Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (10 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print

আপডেট : ০৮-০৪-২০১৭

হিরোশিমা: ভয়াল সেই স্মৃতি ধরে রাখার যুদ্ধ

মনজুরুল হক


হিরোশিমা: ভয়াল সেই স্মৃতি ধরে রাখার যুদ্ধ

এক জীবনের মর্মান্তিকতার বার্তা অন্য প্রজন্মের মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্যভাবে পৌঁছে দেওয়া আদৌ সম্ভব কি? প্রশ্নের চটজলদি উত্তর নেই বলেই হয়তো ফ্রান্সে বসবাসরত চেক ঔপন্যাসিক মিলান কুন্দেরা একসময় আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমাদের জীবনটাই হচ্ছে সর্বগ্রাসী বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতিকে ধরে রাখার লড়াই। আমরা জানি, সামনে এগিয়ে যেতে হলে পথচলার দিকনির্দেশিকা অতীতের স্মৃতিই আমাদের দেখিয়ে দিতে সক্ষম, বিশেষ করে সেই স্মৃতি, যার পরতে পরতে লেগে আছে জুলুম, অত্যাচার আর মানুষের নৃশংসতার বেদনামাখা সব কাহিনি। আমরা যেন অতীতের সে রকম মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা বেমালুম ভুলে গিয়ে আবারও সেই ছলনার একই পথে পা না বাড়াই, স্মৃতিই কেবল পারে অতীতের ভুল আর বিভ্রান্তিগুলো আমাদের মনে ফিরিয়ে এনে সেই একই পথে আবারও যাত্রা করা থেকে আমাদের বিরত রাখতে।’ ৭২ বছর আগে জাপানের দুই শহর হিরোশিমা আর নাগাসাকিতে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিকতাকে ঘিরে এসব প্রশ্ন শুরু থেকে ছিল। কিন্তু স্মৃতি ধরে রাখার কান্ডারিরা ক্রমশ হারিয়ে যেতে থাকায় স্মৃতি সংরক্ষণের নতুন উপায় নিয়ে দুই শহরকেই এখন গভীরভাবে ভাবতে হচ্ছে।

১৯৪৫ সালে তিন দিনের ব্যবধানে জাপানের দুই শহরকে আণবিক বোমা হামলার শিকার হতে হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একেবারে শেষ দিকটায় এসে জাপানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করতে আণবিক বোমা হামলার যৌক্তিকতা কতটা ছিল, সেই প্রশ্নে ঐতিহাসিক আর রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা শুরু থেকেই গুরুতরভাবে বিভক্ত। হিরোশিমা-নাগাসাকির স্মৃতির বেলাতেও বিভাজন সমান গুরুত্ব নিয়ে উপস্থিত। এরপরও বলতে হয়, দুই শহরের ট্র্যাজেডি অন্যদিক থেকে আবার মানুষের বিবেককে জাগিয়ে রাখার জুতসই এক হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করে চলেছে।

দুই শহরের অভিজ্ঞতা অনেকটা সমপর্যায়ের হলেও তিন দিনের ব্যবধানে নাগাসাকির মর্মান্তিকতার ঠাঁই হওয়ায় নাগাসাকি যেন হিরোশিমার অনুজ। একই অভিজ্ঞতার ভিন্ন কিছু প্রেক্ষাপট হিরোশিমা আর নাগাসাকিকে স্বল্প দূরত্বে বসিয়ে দিয়েছে, যে বাস্তবতার আঁচ পেতে হলে এক ভ্রমণে দুই শহর দেখে আসার বিকল্প নেই।

দুই শহরেই আণবিক বোমা হামলার মর্মান্তিকতার সাক্ষী হয়ে থাকা প্রজন্ম এখন অস্তগামী। গত সাত দশকে তাঁদের অনেকেই দেশ-বিদেশে নিজেদের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেওয়ার মধ্য দিয়ে পরমাণুমুক্ত বিশ্বের প্রয়োজনীয়তার বার্তা বিশ্ববাসীকে শুনিয়ে এসেছেন। তবে আগামী বছর দশেকের মধ্যে তাঁরা সবাই চলে গেলে যে শূন্যতার সৃষ্টি হবে, তা পূরণ করে নিতে নানা রকম উদ্যোগ হিরোশিমা ও নাগাসাকিকে এখন নিতে হচ্ছে। হিরোশিমার বেলায় স্মৃতি ধরে রাখার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে হিরোশিমা শান্তি স্মৃতি জাদুঘর। নগর কেন্দ্রের শান্তি স্মৃতি উদ্যানের পাশে গড়ে ওঠা সেই জাদুঘরে আছে ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট সকাল ৮টা বেজে ১৫ মিনিটে ঠিক কী ঘটেছিল এবং এর পরিণতিতে কোন ভাগ্য হিরোশিমাবাসীকে বরণ করে নিতে হয়েছে, তার নানা রকম নিদর্শন।

বিশ্বখ্যাত জাপানি স্থপতি কেনজো তাঙ্গের নকশা করা সেই জাদুঘর চালু হয়েছিল আণবিক বোমা হামলার দশম বার্ষিকীকে সামনে রেখে, ১৯৫৫ সালের এপ্রিলে। আণবিক বোমা হামলার ক্ষয়ক্ষতির বাস্তবতা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে পরমাণু অস্ত্রের বিলুপ্তিতে অবদান রাখা এই জাদুঘরের উদ্দেশ্য। সেই লক্ষ্যে বোমা হামলার সঙ্গে সম্পর্কিত নানা রকম নিদর্শন জাদুঘরে তিনটি ভাগে ভাগ করে নিয়ে দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হয়। তিনটি মোটা দাগের সেই বিভাজন হচ্ছে হিরোশিমার ইতিহাস; আণবিক বোমা হামলা ও ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত বর্ণনা; এবং পরমাণু অস্ত্রের হুমকি। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার স্থায়ী প্রদর্শনী কক্ষে দর্শকেরা জাদুঘরে সংরক্ষিত বিভিন্ন নিদর্শন দেখার মধ্য দিয়ে মূল্যবান যে বার্তা পেয়ে থাকেন, তা হলো মানবজীবনে সেই মর্মান্তিকতার যেন আর পুনরাবৃত্তি না হয়, তা নিশ্চিত করতে হলে কী আমাদের করা দরকার, সেই পথনির্দেশনা।

এবারের হিরোশিমা বার্ষিকীর আগে কথা হচ্ছিল জাদুঘরের পরিচালক কেনজি শিগার সঙ্গে। আণবিক বোমার ওপর আলোকপাত করা যেকোনো প্রদর্শনীর শুরুতেই কোন দিকটিতে গুরুত্ব দেওয়া হবে, তা আয়োজকদের ঠিক করে নিতে হয়। কেনজি শিগা মনে করিয়ে দিলেন, এই প্রশ্নকে ঘিরেই আণবিক বোমা হামলার ৫০তম বার্ষিকীকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউটের সঙ্গে হিরোশিমা জাদুঘরের নির্ধারিত একটি প্রদর্শনী শেষ পর্যন্ত স্থগিত হয়ে গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে এখনো অনেক লোক রয়েছেন, যাঁরা মনে করেন, আণবিক বোমা হামলা যুদ্ধের সমাপ্তি টেনে আরও অনেক মানুষের জীবন রক্ষায় অবদান রেখেছিল। অর্থাৎ, আণবিক বোমার শক্তির দিকটির প্রতি তাঁরা আকৃষ্ট, মানুষের জীবনে নারকীয় যে ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে আসে, সেদিকে নয়।

তবে কেনজি শিগার পরিচালনাধীন জাদুঘর আণবিক শক্তির ভয়াবহতার দিকেই এ রকম বিশ্বাস থেকে আলোকপাত করছে যে, মানুষ সেই ভয়াবহতা সম্পর্কে বেশি করে জানতে পারলে শান্তির গুরুত্ব আরও ভালোভাবে বুঝতে পারবেন। প্রদর্শিত বিভিন্ন সামগ্রীর বাইরে জাদুঘরের সংরক্ষণে থাকা আরও ২০ হাজারের বেশি নিদর্শনের মধ্য থেকে আগুনে ঝলসে যাওয়া একটি লাঞ্চ-বক্সের ছবি দেখিয়ে দিলেন কেনজি শিগা। লাঞ্চ-বক্সটি ছিল স্কুলবালিকা রেইকো ওয়াতানাবের। ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট সকাল ৮টা বেজে ৪৫ মিনিটের ঠিক পরের কয়েক মুহূর্তের মধ্যে বিলীন হয়ে যায় সাত বছর বয়সী ওই বালিকা। ঝলসে যাওয়া লাঞ্চ-বক্সটি জানান দেয় রেইকো ওয়াতানাবের অস্তিত্ব। সে রকম ভয়ংকর বেদনাদায়ক পরিণতি যেন আর কাউকে ভবিষ্যতে কখনো বরণ করে নিতে না হয়, সেই প্রত্যাশা নিয়ে মানুষের প্রাণের গভীরে ধূপশিখা জ্বালিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় নিবেদিত হিরোশিমার সেই জাদুঘর। জাদুঘরটির মূল্যবান এক সংগ্রহ এখন হয়ে উঠেছে বোমা হামলার ভুক্তভোগীদের ধারণ করে রাখা স্বীকারোক্তি। পারমাণবিক বোমা হামলার শিকার ‘হিবাকুশা’রা বিদায় নিলেও তাঁদের ধারণ করে রাখা কণ্ঠস্বরে মর্মান্তিকতার বার্তা শেষ দিন পর্যন্ত আমাদের বলে যাবে ‘আর নয় হিরোশিমা’।

এমএ/ ০৬:৪৭/ ০৪ আগস্ট

 

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে