Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ২৩ আগস্ট, ২০১৯ , ৮ ভাদ্র ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (70 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ১২-১৬-২০১৭

'স্বপ্নের বাংলাদেশ হবে ধর্মনিরপেক্ষ'

আহমেদ কুতুব


'স্বপ্নের বাংলাদেশ হবে ধর্মনিরপেক্ষ'

'মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির স্বপ্ন ছিল স্বাধীন বাংলাদেশ হবে সুখী ও সমৃদ্ধ একটি কল্যাণকামী দেশ। এ দেশটি হবে সমাজতান্ত্রিক চেতনার, ধর্মনিরপেক্ষ ও সবার সমান অধিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। দেশের সকল জাতি, গোষ্ঠী, ধর্ম, বর্ণের মানুষ সমানভাবে বসবাস করবে। এখানে কোনো হানাহানি, কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। আগেও এমন বাংলাদেশ কল্পনা করেছিলাম। এখনো এমন বাংলাদেশ কল্পনা করছি। আমৃত্যু এমন বাংলাদেশের কল্পনা ও স্বপ্ন দেখে যাব।'

স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশ ৪৬তম বর্ষে পদার্পণের আগে প্রতিবেদকের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে দেশ নিয়ে এমন প্রত্যাশার কথা জানালেন শহীদজায়া বেগম মুশতারী শফি।

শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করে তিনি বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সে জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ খুব ভালো চলছে। অর্থনৈতিকভাবে দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি [শেখ হাসিনা] যোগ্যভাবে দেশ চালাচ্ছেন। বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের আসন আজ অনেক উঁঁচুতে। আমরা চাই বাংলাদেশ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আরো বহু উপরে উঠবে।'

তবে শেখ হাসিনার এসব অর্জন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কিছু কর্মকাণ্ডে ম্লান হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি—'প্রতিদিনই পত্রিকার পাতা উল্টালে ছাত্রলীগ-যুবলীগের খুনোখুনি, টেন্ডারবাজি আমাদের জন্য সুখকর নয়। মনে দাগ কাটছে। সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি করছে। এদের কঠোরভাবে রুখতে হবে। তা না হলে শেখ হাসিনার সব অর্জন শেষ হয়ে যাবে। দেখতে হবে ছাত্রলীগ-যুবলীগে জামায়াত-শিবিরের কেউ ঢুকে এ সন্ত্রাস করছে কি-না?'

জায়ামাত-শিবিরকে নিষিদ্ধ না করায় ক্ষোভ রয়েছে জানিয়ে এ শহীদজায়া বলেন, 'জামায়াত-শিবিরকে রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ করা না হলে তারা স্বাধীন বাংলাদেশে আবারো ফণা তুলে উঠবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বপ্নের বাংলাদেশকে আবারো ক্ষতবিক্ষত করে দেবে। এদের রাজনীতিতে রেখে দিয়ে স্বপ্নের বাংলাদেশ আমি কল্পনা করতে পারি না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আবেদন—তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হোক। কারণ যুদ্ধাপরাধীরা এবং তাদের দল জামায়াত-শিবিরের বাংলাদেশে রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই। মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী মানুষকে শহীদ করে তারা এ দেশে রাজনীতি করার কোনো অধিকার রাখে না।'

চট্টগ্রামসহ সাত বিভাগীয় শহরে সরকারিভাবে সাতটি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর স্থাপনের দাবি জানিয়ে মুশতারী শফি বলেন, 'স্বাধীনতার পর ৪৭ বছর চলে যাচ্ছে। চট্টগ্রামে আমরা ব্যক্তিগতভাবে একটি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর করতে চেয়েছিলাম। তা নানা কারণে সম্ভব হয়নি। সরকার ঢাকায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর করেছে। সেজন্য শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ। চট্টগ্রামেও সরকারিভাবে একটি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর করতে হবে।

কারণ মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের অনেক স্মৃতি ব্যক্তিগতভাবে শহীদ পরিবার, মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষদের ঘরে বা ব্যক্তিগতভাবে সংরক্ষণে রয়েছে। যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় এসব স্মৃতি সংরক্ষণ করেছিলেন তাদের অনেকে মারা গেছেন। প্রতিদিনই কেউ না কেউ মারা যাচ্ছেন। চট্টগ্রামে একটি সরকারি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর থাকলে আমাদের কাছে যেসব যুদ্ধকালীন স্মৃতি আছে তা জাদুঘরে দিয়ে একটি সংগ্রহশালা তৈরি করে দিয়ে যেতে পারতাম। আগামী প্রজন্ম তা দেখে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারত। স্মৃতিগুলো বিচ্ছিন্নভাবে পড়ে না থেকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ হত।'

আগামী প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানাতে বধ্যভূমি সংরক্ষণ করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি—'বধ্যভূমির মধ্যে অনেক বধ্যভূমি বিলীন হয়ে গেছে। দুই-একটি সরকার সংরক্ষণ করেছে। চট্টগ্রাম শহরে ১৪টি বড় বধ্যভূমি থাকলেও কয়টি সংরক্ষণ করা হয়েছে তা কেউ বলতে পারবে না। অসংখ্য বধ্যভূমি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে—এগুলো চিহ্নিত করতে হবে। তারপর তা সংরক্ষণ করতে হবে।আগামী প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানাতে এবং তাদের সামনে তুলে ধরতে হলে বধ্যভূমি সংরক্ষণ করা জরুরি।'

'স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র' সংরক্ষণ করাও জরুরি বলে মনে করেন শহীদজায়া মুশতারী শফি—"২৫ মার্চ যখন চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ প্রচার করতে দেওয়া হয়নি, তখন বেতারে কর্মরত ১০ জন বাঙালির সবাই কাজ বন্ধ করে অঘোষিত ধর্মঘট শুরু করেন। পরে বেলাল মোহাম্মদ কালুরঘাটে রেডিও স্টেশনটি চালু করার পরিকল্পনা নেন। আমার স্বামী ডা. শফি চেম্বার থেকে ফিরে আসলে তাকে বিষয়টি জানান।

এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে বেলাল ভাইকে জড়িয়ে ধরেন ডা. শফি। পরে বেলাল মোহাম্মদ চলে যান। যাওয়ার আগে বেলাল ভাই বিকেল ৬টার সময় রেডিও চট্টগ্রাম স্টেশন আমাদের বাসায় চালু রাখতে বলে যান। বেলাল ভাইয়ের কথামতো রেডিও চট্টগ্রাম স্টেশন চালু রাখি। সন্ধ্যা ৭টার দিকে 'স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র' থেকে বলছি ঘোষণা পাঠ করেন আবুল কাশেম সন্দ্বীপ।

এরপর 'জয় বাংলা, বাংলার জয়'সহ দেশাত্মবোধক বেশ কয়েকটি গান প্রচার করেন তারা। একই সঙ্গে 'স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র' থেকে তখনই আবদুস সালাম 'কোরআন তেলাওয়াত' করেন। রাত সাড়ে ৮টার দিকে ইংরেজিতে 'স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের' ঘোষণা দেন আবদুল আল ফারুক। বাসায় বসে আমরা পরিচিত এসব কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছিলাম 'স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে'।

রাত সাড়ে ১২টায় তারা আমার বাসায় ফিরে আসেন। পরের দিন ২৬ মার্চ সকাল সাড়ে ৮টায় ডা. আবু জাফর চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে 'স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে' যান আওয়ামী লীগ নেতা এমএ হান্নান। তিনি বেতারে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর পাঠানো স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করতে চান। বেলাল মোহাম্মদ রাজি হন। ঘোষণাটি পাঠ করেন এমএ হান্নান। পরে এ ঘোষণা লিফলেট আকারে পুরো চট্টগ্রামে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধের সমৃদ্ধ ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে জানাতে 'স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রটি' সংরক্ষণ করা খুবই জরুরি।"

মেজর জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, "২৬ মার্চ বিকেলে বঙ্গোপসাগর থেকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে কামানের গোলা নিক্ষেপ করতে শুরু করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। গোলার শব্দ ও কম্পনে কেঁপে উঠতে থাকে পুরো চট্টগ্রাম। রাতে গোলাগুলো বাসা থেকে লাল হয়ে ছুটতে দেখেছি। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নগরীর স্টেশন রোডের কার্যালয়ে দফায় দফায় মিটিং করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন।

পাড়ায় পাড়ায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বাঙালিদের সংগঠিত করতে শুরু করেন। খবর পাচ্ছিলাম—আওয়ামী লীগ নেতা এম আর সিদ্দিকির বাসায়ও আওয়ামী লীগ নেতারা বৈঠকের পর বৈঠক করছিলেন। ২৭ মার্চ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ইপিআর বাহিনীর একটি গাড়ি আমাদের বাড়ির সামনে এসে থামে। মাহমুদ নামে এক অফিসার এসে ডা. শফির সঙ্গে একান্তে কথা বলেন।

তারপর ডা. শফি তার জিপে করে সবাই কালুরঘাট 'স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে' চলে যান। এর মধ্যে 'স্বাধীন বাংলা বেতার' থেকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য জনতাকে উজ্জীবিত করতে শুরু করলে চারদিক থেকে চাপ আসতে থাকে। এতে নিরাপত্তা সংকটে ভুগতে শুরু করেন বেলাল ভাই। তিনি পটিয়ায় গিয়ে থানার ওসি মো. আউয়ালের সহযোগিতা চেয়ে বেতার কেন্দ্রের নিরাপত্তার জন্য কয়েকজন পুলিশ সদস্য চান। ওসি সাহেব বেলাল ভাইকে বলেন, 'করালডাঙ্গা পাহাড়ে একজন মেজরের নেতৃত্বে কিছু বাঙালি সৈনিক অবস্থান করছেন।

তাদের সহযোগিতা নিতে পারেন।' ওসি একজন পুলিশ দিয়ে বেলাল ভাইকে করালডাঙ্গা পাঠান। সেখানে গিয়ে বেলাল ভাই তার পরিচয় দিয়ে মেজরের সঙ্গে কথা বলতে চান। মেজর জিয়া এগিয়ে আসলে তার কাছে বেতার কেন্দ্রের নিরাপত্তা চাইলে মেজর জিয়া তার সঙ্গে থাকা সৈনিকদের ৪-৫টি গাড়িতে করে বেতার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। তিনি পটিয়া থেকে চট্টগ্রামে আসার পথে আতঙ্কে ছুটতে থাকা মানুষদের অভয় দিয়ে বলেন, 'ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বাঙালিরা পাক সেনাদের প্রতিরোধ করবে।' তারা বেতার কেন্দ্রে এসে চারদিক ঘিরে নিরাপত্তা দুর্গ তৈরি করেন।

সন্ধ্যায় বেলাল ভাই জিয়ার সঙ্গে আলোচনার এক ফাঁকে বলেন, 'বঙ্গবন্ধুর একটি ঘোষণা প্রচার করা হয়েছে। চাইলে সেটি আপনি মেজর হিসেবে একবার পাঠ করতে পারেন।' প্রথমে রাজি না হলেও পরে রাজি হন মেজর জিয়া। বেলাল ভাইকে তিনি বলেন, 'আমি বাংলা লিখতে জানি না।' বেলাল ভাই ঘোষণাটি বাংলায় লিখে দেওয়ার পর তা বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ঘোষণা করেন মেজর জিয়া।"

৩০ মার্চ পাকবাহিনী পুরো চট্টগ্রাম দখলে নেওয়ার পর বিভীষিকাময় পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে মুশতারী শফি বলেন, '৩০ মার্চ হঠাৎ করেই পুরো চট্টগ্রাম দখল করে পাকবাহিনী। তারা আস্তে আস্তে ডিসি হিল, বন্দরসহ পুরো শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলে। আতঙ্কে দিন কাটতে থাকে আমাদের। ৭ এপ্রিল আমাদের পুরো বাড়িটি ঘিরে ফেলে পাকবাহিনী। দুইজন মেজর এসে সভা-সমাবেশের ছবি দেখিয়ে আমাকে খুঁজতে থাকে। তারপর তারা আমার স্বামী ডা. শফি ও ছোট ভাই এহসানকে জিপে করে তুলে নিয়ে যায়।

যাওয়ার সময় বাসার তিন দিকে দুইজন করে ছয়জন আর্মি পাহারা বসিয়ে দিয়ে যায়। পরদিন দুইজন আর্মিকে সঙ্গে করে নিয়ে এসে দুইজন কাবুলিওয়ালা ৫০ হাজার টাকা ঘুষ চান। নগদ টাকা নেই জানিয়ে স্বর্ণ দিতে চাইলে তারা তা নিতে রাজি হননি। সেই রাতেই ৭ সন্তানকে নিয়ে বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে রাত ৪টার দিকে পালিয়ে চৈতন্যগলি কবরস্থানের লাশ গোসল করানোর ঘরে গিয়ে আশ্রয় নেই। ভোরে পাশের একটি বাড়িতে আশ্রয় নেই। সেখান থেকে একটি চিঠি লিখে ৭ ছেলে-মেয়েকে নগরীর আসকারদীঘিতে ছোট বোনের বাসায় পাঠিয়ে দেই।

আমি একটি বোরকা কিনে তা পড়ে ছুটে যাই মিরসরাইতে। মিরসরাইতে যাওয়ার সময় পথে পথে মানুষকে অমানুষিক নির্যাতন করতে দেখেছি। ধান ক্ষেতে মানুষের লাশ পড়ে থাকতে দেখেছি। সেখানে গিয়ে খানকা মাজার শরিফে আশ্রয় নিয়ে ছোট বোনের বাসা থেকে সন্তানদের নিয়ে আসি। ২৪ মে ভারতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে মিরসরাই থেকে রওনা দেওয়ার পর একটি স্কুলে গিয়ে আশ্রয় নেই। সেখানেও প্রচুর রক্ত দেখেছি। দুইজন দালালের সহযোগিতায় ছেলে--মেয়েদের নিয়ে ফেনী নদী পাড় হয়ে ভারতের উদয়পুরে যাই। বাংলাদেশ পাড় হয়ে ভারতে পা রেখেই অজ্ঞান হয়ে যাই।'

সূত্র: সমকাল

আর/০৭:১৪/১৬ ডিসেম্বর

সাক্ষাৎকার

আরও সাক্ষাৎকার

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে