Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২০ , ৫ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 1.5/5 (4 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১২-২৮-২০১২

নতুন বছরে স্বপ্নের বাংলাদেশ 

ফকির ইলিয়াস



	নতুন বছরে স্বপ্নের বাংলাদেশ 

আর কদিন পরই ২০১৩ সাল শুরু হতে যাচ্ছে। এদেশের মানুষের স্বপ্ন অনেক। এই স্বপ্ন দীর্ঘদিনের। চার দশক পেরিয়ে গেছে। আমরা জানি, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশায় কোনো কৃত্রিমতা ছিল না। তারা রক্ত দিয়েই একটি মানচিত্র পাওয়ার জন্য উদগ্রীব ছিল। তাই প্রাণের বলিদান, আত্মাহুতি কোনো মুখ্য বিষয় ছিল না। ১৯৭১ সালে, সে সময় রাজনীতিকরাও স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন একটি স্বাধীন ভূমির। একটি বলীয়ান জাতিসত্তার। মানুষ রাজনীতিকদের কথায় আস্থা রেখেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল যুদ্ধে। সে যুদ্ধে তারা বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল। এরপরের দায়িত্বটুকু ছিল জনগণ-রাজনীতিকের সমন্বয় সাধনের। যে কাজটি দ্রুত করতে পারেননি স্বাধীনতা পরবর্তী রাষ্ট্রশাসকরা। করতে পারলে তাৎক্ষণিক বহুধা বিভক্তির জন্ম হতো না। মানুষও বিভ্রান্ত হতো না। একটি স্থিতিশীলতার পথ দেখতো জাতি।

রাষ্ট্রের অবকাঠামো নির্মাণে, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা সবসময়ই জরুরি ভূমিকা রাখে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সে পরিকল্পনায় ছিলেন ব্যাপক উদার। তার উদারতা তাৎক্ষণিক মহানুভবতার পরিচয় দিলেও পরাজিত পক্ষ সেটা দেখেছিল দুর্বলতা হিসেবে। যার ফলে এখনো তারা বলে কিংবা বলার সাহস দেখায়, শেখ মুজিব ঘাতক-দালালদের সাধারণ ক্ষমা করে দিয়েছিলেন! বঙ্গবন্ধু তেমন কোনো ‘ক্ষমা’ ঘোষণা করেননি। বরং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার তাগিদ দিয়েছিলেন। বিভিন্ন ব্যক্তিগত খাতিরের সুযোগ নিয়ে, সামাজিক মুচলেকা দিয়ে তারা পার পাওয়ার চেষ্টা করেছিল। কেউ কেউ পলায়ন করেছিল পাকিস্তানে। পলাতক মাহমুদ আলী পাকিস্তানে মারা গেলেও গোলাম আযমরা ফিরে এসেছিল পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে এবং পাখনা মেলেছিল সদলবলে। পঁচাত্তরের নির্মম হত্যাযজ্ঞের পর যারা ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার নেশায় মত্ত ছিল তাদের লক্ষ্য ছিল ভিন্ন। দেশের মঙ্গল সাধনের চেয়ে, দেশ থেকে মুজিব এবং তার স্বপ্নের নামাবলি মুছে দেয়ার প্রধান ইজারা নিয়েছিল তারা। দেশের মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটানোর চেয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ লুটপাটকে বেছে নিয়েছিল তারা টিকে থাকার সিঁড়ি হিসেবে।
 
প্রয়োজনীয় গণউন্নয়ন খাতের বাজেটকে সঙ্কুচিত করে তারা মনগড়া অনুন্নয়নশীল খাতে বরাদ্দ করেছিল বেশি রাষ্ট্রীয় অর্থ। সবচেয়ে বেশি অমনোযোগী ছিল শিক্ষা খাতের প্রতি। ভয় ছিল, মানুষ সুশিক্ষিত হয়ে গেলে লুটপাটের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদী হয়ে উঠতে পারে। একটি জাতি ও রাষ্ট্র গঠনে যে প্রত্যয়টির প্রধানত প্রয়োজন ছিল তা হচ্ছে দেশ গঠনে আন্তরিকতা। সেদিকে না এগিয়ে একটি মহল বন্দুক উঁচিয়ে ক্ষমতা স্থায়ী বন্দোবস্ত নিয়ে ছিল মরিয়া। শেখ মুজিবকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বিভিন্ন নেতা স্পষ্ট বলেছিলেন, কালসাপেরা ছোবল দিতে পারে। হ্যাঁ, সেটাই হয়েছিল। বন্দুকধারীদের সঙ্গে খুব সহজেই যোগ দিয়েছিল পরাজিত রাজাকার চক্র। তাদের মধ্য থেকে শাহ আজিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী করার মাধ্যমে রাজাকার পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল বেশ জোরেশোরে। এ সময় দুটি চেষ্টা ছিল প্রকট। একটি হচ্ছে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে পলিটিশিয়ানদের জন্য পলিটিক্সকে ডিফিকাল্ট করা। আর অন্যটি হচ্ছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নামক দলটিকে ক্রমেই নিশ্চিহ্ন করে দেয়া। এই দলের নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, অতএব এদেরই নিপাত করো এমন একটি নেপথ্য চিন্তায় ইন্ধন জুগিয়েছিল পরাজিত ঘাতক আলবদর-রাজাকার চক্র। পাক তমদ্দুনকে কাজে লাগানোর চেষ্টা ছিল ব্যাপক। একটি রাষ্ট্রের বশ্যতা স্বীকার করে সে রাষ্ট্রের মানুষের জন্য পজিটিভ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করার মানসিকতা বাংলাদেশে পরাজিত চক্রের শুরুতেই ছিল না। তারা নাখোশ হয়ে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ছিল ১৯৭৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত। এরপরই সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছিল যথার্থই।
 
বাংলাদেশের উন্নয়ন না হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হচ্ছে জনগণের প্রতি রাজনীতিকদের আনুগত্য না থাকা। দায়বদ্ধতার অভাব এবং জনগণের সম্পত্তি হরণ করে নেয়ার মানসিকতা। স্বৈরশাসক এরশাদ সে কাজে নতুন মাত্রা যুক্ত করে, মস্তানদের লেলিয়ে দেন প্রতিপক্ষ রাজনীতিকদের ওপর। ফলে দেশের ভেতরে ‘পলিটিক্যাল ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’রা প্রবল শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এরা মন্ত্রিত্ব পর্যন্ত পায়। তাদের বাসা থেকে ধৃত হয় গালকাটা কামালের মতো দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। রাষ্ট্রপক্ষ, জনগণের ওপর এমন দানব লেলিয়ে দেয়ার ঘটনাগুলো বাংলাদেশের রাজনীতিকে বিষিয়ে তোলে।
 
এরশাদের পতনের পর তারা নতুন আঙ্গিকে প্রধান দুদল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ওপর ভর করে। তারা শুরু করে নতুন নতুন অপচেষ্টা। এই যে দুই প্রধান দলের ভেতরের লুটেরা শ্রেণী, তারা যে এরশাদের সৃষ্টি তা খুঁজে দেখলেই স্পষ্ট হয়ে যাবে। এদের দেখাদেখি প্রধান দুই দলে আরো কিছু নেতা এ পথ অনুসরণ করেছে ’৯০-এর গণআন্দোলনের পরে।
 
প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার পর দেশে ডানপন্থী মোর্চাটি বেপরোয়া হয়ে উঠতে থাকে। এই যে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রথা’ সেটাও কিন্তু রাজনীতিকদের পারস্পরিক অবিশ্বাসের ফসল। রাজনীতিকদের যে ন্যূনতম দায়বদ্ধতা জনগণের প্রতি নেই তার প্রমাণও এই তত্ত্বাবধায়ক প্রথাটি। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতেও এতো চমৎকার গণতান্ত্রিক সৌহার্দ্য থাকার পরও বাংলাদেশ তা অনুসরণ করতে পারেনি তা চরম বেদনাদায়ক এবং লজ্জাজনকও বটে।
 
বিএনপির ব্যর্থতার কারণে ’৯৬-এর নির্বাচনে জিতে আসে আওয়ামী লীগ। কিন্তু এ সময়ে আওয়ামী নেতারা আরো দাম্ভিক, অহমিকাপূর্ণ আচরণ শুরু করেন গণমানুষের প্রতি। দুর্নীতিতে তারাও সমান পারদর্শিতা দেখান। মানুষ দাঁড়ানোর পথ খুঁজে না পেয়ে ২০০১ সালের নির্বাচনে আবার বিএনপি জোটের হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়। সে সঙ্গে মন্ত্রিত্ব পায় একাত্তরের আলবদর বাহিনীর দুই খুনি ও তাদের প্রেতাত্মা। দেশে জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদ লালনে স্বীকৃত রাজনীতিকদের কী ভূমিকা ছিল তা আজো অজ্ঞাত। শায়খ রহমান কিংবা বাংলা ভাই কখনই দেশে প্রধান কোনো নায়ক ছিল না। প্রধান নায়করা নেপথ্যে ছিল এবং এখনো আছে। ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের মূল্য যারা এখনো স্বীকার করতে চায় নাÑ তারা অন্যভাবে ক্ষমতার মসনদ চায়। আর তা হচ্ছে জঙ্গিবাদ। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জরিপ, সমীক্ষার মতে বাংলাদেশ জঙ্গিবাদের উর্বর ভূমি হতে চলেছিল ২০০১-২০০৫ সালে। এর আগেই কেউ কেউ ‘বাংলা হবে আফগান’ সেøাগান দিয়েছিল প্রকাশ্যেই। যা রাষ্ট্রের জন্য, মানুষের জন্য ছিল ভয়ানক শঙ্কার কারণ। শঙ্কার কারণ ছিল সুস্থ ধারার রাজনীতির জন্যও। এমন চরম হতাশার মধ্যেই জন্ম নেয় ওয়ান-ইলেভেন নামক পরিবর্তনটি। এরপর দেশের মানুষ আবারো গণতন্ত্রের পক্ষে রায় দিয়ে মহাজোটকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। প্রায় এক কোটি নতুন ভোটার চেয়েছিল- যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। এই প্রক্রিয়াটি এখন যখন চলছে, তখন আমরা দেখছি একটি বিশেষ মহল নানা ভাবে সরকারের প্রক্রিয়া বানচাল করার চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। হঠাৎ করেই তুরস্কের একটি প্রতিনিধিদল বিশেষ ভিসায় বাংলাদেশে এসে বিশেষ ট্রাইবুন্যালের বিরুদ্ধে নানা কথা বলছে। তুরস্কের এই প্রতিনিধিদল ঢাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কার্যক্রম সরজমিন দেখতে যান। এছাড়া তারা এই আদালতে ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে কথা বলেন বিভিন্ন মহলের সঙ্গে। আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ বলেছেন, কারো দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কেউ বিদেশে এই বিচার নিয়ে মন্তব্য করলে সেটাকে তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বলে বিবেচনা করবেন। এই বক্তব্য তিনি তুরস্কের দলটিকে জানিয়ে দিয়েছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কিছুই না জানিয়ে তুরস্কের এই দল ঢাকায় বিমানবন্দরে এসে অন অ্যারাইভাল ভিসা নিয়েছিল। এর অর্থ কী? তার অর্থ হলো এই এরা পরিকল্পিতভাবেই বাংলাদেশে এসেছে- রাজাকার আলবদরদের পক্ষে অবস্থান নিতে। এদিকে, বিশেষ ভিসার ‘অপব্যবহার’ করে তুরস্কের বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এসে মানবতাবিরোধী অপরাধের আসামিদের পক্ষে দূতিয়ালি করায় সরকার উদ্বিগ্ন। সে কথা তুরস্কের রাষ্ট্রদূত মেহমুত ভারকুল ইরকুলকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে এ বিষয়ে সরকারের অসন্তোষের কথা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
 
বাংলাদেশে মৌলবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়নে পরিকল্পনা নতুন নয়। ২০১৩ সালে তা আরো প্রকট রূপ নিতে পারে। মৌলবাদীদের দোসররা বিদেশ থেকে আরো লবিস্ট নিয়ে যেতে পারে। আমরা নিকট অতীতে দেখেছি, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি এমন বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে যেখানে ভাস্কর্য পর্যন্ত নিরাপদ নয়। একশ্রেণী ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি করে দেশকে অচল করে দেয়ার পাঁয়তারা করেছে এরাই। এরা ১৮ দলীয় জোটের নামে মূলত আবারো জঙ্গিতন্ত্র কায়েমে তৎপর হবে সন্দেহ নেই। এমনি একটি শঙ্কা নিয়েই প্রস্তুতি নিতে হবে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের। তত্ত্বাবধায়ক- নাকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হবে- সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। আমরা একটি সুখী বাংলাদেশ চেয়েছিলাম। তা কি বাস্তবায়িত হবে? নাকি শহীদের রক্তেভেজা এই বাংলার মাটিতে অধরাই থেকে যাবে স্বপ্নের নামাবলি! বিষয়টি এই প্রজন্মকে ভাবতে হবে গভীরভাবে।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে