ্ধে কথা বলে টার্গেটে পরিণত না হই। বিষয়টা যেহেতু খুব সেনসিটিভ, তাই তা এড়িয়ে যেতে হবে গোটা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ প্রজন্মকে। ২। রাজাকার-পাকিজাত ভ্রান্তরা নারী-নেশা প্রভৃতি বিষয়ে জড়িয়ে শাহবাগ প্রজন্মকে টার্নডাউন করতে চাইছে- চাইবে। সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। মনে রাখা দরকার, আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এই আলবদর অজগরদের নির্মূল করতে না পারলে তারা ছোবল দেবে যে কোনো সময়- তা আমরা যেন ভুলে না যাই।
 
আমরা লক্ষ করছি, দ্বীপবাস থেকে অনেকেই বেরিয়ে আসছে। খসে পড়ছে তাদের মুখোশ। ঢাকাইয়া সাহিত্যের পাহারাদার বলে স্বঘোষিত কিছু কলমবাজ নানাভাবে শাহবাগ আন্দোলনকে ‘নারাজি’ দিচ্ছে। এদের অতীত ইতিহাস বলে, এরা মূলতই সুবিধাবাদী। মওলানা মওদুদি- ব্রিটিশ থেকে পাকিস্তানের স্বাধীনতা চায়নি। পরে এই পাকিস্তানেই মৌলবাদী রাজনীতি করেছে। জামাতিরাও বাংলাদেশ চায়নি। পরে এই বাংলাদেশেই তারা রাজনীতি করে হাজার কোটি টাকা বানিয়েছে। শাহবাগ নিয়ে লিখিত, পঠিত, সংগঠিত শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিও টিকে থাকবে। কারণ এই প্রজন্ম মূলধারার অন্বেষণ করছে। স্যার ফজলে হাসান আবেদ-ড. মোহাম্মদ ইউনুস কিংবা অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদরা শাহবাগে যাননি। এরা শহীদ জননী জাহানারা ইমামের সঙ্গেও ছিলেন না। তাই তা নিয়ে ভাবিত হবার কোনো কারণ নেই। শেষ পর্যন্ত ড. কামাল হোসেন শাহবাগে গিয়েছিলেন। আমি মনে করি, প্রজন্ম যে ডাক দিয়েছে, নিজ অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই রাজনীতিকদের সেখানে সংহতি জানানো দরকার।
 
মনে রাখা দরকার সাইবার জগতে মৌলবাদী প্রজন্মও কিন্তু বসে নেই। তারা নানা গ্রুপ করে অপপ্রচার চালাচ্ছে। অনেক সৃজনশীল, দেশপ্রেমিক, ধর্মে বিশ্বাসী, স্বনামধন্য ব্লগারদের যারা ‘ইসলাম বিরোধী’ তকমা দিয়ে ঘোলা জলে মাছ শিকার করতে চায়- তাদের স্বরূপ উন্মোচনের সময় এসেছে। এরা কি ভুলে গেছে তাদের নেতা-নেত্রীরা বিদেশে এসে কিভাবে মদ গিলে, অ- রোজাদার থাকে, পতিতা পল্লীতে যায় তার অনেক ডকুমেন্টই আর্কাইভে সংরক্ষণ করা আছে। ধর্ম ব্যবসার নামে যারা রাজনীতি করে- তাদের সন্তানরা বিদেশে কী কী কুকর্ম করে তার ফর্দও অনেক দীর্ঘ। তা অনেকেরই জানা। কিছু কিছু মিডিয়ায় রিপোর্ট লিখে বাংলাদেশের গণজাগরণ আর ঠেকানো যাবে না। এদেশের মানুষ রাজাকারদের সর্বোচ্চ শাস্তি চায়। বাংলাদেশ সেই নতুন সূর্যের আলোতে আলোকিত হবেই।
 
বেগম খালেদা জিয়ার একটি বিবৃতি প্রচার করা হয়েছে সম্প্রতি। তিনি শাহবাগ আন্দোলনকে দখল করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বল তার কোর্টে নয় বলেই এমন মন্তব্য করছেন বেগম জিয়া? মাহমুদুর রহমান, পিয়াস করিম কিংবা আসিফ নজরুলই শুধু নয়, আরো যারা মুখোশ পরে দেশের গণজাগরণের বিরুদ্ধে নানারকম কুৎসা রটনা করতে চাইছে, এদের বিরুদ্ধেও জনমত গড়ে তোলা দরকার। ভুলে গেলে চলবে না- এই গণজাগরণকে ভিন্ন খাতে প্রবাহের ডানপন্থী মরণকামড় অব্যাহত রয়েছে। বিএনপির যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন বলে দাবি করেন- তারাও ভুলে গেছেন একাত্তর। এর কারণ কী? কারণটি হচ্ছে- তারা না বুঝেই যুদ্ধে গিয়েছিলেন। অথবা চাপে পড়ে হাতিয়ার তুলেছিলেন হাতে। একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার বিপ্লব থামে না। থামতে পারে না। নাৎসিদের বিচার আজো হচ্ছে। তা কি আমরা মনে রাখবো না? শাহবাগের গণজাগরণ থেকে নতুন ঘোষণা এসেছে। বলা হয়েছে ২১ ফেব্রুয়ারি সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানাতে হবে। যে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নেই সেসব প্রতিষ্ঠানে অস্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ করতে হবে। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি গাইতে হবে। কী চমৎকার কথা! কী স্পর্ধিত উচ্চারণ !! অভিনন্দন, হে তরুণ প্রজন্ম। স্যালুট তোমাদের।
 
আমরা খুব গভীরভাবে দেখছি, অন্যান্য অনেক ইস্যু নিয়ে কথা বাড়িয়ে গণমানুষকে বিভ্রান্ত করতে চাইছে কেউ কেউ। অন্যান্য ইস্যু দিয়ে ঘাতকদের বিচারের দাবি ঢেকে দেয়ার চেষ্টা এক ধরনের চালিয়াতি। আমাদের লক্ষ্য ‘ক্রিস্টাল ক্লিয়ার’ হওয়া দরকার। শাহবাগ আন্দোলন কিন্তু আমাদের হাজার হাজার ফেসবুক ফ্রেন্ডদের অবস্থান চিহ্নিত করতে খুব সাহায্য করছে। অতএব সাধু সাবধান! বলে রাখি, এদের সঙ্গে তর্কে না গিয়ে এদের বন্ধু তালিকা থেকে বাদ দেয়া এবং ব্লক করে রাখাই উত্তম কাজ। এর কোনো বিকল্প নেই। কারণ এদের সঙ্গে তর্ক করা অযথা সময় নষ্ট করা মাত্র। হ্যাঁ, অনলাইন, ব্লগ, ফেসবুক যে মানুষকে সত্যের পথে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে শাহবাগ তার প্রমাণ। এই মূলধারার চেতনা গোটা দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া দরকার। গ্রামে গ্রামে, এলাকায় এলাকায় গণজাগরণ ছড়িয়ে দেবার ডাক এসেছে। হাতের মোবাইল ফোন হয়ে উঠেছে মানুষের ঐক্য-ডাক-সংহতির প্রতীক। এই ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। রাষ্ট্রপক্ষ তার কাজ করবে। কিন্তু শক্তি জোগাতে হবে গণমানুষকে। এই দুই সপ্তাহেরও অধিক সময় দেশের মানুষ সেই শক্তি জুগিয়েছেন। আরো জোগাবেন। আমরা সেই প্রত্যয় অবশ্যই করছি। জয় বাংলা ।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে