Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ , ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.9/5 (30 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ১১-১২-২০১৭

জিন-কফিল, অমীমাংসিত সত্যের গল্প

বদরুন নাহার


জিন-কফিল, অমীমাংসিত সত্যের গল্প

জায়গাটার নাম ধুন্দুলনাড়া। 

একটা জঙ্গুলে জায়গা। যেতে হবে ট্রেনে করে, তারপর নৌকায় এবং শেষে পায়ে হেঁটে। যেতে যেতে পা কাটবে, গোটা বিশেক জোঁক ধরবে। দীর্ঘ পথের পর লোকজন যখন বলবে- 'ধুন্দুলনাড়া? ওই তো দেখা যায়। তখন বুঝতে হবে আরও মাইল সাতেক বাকি।' 

হুমায়ূন আহমেদের জিন-কফিল গল্প পাঠের শুরুতেই পথটি হয়ে ওঠে রহস্যময়। গল্পের কথকের কাছে জানবেন, সাত মাইল বাকি ধুন্দুলনাড়া। তিনি আমাদের জানাচ্ছিলেন কালু খাঁ নামে সাধুর অলৌকিক ক্ষমতা দর্শনের গল্প। তখনও বুঝতে বাকি থেকে যাবে গল্প সাধু কালু খাঁর নয়, গল্পটি মসজিদের ইমাম ও তার স্ত্রী লতিফার। মূলত গল্পটি জিন-কফিল আর তার অলৌকিক ক্ষমতার। 

ছোটগল্পের শুরুর জগৎ সরব রেখেছিলেন গোগোল, চেকভ, তলস্তয়, গোর্কি, মোপাঁসা, দস্তয়েভস্কি, অ্যালন পো ও মার্ক টোয়েনসহ বিশ্বখ্যাত সব গল্পকার। তবে এ কথা স্বীকৃত যে, বিশ্ব পাঠকের কাছে ছোটগল্পকে জনপ্রিয় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন এডগার অ্যালান পো (১৮০৯-১৮৪৯), তার রহস্য গল্পের রোমান্স পাঠককে বিমোহিত করে। বাংলা ছোটগল্পের সূচনালঘ্নেও এই ধারার ব্যত্যয় ঘটেনি। আমাদের ছোটগল্পের শুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) থেকে। তার গল্পগুচ্ছ আজ পর্যন্ত বাংলা ছোটগল্পের মহারাজ। সেখানেও রয়েছে অতিপ্রাকৃত গল্প। ক্ষুধিত পাষাণ, মণিহার ও নিশীথসহ বেশ কিছু গল্পে পাওয়া যায় রহস্যময় উপস্থাপন। 

হুমায়ূন আহমেদকে গল্পের জাদুকর বলা হয়। তার রবীন্দ্র অনুরক্তির কথাও আমাদের জানা। তাই বলে তিনি রবীন্দ্রনাথকে অনুকরণ করেছেন বলা যাবে না। হুমায়ূন আহমেদের গল্পের নিজস্ব ভঙ্গি রয়েছে, যা তার সময়ের বাস্তবতারও স্বরৃপ। নিজ ক্ষমতা বলেই তিনি বাংলাদেশের ছোটগল্পে বিশেষ স্থান করে নিয়েছেন। আর তার ছোটগল্পের ভিতকে জোরালো করে তুলতে অতিপ্রাকৃত ধারায় গল্পগুলোর ভূমিকা স্বীকার করতে হবে। তার অতিপ্রাকৃত গল্পের সংখ্যাও কম নয়। এর মধ্যে ভয়, জিন-কফিল, অচিন বৃক্ষ, ছায়াসঙ্গী, শবযাত্রা, মৃত্যুগন্ধী উল্লেখ্য।

বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে তিনি জনপ্রিয় লেখক হিসেবে পরিচিত। এই অর্জন কোনো সহজ কাজ নয়। কেননা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে স্বয়ং পাঠক। নিজের পাঠককে না জানলে বা তারা কী চায় তা না বুঝে এ অর্জন সম্ভব নয়। হুমায়ূন আহমেদের বড় একটি বৈশিষ্ট্য তিনি তার পাঠকের মনোজগতের ভূমিটাকে স্পর্শ করতে পেরেছিলেন। তার সময়ে বাংলার মানুষের বিচরণ ক্ষেত্র, সামাজিক-পারিবারিক কাঠামো এবং লোকবিশ্বাসের অবস্থান নিয়ে তিনি কাজ করতে সমর্থ ছিলেন। বুঝতে পেরেছিলেন পাঠকের চাহিদা। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে হুমায়ূন আহমেদ অনূদিত দি এক্সরসিস্ট বইটির ভূমিকা। যেখানে লেখক জানিয়েছিলেন, একবার তিনি অর্থকষ্টে পড়েছিলেন। তখন জানতে পারলেন কাজী আনোয়ার হোসেন ভৌতিক বা গোয়েন্দা জাতীয় উপন্যাস অনুবাদ করে দিলে নগদ দেন। রাত জেগে তিনি অনুবাদ করলেন উইলিয়াম পিটার ব্লেটির 'দি এক্সরসিস্ট'। এ থেকে তিনি নগদ দুই হাজার টাকাও পেয়েছিলেন। কিন্তু এই মূল্যের চেয়েও হয়তো হুমায়ূনের কাছে মূল্যবান হয়েছিল অন্য কিছু, যা তিনি জানিয়েছেন 'কেন জানি না বেশ কিছু পাঠক এই বইটি চাচ্ছে। পাঠকের চাওয়া মানে প্রকাশকদের চাওয়া। আমি তাদের চাওয়াকে মূল্য দিলাম।'

অভিজ্ঞতাই তাকে পথ দিয়েছিল, যে কারণে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট নিয়ে তিনি পাঠককে নিয়ে গেলেন একের পর এক রহস্যময় গল্পে। সমাজের মানুষের বিশ্বাস, পরিবর্তিত পরিস্থিতি ও বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রাকে সঙ্গে রেখেই লেখক স্বীকার করে নেন এক অমীমাংসিত জগৎকে। আর তা নির্মিত করেন মানবিকতার সংমিশ্রণে। জিন-কফিল গল্পটি হুমায়ূন আহমেদের এমনই এক গল্প। প্রায় সাড়ে ৯ হাজার শব্দের গল্প, ৩২ পৃষ্ঠা দীর্ঘ যার ব্যাপ্তি। যা পাঠ শেষে পাঠকের মনে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে, হুমায়ূন আহমেদের ছোটগল্প জিন-কফিল শুধু কি একটি অতিপ্রাকৃত গল্প? নাকি এক মানবিক আখ্যান? 

বিংশ শতাব্দীতে বিশ্বে অতিপ্রাকৃত কাহিনীকে মনস্তাত্ত্বিক ও মানবিক দৃষ্টিজাত আখ্যানে রৃপ নিতে দেখা যায়। পাঠক এ গল্প যাত্রায় এক রহস্যমণ্ডিত পথ ধরে হেঁটে যেতে যেতে পাবেন জিনের উপস্থিতির ধর্মীয় ব্যাখ্যা, যুক্তি বিশ্নেষণে বৈজ্ঞানিক মতামত। এমন কি গোয়েন্দা কাহিনীর মতো রহস্যের জট উন্মোচনের উত্তাপ। জিন-কফিল যদিও মিসির আলীর গল্প নয়, কিন্তু এটা আবার মিসির আলীর গল্পও বটে। ধুন্দুলনাড়া গ্রামবাসীর আচরণ ছিল স্বাভাবিকতার বাইরে। গ্রামের শেষ প্রান্তে অবস্থিত মসজিদও বড় রহস্যঘেরা। জিন? নাকি সাপের ভয়ে যেখানে মুসল্লিরা নামাজ পড়তে যায় না? তা আমরা নিশ্চিত নই। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ সেই গল্পের সঙ্গে যুক্তির সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন। বিশ্বাসকে তিনি দিতে চেয়েছেন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। কিন্তু সেখানে রহস্য থেকেই যায়, অজপাড়াগাঁর এক মসজিদের ইমাম, যার কোনো শেকড় নেই। তার প্রেম এবং স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ অভিনব! লেখক সেই ইমামের দাড়ির বর্ণনায় উপস্থিত করেন বিশ্বের আরেকজন রহস্য গল্পের নির্মাতা আর্নেস্ট হেমিংওয়ের কথা। নিজের দেশের কৃষ্টি আর সংস্কৃতির সঙ্গে বিশ্ব সেতুর এমন সচেতন নির্মাণ পাঠককে সমৃদ্ধ করবে। 

জিনে ধরা লতিফা। খুবই শক্ত জিন-কফিল। সেই জিনের কারণে লতিফার দু-দুটি সন্তান জন্মের পর পরই মারা যায়। সেখান থেকে গল্প চলে আসে ফ্ল্যাশব্যাকে নেত্রকোনা শহরে। প্রকৃতির সবকিছু মানুষের জানা হয়নি, অজানা সত্যের গল্প পাঠকের মনে বিশেষ স্থান পেয়েছে সেই আদিকাল থেকেই। জিন-কফিলের গল্পের যে অবতারণা তা আমাদের সমাজ জীবনে খুবই গ্রহণযোগ্য এক ভূমি। 

গল্পের কাহিনীতে সমাধানের পথ প্রশস্ত। এমনকি রহস্য উন্মোচনের প্রবণতা লক্ষণীয়। আর তাই যেন অতিথি শিল্পীর মতো এ কাহিনীর শেষে উপস্থিত হয়েছে মিসির আলী। একটি কিশোরী মেয়ের অসম প্রেম, তার ভালোবাসা আর মানসিক দ্বন্দ্ব। কৃষিপ্রধান এই দেশে প্রাকৃতিক খামখেয়ালি আর অলৌকিকতার বিশ্বাস, ধর্মীয় অনুশাসন, সেই সঙ্গে বিজ্ঞানচর্চার বিকাশ এই গল্পের মিথস্ট্ক্রিয়া, এই গল্পের জাদু। যা নির্মাণে লেখক যেন রহস্যর পথ নয়, তৎকালীন বাস্তবতাকেই কাজে লাগিয়েছেন। 

গল্পে হুমায়ূন আহমেদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। ইমাম সাহেবের বয়স, তার স্ত্রীর মুগ্ধতা আর কাহিনীর বর্ণনারীতি সম্পূর্ণরৃপে তার পূর্বাপর লেখার মতোই। মানুষের সাব-কনসাস মাইন্ডের যে দ্বন্দ্ব, তা কাজে লাগিয়ে বাস্তবতার নিরিখে গল্পটি এক মানবিক আখ্যানে রৃপ নেয়। শ্রেণি যে মানুষের প্রেমের ক্ষেত্রে কখনই গুরুত্ব পায়নি, তা যেমন সত্য, তেমনি শ্রেণি অস্বীকারে আধুনিক মানুষ এখনও অক্ষম। সমাজের এরৃপ অবস্থানে এসে এক কিশোরীর মনোবৈকল্য খুব স্বাভাবিক। মনোজগতের এই ক্রাইসিসের ফলে সৃষ্ট নিষ্ঠুর পরিণতির উপস্থাপনে লেখক মমতার আশ্রয় নেন। তখন মানবিক হৃদয় সহসায় অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। আর তাই বলা যায়, জিন-কফিল গল্পটি অতিপ্রাকৃতিক অবস্থান উতরে এক মানবিক গল্পে পর্যবসিত হয়। 

কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ আমাদের আসলেই কোনো নিশ্চিত অবস্থানে নিয়ে গেছেন কি? দ্বন্দ্ব থেকেই যায়। মানসিক মুক্তি মেলে না। শিশু দুটির প্রকৃত খুনি আসলে কে? লতিফা? নাকি জিন-কফিল?

এমএ/০১:৪০/১২ নভেম্বর

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে