Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ২১ আগস্ট, ২০১৯ , ৬ ভাদ্র ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.8/5 (79 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ০৮-২৪-২০১৭

লিখি শান্তি পাবার জন্য। শূন্য হবার জন্য : বিধান সাহা

রাসেল রায়হান


লিখি শান্তি পাবার জন্য। শূন্য হবার জন্য : বিধান সাহা

বিধান সাহা’র জন্ম ২১ মার্চ ১৯৮৪; টাঙ্গাইলের ভূয়াপুরে, মামা বাড়িতে। পৈতৃক নিবাস বগুড়ার ধুনটে। চারুকলা বিষয়ে স্নাতকোত্তর। বর্তমানে একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। প্রকাশিত বই : অব্যক্ত সন্ধির দিকে [কবিতা; চৈতন্য, ২০১৫], এসো বটগাছ [না-কবিতা; চৈতন্য, ২০১৭]।

দ্বিতীয় দশকের কয়েকজন কবির কাব্য-ভাবনা ও লেখালেখি নিয়ে সাহিত্যের এই আয়োজন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একই সময়ের কবি রাসেল রায়হান। 

প্রশ্ন : ঠিক কিসের তাগিদে লিখছেন? এখান থেকেই শুরু করি, কী বলেন?

উত্তর : খুব একটা জটিল করে আমি আমার জীবনকেও কখনো ভেবে দেখিনি। লেখাকে তো নয়ই। এই বিশ্লেষণ কখনো কখনো আত্মঘাতী মনে হয় আমার কাছে। তবে, এইটুকু বলা যেতে পারে, লেখার ভেতর দিয়ে আমি সুন্দরের উপাসনা করি। সুন্দরের কাছে পৌঁছাতে চাই। এমনটা পূর্বেও আরো অনেকেই করেছেন, পরেও আরো অনেকে করবেন। তবু, প্রতিটি মানুষের মুখ চিরকালই আলাদা। আমার মনে হয়, আমার লেখায় কী কী আছে, বা, আদৌ কিছু আছে কিনা, তা খুঁজে দেখার দায় পাঠকের, সমালোচকের।

লিখি স্বস্তি পাবার জন্য। শান্তি পাবার জন্য। শূন্য হবার জন্য।

প্রশ্ন : আপনার প্রকাশিত বইগুলো কতটা ব্যক্তি আপনাকে রিপ্রেজেন্ট করছে?

উত্তর : বইগুলোতে আমারই অনুভূতির নানান স্তর বিন্যস্ত। আমি আমার ভেতর দিয়েই পুরো পৃথিবীটাকে যাপন করি। অর্থাৎ আমার অনুভূতি দ্বারাই আমার পৃথিবী নির্মিত। সুতরাং, যা লিখি তা তো আমারই যাপিত জীবনের খণ্ড খণ্ড অনুভূতি।

প্রশ্ন : এক লাফে কবিতার আন্তর্জাতিকতায় চলে যাই। আন্তর্জাতিকতা বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?

উত্তর : গ্লোবাল ভিলেজে যে কোনো শিল্প বৈশ্বিক হবার কোনো বিকল্প দেখি না। শিল্প সৃষ্টির সময় এটা মাথায় রাখা চলে না যে, একে আমি বৈশ্বিক মানদণ্ডে দাঁড় করাব। উচ্চমানের শিল্প তার নিজ গুণে বিশ্ব দরবারে পৌঁছায়। এ সময়ে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ভূমিকাও এক্ষেত্রে খুব প্রসঙ্গিক ও যৌক্তিকভাবে চলে আসে। আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠার জন্য ভাষাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাশাপাশি, যদি রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী এবং প্রতিনিধিত্বশীল রাষ্ট্র হওয়া যায়, তাহলে সেই রাষ্ট্রের শিল্প-সাহিত্যও প্রতিনিধিত্বশীল হবে। বাংলাদেশ যদি ডমিনেটিং রাষ্ট্র হয়ে উঠতে পারে, তাহলে বাংলা ভাষাও ডমিনেট করবে। ধীরে ধীরে বাংলাই হয়ে উঠবে আন্তর্জাতিক ভাষা। তখন সাহিত্যও আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠবে। মূল কথা, রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হওয়ার কোনো বিকল্প নাই এক্ষেত্রে।

প্রশ্ন : একজন কবির নিজের মাটির কথা বলা কতটা বাধ্যতামূলক? কবিতা কখন নিজের সীমারেখা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক হয়ে ওঠে?

উত্তর : কবির জন্য কোনো কিছুই বাধ্যতামূলক নয়। তবে, কবি যেহেতু একটি ভূখণ্ডে বাস করেন, সেই ভূখণ্ডের আলো-হাওয়া, পারিপার্শ্বিকতা, সেই সময়ের রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত, সুতরাং তাঁর লেখায় সেই ভূখণ্ডের কথা সহজাতভাবেই আসবে। কিন্তু তিনি বাধ্য নন।

অনুভূতি তো স্বয়ং বৈশ্বিক। আমার মনে হয়, নিজের অনুভূতিকে কবিতায় যথার্থভাবে তুলে ধরতে পারলে নিশ্চিতভাবেই তা বৈশ্বিক হতে বাধ্য। মায়ের প্রতি সন্তানের যে প্রেম তা সব দেশে, সকল ভূখণ্ডে একই রকম। কষ্টের যে চিৎকার তাও সকল দেশে একই রকম।

প্রশ্ন : কবিতার সঙ্গে জীবনাচরণ কিংবা রাজনীতির কোনো দ্বন্দ্ব নেই?

উত্তর : নেই। যদি আদ্যপান্ত কবিতাজীবন যাপন করা যায়। শ্যাম ও কূল দুটোই রাখতে চাইবেন যারা, তাদের ক্ষেত্রে দ্বন্দ্ব তৈরি হবার সম্ভাবনা প্রবল।

প্রশ্ন : আচ্ছা। বাংলা কবিতা কতটা ক্ল্যাসিক হয়ে উঠতে পারছে?

উত্তর : প্রথম কথা, ক্ল্যাসিক বিষয়টা আমার কাছে পরিষ্কার নয়। কোন কোন অনুষঙ্গ থাকলে কবিতাকে ক্ল্যাসিক বলা হয়, তা আমারও জিজ্ঞাসা। তবে সুসমন্বয় যদি ক্ল্যাসিক কবিতার ভিত্তি ধরা হয় তাহলে বাংলা কবিতায় তেমন সুসমন্বিত কবিতা ও গ্রন্থ প্রচুর আছে। অথবা, কালজয়ী লেখাকে যদি ভিত্তি ধরা হয়, তাহলে বাংলা ভাষায় এমন অনেক কবিতা, কবিতাগ্রন্থ রচিত হয়েছে যাকে ‘ক্ল্যাসিক’ বলা হয়। মাইকেল মধুসূদনের মেঘনাদবধ কাব্য, রবীন্দ্রনাথের সোনার তরী, জসীমউদ্দীনের সোজন বাদিয়ার ঘাট, আল মাহমুদের সোনালী কাবিনসহ আরো অনেক গ্রন্থের উদাহরণ দেয়া যায় সেই সূত্রে।

প্রশ্ন : দুই বাংলার কবিতা নিয়ে জানতে চাই, বিধান। দুই বাংলার কবিতায় মিল কী? পার্থক্য কী?

উত্তর : পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা মিলিয়ে যে ওপার বাংলা, আাশির দশকের পরে তাদের কবিতা খুব বেশি এগোয়নি। পক্ষান্তরে বাংলাদেশে অনেক শক্তিশালী কবি এসেছেন এই সময়ে। অনেক অনেক ভালো কবিতা লেখা হচ্ছে। পার্থক্যটা হলো, ওপার বাংলায় একটা মিশ্র সাংস্কৃতিক আবহ বিরাজমান। কিন্তু বাংলাদেশে সেই সংকট নেই। হিন্দী আর ইংরেজির আগ্রাসন থেকে ওপার বাংলায় বাংলাকে টিকিয়ে রাখাটাই সম্ভবত প্রথম কর্তব্য বলে ধরে নিয়েছেন সে দেশের লেখকেরা। ভুল হতে পারে, তবু, এই দূর থেকে আমার এমন মনে হয়। তাছাড়া, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন এসব অভিজ্ঞতা তো তাদের নেই, ফলে তাদের লেখায় এসব পাওয়া যাবে না। আরেকটি বিষয়, বাংলাদেশের কবিদের লেখায় আরবি-ফারসি শব্দের বহু ব্যবহার দেখা গেলেও পশ্চিমবঙ্গের কবিদের লেখায় এর ব্যবহার কম চোখে পড়ে।

আর, ভাব ও ভাষার মিলের কথা প্রথমে বলতে হবে। বাঙালির আবেগ সব জায়গাতেই প্রায় একই রকম।

প্রশ্ন : কবিতায় আপনি কিসের দিকে বেশি জোর দেন? নির্মাণে, না বোধে?

উত্তর : প্রথমত বোধটা খুবই জরুরি। নির্মাণ একটি শিল্পকে নান্দনিক করে তোলে। সোল আর বডি যেমন। আমি দুটোকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করি।

প্রশ্ন : অন্যান্য শিল্পমাধ্যমের সাথে কবিতার পার্থক্য কোথায়?

উত্তর : শিল্পের অন্যান্য মাধ্যমের সাথে যদি তুলনা করেন, যেমন, সিনেমা, গান, নৃত্য... এতে ভোক্তার অংশ্রগ্রহণ শুধু গ্রহণের। কিন্তু কবিতার, শুধু কবিতাই বা বলি কেন, যে কোনো শব্দশিল্পের ক্ষেত্রেই অংশগ্রহণ বিনিময়ের। অর্থাৎ পাঠকেরও একটা প্রস্তুতি লাগে। কবিতা শব্দশিল্পের তুরীয় রূপ। সুতরাং এমন একটি শিল্পের রস আস্বাদনের জন্য ভোক্তা, অর্থাৎ পাঠকেরও পরিশ্রমী অংশগ্রহণ দরকার হয়। অন্তত পাঠের পরিশ্রমটুকু দরকার হয়। কবিতার পাঠক এই পরিশ্রমটুকু করতে বেশিরভাগ সময়ই গড়রাজি থাকেন।

প্রশ্ন : আর নিজের জগত নির্মাণ কতটা জরুরি? জরুরি হলে আপনার ক্ষেত্রে সেই পদ্ধতিটা ঠিক কেমন?

উত্তর : সকলেরই একটা নিজস্ব অনুভূতির জগত থাকে। জোর করে জগত নির্মাণের উস্কানী একটা ট্র্যাপ। যেটা জরুরি তা হলো প্রত্যেকের সেই নিজস্ব জগতটাকে গভীরভাবে জানা। সেটাকে শৈল্পিকভাবে প্রকাশ করা।

প্রশ্ন : কবিতার পাঠক কমের যে অভিযোগ আছে, সেটার ভিত্তি ঠিক কী বলে মনে হয় আপনার? উত্তরণ কীভাবেসম্ভব?

উত্তর : কবিতার পাঠক চিরকাল কমই ছিলো। অনেক আগে কোথাও এমন পড়েছিলাম, ‘ কবিতা তো ক্লাউন নয় যে পাঠককে সুড়সুড়ি দিয়ে জাগাবে।’ বা, এমনও নয় যে, কবিতার সাথে তাল মিলিয়ে ঝিঙ্কাচিকা নাচ করবে কেউ। ঈদের দিনে রাস্তায় রাস্তায় বাজবে কবিতা— এমন তো না। তবে অতীতের সাথে যদি তুলনায় যান তাহলে বলব এখন কবিতার পাঠক বেড়েছে। চেষ্টা করে পাঠক বাড়ানোর ক্ষেত্রে আমার সাধারণ একটা ভাবনা আছে। তা হলো, অনেক অনেক কবিতা লেখা, নানা শ্রেণিপেশার মানুষের কবিতা লেখা উচিত। সমাজে যেহেতু নানান স্তর আছে, সুতরাং কবিতালেখকদেরও নানান স্তর তৈরি হলে ‘মানিকে মানিক’ চিনে নেবে।

এছাড়া আলাদা করে উত্তরণের বিষয়ে আমি ভাবি না। আমার কাছে এটা এমন এক শিল্পমাধ্যম, যে, সুক্ষ্ম অনুভূতিপ্রবণ, মৌনমুখর, পরিশ্রমী এবং উচ্চাঙ্গ শিল্পরসিকমাত্রই এটা গ্রহণ করবেন।

প্রশ্ন : শ্লীলতা-অশ্লীলতা বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন? সাহিত্যে এই শ্লীলতা-অশ্লীলতার সীমা ঠিক কতটুকু? কতটা শ্লীলতা অতিক্রম করে গেলে সেটাকে অশ্লীল বলা যেতে পারে? আদৌ বলা যেতে পারে কি না?

উত্তর : শিল্পে অশ্লীলতা বলে কিছু নেই। তবে, অশ্লীলতাকে শিল্প করে তোলা দক্ষ শিল্পীর কাজ। কাঁচা হাতে এ বিষয়কে ডিল করতে যাওয়া ভয়ংকর। সামান্য এদিক-সেদিক হলেই তা অশ্লীল হয়ে ওঠে। সুতরাং যদি সত্যিই শিল্প হয়ে ওঠে কোনো কিছু, তা অশ্লীলতার সীমারেখাকে অতিক্রম করে যায়। আবার, অশ্লীলতার একটা সামাজিক পার্সপেক্টিভও থাকে।

প্রশ্ন : বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, নবীন কবিরা জ্যেষ্ঠদের তেমন সাপোর্ট পাচ্ছেন না। সত্যিকারের কবিরা সেই সাপোর্টটা চায়ও না হয়তো একসময়। কিন্তু জ্যেষ্ঠদের অসহযোগিতার কারণটা ঠিক কী?

উত্তর : ধারণাটা ভুল। জ্যেষ্ঠ অনেক কবিই আছেন যারা নবীনদের সাপোর্ট করেন। আমাদের দেখাটা বোধ হয় একজন বা দুজনে সীমাবদ্ধ হয়ে উঠছে। ফলে জ্যেষ্ঠদের বৃহত্তর অংশ, যারা নবীনদের উৎসাহ দেন, তাদের লেখা আন্তরিকভাবেই পাঠ করেন, তাদের চোখে পড়ছে না।

প্রশ্ন : এখন কবিদের এক ধরনের ছন্দবিমুখতা লক্ষ করা যাচ্ছে, বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?

উত্তর : এক্ষেত্রে দুটো ব্যাপার লক্ষ্য করি আমি। এক হচ্ছে, কবিতা চর্চার প্রাথমিক পর্যায়ে যারা লিখছেন তাদের ভেতর ছন্দ-প্রবণতা কম। কারণ ছন্দ শেখার জন্য যে পরিশ্রমটুকু করা দরকার, তা তাদের করা হয়ে ওঠে না। আবার এই পরিশ্রমটুকু করতে গেলে তাদের ভাবপ্রকাশ, লেখার জন্য যে তীব্র আবেগ তাও ব্যহত হতে পারে। দুই : চর্চার একটা নির্দিষ্ট সময়ে, বাংলা কবিতার বিভিন্ন গলি-ঘুপচি ঘুরতে গিয়ে যখন তারা দেখেন ছন্দেও উৎকর্ষতা দেখিয়েছেন অনেক মহারথী, তখন তারাও ছন্দ বিষয়টিকে আয়ত্বে আনার জন্য সচেষ্ট হন। অন্তত ‘আমি কবি, অথচ ছন্দমূর্খ’ এই দায় থেকে তারা বের হতে চান।

প্রশ্ন : কাব্যগ্রন্থ ‘অব্যক্ত সন্ধির দিকে'র দু’বছর পরে 'এসো বটগাছ' গদ্যগ্রন্থ, এরপর?

উত্তর : এখনও নিশ্চিত নই। কবিতা তো লিখছিই। তবে কবিতার পাশাপাশি গল্প লিখতে শুরু করেছি। উপন্যাসের দিকেও হয়তো কখনো যাওয়া যাবে। গ্রন্থ হিসেবে এরপরে কোনটা আসবে তা এখনও নির্দিষ্ট না।

ধন্যবাদ বিধান।

আপনাকেও ধন্যবাদ, রাসেল।

এমএ/ ০৭:৪৭/ ২৪ আগস্ট

সাক্ষাতকার

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে