Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ২১ আগস্ট, ২০১৯ , ৬ ভাদ্র ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (50 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ১১-০৯-২০১৭

আমাদের উচিত সহজ করে কবিতা লেখা : গিরীশ গৈরিক

আমাদের উচিত সহজ করে কবিতা লেখা : গিরীশ গৈরিক

আপনি অনেকদিন ঢাকায় আছেন। কবিতা নিয়ে বহু রাজনীতি-গ্রুপিংয়ের কথা শোনা যায়। অনেকে নাকি গ্রুপিং করেই কবি হিসেবে টিকে আছে। আপনাকে বরং এখান থেকেই প্রশ্ন শুরু করি।আপনার অভিজ্ঞতা থেকে বলুন তো বিষয়টা নিয়ে...

গ্রুপিং করে টিকে থাকা আর বই না পড়ে হুজুরের কাছ থেকে কলমে ফুঁ নিয়ে পরীক্ষা দেওয়া আমার কাছে একই বিষয় মনে হয়। দুর্বল কবিতা লিখে গ্রুপিং করে টিকে আছে- এমন ইতিহাস পৃথিবীর কোনো দেশে নেই। গ্রুপিং করা গ্রুপবাজদের আত্মতুষ্টি ছাড়া জীবনে আর কিছু মেলে না। সময়ের ব্যবধানে গ্রুপ যখন ভেঙে যায় তখন তারা নিজেরা নিজেরা গালাগালি করে।

 আমরা গ্রুপিংয়ের সাথে আড্ডার বিষয়টিকে গুলিয়ে ফেলছি না তে? কিছু মানুষ শেয়ারিং, ভালো লাগা- এসবকে প্রাধান্য দিয়ে আড্ডায় বসে। সেটাকেও অনেক সময় আমরা গ্রুপিং নাম দিই।

ভালো কথা বলেছেন। আমাদের দেশে যেমন একজন মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব হলে অনেকে মনে করে অনেক কিছু হয়ে গেছে। সাহিত্যে গ্রুপিং বিষয়টা এমন নয় অবশ্য। সাহিত্যে গ্রুপিং হলো : কোনো বিশেষ বিষয়কে কেন্দ্র করে কতিপয় কবি বা লেখক সেই বিষয়কে প্রতিষ্ঠিত করা। যেমন হাংরি গ্রুপ। এটা কিন্তু পজেটিভ। কিন্তু আমাদের দেশে গ্রুপিং করে শুধু ক্ষতি করা হয়েছে।

ক্ষতির বিষয়টি কেমন?

তারা নিজেদের মতো করে সাহিত্যকে ব্যবহার করেন এবং গোষ্ঠি চর্চা করে এক গ্রুপ আরেক গ্রুপকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেন। সাহিত্যে যখন ব্যক্তিগত চর্চা হয় তখন সাহিত্য অনেক দূরে চলে যায়।

 আপনার লেখায় আসি। ‘ক্ষুধার্ত ধানের নামতা’,  ‘মা সিরিজ’... তারপর?

আমার আশা ছিল ২০১৮ সালে আমার ‘মা : ধ্যানপর্ব’ কলকাতা থেকে প্রকাশিত হবে। প্রকাশনীও ঠিক ছিল, কিন্তু ‘ডোম সিরিজ’ লেখার পর মত পরিবর্তন করে ‘ডোম সিরিজ’ প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিই। এখন ‘ডোম সিরিজ’নিয়ে কাজ করছি। সেই সাথে জেমস জয়েসের কবিতাসমগ্র অনুবাদ করছি। আমি কবিতার মানুষ; যতদিন বেঁচে থাকব, কবিতাই লিখব।

 আপনার বই কতটা ব্যক্তি আপনাকে রিপ্রেজেন্ট করছে বলে মনে হয়?

একজন কবি বা লেখক সারা জীবন লিখে তার নামটাই শুধু বড় করেন, তার ব্যক্তিত্বকে বড় করেন। লেখার সাথে ব্যক্তিত্বের গভীর মিল আছে। আমার প্রকাশিত বইগুলো আমাকে প্রেজেন্ট করেছে কিন্তু আমার ব্যক্তিত্ব আমার বইকে বেশি একটা প্রেজেন্ট করেছে কি না- সে বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে। তবে ভালো লেখার সাথে ভালো ব্যক্তিত্ব থাকলে তার সাহিত্যে সমৃদ্ধি আরও বাড়বে।

 আপনার মনে হয় না যে, সিরিজ কবিতায় অনেক রিপিটেশন থাকে? এটা কবিতার একটা ফাঁক, না?

কারও কারও সিরিজ কবিতায় এই রিপিটেশন আমি দেখেছি। তাই আমি যখন সিরিজ কবিতা লেখা শুরু করি তখন থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম কোনো প্রকার রিপিটেশন করব না। আমার ‘মা সিরিজ’ কবিতা পাঠ করলে দেখবেন কোনো প্রকার রিপিটেশন নেই। সিরিজ কবিতা লেখা খুবই কঠিন, যদি সেই কবিতার বোধ ও বিষয় একটি থেকে আরেকটিকে স্বতন্ত্র করা হয়, তাহলে ভালো হয়। আমি তাই করেছি। সিরিজ কবিতা লেখা হলো একটি বিষয়ের প্রতি গভীর সাধনা, গভীর নিমগ্নতা। এখন আমি ‘ডোম সিরিজ’ নিয়ে কাজ করতে করতে নিমগ্নতার বিষয়টি আরো গভীরভাবে টের পাচ্ছি।

 আপনার এই নিমগ্নতা অন্যের কাছে বিরক্তিকর হয়ে উঠতে পারে না?

একজন পাঠক তখনই বিরক্ত হবেন যখন তিনি আর কোনো প্রকার মনযোগ ধরে রাখতে পারবেন না। আমার মনে হয়, আমার কবিতা মনযোগহীন নয়। কারণ আমি সিরিজ কবিতায় বারবার চেষ্টা করি একটি কবিতা থেকে আরেকটি কবিতার অনুবিষয় ও বোধের স্বাতন্ত্র্য ধরে রাখতে। আমি মানুষের জীবনঘনিষ্ঠ শিল্পচর্চা করি, সেখানে বিরক্তির প্রসঙ্গ আসবে বলে মনে করি না।

 পাঠকের প্রসঙ্গই যখন আসলো, একটা বিষয় বলুন তো : কবিতার পাঠক কমের একটা অভিযোগ পাওয়া যায়? এই অভিযোগ কতটা সত্যি?

কবিতার পাঠক কোনোকালে বেশি ছিল না। রবীন্দ্রনাথের কবিতার পাঠক কেমন ছিল, তার একটি বিবরণ পাই আমরা তার একটি চিঠিতে, যে চিঠিতে তিনি সিগনেট প্রেসের মালিককে লিখে জানিয়েছিলেন, তার ‘বলাকা’ কাব্যগ্রন্থ যেন ৩০০ কপি ছাপা হয়। আমার জানা মতে, পৃথিবীর কোনো ভাষার কবিতার পাঠক তুলনামূলক বেশি নেই, সাহিত্যের অন্য শাখা থেকে। ধরুন, বোদলেয়ারের ‘লা ফুলর দ্য মল’ যে বছর প্রকাশিত হয় সেই বছরে বিক্রি হয়েছিল ১২৫০ কপিরও কম। অথচ ওই বছরে অনেক উপন্যাস মিলিয়ন মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়েছিল। কবিতার পাঠক আগেও যেমন ছিল এখনও তেমন আছে। কবিতাগ্রন্থ ক্রয়-বিক্রয় দিয়ে কবিতার পাঠক নির্ণয় করা কঠিন হবে। কেননা এখনকার পাঠকেরা কবিতা বিভিন্ন মাধ্যম দিয়ে পাঠ করার সুযোগ পাচ্ছে। যেমন, আমি ইউটিউবে দেখেছি অসংখ্য কবিতার আবৃত্তির ভিউয়ার ১০ লক্ষের বেশি। তবে আমরা বর্তমানে যে ধরনের কবিতা লিখি এই ধরনের কবিতা যত বেশি লেখা হবে তত বেশি পাঠক কমে যাবে। কারণ আমাদের কবিতা জীবনমুখী নয়। পৃথিবীর সকল মহৎ শিল্পের ভাষা সহজ কিন্তু তার জীবনবোধ অনেক গভীরের। তাই আমাদের উচিত সহজ করে কবিতা লেখা, কিন্তু তার জীবনবোধ থাকতে হবে অনেক গভীরে।

 কবিতার সঙ্গে জীবনাচরণ কিংবা রাজনীতির কোনো দ্বন্দ্ব নেই?

দ্বন্দ্ব থেকেই কবিতার জন্ম। কবিতার দ্বন্দ্ব শুধু জীবনাচরণ বা রাজনীতির সাথে নয়, কবিতার সাথে দ্বন্দ্ব তাবৎ পৃথিবীর সকল অপকর্মের সাথে।

 কবিতায় শ্লীলতা-অশ্লীলতার একটা তর্ক শোনা যায় মাঝে মাঝে। এই শ্লীলতা-অশ্লীলতার সীমা ঠিক কতটুকু? আদৌ কোনো সীমা আছে কিনা?

কোনো কিছু যদি শিল্প হয়ে ওঠে, তবে তা যতই নগ্ন কিংবা কুরুচিপূর্ণ (কারও কারও ক্ষেত্রে) হোক না কেন; সেসব শিল্প অশ্লীল নয়। সেইসব শিল্পই অশ্লীল যার ভেতরে কোনো শিল্পবোধ নেই। শুধু যৌনশব্দ ব্যবহার করলে অশ্লীল হয় না, মূলত কবি বা লেখক কী বলতে চেয়েছেন- সেটাই বিবেচ্য বিষয়। যেমন ধরেন : ‘আমি বাঁশির যোনিতে সুর হয়ে ঢুকে যাব’। এখানে যোনি শব্দটি অশ্লীল নয়।

 অনুবাদ নিয়ে বলি, যেহেতু আপনি অনুবাদ করছেন। অনুবাদে কবিতা থেকে অনেক কিছু হারিয়ে যায় কি না? শেষ পর্যন্ত থাকে কী?

আসলে আমি অনুবাদ করছি সেটা বলা যাবে না, আমি করছি কবিতার অনুসৃজন। একটি কবিতা পাঠ করে, অনুধাবন করে আমার যা মনে হয়েছে সেটা আমার মতো করে লেখা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো অনুবাদ সম্পর্কে বলেছেন : ‘একটি হাতি অনুবাদ করলে হয় সেটা গরু হবে, না হয় ঘোড়া হবে; হাতি আর কখনো হবে না।' তাই আমি আমার মতো কাজ করছি।

 একজন কবির নিজের মাটির কথা বলা কতটা বাধ্যতামূলক? কবিতা কখন নিজের সীমারেখা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক হয়ে ওঠে?

একজন কবির নিজের মাটির কথা বলা কতটা নয়, সবটাই বলা বাধ্যতামূলক। যেমন ধরেন ফরাসি কবিতা, তারা তাদের মাটির কথা বলে বলেই বৈশ্বিক। তবে সেই কবিতাগুলি প্রকৃত প্রস্তাবে কবিতা হয়ে উঠতে হবে। কবিতা বৈশ্বিক হয়ে ওঠার পেছনে শুধু ভালো কবিতাই যথেষ্ট নয়, তার সাথে সেই ভাষার মানুষকে রাজনৈতিকভাবেও এগিয়ে আসতে হবে এবং তার সরকারি সহযোগিতাও দরকার। শেষ কথা হলো, ভালো অনুবাদ হওয়া প্রয়োজন। যেমন ধরুন পেইন্টিং কোনো ভাষায় অনুবাদ করতে হয় না বিধায় আমাদের এসএম সুলতান বৈশ্বিক, কিন্তু পেইন্টিং যদি অনুবাদ করতে হতো তাহলে আমার মনে হয় সুলতান বৈশ্বিক হতে পারতেন না।

 আরেকটা কমন প্রশ্ন, প্রায় সবাইকেই জিজ্ঞেস করছি, বর্তমানে কবিদের ভিতরে এক ধরনের ছন্দবিমুখতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?

দারুণ প্রশ্ন। ছন্দবিমুখতার আগে আমাদের বুঝে নেওয়া দরকার কবিতায় ছন্দ কেন প্রয়োজন? ছন্দ কবিতার ধ্বনিকে সুরালো করে অর্থাৎ কবিতাটি গীতল হয়। যাতে করে কবিতা পাঠ করতে কোনো পাঠক বাধাপ্রাপ্ত না হয়। তবে কোনো কবি যদি ছন্দে না লিখে তার কবিতার ধ্বনিকে সুরালো বা পাঠের জন্য স্মুথ করতে পারে, তাহলে কবিতা হবে না কেন? আসলে ছন্দ কবিতার অনেকগুলো বৈশিষ্ট্যের একটি মাত্র। তা না হলে ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত অনেক বড় কবি হতো।

আবার একই সঙ্গে ছন্দ কবিতাকে নির্দিষ্টতায় আবদ্ধ করে। এই আবদ্ধ হলো ছন্দের মাত্রা। মাত্রা কী? মাত্রা হলো যার দ্বারা কোনো কিছু নির্দিষ্টভাবে পরিমাপ করা যায়। এখানেই প্রশ্ন, কবিতা যদি মুক্তচর্চা হয় তবে কেন ছন্দের মাত্রা দ্বারা আবদ্ধ হবে? এই সমস্যা থেকেই মুক্তকছন্দের আবিষ্কার হলো, অর্থাৎ মাত্রাহীন ছন্দ। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি কোনো কবির কবিতায় মাত্রাহীন ছন্দের স্পন্দন নিয়ে বোধের বিষয়টি ঠিক থাকলেই ভালো কবিতা হবে।

 আরেকটা কমন প্রশ্ন। এটাই শেষ। লিটলম্যাগের ম্রিয়মাণতা আর দৈনিকগুলোর উত্থান, এই দুইয়ের সুবাদে সাহিত্য একটি করপোরেট শ্রেণির কাছে বাঁধা পড়ছে কিনা?

ভালো প্রশ্ন। ছোটকাগজের ম্রিয়মাণতা যে দৈনিকগুলোর সাহিত্যপাতার উত্থান ঘটিয়েছে তা নয়। দৈনিকের সাহিত্যপাতার উত্থান তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থে তৈরি করছে। ব্যবসা হচ্ছে বিধায় করছে, আবার যখন ব্যবসা হবে না তখন তারা বন্ধ করে দিবে। সাহিত্য নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা আছে বলে আমার মনে হয় না। মাথাব্যথা থাকলে তারা সাহিত্যের মান বজায় রেখে সাহিত্যপাতা তৈরি করতো, লেখক সম্মানজনক সম্মানি দিত। করপোরেটদের প্রধান কাজই ব্যবসা, এই ব্যবসা করতে যে সাহিত্য করা উচিত কিংবা যে সকল কবি ও লেখক তাদের হয়ে কাজ করে দিবে, তাদের নিয়ে সাহিত্য তারা করছে।

এমএ/০৭:২০/০৯ নভেম্বর

সাক্ষাতকার

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে