Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ১৯ মে, ২০১৯ , ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (50 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ১২-০৫-২০১৭

জনগণ সব সময় নিয়ামক শক্তি

জনগণ সব সময় নিয়ামক শক্তি

দীর্ঘদিন পর বিচ্ছিন্ন কিছু বাধাবিপত্তি ছাড়া বিএনপি শান্তিপূর্ণভাবে জনসভা করতে পেরেছে। এর আগে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করে এসেছেন।

তাঁর আসা-যাওয়ার পথে পথে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। এদিকে আগামী নির্বাচনও ক্রমে নিকটবর্তী হচ্ছে। কিছুদিন আগে দলটি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে অংশ নিয়েছে। বেশ কিছু দাবি করে এসেছে। মূলত সংসদের বাইরে থাকা এই প্রধান বিরোধী দলের সমাবেশ করতে পারার মধ্য দিয়ে চলমান রাজনীতিতে নতুন বাতাস বইছে। দলটির সাংগঠনিক প্রস্তুতি, নির্বাচনে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান, দেশের পরিস্থিতি ইত্যাদি বিষয়ে কথা বলেছেন দলের বর্তমান মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সাক্ষাত্কার নিয়েছেন এনাম আবেদীন ও শারমিনুর নাহার
 
প্রশ্ন : দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।

মির্জা ফখরুল : দেশ এখন একটা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সংকটটা বহুমাত্রিক।

প্রধান সংকট, দেশে এখন সাংবিধানিক জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের কাছে মনে হয়, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ জটিলতা। প্রধান বিচারপতি পদত্যাগ করেছেন। এখন পর্যন্ত পরবর্তী প্রধান বিচারপতি কে হবেন, সেটি নিশ্চিত না। তাহলে বলা যায়, প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য। দেশের ইতিহাসে এমন ঘটনা ঘটেনি।   দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্র তিনটি স্তম্ভের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকে। আইন, বিচার ও শাসন বিভাগ। এই তিন বিভাগই এখন নড়বড়ে। আইন বিভাগ বা বর্তমান সংসদ কোনো নির্বাচিত সংসদ নয়। কারণ এই আইন বা সংসদ বিভাগের সংসদ সদস্যরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হননি। সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৪ জন সংসদ সদস্য এসেছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে। আর বাকি ১৪৭ জনকে ভোট দিতে গেছে দেশের সর্বসাকল্যে মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ। তাহলে আমরা এটা বলতে পারি, এই সংসদে দেশের মোট জনসংখ্যার ৫ শতাংশ মানুষের সমর্থন আছে। তাই সাংবিধানিকভাবে জনপ্রতিনিধিত্বশীল যে সংসদের কথা বলা আছে, এই সংসদ সে সংসদ নয়। বিচার বিভাগ, বিশেষ করে বর্তমানে প্রধান বিচারপতির আসনের যে শূন্য অবস্থা তা প্রথমেই বলেছি। তৃতীয়ত, প্রশাসন বা শাসন বিভাগ। বর্তমান প্রশাসন পুরোপুরি দলীয়করণ হয়ে গেছে। এখানে প্রজ্ঞা, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতার কোনো মূল্য দেওয়া হয় না। দলের নির্দেশই, মানে সরকার যারা চালাচ্ছে, তাদের নির্দেশেই তারা সব করছে। অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, এ প্রশাসন বারবার ফেল করছে। খবরের কাগজ খুললেই হত্যা, খুন, গুম, ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, ডাকাতি, বাবা ছেলেকে খুন—সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি।
 
প্রশ্ন : শুধুই কি সামাজিক বিশৃঙ্খলা?

মির্জা ফখরুল : শুধুই সামাজিক বিশৃঙ্খলা নয়। আইন-শৃঙ্খলার চরম দুরবস্থা। কারণ যাদের হাতে এ কাজ, তারা অন্য কাজে ব্যস্ত। এক. ভিন্নমতের বিরোধী দলকে দমন। দুই. টাকা রোজগার করা। ফলে তাদের আসল যে কাজ সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা, আইনের শাসনের প্রতিষ্ঠা—এগুলো তারা করে না। করার সময়ই পায় না। দুই দিন আগেই খবরের কাগজে দেখলাম, সিআইডির লোক ৪৭ লাখ টাকা নিয়েছে একজনের কাছ থেকে। কক্সবাজারে ডিবির সাতজন টাকা আদায় করে সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েছে। এমন নানা ঘটনা অহরহ ঘটছে। র্যাবের এক ইন্সপেক্টরকে পাবলিক পিটুনি দিয়েছে। প্রতিদিন এসব ঘটনা ঘটছে। কিছুদিন আগে নারায়ণগঞ্জের সাত খুন, সেটাও তো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকদের হাতে হয়েছে। কেন এমন হবে?

একজন মানুষকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পরিবারের লোকজন দেখছে যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোক পরিচয় দিয়ে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। এরপর তার কোনো খবর নেই। এমন শত শত কেস আছে, যাদের কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছে না। ঢাকায় কিছু বিশিষ্ট নাগরিককে এমনভাবে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। যেমন অনিরুদ্ধ সরকার। দেখা গেল কয়েক মাস পর তাকে তাঁর বাসায় পাওয়া গেল। এর আগে ফরহাদ মজহারকে তুলে নিয়ে গেল। ভোরবেলা তাঁকে তুলে নিয়ে গেল আবার রাতে বিভিন্ন নাটক করে দিয়ে গেল। এরও আগে আমাদের সিলেটের এমপি ছিলেন ইলিয়াস আলী। তাঁকে গুম করা হয়। এখন পর্যন্ত তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। চৌধুরী আলম, পারভেজ এমপির কোনো খবর নেই। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোবাশ্বের, তাঁকেও নেওয়া হয়েছে। 

তাহলে জনগণ প্রশাসনের কাছে কী চাইবে? প্রশাসনের মাধ্যমেই যদি অপরাধ ঘটে, তাহলে জনগণ কার কাছে যাবে? ধরা যাক, কোনো একজন ব্যক্তির জমি দখল হয়ে গেছে। সে কার কাছে যাবে, নিশ্চয় পুলিশের কাছে? কিন্তু পুলিশ তার মামলা নেবে না। টাকা চাইবে। অনেক সময় টাকা দিতে চাইলেও মামলা নিচ্ছে না। মানুষ সত্যিকার অর্থেই অসহায়। কার কাছে যাবে? আর দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথা তো নতুন করে বলার নেই। প্রতিদিন খবর বের হয়—আজ অমুক ব্যাংক দেউলিয়া হলো, বেসিক ব্যাংক বন্ধ হয়ে গেল, অমুকে ঋণ করে টাকা ফেরত দিচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা হাইজ্যাক হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, কোনো কিছুই আসলে সরকারের আয়ত্তে নেই। সরকার সারা দিন উন্নয়নের কথা বলে যাচ্ছে; কিন্তু উন্নয়ন কোথায়? এই ঢাকা শহরেই কয়টা রাস্তা ভালো? ট্রাফিক সিস্টেমের কী দৈন্যদশা। এমন অবিশ্বাস্য যানজট অতীতে আর কখনো দেখিনি। গ্রামে বা নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য যে ‘সোশ্যাল সেফটিনেস’-এর পরিকল্পনা সেগুলো সব গণলুট হচ্ছে। কত টাকা প্রকৃত দরিদ্রদের কাছে পৌঁছাচ্ছে? প্রায়ই ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হয়। কিন্তু এসবের কোনো মামলা নেই। বিরোধী রাজনীতিবিদদের কটা মামলা আছে, দুর্নীতি কী—সেসব নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। অন্যদিকে হাজার হাজার কোটি  টাকা চলে যাচ্ছে, তা নিয়ে কোনো কথা নেই। শেয়ারবাজারে দুর্নীতির ঘটনা ঘটল। সার্বিক বিষয় নিয়ে একটি তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার কথা; কিন্তু আজও তা আলোর মুখ দেখল না।

প্রশ্ন : এখন তো আপনারা একটি সভা করলেন, পরিস্থিতির কি কোনো পরির্বতন মনে হচ্ছে?

মির্জা ফখরুল : এখন দেশের মূল সমস্যা—গণতন্ত্রহীনতা। আওয়ামী লীগ ১৯৭৪-৭৫ সালে একদলীয় শাসনব্যবস্থা বাকশাল তৈরি করেছিল। অন্য কোনো দল থাকবে না। শুধু আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাকশাল থাকবে। চারটি বাদ দিয়ে সেস ময় সব পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কেউ কোনো সংগঠন করতে পারবে না। কোনো ব্যক্তিস্বাধীনতা থাকবে না। একেবারে এককেন্দ্রিক নেতৃত্ব। আর কেউ কোথাও থাকতে পারবে না। একেবারে রেজিমেন্টেড। এবার তারা যা করেছে, বহুদলীয় গণতন্ত্রের কথা সংসদে বলা থাকলেও তারা সেটা করছে না। আমরা একটা মিটিং করতে চাইলেও অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু তারা অনুমতি দেয় না। এ কথা-সে কথা বলে। এটা কোনো গণতন্ত্রের শর্ত হতে পারে না। দেশ এখন চলছে একটা ছদ্মাবরণে একদলীয় শাসনে। আমরা যারা রাজনীতি করি, ভিন্নমত পোষণ করি, তারা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি, এটা একটি সিকিউরিটি স্টেট। আমার টেলিফোন ক্লোন করছে। সারাক্ষণ রেকর্ডেড হচ্ছে। কিভাবে একজন স্বাধীন মানুষ এখানে বসবাস করবে?

দীর্ঘদিন পর সভা করার অনুমতি পেলাম আমরা। এর মধ্য দিয়ে কিন্তু সরকারের কাছেও একটি বার্তা পৌঁছে গেছে।

প্রশ্ন : আপনারা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে অংশ নিয়েছেন। কিছু প্রস্তাবও দিয়ে এসেছেন। সেগুলো কি মানা হবে? 

মির্জা ফখরুল : এখন নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি ছিল আওয়ামী লীগের। এ জন্য তারা ১৭৩ দিন হরতাল করেছে। এই ১৭৩ দিনের মধ্যে তারা জ্বালাও-পোড়াও, মানুষ হত্যা—বহু কিছু করেছে। সেটাকে তারা যখন ২০০৮ সালে দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে সংসদে এলো তখন পরিবর্তন করল হাইকোর্টের একটি রায়কে ভিত্তি করে। যে রায়ে বলা হয়েছিল, পরবর্তী দুটি নির্বাচন হতে পারে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিতে। কিন্তু তারা সেটা করল না। তারা আবারও পুরনো পদ্ধতিতে নির্বাচন করল। ২০১৪ সালে তারা গায়ের জোরে নির্বাচন করল। এই নির্বাচনে কেউ অংশ নেয়নি। শুধু আমরা নই, কমিউনিস্ট পার্টি, গণফোরাম, বাসদ, ন্যাপ কেউ করেনি। এখন পর্যন্ত ওই বিষয়টার কোনো সুরাহা হয়নি। এখনো কেউ জানে না কিভাবে নির্বাচন হবে।

তারা নির্বাচন কমিশন গঠন করেছে। এখানেও তারা জাতিকে বিভ্রান্ত করেছে। বলা হলো, নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য সার্চ কমিটি করছি। সার্চ কমিটি কাদের নিয়ে গঠিত হলো? যাদের মধ্যে ৯০ শতাংশ ব্যক্তিই দলীয় (পার্টিজান)। রাজনৈতিক দলগুলোকে বলেছে, নাম দাও। আমরা নাম দিয়েছি। সেখান থেকে তাদের পছন্দমতো লোকদের তারা তুলে এনেছে। এদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করেছে। আমরা রাষ্ট্রপতির কাছে গিয়েছিলাম। আমাদের দাবি দিয়ে এসেছিলাম। এই নির্বাচন কমিশন গঠন করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ঠিক হোক। সেই নীতিমালার অধীনে সার্চ কমিটি ঠিক হোক। এরপর সেই সার্চ কমিটি একটি নির্বাচন কমিশন প্যানেল তৈরি করবে। সেখানে রাজনৈতিক দলগুলো মতামত দেবে। কিন্তু সেটা করা হলো না। এমন একজনকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নির্বাচিত করা হলো, যিনি অতীতে বহুবার এই রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেছেন। তার পরও আমরা মতগুলো নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে এসেছি। স্থানীয় নির্বাচনে আমরা অংশ নেব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। নির্বাচন কমিশন ডাকলে আমরা গেছি। কিভাবে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে সে প্রসঙ্গে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেছি। তার মধ্যে প্রথমেই আমরা বলেছি, নির্বাচনকালীন অর্থাৎ এই ৯০ দিন একটা নিরপেক্ষ সরকার থাকতে হবে, যাতে তারা নিরপেক্ষভাবে নির্বাচনের জন্য কাজ করতে পারে। ২. এখন যে সংসদ আছে, সেখানে তারা যে বিধান করেছে তাতে এই সংসদই থেকে যাবে। নতুন নির্বাচিত প্রতিনিধি এলে তারা তাঁদের হাতে ক্ষমতা দিয়ে তবেই যাবে। এটা তো পৃথিবীর কোনো সংসদীয় কাঠামোতে নেই। সংসদ অবশ্যই বাতিল করতে হবে। নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা করার আগেই বাতিল করতে হবে।

প্রশ্ন : এ সমস্যাগুলো থেকে উত্তরণের উপায় কী?

মির্জা ফখরুল : উত্তরণের উপায় হলো, যে সমস্যাগুলো সংকট তৈরি করেছে সেগুলো চিহ্নিত করে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে বসতে হবে। বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে বসে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে, সমঝোতার মাধ্যমে একটি পথ বের করতে হবে, যাতে পরবর্তী নির্বাচনের জন্য আমরা একটা পথ বের করতে পারি। আমরা বলছি না বিএনপিকে নিয়ে সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জনগণ যাকে নির্বাচিত করবে তাকে নিয়ে সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

প্রশ্ন : আপনার কি মনে হয় সরকারের দিক থেকে এমন কোনো আভাস আছে?

মির্জা ফখরুল : দেখুন, আভাসটা গুরুত্বপূর্ণ না। আর আভাস তো এখন দেখা যায় না। অনেক সময় হঠাৎই ঝড় আসে। এক-দুই মিনিটের মধ্যে ঝড় আসে। কালবৈশাখী আসার আগে ঈশান কোণে লাল দেখা যায়। লাল মানে একটা থমথমে ভাব। দেশ এখন সেই থমথমে ভাবের মধ্যে আছে। অনিশ্চয়তা, অস্থিতিশীলতা। বিশ্বাস নেই।  

প্রশ্ন : আর যদি সরকার গতবারের মতোই এবার নির্বাচন করতে চায়? 

মির্জা ফখরুল : এবার চাইলেই পারবে না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো এবার কোনো নির্বাচন এ দেশে হবে না।

প্রশ্ন : হলে কি প্রতিহত করা হবে?

মির্জা ফখরুল : দেখুন, এগুলো ফাটকা কথা। সেটা তখন দেখা যাবে। এই ধরনের একনায়কতন্ত্র, কর্তৃত্ববাদী সরকার বেশিদিন থাকে না। আইয়ুব খান ১২ বছর ছিলেন, এরশাদ ৯ বছর ছিলেন। তাদেরও কিন্তু ১০ বছর হয়ে যাচ্ছে। এই ১০ বছরে যে পরিস্থিতি হয়েছে, তাতে সরকারের উচিত হবে, বুদ্ধিমানের কাজ হবে এই মুহূর্তে একটি সমঝোতায় আসা। তা না হলে গোটা দেশের জন্য একটি ক্ষতিকর অবস্থা হবে।

প্রশ্ন : জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির জন্য খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। এই মামলার রায়ে যদি চেয়ারপারসনের সাজা হয়, তখন নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিএনপি কী সিদ্ধান্ত নেবে?

মির্জা ফখরুল : দলের চেয়ারপারসনের এই মামলা চলছে বিশেষ কোর্টে। সেটা সাধারণ আদালত নয়। একটা আলিয়া মাদরাসার ওখানে অস্থায়ী কোর্ট বসানো হয়েছে। এটা করা হয়েছিল বিডিআর সদস্যদের বিচারের জন্য। ওখানে দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে নিয়ে বিচার করা হবে। অন্যান্য আসামির ক্ষেত্রে এই মামলায় সময় দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের নেত্রীকে কোনো সময় দেওয়া হচ্ছে না। সাত দিন পর পর তারিখ পড়ছে। আমাদের প্রত্যেক নেতার বিরুদ্ধেই অসংখ্য মামলা করে রাখা হয়েছে। ফলে যেটা স্পষ্ট হচ্ছে যে এই দেশে আসলে কোনো গণতন্ত্র নেই। ভিন্নমত পোষণকারীদের কোনো অবস্থান নেই। কথা বললেই ধরে নিয়ে যায়। আপনাদের পত্রিকাতেও যদি আপনারা কিছু বলেন, তাহলে তুলে নিয়ে যাওয়া হবে। কোন রিপোর্টার এটা করলেন সে খোঁজে পরে যাবে। ইলেকট্রনিক মিডিয়াতেও তাই। বিএনপিকে একটু বেশি দেখানোর জন্য চাকরি চলে যাচ্ছে অনেকের। একে টক শোতে আনা যাবে না। তাকে যাবে না। ইত্যাদি। নানা কথা।

প্রশ্ন : ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ যে একতরফা নির্বাচন করল তাতে বিএনপির কোনো দায় আছে কি?

মির্জা ফখরুল : না, বিএনপির কোনো দায় নেই। দেখুন, গাড়ি যে চালায় পুরো নিয়ন্ত্রণ কিন্তু তারই হাতে। সে কখন থামবে, কখন কোথায় ব্রেক করবে, কখন ডানে যাবে, বাঁয়ে যাবে—এগুলো সবই তারই দায়িত্ব। তত্ত্বাবধায়কের দাবিতে তো সারা দেশ অচল হয়ে গেছিল। ঢাকা শহর বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। তখনই তো সরকারের দায়িত্ব ছিল উদ্যোগী হয়ে সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে নির্বাচন করার। তারা তো নির্বাচনই করল না। শেষ মুহূর্তে জাতিসংঘকে আসার অনুমতি দিল। তখন তারা এলো। তখন শিডিউল হয়ে গেছে। তার পরও আমরা বললাম, সাত দিন সময় দেওয়া হোক; কিন্তু তারা দেয়নি। ফলে অলিখিতভাবে তারা বলেছিল, এই নির্বাচন শুধু সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য। এরপর তারা এটা চেপে গেছে। কারণ তারা বুঝে গেছে যদি একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়, তাহলে তারা পরে ক্ষমতায় আসতে পারবে না। সরকারকে নমনীয় হতে হবে। সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। তাকে দায়িত্ব নিতে হবে।

প্রশ্ন : আপনারা কি এখন নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত?

মির্জা ফখরুল : আমরা তো সব সময় নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। আমাদের তো প্রার্থীর সমস্যা নেই। একেকটি আসনে তিনজন, চারজন প্রার্থী আছে। আমাদের সমস্যা হলো কোন পদ্ধতিতে আমরা নির্বাচনে যাব। দলের প্রস্তুতি নিয়ে অন্য কারো চিন্তা করার কোনো কারণ নেই। আমরা নির্বাচনমুখী দল। সব সময় নির্বাচন মাথায় রেখেই আমরা কাজ করি।

প্রশ্ন : সমাবেশে খালেদা জিয়া বলেছেন, শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন নয়?

মির্জা ফখরুল : প্রধানমন্ত্রী থেকে যদি নির্বাচন দেন, তাহলে সেই নির্বাচন জনগণ গ্রহণ করবে না।

প্রশ্ন : জামায়াত নির্বাচনী জোটে থাকবে কি?

মির্জা ফখরুল : আমাদের সঙ্গে তাদের যে জোট সেটা আগে ছিল নির্বাচনী জোট। এখন হলো আন্দোলনের জোট। নতুন করে ২০ দল গঠন করার পর থেকে জোট। চারদলীয় জোট নেই। ২০০৮ সালের পরে ঘোষণাপত্রে কর্তৃত্ববাদকে সরানোর জন্য আন্দোলনের জোট। ওটার এখনো কোনো পরিবর্তন হয়নি। এর মধ্যে অনেক ঘটনা ঘটেছে। জামায়াতে ইসলামীর প্রধান প্রধান নেতার ফাঁসি হয়েছে। লক্ষ করে থাকবেন, এসব রায় নিয়ে আমরা কোনো কথা বলিনি। আমরা বিচারপদ্ধতি নিয়ে কথা বলেছিলাম। অবশ্যই আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই। কিন্তু সেই বিচার হতে হবে নিরপেক্ষ, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের। এরপর জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে কোর্টের রায়ে। দলকে কিন্তু নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়নি।

প্রশ্ন :তারা তো নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না।

মির্জা ফখরুল : এখন পর্যন্ত পারবে না। ওরা কিন্তু আপিলেও যায়নি। দলের নামে তাদের মার্কা নিয়ে তারা নির্বাচন করতে পারবে না। কিন্তু দল হিসেবে তারা কাজ করতে পারবে। সরকার কিন্তু একটা ফাঁক রেখে দিয়েছে। এই ফাঁক রাখার বিষয়েই কিন্তু তাদের সুবিধাবাদ কাজ করেছে। এই সমস্যাটা জিইয়ে রাখা। নির্বাচনী উপাদান হিসেবে আবার ব্যবহার করা যাবে। সেটা তারা এখনো করছে। আমরা নির্বাচনী জোট নিয়ে এখনো কোনো আলোচনা করিনি। এ বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। জামায়াতে ইসলামী এখনো আমাদের সঙ্গে আন্দোলনের জোটে আছে।

প্রশ্ন : সরকারের বাইরে থাকা উদারপন্থী দলগুলোকে আনার একটা উদ্যোগ ছিল আপনাদের। সে বিষয়ে কোনো অগ্রগতি আছে কি?

মির্জা ফখরুল : ২০১৪ সালের আগে আমরা যাদের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনের উদ্যোগ নিয়েছিলাম তারা কেউই পরে নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমরা আবারও তাদের সঙ্গে কথা বলছি। তিন দল আছে এখনো। এদের সঙ্গে কথা হয় সিপিবি, বাসদ, টিপু বিশ্বাসের দল। গণসংহতির সঙ্গে কথা বলছি। অন্যদিকে ইসলামী দলগুলোর সঙ্গেও কথা বলছি গণতান্ত্রিকভাবে কিভাবে নির্বাচনে যেতে পারি।

প্রশ্ন : বিএনপি যদি ক্ষমতায় যায়, তাহলে তারা কি সুশাসন দিতে পারবে?

মির্জা ফখরুল : সব সময় দিয়েছে, আবারও দেবে। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ করেছিলাম। তখন আমাদের নিজেদেরই অনেক লোক আটকা পড়েছিল। আমরা এটা করব।

সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হোক। গণতন্ত্রের জন্য আমরা বহু প্রাণ দিয়েছি। এবারও হাজার হাজার লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাঁচ শর ওপরে মানুষ গুম হয়েছে। সারা বাংলাদেশ মামলায় জর্জরিত। এ অবস্থা থাকলে তাসের ঘরের মতো দেশের অর্থনীতি ভেঙে যাবে। এ কারণে সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হওয়া উচিত। সমঝোতার রাজনীতিতে আসা উচিত। সমঝোতার রাজনীতি সুশাসন, অর্থনৈতিক উন্নতি, মানুষের মূল্যবোধের উন্নতি—সব কিছুর জন্যই দরকার।  

প্রশ্ন : আমাদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

মির্জা ফখরুল : আপনাদেরও অনেক ধন্যবাদ।

এমএ/১০:৫০/০৫ ডিসেম্বর

সাক্ষাৎকার

আরও সাক্ষাৎকার

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে