Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২০ , ১০ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 1.0/5 (2 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১২-২২-২০১২

ব্যর্থতার কারণগুলো খতিয়ে না দেখলে

ফকির ইলিয়াস



	ব্যর্থতার কারণগুলো খতিয়ে না দেখলে

একটা তীব্র সংকট আর শঙ্কার দিকে অগ্রসর হচ্ছে বাংলাদেশ। বিজয়ের ৪১ বছর পূর্ণ করেও একটা চরম অপূর্ণতা। এই অপূর্ণতার দায় জনগণের নয়। দায় রাজনীতিকদের। যারা এই দেশের মানুষকে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখাতে পারতেন। কথা ছিল এই বিজয় দিবসের আগেই একাত্তরের ঘাতক-দালাল, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় ঘোষণা করা হবে। না, তা হয়নি। তাহলে কি নেপথ্যে কেউ রায় ঠেকিয়ে দিচ্ছে? এমন প্রশ্ন জনগণের মাঝে।

এলজিআরডি মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন আগামী বিজয় দিবসের (২০১৩) আগেই রায় কার্যকর করা হবে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস তেমনটি বলে না। রায় ঘোষিত হবে। আপিল হবে। আপিলের রায় হবে। আরো কতো কী! বর্তমান মহাজোট সরকারের সময় মাত্র এক বছর। এ সময়ের মাঝে তারা তা পারবেন, এমন কোনো লক্ষণ আছে বলে আমি অন্তত মনে করি না। আমার কাছে কেন জানি মনে হচ্ছে, মহাজোট সরকারের ব্যর্থতার পাল্লা দিন দিন ভারী হচ্ছে। একটা কালো মেঘের রেখা ক্রমশ ঢেকে দিচ্ছে তাদের সফলতার কিয়দংশ। সম্প্রতি বিকাশ নামের একজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর জামিন লাভ এবং দেশ থেকে ভারতে পলায়ন বিষয়ে নানা সংবাদ পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। কোনো কোনো মন্ত্রী এই শীর্ষ সন্ত্রাসীর জামিনের পক্ষে আইনি প্রক্রিয়ার সাফাইও গেয়েছেন। কোনো অভিযুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী এভাবে মুক্তি পায় কী করে? নিশ্চয়ই তার খুঁটির জোর অনেক বেশি ছিল বলেই সে জামিন পেয়েছে! এটা বর্তমান সরকারের জন্য একটি চরম বিব্রতকর সংবাদ তো বটেই।
 
বিশ্বজিৎ দাশ হত্যাকান্ডের খুনিরা ধরা পড়ার পর এখন কেউ কেউ এদের বাঁচাতেও মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এই জাতি খুব হতবাক হয়ে দেখলো, হতভাগা দর্জি বিশ্বজিতের পরিবারকে সান্ত¡না দেয়ার জন্য কোনো রাজনীতিকই তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন না। অথচ বিশ্বজিৎ হত্যাকা- গোটা বিশ্বের বিবেকবান মানুষকে নাড়া দিয়েছে। শিরোনাম হয়েছে ইউরোপ-আমেরিকার সংবাদ মাধ্যমে। এমন নৃশংস হত্যাকান্ডের পরও সরকারের শীর্ষ মহল ‘নেপথ্য শক্তির হাত খুঁজছেন। যদি নেপথ্য শক্তি থেকেই থাকে, তবে ওদের আইনের হাতে সোপর্দ করা হচ্ছে না কেন? ঠিক একইভাবে ষড়যন্ত্রের গন্ধও খোঁজা হচ্ছে পদ্মা সেতু ও বিশ্বব্যাংক ইস্যুতে। প্রধানমন্ত্রী বলেই দিয়েছেন, দুদককে চাপের মধ্যে রেখে নাকি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করতে চাইছে বিশ্বব্যাংক। এসব কথা কী সঙ্গতিপূর্ণ হচ্ছে? শেষ পর্যন্ত যে মামলা হয়েছে, তার সাবেক দুই মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন এবং আবুল হাসান চৌধুরীকে আসামি করা হয়নি। বলা হয়েছে তাদেরকে সন্দেহভাজন তালিকায় রাখা হয়েছে। পদ্মা সেতু বিতর্ক যেভাবে গড়াচ্ছে তা বেশ নিশ্চিত করে বলা যায়, পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তুত স্থাপন বর্তমান সরকারের সময়ে হবে না। আর এভাবেই ব্যর্থতার পাল্লা ভারী হচ্ছে বর্তমান সরকারের। সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা রুজু হওয়ার পর বিশ্বব্যাংকের ঢাকা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, পর্যবেক্ষক কমিটির মতামত জানার পর তারা তাদের সিদ্ধান্ত জানাবেন। অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেছেন, দুদকের পরামর্শ অনুযায়ী মামলা করা হয়েছে। একটি বিষয় খুব স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, বাংলাদেশে কিছু কিছু ‘ব্যক্তি’কে স্পর্শ করা সম্ভব নয়!
 
দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়া যখন বেশ এগিয়েছে, তখন আলবদর-রাজাকার দোসররা বসে নেই। তা দেখছে দেশের মানুষ। অন্যদিকে মৌলবাদী রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে বাম মোর্চা হরতাল পালন করেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর জন্য নানা গ্রুপ এখন সক্রিয়। ‘সেভ বাংলাদেশ’ নামে একটি অনলাইন গ্রুপ যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে নানাভাবে মরিয়া হয়ে উঠেছে। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, বাংলাদেশ বাঁচানো দরকার। সেখানে ‘যুদ্ধাপরাধী ইস্যু’ কোনো বিষয় নয়!
 
সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়ায় ত্বরান্বিত করতে চাইছে এটা ঠিক। কিন্তু এর পাশাপাশি অন্য ইস্যুগুলো সুষ্ঠুভাবে সমাধান করতে চরম ব্যর্থ হয়েছে। শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি, ইলিয়াস আলী গুম, সাগর-রুনি হত্যা মামলা, হলমার্ক কেলেঙ্কারি, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এপিএস কেলেঙ্কারি বিষয়গুলো রাষ্ট্রের বিভিন্ন অবকাঠামোতে ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। এই ক্ষত ক্রমশ বৃহৎ কর্কটে রূপ নিতে পারে। এবং সরকারকে ভোটের রাজনীতিতে চরম বেকায়দায় ফেলতে পারে।
 
বাংলাদেশে ছাত্রলীগ, যুবলীগ নামধারী কিছু দখলদারদের তান্ডব গণমানুষকে চরম অতিষ্ঠ করে তুলেছে। জঙ্গিবাদ আর হাওয়া ভবনের দৌরাত্ম্য থেকে বাঁচার জন্য মানুষ মহাজোটকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। কিন্তু ফলাফল কী হয়েছে? এটা নিশ্চিত করে বলা যায়, যদি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের ভরাডুবি হয়, তবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার পরদিনই ভেস্তে যাবে।
 
পনেরো আগস্টের খুনিদের খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে (২০০১) মুক্ত করার সাহস দেখাননি। কিন্তু ২০১৪-এর প্রেক্ষাপট হবে ভিন্ন। কারণ রাজাকার আলবদর চক্রের দোসররা তাদের নেতাদের মুক্তির দাবিটি প্রধান করেই নির্বাচনে বিএনপিকে সমর্থন দেবে। অন্যদিকে বেগম খালেদা জিয়ার দুই পুত্র দেশে ফেরার জন্যও জামাতের সমর্থনের দরকার রয়েছে বিএনপির।
 
কথায় বলে, পুকুরে কুমির রেখে মাছের চাষ করা যায় না। বাংলাদেশে অবস্থা এখন অনেকটা তাই। বেশ কজন মন্ত্রী, উপদেষ্টা যেভাবে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলছেন, তাতে সরকার পক্ষের পালক প্রতিটিই খসে পড়ছে। আর পালকবিহীন পাখির শ্রী কেমন হয়, তা সরকারের নীতিনির্ধারকদের অজানা নয়। সরকারের নীতিনির্ধারকরা অনেক কিছু জানেন। তারপরও তারা ক্রমশ যেভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন, তাতে দেশের মানুষ আস্থা হারাচ্ছেন প্রতিদিন। এই সুযোগে কিছু ‘পুরোনো জ্ঞানপাপীরা’ সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করেই যাচ্ছে। ‘উত্তরা কেলেঙ্কারির নায়ক’ জ্বালানি উপদেষ্টার দায়িত্বে থাকা বেগম জিয়ার একজন প্রিয় সম্পাদক এখন হিরো বনার চেষ্টায় আছেন। বিচারকের স্কাইপি কথোপকথন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার পিছিয়ে দিয়েছে, এমন ক্রেডিট এই মহলটি নিতে চাইছে। আর কিছু ডানপন্থি লেখক বুদ্ধিজীবী হাততালি দিচ্ছে তাদের পাশে থেকে। সরকারের ব্যর্থতাগুলোর কারণ খতিয়ে দেখা খুবই জরুরি দরকার। ‘কোনো ব্যর্থতা নেই’ এমন বুলি আউড়িয়ে ক্ষমতাসীনরা পার পেয়ে যাবেনÑ তা ভাবার কোনো অবকাশ নেই।
 
আমরা দেখছি, সরকারের কিছু ‘মাউথ স্পিকার’ সিনিয়র নেতারা নানারকম অসংলগ্ন কথাবার্তা বলে চমক দেখাতে চাইছেন। এমন চমক হালে খুব দ্রুতই ফিকে হয়ে যায়। কিছু কিছু বিষয় আছে; যা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের দাবি রাখে। বাংলাদেশে সুবিচার প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি দমনে যদি প্রধানমন্ত্রী নিজে তদারকি করেন, তবে আগামী এক বছরে কিছুটা হলেও রাষ্ট্রের অবস্থার উন্নতি হতে পারে। মনে রাখা দরকার, বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, লেখক আহমদ ছফা বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ যখন জিতে, তখন একাই জিতে। আর যখন হেরে যায় তখন গোটা বাংলাদেশ হেরে যায়।’ প্রশ্ন হচ্ছে যুদ্ধাপরাধী ও তাদের দোসরদের কাছে বাংলাদেশ কী আবার হেরে যাবে?
 
 

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে