Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২০ , ১০ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 4.0/5 (1 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১২-১৫-২০১২

বিজয়ের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে

ফকির ইলিয়াস



	বিজয়ের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে

বিজয়ের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে এই প্রজন্ম যে স্বপ্ন দেখে, তা হচ্ছে মানুষ হিসেবে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার। বিশ্বজিৎ দাস- তেমনি একজন তরুণ ছিলেন। তিনি পেশা হিসেবে দর্জি জীবন বেছে নিয়েছিলেন। যেদিন তাকে হত্যা করা হয় সেদিন তিনি কাজে যাচ্ছিলেন। না, কোনো মিছিলে-পিকেটিংয়ে-সভায় যাচ্ছিলেন না। একজন মানুষ তার নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাবে, যেতে পারবে বলেই আমরা স্বাধীনতা চেয়েছিলাম। আমরা বিজয় চেয়েছিলাম। সেই বিজয়ের বাংলাদেশে এসব কী হচ্ছে? একদিকে ঘাতক-রাজাকারদের চামচাদের আস্ফালন। আর অন্যদিকে মধ্যস্বত্বভোগীদের দখল প্রচেষ্টা!

বিশ্বজিৎকে যারা হত্যা করেছে, ওদের ছবি মিডিয়ায় এসেছে। টিভিতে দেখানো হয়েছে সেইসব বীভৎস চিত্রাবলি। তারপরও ওদেরকে কি রাষ্ট্রপক্ষের চিনতে অসুবিধা হচ্ছে? কেন হচ্ছে? মনে রাখা দরকার এসব হায়েনাদের কঠোর হাতে শায়েস্তা করতে না পারলে প্রকারান্তরে মৌলবাদী-জঙ্গিবাদীরাই হীনস্বার্থ হাসিলে ম“ পাবে। ভেঙে পড়তে পারে গোটা দেশের কলকব্জা। মনে রাখা দরকার, লুটপাট আর ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্য তিরিশ লাখ লোক নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করেননি। তারা চেয়েছিলেন, পরবর্তী প্রজন্ম শান্তিতে, স্বস্তিতে বেঁচে থাকবে। যে চেতনা, স্বপ্ন এবং প্রত্যাশার লক্ষ্যে স্বাধীন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির অভ্যুদয় হয়েছিল তা আজ কতোটা বাস্তবতার পরশ পেয়েছে, সে প্রশ্নটি উত্থাপিত হচ্ছে বারবার। ৪২ বছর একটি জাতি এবং রাষ্ট্র পুনর্গঠনে কম সময় নয়। রাষ্ট্রের রাজনীতিকরা চাইলে অনেক কিছুই হতে পারতেন। কিন্তু হয়নি। কেন হয়নি সে প্রশ্নের জবাব কারোই অজানা নয়।
 
বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির মৌলিক মূলনীতি ছিল গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং জাতীয়তাবাদ। একটি দেশে গণতন্ত্রের পাশাপাশি সমাজতন্ত্র চলতে পারে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। তারপরও ঊনসত্তর-সত্তর-একাত্তরে জাতীয় রাজনৈতিক ঐকমত্যের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল ঐ চার মূলনীতির পক্ষে। যার ওপর ভিত্তি করে সংগঠিত হয়েছিল মহান মুক্তিযুদ্ধ। এটা খুবই হতাশা এবং দুঃখের কথা, যে চেতনা নিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল, স্বাধীনতা অর্জনের পর সে চেতনা আর রাষ্ট্র পরিচালকদের মাঝে সমুন্নত ছিল না। যার ফলেই পরাজিত মধ্যস্বত্বভোগী গোষ্ঠীটি সুযোগ মতো তাদের ছোবল দিতে তৎপর ছিল। ‘একশ এক’ টাকা কিংবা ‘এক হাজার এক’ টাকায় রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি কাউকে দান করে দেয়ার রেওয়াজ বিশ্বের অন্য কোনো দেশে আছে কিনা- তা আমার জানা নেই। কিন্তু শুধুমাত্র বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিতেই গেলো ৪২ বছরে অনেক মূল্যবান ভবন, হাজার হাজার একর পতিত জমি, খাসভূমি উদ্যান, নামমাত্র মূল্যে বিলিবণ্টন করে নিয়েছেন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক-পরিচালকরা। কতোটা মগের মুল্লুক মনে করলে এমনটি করা যেতে পারে তা ভাবলে গা শিউরে ওঠে। কিন্তু রাষ্ট্রের জনগণ এতোই অসহায় যে তারা প্রতিবাদ তো দূরের কথা ‘রা’টি পর্যন্ত করেন না। কিংবা করতে পারেন না।
 
ভেবে অবাক হতে হয় দেশের প্রতিটি সরকারই গেলো ৪২ বছর বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে মনোযোগী না হয়ে বরং চেপে গেছে। সন্ত্রাস, দুর্নীতি, রাজনৈতিক নিপীড়নÑ এগুলোর মতো বড় ইস্যুর কথা যদি বাদই দিই তবে তো রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোনো দায়িত্ব থাকে না। তারপরও আছে আরো অনেক ছোট ছোট জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বাংলাদেশে লঞ্চ-স্টিমারডুবির মতো একটা ভয়াবহ ঘটনা ঘটে প্রায় প্রতি বর্ষা মৌসুমে। পত্র-পত্রিকার ভাষ্য অনুযায়ী প্রায় প্রতি বছরই লঞ্চ-স্টিমারডুবির ঘটনা ঘটে বাংলাদেশে। হাজার হাজার লোকের প্রাণহানি ঘটে। পরিতাপের বিষয় এর কোনো তদন্ত হয় না। লঞ্চ-স্টিমার-জাহাজ নিয়ন্ত্রণ বিধি বলে কোনো নিয়মকানুন নেই। বাংলাদেশের প্রতিটি সেক্টরই এক একটি মিনি স্বৈরকেন্দ্র। চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যাংকিং, ডাক, তার-টেলি, সড়ক, পরিবহন সবকটি গণপ্রয়োজনীয় সেক্টরই নিয়ন্ত্রণ করছে এক একটি স্বৈরপেশিশক্তি। কোনো রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলে আগে তার পকেট গুনে দেখার চেষ্টা করা হয়। রোগীটি ধনী না গরিব। ধনী হলে তাকে চিকিৎসকদের পছন্দমতো (যেগুলো নেপথ্য পার্টনার তারা নিজেরাই) ক্লিনিকে ভর্তির উপদেশ (!) দেয়া হয়। আর রোগীটি গরিব হলে তার স্থান হয় হাসপাতালের বারান্দায়। একই অবস্থা শিক্ষা ক্ষেত্রেও। মন্ত্রী-আমলা-বড় কর্তাদের সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য পাঠানো হয় বিদেশে। আর গরিব মধ্যবিত্তদের সন্তানদের রাজনীতিকরা ব্যবহার করেন তাদের হাতিয়ার হিসেবে। শিক্ষকরা পরামর্শ দেন প্রাইভেট কোচিং সেন্টার, প্রাইভেট স্কুল কলেজে ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি হবার বৈষম্য আর কতোটা নগ্ন হতে পারে? বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরটিও এখন দখল হয়ে গেছে রাজনীতিকদের দ্বারা। বড় বড় সরকারি, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পরিচালক নিয়োগপ্রাপ্ত হন রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে। সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া ‘হলমার্ক’ কেলেঙ্কারি, আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর ট্র্যাজেডির নেপথ্য নায়করা কতোটা দীর্ঘহস্তÑ তা দেখতে পাচ্ছেন দেশের মানুষ। এদের কি আদৌ বিচার হবে, এমন হতাশা প্রকাশিত হচ্ছে মানুষের চোখে মুখে প্রতিদিন। বাংলাদেশের সড়ক ব্যবস্থা, রেল যোগাযোগ এখনো ধারণ করে আছে শত বছরের দারিদ্র্য। লোক দেখানো কিছু উন্নয়ন হলেও এখনো বৃষ্টির পানিতে ডুবে যায় রাজধানী ঢাকা শহর। যাত্রাবাড়ীর মোড় গোটা দেশের মানুষের জন্য এক চরম আতঙ্কের নাম।
 
মন্ত্রীরা গাড়ি হাঁকাতে পারলেও জনসাধারণ হেঁটেও পথ চলতে পারেন না। তার ওপর অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে রাজনৈতিক নেতা ও তাদের দোসরদের ভবন-দালান। দখল হয়ে যাচ্ছে লেক, পার্ক, নদীর চর, এমনকি কখনো কখনো নদীও। যারা ক্ষমতায় থাকছে তাদের নেতাকর্মীরাই ভোগ করছে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিকে। যারা কোটি কোটি টাকা বানাচ্ছেন, তারাই বলেন- দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। মোবাইল ফোন বিপ্লবে সয়লাব এখন দেশ! তাহলে দেশটির গায়ে দারিদ্র্যের ছাপ কোথায়? কে বলবে বাংলাদেশ গরিব দেশ? হ্যাঁ, দারিদ্র্য জড়িয়ে আছে দেশের পাঁজরে, অস্থি, মজ্জায়। কয়েক হাজার পরিবার ধনাঢ্য ব্যক্তিত্বের উত্থান হলেও অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে দারিদ্র্য করে রাখা হয়েছে আপামর জনসাধারণকে। মৌলিক উন্নয়নের কোনো ছোঁয়া রাষ্ট্রের কাঠামোতে লাগেনি।
 
ন্যায্য ইস্যু নিয়ে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কিছু বললে তারা ধর্মঘটের হুমকি দেন। শিক্ষক, বৈমানিক, ব্যাংকার, কর্মকর্তা, শ্রমিকসহ প্রায় প্রতিটি সেক্টরের মানুষের এক অনন্য শক্তি হচ্ছে তারা কর্ম বয়কট করবেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে তারা নিজেরা নিজের আয়নায় নিজের চেহারা দেখেন না। নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত না হলে দেশপ্রেম প্রতিষ্ঠা হয় না। আর দেশপ্রেম প্রতিষ্ঠিত না হলে দেশের কল্যাণে কাজ করার মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না। প্রতিটি জাতির প্রবাসীদের দেশপ্রেম অনন্য। তার কাণে তারা দেশের বাইরে থেকেও দেশের প্রকৃত অবস্থা অনুধাবন করতে পারেন। বাংলাদেশের প্রবাসীরা কোটি কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠান। আর নিজেরা দেশে গিয়ে সামান্য সামাজিক নিরাপত্তাটুকুও পান না। বাঙালি জাতির বিজয়ের স্বপ্ন ছিল। বিজয় এসেছে। কিন্তু পরাজয়ের মৌন ধারাবাহিকতায় ক্রমশ ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে সেই স্বপ্নসৌধ। বলতে দ্বিধা নেই যদি একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক নেতা কিংবা নেত্রী কঠোর হয়ে বাংলাদেশের হাল ধরতেন তবে আজকের প্রেক্ষাপট ভিন্ন রকম হতো।
 
কখনো মনে হয়, বাঙালির সামনে এখন আর বিশেষ কোনো স্বপ্ন-গন্তব্য নেই। জাতি স্বপ্ন দেখতে ভুলে গেছে। তারপরও আশা জাগায় এ দেশের তরুণরা। ওরা জানিয়ে দেয়- এ দেশে আলবদর রাজাকারদের বিচার হতেই হবে। ওরা বলে- শহীদ জননী জাহানারা ইমাম আমাদের আদর্শ। আলবদর-রাজাকারদের বিচার ত্বরান্বিত করার স্বপ্ন নিয়েই বর্তমান মহাজোট সরকারকে দেশের কোটি কোটি তরুণ-তরুণী ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র অব্যাহত ছিল, আছে, থাকবে। তারপরও সকল বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে ট্রাইব্যুনাল যে কাজ করে যাচ্ছে, তা নন্দিত হচ্ছে দেশে-বিদেশে। বিচারপতি নিজামুল হক নাসিমের পদত্যাগ এরই ধারাবাহিকতা। যা তরুণ প্রজন্মের কাছে নন্দিত হয়েছে। এখনো বাঙালি জাতি, বাংলাদেশের সামনে রয়েছে, একটি পরিশুদ্ধ, ইতিহাস অন্বেষী রাষ্ট্র ও প্রজন্ম গঠনের প্রত্যয়। যারা সত্যের ওপর শক্তিশালী বুক নিয়ে দাঁড়াবে। বাঙালি জাতি যদি এই স্বপ্নটি পূরণেও ব্যর্থ হয় তবে জাতির যাযাবরত্ব আরো দীর্ঘায়িত হতে পারে। স্বপ্ন এখন একটিই এই প্রজন্ম জাগবে। ভেঙে দেবে কালো আঁধারের লৌহ দরোজা। বিজয়ের ৪২ বছরের দেনা-পাওনা, ভাগ-বাটোয়ারার হিসাব নিতে হবে। দিতে হবে। শুধু গলাবাজি করে কোনো ক্ষুধার্থকে তুষ্ট করা যায় না। আমি খুব শক্তভাবে বিশ্বাস করি, সকল অশুভ শক্তি এই বাংলাদেশে একদিন পরাজিত হবেই। যেভাবে পরাজিত হয়েছিল একাত্তরে পাকি হানাদার ও তাদের এ দেশীয় দোসররা।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে