Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ২৬ মে, ২০১৯ , ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.7/5 (13 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ১১-০১-২০১৭

ভূতের পড়া বই

ধ্রুব এষ


ভূতের পড়া বই

বাচ্চাটার চোখে ঘুম লেগে গেছে। সেই সন্ধে থেকে এতক্ষণ পড়েছে। বাংলা, ইংলিশ। গণিত, ভূগোল। হোমটাস্কও করেছে। ফুলের টব ড্রয়িং করেছে এবং রং করেছে ড্রয়িং খাতায়। আর কত? ঘুমে চোখ একদম যাকে বলে অর্ধনিমীলিত হয়ে আছে বেচারির। কেউ দেখছে না। বাবা ফোনে কথা বলছেন, মা পড়া দেখিয়ে দিয়ে রান্নাঘরে গেছেন। বাচ্চাটার ফুফু, বাচ্চাটা ডাকে পিপি, সে তার ঘরে পড়ছে। এখন যদি ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে চেয়ার থেকে পড়ে যায় বাচ্চাটা!
না। মা রান্নাঘরে থাকলে কী হবে, সব কথার শেষ কথা হলো, কেউ না দেখলেও মা সব দেখেন। সে মানুষের ছানার মা হোন আর ভূতের ছানার মা হোন।
রান্নাবান্না শেষ হয়েছে, বাচ্চাটার মা এ ঘরে এলেন। বাচ্চার অবস্থা দেখে বললেন, ‘আহা রে! আহা রে! ঘুম ধরে গেছে আমার পাখিটার! আহা রে পাখি! এখন আমরা দুটো ভাতের ডিম খাব, হ্যাঁ? ভাতের ডিম খেয়ে ঘুম দেব, হ্যাঁ?’

বাচ্চা বলল, ‘আমি ভাতের ডিম খাব না, মা।’
‘এ রকম করে না, সোনা। বলেছি না, রাতের বেলা ভাতের ডিম না খেলে এক চড়ুই পাখির ওজন কমে যায়।’
‘কোন চড়ুই পাখির ওজন কমে যায়, মা? ভেন্টিলেটরের চড়ুই পাখিটার?’
মা হাসলেন। কথাটা এ রকম না আসলে। রাতের বেলা যদি ভাতের ডিম না খায়, এক চড়ুই পাখির সমান ওজন কমে যাবে, মায়েরা এ রকম বলেনই বাচ্চাদের। সত্যি কিছু না। তবে, মা চিন্তা করে দেখলেন, তাঁর বাচ্চা কিছু খারাপ তো বলেনি।

সে রাতের বেলা ভাতের ডিম না খেয়ে ঘুমালে ভেন্টিলেটরের চড়ুই পাখিটার ওজন যদি কমে যায়, লক্ষ্মী একটা বাচ্চা হিসেবে সে নিশ্চয় অন্তত দুটো খেয়ে ঘুমাবে। বুদ্ধিমতী মা বললেন, ‘হ্যাঁ সোনা। ভেন্টিলেটরের চড়ুই পাখিটার ওজন কমে যাবে। তুমি যদি রোজ এ রকম ভাতের ডিম না খেয়ে ঘুমাও, তাহলে তো ওজন কমতে কমতে একদিন একেবারে নেই হয়ে যাবে বেচারি। আমরা কেউ আর তাকে দেখতেই পাব না।’
‘দেখতেই পাব না?’
‘উঁহু।’
বাচ্চাটার ঘুম কেটেছে একটু। সে মনে হয় বিবেচনা করে দেখল বিষয়টা। সম্মত হলো খাবে। উঠে রান্নাঘরের দিকে হাঁটা দিচ্ছিল, মা বললেন, ‘একি! একি! কতবার বলেছি পাখি, বই, খেলা রেখে উঠতে হয় না। ভূত এসে বই পড়ে যায় তাহলে।’

আশ্চর্য! এটা একটা ন্যায্য কথা হলো? খোলা রাখলে ভূত এসে বই পড়ে যায়! পড়ে গেলে কী? বইয়ের অক্ষর কি উল্টো হয়ে যাবে? না বইয়ের ছবি ঝাপসা হয়ে যাবে? দুঃখজনক। অনেক মানুষকেই বলতে শুনি কথাটা। আফসোস! কেউ একবার চিন্তা করে দেখে না, শিক্ষা সুযোগ নয়, অধিকার। ভূতেরা যদি বই ছাপতে পারত, মানুষের বই পড়ত কখনো? কখনো না। এটুকু আত্মসম্মানবোধ আছে ভূতদের। আর ভারি তো একটা কথা! বই খোলা না রাখলে যেন বই পড়তে পারে না ভূতেরা। মানুষের যে কত কী ধারণা। এই যে, এখন যে এই গল্পটা লিখছে, তার ধারণা, ভূতেরা তার খুব বন্ধু। মোটেও তা নয়। তাকে একদম পছন্দ করে না ভূতেরা। ভূতদের অনুমতি না নিয়ে সে কোন আক্কেলে ভূতের গল্প লেখে? ভূতদের কোর্ট-কাছারি নেই। না হলে ঠিক মানহানির একটা মামলা তার নামে করে দিত ভূতেরা। এক হাজার এক কোটি টাকার মামলা। দেখা যেত তখন।

যাক। বই বন্ধ করে ভাতের ডিম খেতে গেছে বাচ্চা। ভাতের ডিম মানে ভাত দিয়ে ডিমের মতো বানানো আর কি। মা বানিয়ে দেন। বাচ্চা খায়। ডাইনিং টেবিল রান্নাঘরে তাদের। ফোনে কথা বলতে বলতে গেছেন বাবাও। পিপিও পড়ায় বিরতি দিয়ে উঠেছে। খেয়ে আবার পড়তে বসবে। তারা অবশ্য ভাতের ডিম খাবে না, ভাত খাবে, মাছ খাবে। খাক। আমার কী?

সাউন্ড ছাড়া টেলিভিশন চলছিল এতক্ষণ। ডিশের লাইন চলে গেল হঠাৎ। টেলিভিশনের মনিটর নীল হয়ে গেল। ‘নো সিগন্যাল’ লেখা উঠল।
এখন?
খাওয়াদাওয়া করুক তারা। বাচ্চাটা ভাতের ডিম খাক। মা, বাবা, পিপি ভাত-মাছ খাক।
আমি এখন একটা ছড়া বলি, নাকি?
বলি।
হই রে বাবুই হই
ভূতেরা চড়ে মই
হই রে বাবুই হই
ভূতেরা ভাজে খই
হই রে বাবুই হই
ভূতেরা পড়ে বই
হই রে বাবুই হই
আশ্চর্য হই!

মানুষের বানানো ছড়া। ভূতেরা বই পড়ে শুনে আশ্চর্য লাগতেই পারে তেনাদের। কী আর বলব?
এই যে, বুদ্ধিমতী মায়ের কথা শুনে বই খোলা রেখে যায়নি বাচ্চাটা, তাতে খুব আটকা পড়েছে আর কি! বন্ধ বই খুলে পাতা উল্টে দিব্যি এটা-সেটা পড়তে পারে ভূতেরা। ক্লাসের বই পড়তে পারে। গল্প-কবিতার বইও পড়তে পারে। বই বন্ধ কি খোলা, ব্যাপার না।

এই যে আমি এখন টেবিল থেকে নিয়ে একটা গল্পের বই পড়ছি বাচ্চাটার। বইটার নাম হলো ভূতের পড়া বই। বন্ধ বই খুলে পাতা উল্টে উল্টে পড়ছি। বাচ্চাটাকে তার জন্মদিনে বইটা উপহার দিয়েছেন তার টিচার, মিস ঘাসফুল।

এই গল্প, ওই গল্প করে বইয়ের শেষ গল্পটা পড়ছি, কত কী মুখস্থ করে ফেললাম, এ সময় ডিশের লাইনের কানেকশন ফিরল। তারাও ভাতের ডিম ও ভাত-মাছ খেয়ে ফিরল। সাউন্ড বাড়িয়ে কতক্ষণ টেলিভিশন দেখল, গল্প করল, ঘুমিয়ে পড়ল। আমি যে ভূতের পড়া বই পড়ছি, দেখলই না।
সব দিন এ রকম করে বই পড়ি আমি। পড়ে বই আবার বন্ধ করে রেখে যাই। আজ তা করলাম না। পড়া শেষ করে খোলাই রেখে দিলাম ভূতের পড়া বই। সকালে নিশ্চয় তারা দেখবে।

আর কেউ না, দেখল বাচ্চাটাই। ঘুম থেকে উঠে। দেখে চিন্তা করল, একি রে! ভূত এসে বই পড়ে গেছে দেখি! মা দেখলে ঠিক বকবে। তবে মা সেই রান্নাঘরে, বাবা বারান্দায়, পিপি তার ঘরে, তাও সতর্কতার সঙ্গে এদিক-ওদিক দেখে নিয়ে ভূতের পড়া গল্পের বইটা বন্ধ করে দিল বাচ্চাটা। কী কাণ্ড! হেঁ-হেঁ! হেঁ-হেঁ-হেঁ!

এমএ/০২:০৪/০১ নভেম্বর

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে