Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ১১ নভেম্বর, ২০১৯ , ২৭ কার্তিক ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (123 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ০৯-২৯-২০১৭

মেয়র অপহরণের পেছনের রহস্য ফাঁস!

মেয়র অপহরণের পেছনের রহস্য ফাঁস!

জামালপুর, ২৯ সেপ্টেম্বর- সিরাজুল ইসলাম: জামালপুরের সরিষাবাড়ীর মেয়র ও পৌর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি রুকুনুজ্জামান রুকন অপহরণ ঘটনাকে ঘিরে রহস্য তৈরি হয়েছে। কোটি টাকার কাবিনে দ্বিতীয় স্ত্রী উম্মে হাবিবা মৌসুমীকে ঘরে তোলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ রহস্য দেখা দিয়েছে।

মৌসুমীকে বিয়ের পর এ নিয়ে পারিবারিক ঝামেলাও চলছিল। শেষপর্যন্ত স্ত্রীকে তালাক দিয়ে এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার চেষ্টাও করেছিলেন মেয়র রুকন।

কিন্তু কাবিনের কোটি টাকা পরিশোধের ভয়ে আটকে গিয়েছিল মেয়রের পরিত্রাণের সেই উদ্যোগ। অপহরণ ও উদ্ধারের ঘটনা নিয়ে রহস্য এখানেই শেষ নয়।

ঘটনার দিন ২৫ সেপ্টেম্বর ভোর ৬টার দিকে রুকনের উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের ৬০ নম্বর বাসায় ৩৫-৩৬ বছর বয়সী এক নারী এসেছিলেন তার সঙ্গে দেখা করতে। রুকনের সঙ্গে প্রায় দেড় ঘণ্টা কথা বলার পর তিনি চলে যান।

মেয়র তাকে এগিয়ে দিতে নিচ পর্যন্ত যান। পরে বাসায় ফিরে সকাল ৯টার দিকে বের হয়ে আর ফেরেননি মেয়র। বাড়ির সিসি ক্যামেরায় ওই নারীর ভেতরে ঢোকা ও বের হওয়ার দৃশ্য ধরা পড়ে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। পুলিশ বলছে, কাবিন ও নারী রহস্য ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি বিষয় সামনে রেখে তদন্ত চলছে। মেয়র অসুস্থ থাকায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা যাচ্ছে না। তিনি সুস্থ হলে সব বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

সরিষাবাড়ীর স্থানীয় সূত্র বলছে, কোটি টাকার কাবিনে এক বছর আগে মেয়র রুকন তার বড় ভাইয়ের শ্যালিকা উম্মে হাবিবা মৌসুমীকে বিয়ের পর উত্তরার একটি বাসায় রাখেন। মৌসুমীরও এটা দ্বিতীয় বিয়ে। রুকনকে বিয়ে করার আগে ৪০ লাখ টাকা নিয়ে মৌসুমী তার আগের স্বামীর সংসার ছাড়েন।

এ নিয়ে সরিষাবাড়ীতে নানান কথা চালু আছে। সরিষাবাড়ী থানার ওসি রেজাউল ইসলাম খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তার জানামতে মেয়র রুকনের কোনো শত্রু ছিল না। তার পারিবারিক সমস্যা থাকতে পারে।

সরিষাবাড়ীর স্থানীয় সূত্র জানায়, কোটি টাকা কাবিনে উম্মে হাবিবা মৌসুমীকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে ঘরে তোলার পর থেকেই মেয়রের পরিবারে কলহ চলছিল। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বনিবনা হচ্ছিল না।

অন্যদিকে কোটি টাকা দেয়ার ভয়ে দ্বিতীয় স্ত্রীকেও তালাক দিতে পারছিলেন না। মাস দুয়েক আগে দ্বিতীয় স্ত্রী ঢাকা থেকে সরিষাবাড়ী গিয়ে মেয়রের বাড়ি থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র ঢাকায় আনার উদ্যোগ নিলে কলহ বাড়তে থাকে।

এরই জেরে মেয়র রুকন প্রথম স্ত্রীকে তালাক দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হস্তক্ষেপে সেখান থেকে প্রকাশ্যে সরে আসেন রুকন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে এ নিয়ে কলহ চলছিল।

সূত্র বলছে, দ্বিতীয় স্ত্রী এর আগে এক প্রবাসীকে বিয়ে করেছিলেন। ওই প্রবাসীর কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা বাগিয়ে নিয়ে এক বছর আগে তাকে তালাক দিয়ে রুকনকে বিয়ে করেন।

অপহরণের ঘটনায় জিডি করা হয় উত্তরা থানায়। জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুর রাজ্জাক জানান, রুকন যে মোবাইল ফোনটি নিয়ে বের হয়েছিলেন তা এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সেটি উদ্ধারে প্রযুক্তির সহযোগিতা নেয়া হচ্ছে। মেয়রের বাসায় যে নারী এসেছিলেন তাকেও চিহ্নিত করা যায়নি। তাকে পাওয়া গেলে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন সহজ হতে পারে।

কথা হয় মেয়র রুকনের বড় ভাই ও জিডির বাদী সাইফুল ইসলাম টুকনের সঙ্গে। তিনি বলেন, রুকন যখন বাসা থেকে বের হন তখন গানম্যান শিহাব উদ্দিন তার সঙ্গে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি কাউকে সঙ্গে নেননি।

তিনি বলেছেন, ‘আমি একটি ব্যক্তিগত কাজে বের হচ্ছি। পাশের পার্কে যাব। এখনই চলে আসব।’

টুকন বলেন, ‘ঘটনার পরদিন ২৬ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টার দিকে আমিসহ পাঁচজনকে র‌্যাব প্রধান কার্যালয়ে ডেকে নেয়া হয়। আমার সঙ্গে ছিলেন মেয়রের দ্বিতীয় স্ত্রী (আমার শ্যালিকা) উম্মে হাবিবা মৌসুমী, মেয়রের পোশাক কারখানা দেখভালের কাজে নিয়োজিত মিশু, মেয়রের গানম্যান শিহাব উদ্দিন এবং গাড়িচালক আবু সাঈদ।

সারাদিন র‌্যাব কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রাত ১১টার দিকে আমাদের ছেড়ে দেয়া হয়। রুকন কিভাবে নিখোঁজ হয়েছে র‌্যাব আমাদের কাছে তা জানতে চেয়েছে। কিন্তু আমরা কিছু জানাতে পারিনি।’

এ বিষয়ে র‌্যাব পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, রুকনকে উদ্ধারে তার স্বজনদের কাছ থেকে কিছু তথ্য চেয়েছিলাম। কিন্তু তারা কোনো তথ্য দিতে পারেননি। এ বিষয়ে র‌্যাবের কাছে উল্লেখ করার মতো কোনো তথ্য নেই।

মেয়রকে উদ্ধারের পর রাতে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। রাত সাড়ে ১২টার দিকে নেয়া হয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা কার্যালয়ে (ডিবি)।

বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বিকালে মেয়রকে পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে বিকালে তাকে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

মেয়রের বড় ভাই টুকন বলেন, হার্টের সমস্যা ও উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন মেয়র। অপহরণ নিয়ে তাকে কিছু জিজ্ঞেস করা হয়নি। সুস্থ হলে তিনি নিজেই সংবাদ সম্মেলনে সবকিছু বলবেন।

এক প্রশ্নের জবাবে টুকন বলেন, রুকনের দুটি মোবাইল সেট। একটি সঙ্গে করে নিয়ে বের হয়েছিলেন। সঙ্গে থাকা মোবাইলটির হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। টুকন জানান, রুকনকে কেউ হুমকি দেয়নি। দলীয় নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করতেই তিনি অপহরণের আগের দিন একটি স্ট্যাটাস দেন।

সেখানে উল্লেখ করেন, ‘নতুন প্রজন্মের কাছে আমার আহ্বান- আমাকে হত্যা করা হলেও তোমাদের সিক্ত ভালোবাসা যেন অটুট থাকে। আমার উন্নয়নের ধারাবাহিকতা তোমরা ধরে রাখবা।’

টুকন আরও জানান, মেয়র সরিষাবাড়ী থেকে ঢাকায় এলে উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের ৬০ নম্বর বাসায় থাকতেন। ছয়তলা ভবনের তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে মেয়র ছাড়াও তার গানম্যান, গাড়িচালক, এক ভাতিজা এবং অফিসের দুই কর্মচারী থাকতেন।

এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক রুকন। ছেলে স্বপ্নীলের বয়স (১৪) এবং মেয়ে স্মরণীর বয়স (৭)।

কথা হয় সরিষাবাড়ী পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি উপাধ্যক্ষ মিজানুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার জানামতে তার কোনো শত্রু নেই। তার প্রথম স্ত্রী কামরুন্নাহার হ্যাপী সরিষাবাড়ীতে থাকেন। দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে তিনি ঢাকায় থাকতেন।

এক বছর আগে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন ঢাকাতেই। তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দিলে তাকে পৌর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির পদ দেয়া হয়। পরে তিনি আওয়ামী লীগের টিকিটে মেয়র পদে নির্বাচন করে জয়ী হন।’

সরিষাবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হারুন আর রশীদ বলেন, ‘বৃহস্পতিবার দুপুরে আমি মেয়রের সঙ্গে দেখা করতে হাসপাতালে গিয়েছিলাম। কোনো কথা বলতে পারিনি। ডাক্তারদের বারণ আছে।

উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি আলী হোসেন খান জানান, পৌর মেয়র এখনও অসুস্থ। স্বাভাবিকভাবে কথা বলার মতো পরিস্থিতিতে তিনি নেই। সুস্থ হলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তখন প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে। যে নারী মেয়রের সঙ্গে দেখা করে গেছেন সেই নারীর বিষয়ে এখনও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

একই ধরনের তথ্য জানিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘মেয়র স্বাভাবিক পর্যায়ে এলে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে পরবর্তীতে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তিনি জানান, ঘটনার দিন সকালে যে নারী মেয়রের সঙ্গে দেখা করে গেছেন, তাকে খোঁজা হচ্ছে। পুরো বিষয়টি ডিবি পুলিশের পক্ষ থেকে মনিটরিং করা হচ্ছে। ডিবির যুগ্ম-কমিশনার আবদুল বাতেন জানান, মেয়র রুকনকে তার পরিবারের সদস্যদের জিম্মায় দেয়া হয়েছে। অপহরণ রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত অব্যাহত আছে।

সরিষাবাড়ী থানার ওসি রেজাউল ইসলাম খান বলেন, ব্যবসায়িক লাইসেন্স না দেয়ায় রফিকুল ইসলাম নামে এক ঠিকাদারের সঙ্গে প্রায় এক মাস আগে রুকনের কথাকাটাকাটি হয়েছিল। এ ঘটনায় সরিষাবাড়ী থানায় একটি জিডি করেছিলেন রুকন।

সরিষাবাড়ী প্রতিনিধি জানান, যোগাযোগ করা হলে মেয়রের প্রথম স্ত্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা কামরুন্নাহার হ্যাপী সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে বলেন, স্বামী মেয়র রুকুনুজ্জামানের নিখোঁজ বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তাকে সন্ধ্যায় ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।


আরএস/০২:১৫/২৯ সেপ্টেম্বর

জামালপুর

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে