Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ২১ মে, ২০১৯ , ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.9/5 (32 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ১১-০৪-২০১৭

ভুলের গল্প

সেলিনা হোসেন


ভুলের গল্প

রক্তে মাংসে গড়া মানুষ কোনো রোবট নয়। মানুষের ভেতরে নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া কাজ করে। একেকজনের মানবিক চিন্তার জায়গা একেক রকম। সেখানে ভুল বোঝাবুঝি হতেই পারে। কারণ, একজন যখন আরেকজনের মতামত মেনে নিতে না পারে কিংবা সেটার ভুল ব্যাখ্যা করে তখনই ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। কেউ এটা ইচ্ছাকৃতভাবে করে কেউবা নিজের বোঝার অক্ষমতা থেকে করে থাকে। 

আমার মনে হয়, এই দুটো জায়গা থেকেই ভুল বোঝাবুঝির সূত্রপাত হয়। ইচ্ছা করে যারা এটা করে, সেই জায়গা থেকে আমরা যদি সমঝোতার মাধ্যমে বুঝিয়ে সেটাকে এগিয়ে নিতে পারি তবে ভুলের জায়গা থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব। উদাহরণ দিয়ে যদি বলি, কেউ একজন আমার কোনো কথায় কিংবা কাজে ভুল বুঝলে তার কাছে সরাসরি গিয়ে যদি বলি, আপনি আমার এই বিষয়কে বা কথাকে এভাবে দেখবেন না দয়া করে। কারণ আপনি যেভাবে দেখছেন আমি সেভাবে তা বলিনি, তাহলে কিন্তু সেটা একটা ফয়সালা হয়ে যায়। 

আদর্শগত জায়গায় ভুল বোঝাবুঝি বা মতভেদ হয়ে থাকে অনেক সময়। একজন একটা মতবাদ পছন্দ করছে আরেকজন সেটা অপছন্দ করছে, তখনও বৈপরীত্য সৃষ্টি হয়। আমি এই অবস্থাকে ভুল বোঝাবুঝির মতো বড় করে দেখব না। এটা হচ্ছে চিন্তা-চেতনার জায়গায় একজন আরেকজনের মতামতকে মেনে নিতে না পারা। এই মেনে না নেওয়াটাই ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করে। কিন্তু আমি মনে করি, দু'জন ব্যক্তির মাঝে সেই সূক্ষ্ণ আচরণটা থাকা উচিত, যা থেকে দ্বন্দ্ব পরিহার করা যায়। দু'জন দু'জনের মত নিয়ে আলাদা অবস্থানে থেকে সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার কাজটি করতে হয়। সম্পর্ক রক্ষা করে সম্মান বজায় রেখে বন্ধুসুলভ আচরণ করাই শ্রেয় বলে মনে করি। এটা নারীতে নারীতে হতে পারে, পুরুষে পুরুষে হতে পারে কিংবা নারী-পুরুষে হতে পারে। এই জায়গাগুলো সামাজিক প্রক্রিয়ার মধ্যে অবস্থান করে। এ জায়গাগুলো উতরে গেলে বড় ধরনের সামাজিক সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব বলে মনে করি। 

বর্তমানে আধুনিক সময়ে আমাদের জীবনযাপন প্রযুক্তির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। প্রযুক্তির অতি ব্যবহারে অভ্যস্ত আমরা অনেকটা আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছি। এই আক্রমণাত্মক ব্যবহার থেকে আমাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সমস্যাটা প্রকট হয়ে উঠছে। ব্যক্তিগতভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে আমার যাতায়াত খুবই সামান্য। সেটা অনেকটা শূন্যের কোঠায়। কাছের কয়েকজন মানুষের মাধ্যমে অনেক খবর পাই। এই মাধ্যমগুলোতে অভ্যস্তদের মানসিক অবস্থা বিচার-বিশ্নেষণ করলেও আমি অনেক কিছুই দেখতে পাই। অনেককে দেখি সামাজিক মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে এক ধরনের কোন্দল তৈরি করেন, যা অনেকের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি করে। এবং একজন আরেকজনের বিষয়টি মেনে নিতে চায় না। এ ক্ষেত্রে আমি আমার ব্যক্তিগত একটি অভিজ্ঞতার কথা বলতে চাই। সম্প্রতি দেশজুড়ে বন্যার প্রকোপে দুর্ভোগে পড়েছে সাধারণ মানুষ। বন্যার্তদের সাহায্যে আমাদের তরুণ সাহিত্যিকদের একটি উদ্যোগ নিয়েছিল। ওই উদ্যোগের সঙ্গে আমিও ছিলাম। আমাকে একজন বলল, আপনি এই তরুণদের সাপোর্ট দিলেন কেন? ওরা তো আসলে সব টাকা লুট করবে! আমি তাকে বললাম, আপনি দয়া করে এভাবে কথা বলবেন না। সামাজিক মাধ্যমে সকলের সহযোগিতা কামনা করে কাজে না নেমে তারা অন্যভাবেও তো তা সম্পন্ন করতে পারত। ওরা সকলে সৃজনশীল মানুষ। গণমানুষের জন্য কাজটুকু তারা করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

আপনি কেন আমাকে ভুল বোঝাতে এসেছেন। তরুণরা যখন উদ্যোগী হয়ে ত্রাণ বিতরণে নেমেছে আমিও চাই তারা সেখানে যাক, তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী দুর্দশাগ্রস্ত মানুষদের সাহায্য করে আসুক। এই মানুষটি কিন্তু আমাকে ভুল বোঝাতে পারেনি। আমি বরং তাকে বুঝিয়েছি, আপনিও তাদের সঙ্গে থাকুন। এবং দেখুন তারা ঠিকভাবে দরিদ্র মানুষদের কাছে সাহায্য পৌঁছাচ্ছে কি-না। এখন কথা হচ্ছে, আমি না হয় তাদের বিশ্বাস করলাম। আরেকজন মানুষের ইন্ধনে ভুল চিন্তার বলি হয়ে অন্য কেউ তো তাদের সমর্থন না করতে পারত। আর সেটা ঘটলে আমরা বড় একটি ত্রাণ কার্যক্রম থেকে বন্যাপীড়িত মানুষদের সাহায্য করতে পারতাম না হয়তো। কিংবা সেটা পিছিয়ে যেত। আমি এই পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগটা দিতে চাইনি বলেই আরেকজনের কান কথায় কান দিইনি। 

প্রযুক্তির ভুল ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করছি, পরস্পরের মধ্যে হৃদ্যতা নষ্ট করে দিচ্ছি। এই ভুলগুলো যেন আমরা না করি সে বিষয়ে সকলকে সদা সচেতন হওয়া উচিত বলে মনে করি। সম্প্রতি একটি সংগঠনের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার। সেখানে মিডিয়ার কোনো ক্যামেরা যায়নি। আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয় কামাল লোহানী প্রশ্ন তুললেন, এরা একটি ভালো কাজ করছেন। বিভিন্ন জায়গা থেকে খুঁজে এনে কয়েকজন লেখক শিল্পীকে পুরস্কৃত করছেন। কোনো অর্থ তারা দিতে পারছেন না। কিন্তু জায়গাটা তৈরি করে দিচ্ছেন। এখানে মিডিয়া আসে নাই, তাদেরও তো দায়িত্ব ছিল। সব সময় আমাদের খারাপ ইস্যুগুলো হাইলাইট করে দেখাতে হবে কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠান বড় একটি কাজ করল- এ বিষয়কে দেখানোর গরজ তারা বোধ করল না। এখানেও ভুল বোঝাবুঝির জায়গা থেকে যায়। তারা হয়তো ভাবছে, কেন আমি এই ছোট বিষয়টি দেখাতে যাব, আমার কি দায় পড়েছে। কিন্তু এমন ছোট ছোট বিষয় প্রচারে আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের জায়গাগুলো তৈরি হয়। কেননা আমরা এখন প্রবলভাবে নৈতিক মূল্যবোধের সংকটের ভেতর জীবনযাপন করছি। এভাবে জীবনযাপনের মাধ্যমে আমাদের ভুল বোঝাবুঝির সংকটকে বরং বাড়িয়ে তুলছে। 

বর্তমানে পারিবারিক ভাঙন মহামারী আকারে সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে। বলা যায়, আগামী দিনের জন্য মহাসংকট তৈরি করছে। এর জন্য অনেকাংশে ভুল বোঝাবুঝিই দায়ী বলে মনে করি। চারপাশে দেখি, একটি দুটি বাচ্চা রেখেই স্বামী-স্ত্রী বিচ্ছেদের পথে পা বাড়াচ্ছে। এর ফলে ওই দুটি মানুষ যেমন নিজেদের জীবনে সংকট ঘনিয়ে আনছে, পাশাপাশি তাদের সন্তানদের জীবনকেও ঘোর সংকটের মুখে ফেলে দিচ্ছে। আমরা যারা বয়সী আছি, পরিবারের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির জায়গাগুলো সমাধানে এগিয়ে আসা উচিত। সমস্যার কথাগুলো শুনে তাদের বুঝিয়ে দিলে, ভুলের জায়গাগুলো ধরিয়ে দিলে তারা আবারও সুন্দরভাবে সংসারকে এগিয়ে নিতে পারে। কিন্তু আমরা যদি শুধু একপক্ষকে দোষারোপ করি কিংবা তাদের ভুলের জায়গাগুলো ধরিয়ে না দিই, তবে এ সংকট মোচন হবে না কখনও। বরং পারিবারিক তথা সামাজিক সংকটগুলোকে আমরা বরং বাড়িয়ে তুলব। আমাদের নিকটের মধ্যে যারা রয়েছে তাদের মধ্যেকার ভুল বোঝাবুঝির বিষয়গুলো আমরাই সমাধান করে দিতে পারি। এর ফলে আমাদের শিশুরা তাদের বাবা-মায়ের ছায়ার তলে বড় হয়ে উঠতে পারবে, ভাঙনের মতো মহামারী সমাজ থেকে বিদায় নেবে এবং বিপর্যয় থেকে সমাজ রক্ষা পাবে। স্বামী-স্ত্রীকেও সচেতনভাবে বুঝতে হবে একে অপরকে।

ভুল বোঝাবুঝি হতেই পারে কিন্তু সেটা যেন মোটেই বিস্তৃত না হয়। এ জন্য উচিত নিজেদের মধ্যে কথোপকথন, বিশ্বাসগুলো যদি হারিয়ে যেতে থাকে, তবে তার জন্যও কথা বলা উচিত তাদের একে অপরের সঙ্গে। আমরা চাই না কোনো সংসার যেন না ভাঙে, কোনো সন্তান যেন বাবা-মা কোনো একজনকে ছাড়া কষ্টের মধ্যে বড় হয়ে না ওঠে। আমি ব্যক্তিগতভাবে ভাবতেই পারি না কোনো একটি ছেলে বা মেয়ে বাবা-মা ছাড়া বড় হচ্ছে।

আমরা অনেক সময় অনেক দুর্ঘটনার শিকার হই সেটা যেমন সত্যি, তেমনি সত্যি নিজেদের ভুল বোঝাবুঝির জায়গাগুলো নিজেরাই যদি কাটিয়ে উঠতে না পারি, তবে তা অনেক বড় ক্ষতিই বয়ে আনবে আমাদের জীবনে। তাই ব্যক্তিগত জায়গা থেকে এই ভুলের জায়গাগুলোকে চিহ্নিত করে তার জন্য সমাধানে যেতে হবে, নতুবা ভুলের মাশুল গুনে পার করতে হবে পুরো জীবন।

এমএ/০৬:১৫/০৪ নভেম্বর

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে