Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট, ২০১৯ , ৫ ভাদ্র ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.6/5 (22 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ০৮-০২-২০১৭

মহাশ্বেতা দেবী ও আমাদের ইতিহাস পাঠ

বদরুন নাহার


মহাশ্বেতা দেবী ও আমাদের ইতিহাস পাঠ

সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী প্রসঙ্গে প্রায়শ বলা হয়ে থাকে, তিনি ছিলেন প্রান্তিক মানুষের কথাকার। প্রান্তিক মানুষ- এ কথাটির পেছনে অনেক কিছুই লুকিয়ে থাকে। মুখ্যত যে প্রসঙ্গটি একেবারে জড়িয়ে আছে, তা হলো প্রান্তিকের বিপরীতেও এক দল মানুষ থাকে। আর আমরা জানি প্রান্তিক হয়ে যাওয়ার পেছনে একটা ক্রমাগত চাপ প্রয়োগের বিষয় জড়িত। প্রকৃতিতে যেমন নদীর মূল স্রোত একদিন বিলুপ্ত হয়ে নতুন মূল স্রোতের সৃষ্টি করে, তেমনি মনুষ্যসৃষ্ট দাপট, শাসন, শোষণ মানুষকে প্রান্তিক করে তোলে। মূলত এই শ্রেণির মানুষই হয়ে যায় দলিত জনগোষ্ঠী। যেমন আর্যদের আবির্ভাবে হাজার বছর ধরে চলে আর্যীকরণ প্রক্রিয়া। আর সেই প্রক্রিয়ায় বাইরে যারা থেকে যায় তারা তো ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীতেই পরিণত হয়। যদিও তা ইতিহাসেরই একটা অংশ। কিন্তু সেই ইতিহাস লেখা হয় না। কেননা, ইতিহাস পরিণত হয় বিজয়ীর দলিলে।

ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে দলিত মানুষের স্থান দেয়নি সরকার, এমনকি ইতিহাসবিদরাও। এ প্রসঙ্গে ড. আহমদ শরীফ তার 'বাংলার সংস্কৃতি প্রসঙ্গে' শীর্ষক প্রবন্ধে অসম্পূর্ণ ইতিহাসের কথা উল্লেখ করেন- যারা এই দেশের অধিবাসী- সেই হাড়ি, ডোম, চণ্ডাল, বাগদি- যারা শূদ্র, অস্পৃৃশ্য, তাদের কথা তো বাংলাদেশের ইতিহাসে লেখা হয়নি; তাদের কোনো অস্তিত্বও তো আজ পর্যন্ত স্বীকৃত হয়নি। বাঙালির ইতিহাস পূর্ণ অবাঙালি বহিরাগতের বিবরণ দিয়ে। বিদেশি-বিভাষী বিজাতি-বিধর্মী যারা এখানে পরাক্রান্ত হয়ে এসেছে, যারা এখানে ধর্ম নিয়ে এসেছে, তাদেরই রাজত্বের কথা- তাদেরই বিদ্যাবুদ্ধির কথা- তাদের জ্ঞান-গৌরবের কথা, তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তির কথা আমরা আমাদের বলে দাবি করে গর্বে বুক স্টম্ফীত করছি। যেমন একালের মুসলমানেরা বই লেখে, বই মুখস্থ করে এবং মনে করে যে তুর্কি-মোগলরা তাদের স্বগোত্র। তারা ভাবে, ফিরোজ শাহ, শের শাহ, আকবর, আওরঙ্গজেব, সিরাজউদ্দৌলা তাদের স্বজাতি, স্বগোত্র; এবং তাদের শাসনকে নিজেদের রাজত্ব মনে করে গর্বে গর্বিত হতে চায়। স্বদেশ, স্বজাতির আসল পরিচয় গোপন করে নানা কাল্পনিক কাহিনী দিয়ে মন ভরাতে চায়। আজকাল যে কথাটি স্বীকৃত হতে যাচ্ছে, অর্থাৎ আমরা যদি অস্ট্রিক-মোঙ্গলদের বংশধর হই, তাহলে সেই অস্ট্রিক-মোঙ্গলরা চিরকাল এদেশে ছিল নির্জিত, নিপীড়িত। তাদের অধিকাংশ মানুষ এখনও নিম্নবিত্তের-অস্পৃশ্য। তারা কখনও মানুষ হিসেবে স্বীকৃত হয়নি। তাদের মধ্যে যারা বন-জঙ্গলে পালিয়ে গেছে তারা সাঁওতাল, গারো, খাসিয়া ইত্যাদি। যারা এখানে ছিল তাদের দেখেছি দাস ও অস্পৃশ্য।

তাই বোধ হয় এই প্রান্তিক মানুষের মনে খেদ থেকে যায় নিজেদের ইতিহাস জানার। একজন মুণ্ডা কিশোরী মহাশ্বেতা দেবীকে প্রশ্ন করেছিল- 'আদিবাসীদের কি কোনো নায়ক নেই?' যে প্রশ্ন সারাটা জীবন তাড়িত করেছে মানবতাবাদী প্রখ্যাত এই লেখককে। তিনি অনুভব করেছিলেন লেখক হিসেবে, সমকালীন সামাজিক মানুষ হিসেবে, একজন বস্তুবাদী ঐতিহাসিকের সব দায়দায়িত্ব বহনের অঙ্গীকার। হয়তো সেই তাড়নায় বাংলা সাহিত্যকে তিনি ভিন্ন জীবনের আখ্যানে সমৃদ্ধ করেছেন। সাহিত্য রচনার পাশাপাশি ওইসব মুণ্ডারীর আপনজন হয়ে উঠেছিলেন। তিনি ছিলেন শবরদের মাতা। সাঁওতালদের মারাংদাই (বড়দিদি)। ক্ষুদ্র হয়ে যাওয়া গোষ্ঠীর মানুষের জীবনকে উপজীব্য করে উপন্যাস-গল্প রচনা করেছেন একের পর এক। কেবল তাই নয়, তাদের অধিকার আদায়ে পত্রিকায় কলাম লেখা থেকে শুরু করে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে চিঠি পর্যন্ত লিখেছেন তিনি। বাংলা সাহিত্যের ভিন্ন ধারার জননী হয়ে উঠেছিলেন মহাশ্বেতা দেবী।

উপন্যাস বা সাহিত্য যদিও ইতিহাস নয়, তবে ইতিহাস সেখানে থাকে। আর কেউ কেউ সাহিত্য রচনা করে ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারেন। মহাশ্বেতা দেবী তেমন একজন মানুষ, যার সৃষ্ট আখ্যান ইতিহাস হয়ে যায়। তার রচিত 'অরণ্যের অধিকার' উপন্যাস আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে আজ ইতিহাস। এই দলিত, অন্ত্যজ শ্রেণির ইতিহাস পাঠের পদ্ধতি ভিন্ন। সেই পাঠের মর্ম বুঝে তা নতুন করে সর্বজনস্বীকৃত করে তোলা কোনো সহজ কাজ নয়। মহাশ্বেতা দেবী সাক্ষাৎকারে বলেন- '...আমি সারাজীবন সেই ইতিহাসের অনুসন্ধান করছি।... মাঝখানের খালি জায়গাটুকু, যেখানে লোকবৃত্তের ইতিহাস আছে, তাকে খুঁজে বের করি।' 

'অরণ্যের অধিকার' উপন্যাসে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বীরসা মুণ্ডা ও তার সংগ্রামকে তুলে ধরেছেন মহাশ্বেতা দেবী। লেখকের বস্তুবাদী ঐতিহাসিকের দায়দায়িত্বের প্রতি অঙ্গীকারের ফলই এ উপন্যাস; তা তিনি নিজেই বলেছিলেন। 

ব্রিটিশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আদিবাসী মুণ্ডা জনগোষ্ঠীর কয়েকটি আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল ১৮১৯ থেকে ১৯০০ সালের মধ্যে- তামার বিদ্রোহ (১৮১৯-১৮২০), কোল বিদ্রোহ (১৮৩১-৩২), সর্দার বিদ্রোহ বা মুল্কি লড়াই (১৮৫৮-১৯৯৮) এবং উলগুলান (১৯০০)। মুণ্ডা বিদ্রোহের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও বড় বিদ্রোহ হিসেবে ভূমিকা রাখেন বিরসা মুণ্ডার উলগুলান (১৮৭৪-১৯০০)। এ উপন্যাসের নায়ক বীরসা মুণ্ডাকে আনা হয়েছে ভারতীয় দলিত সংগ্রামের ইতিহাস থেকে। এ ধারায় তার প্রথম উপন্যাস 'অরণ্যের অধিকার' (১৯৭৫)। এ প্রসঙ্গে গ্রন্থটির ভূমিকায় বলেন- 'এই উপন্যাস রচনায় সুরেশ সিং রচিত Duststorm and Hanging Mist বইটির কাছে আমি সবিশেষ ঋণী। সুলিখিত তথ্যপূর্ণ গ্রন্থটি ছাড়া বর্তমান উপন্যাস রচনা সম্ভব হতো না।'

সুরেশ সিংয়ের বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৬৬ সালে। বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৮৩ সালে। সেখানে সুরেশ সিং বইটির নাম দেন Birsa Munda and His Movement-1874-1901 । দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায় এস. সিং উল্লেখ করেন মহাশ্বেতা দেবীর উপন্যাসের কথা। তিনি বলেন, 'She (Mahasweta) was instrumental in making me revise the work substantially and produce a new edition.

ইতিহাস-গবেষণা ও উপন্যাস রচনার এমন পারস্পরিক সমন্বয় খুব একটা ঘটে না। মহাশ্বেতা দেবী ইতিহাস থেকে এমন চরিত্র নির্মাণ করেন, যা নিজেই ইতিহাস হয়ে যায়। প্রান্তিক মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া ইতিহাস থেকে তিনি নায়ক খুঁজে সাহিত্যে তাদের প্রতিস্থাপন করেছেন। যেমন 'শালগিরার ডাকে' (১৯৮২) উপন্যাসটির নায়ক তিলকা মাঝি মূলত ইতিহাসের একজন নায়ক। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজস্ব আদায়ের শোষণে পড়া বিহার-উড়িষ্যার সাঁওতাল বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেওয়া তিলকা মুরমুকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলেছেন এ উপন্যাস। ১৭৮৫ সালে এই তিলকা মুরমুর ফাঁসি দিয়েছিল ব্রিটিশ সরকার। 

মহাশ্বেতা বরাবরই বলতেন, তিনি সময়কে লেখার মধ্য দিয়ে দলিলীকৃত করেন। তিনি যেমন ইতিহাস থেকে সময়কে তুলে আনেন, তেমনি লেখকের উপস্থিতিতে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে সাহিত্যের মোড়কে লিপিবদ্ধও করে ইতিহাস তৈরি করেছেন। 

'সুরজ গাগরাই' (১৯৮৩)-এর সুরজ চরিত্রে এমনই এক বীরের উপস্থিতি দেখতে পাই। খড়কাই বাঁধ প্রকল্প নিয়ে আশির দশকের শুরুতে যে সংর্ঘষ হয়, তার নেতা ছিলেন চাইবাসার কাছাকাছি ইলিয়াগড় নিবাসী গঙ্গারাম কালুণ্ডিয়া। তিনি সেনা বিভাগে কাজ করতেন। চাকরি ছেড়ে দিয়ে সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েন। সেই গঙ্গারাম কালুণ্ডিয়াই এ উপন্যাসের সুরজ গাগরাই। সুবর্ণরেখা নদীর বাঁধ প্রকল্প নিয়ে সংঘটিত সংঘর্ষের কাহিনীকে কেন্দ্র করেই এ উপন্যাস। সময়কে ধরতে গিয়ে তিনি কোলহান জাতির ইতিহাসকে সম্পৃৃক্ত করেছেন। এতে তাদের সমাজ-জীবন, পারিবারিক জীবনসহ উঠে আসে। আশির দশকের রাঁচি, পাটনা, উত্তর বিহার ও পালামৌ-ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী অঞ্চলের মানুষজনের সাথে শিল্পায়ন ও উন্নয়নের নামে কিছু জনগোষ্ঠীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রেক্ষাপট।

কাল্পনিক প্রেক্ষাপটে নির্মিত 'চোট্টি মুণ্ডা এবং তার তীর' উপন্যাসেও রয়েছে ইতিহাস। সে ইতিহাস ১৯১০ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যবর্তী কালব্যাপী ভারতীয় রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক সময়। কল্পনা ও বাস্তবতার ফিকশনের দিক থেকে এ উপন্যাসটি মহাশ্বেতা দেবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। এ সময়টি ভারতবর্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, উপন্যাসের শুরুর দিকে ঔপনিবেশিক শাসনামল উপস্থাপিত। দ্বিতীয়ত, স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট হয়ে ওঠে নতুন পুঁজিবাদী সমাজ। মহাশ্বেতার আদিবাসী বীরের আখ্যান নির্মাণের ধারায় চোট্টি মুণ্ডা এবং তার তীর (১৯৮০) উপন্যাসটি এক নতুন রসায়ন। চোট্টি বীর, তবে সে ভারতীয় ইতিহাস বা আদিবাসী সংগ্রামের বীর নয়। চোট্টির জীবনে ঘটে যাওয়া গল্পটি ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় নির্মিত আদিবাসী জীবনাখ্যান। অরণ্যের অধিকার উপন্যাসের প্রেক্ষাপটে থেমে যাওয়া উলগুলানের নতুন সংস্করণ এই চোট্টি মুণ্ডা। 

মহাশ্বেতা দেবীর উপন্যাস প্রসঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন- 'মহাশ্বেতার লেখার দু'টি স্তর আছে। কিছু কিছু রচনা ইতিহাসভিত্তিক, আবার কিছু কিছু গল্প-উপন্যাস সমসাময়িক বাস্তবতার তীব্র রূপ। ইতিহাসচেতনা না থাকলে সমসাময়িক বিষয়ভিত্তিক রচনাও সার্থক হয় না, নিছক গল্প হয়ে যায়। কারণ, সমসাময়িক ঘটনাও ইতিহাসের অঙ্গ।'

১৯৯২ সালে প্রকাশিত 'ক্ষুুধা' উপন্যাসটি তিনি লিখেছেন আশির দশকে; সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় 'মানাতুর মানুষখেকো' নামক লোমহর্ষক ঘটনাকে কেন্দ্র করে। যেখানে প্রকাশ পায় মানাতুরের এক জমিদার তার নিজস্ব চিড়িয়াখানায়, খাঁচায় বন্দি চিতাবাঘকে খাওয়াত বন্ডেড লেবার বা ভূমিদাসের মাংস। এবং একজন নতুন মা ও তার শিশুটিকে বাঘের খাঁচায় ছুড়ে ফেলার সত্যি খবরের ভিত্তিতেই মহাশ্বেতা এ উপন্যাসটি লিখেছেন। এ প্রসঙ্গে লেখক জানান, "যাঁদের ঘটনাগুলি অবিশ্বাস্য মনে হবে, তাঁদের উত্তর দেবার দায় আমার নেই। ডালটনগঞ্জে যে সাংবাদিকের ঘরে থাকতাম সে ঘর, ওই শিবাজী ময়দান, গান্ধী হল, পালামৌয়ের পথ ঘাট, সেদিনের তরুণ বুদ্ধিজীবী সহসাথীরা জানে 'ক্ষুুধা'-র প্রতিটি অক্ষর সত্যি।" 

লেখকের এ তথ্য আসলে সাহিত্য বিচারের ক্ষেত্রে কতটুকু গুরুত্বের? এ প্রসঙ্গে সমালোচকরা বলে থাকেন, সংবাদ মূলত উপন্যাস হতে পারে না। যদিও উপন্যাস এক অর্থে সংবাদই। একটা উপন্যাসে ইতিহাসের নানা তথ্যনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশিত হতে পারে, কিন্তু উপন্যাসের সজীবতা ও অর্থপূর্ণতা নির্ভর করে শব্দে শব্দে যে ভাষার অন্তর্নিহিত সংহতি তৈরি হয়, তার সংহতির সুরের ওপর।

আমরা ক্ষুুধা উপন্যাসের পট নির্মাণের ক্ষেত্রে দেখি, মহাশ্বেতা তার নিজস্ব উপন্যাস নির্মাণভঙ্গিটি বিদ্যমান রাখতে পেরেছেন। কিন্তু তাতে কি উপন্যাসের শিল্প বা আঙ্গিকে কোনো ব্যত্যয় ঘটায় কি-না, তা ভেবে দেখার বিষয়। এই ভাবনার উত্তরণ ঘটিয়ে গেছেন মহাশ্বেতা নিজেই। তার রচিত অসংখ্য সাহিত্য পাঠে পাঠক সে প্রমাণ পাবে। 

আদিবাসী জীবনের সাথে ব্যক্তি মহাশ্বেতার দীর্ঘ কালব্যাপী পথপরিক্রমা। আদিবাসী অস্তিত্ব সংকটের এক কথন দেখতে পাই 'টেরোড্যাকটিল, পূরণসহায় ও পিরথা' (১৯৮৭) উপন্যাসে। এ উপন্যাস প্রসঙ্গে লেখক বলেন, "'টেরোড্যাকটিল' আমার সমগ্র আদিবাসী-অভিজ্ঞতার সারাংশ। নাগেশিয়া-আদিবাসীর মাধ্যমে আমি অন্যান্য আদিবাসীর কথাও বলেছি। মাত্র একটি আদিবাসী গোষ্ঠীর প্রথা ও রীতি মিলিয়ে মিশিয়ে লিখেছি। নিবিষ্ট হয়ে পাঠ করলে 'টেরোড্যাকটিল' আদিবাসীদের, পৃথিবীর সকল অন্ত্যজবাসী মানুষের যন্ত্রণার কথা বলবে।... 'টেরোড্যাকটিল' দেখাতে চায়, ভারতের সমস্ত আদিবাসী জগতের প্রতি কী করা হয়েছে।"

মহাশ্বেতা সমগ্র আদিবাসী জগতের চিত্র আঁকতে চেয়েছেন উপন্যাসটিতে। এতে যে বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরেছেন, তা শুধু ভারতের নয়; সমগ্র পৃথিবীর সমস্যা। গত বছরের ৩০ জুলাই ঞযব ওহফরধহ ঊীঢ়ৎবংং পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে বিশ্বখ্যাত দার্শনিক ও তাত্তি্বক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন, 'আমার মনে হয়, টেরোড্যাকটিল তার সেরা রচনা এবং মেরি ওরাওন সেরা চরিত্র সৃষ্টি (বাস্তব জীবনে তার মতো একজনকে চেনার কথা আমাকে বলেছিলেন তিনি)। তা না হলে উনিশ ও বিশ শতকের গোড়ার দিকের বাঙালি ঔপন্যাসিকদের ব্যাপক প্রভাবে তার গোত্রীয় চরিত্রগুলো বড্ড বেশি মহান, বর্বর। চোট্টি মুণ্ডার বেলায় কেবল হাওয়ার্ড ফাস্টের প্রভাবের কথাই আমাকে বলেছিলেন। এটা হয়তো টেরোড্যাকটিলকে খাটো করতে পারত, কিন্তু অলৌকিক স্টাইলাইজেশন ওই ঔপন্যাসিকার শক্তি এবং শঙ্কর ও বিক্ষ এর আওতার ভেতরই রয়েছে।... টেরোড্যাকটিল লেখার আনুমানিক দুই বছর আগে টেরোড্যাকটিল সম্পর্কে কিছু জানি কিনা, আমাকে জিজ্ঞাস করেছিলেন তিনি। অবশ্যই জানতাম না এবং অচিরেই কথাটা ভুলে গিয়েছিলাম। টেক্সট আমাকে বাস্তব আঘাতের মতো ঘা দিয়েছিল এবং এর সূক্ষ্মতা পুরোপুরি বুঝতে বেশ কয়েক বছর লেগে গিয়েছিল, হয়তো এখনো পুরোপুরি পারিনি। কাহিনীর পটভূমি ছত্তিশগড়, কিন্তু অবুঝ মার নামটা ধরতে না পারলে আপনি জানতে পারবেন না। আত্মধ্বংসী মধ্যবিত্ত নেতৃত্ব সূচিত সহিংসতা, যাকে উপরিগত বামপন্থিরা ও মাওবাদ বলে, তারই গভীর সমালোচনা। এবং পড়তে জানেন এমন পাঠকের জন্যই লেখা হয়েছে।'

প্রকৃতপক্ষে মহাশ্বেতা দেবী শুধু সাহিত্যের নন্দনতাত্তি্বক সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য উপন্যাস রচনা করেননি; জীবনসত্য উদ্ঘাটনের জন্য তিনি উপন্যাস রচনা করেছেন। সমাজের কাছে দায়বদ্ধ একজন মানুষ ছিলেন তিনি। ইতিহাস যার প্রিয় বিষয়। কোনো জাতির ইতিহাসই যে ব্যক্তিত্বের বড় পরিচায়ক- এই বিশ্বাস তার প্রগাঢ়। তিনি ব্যক্তি মানুষের প্রকৃত সত্যের সন্ধান করেছেন ইতিহাস থেকে। এ কারণেই আদিবাসীর বীরত্বপূর্ণ কাহিনী যে ভারতীয় স্বাধীনতার অংশ- সেই বিষয়টিও তিনি তুলে ধরতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। আদিবাসীরাও এ দেশের, এ সমাজের মানুষ- এই বোধটি জাগ্রত করার উদ্দেশ্য নিয়ে আদিবাসীর জীবন আখ্যানের সঙ্গে উপন্যাসে গেঁথে দিয়েছেন ঐতিহাসিক সংগ্রামের পরিপ্রেক্ষিত। ইতিহাসে নতুন নায়কের সন্ধান দিয়ে গেছেন একের পর এক। অলিখিত নায়কেরা তার কলমের মাধ্যমে স্থান করে নিয়েছে সাহিত্যের ইতিহাসে। 

উপমহাদেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীর জন্ম ১৪ জানুয়ারি ১৯২৬ সালে। বাংলাদেশের এক খ্যাতনামা পরিবারে। তার বাবা মনীশ ঘটক বিশিষ্ট সাহিত্যিক। কাকা ঋতি্বক ঘটক বাংলা চলচ্চিত্রের এক ব্যতিক্রমী প্রতিভা ও শ্রদ্ধেয়জন। বাংলা সাহিত্যে এক ম্যারাথন লেখক মহাশ্বেতা দেবী। ২০১৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হয়েছিল আমার। নানা প্রসঙ্গে আলাপচারিতায় জিজ্ঞাসা করেছিলাম- আপনাকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দুটো কবিতা উপহার দিয়েছিলেন। তিনি বললেন- আমিই রবীন্দ্রনাথকে বলেছিলাম, তুমি অত বই লিখো না। বলেন, কেন রে? না, আমার বাবা সব তোমার বই কেনেন আর কেনেন আর কেনেন। অত অত বই সব আমি পড়তে পারি না।

আজ মহাশ্বেতা দেবীর রচনা পাঠ করতে করতে খুব বলতে ইচ্ছে হয়_ তুমি অত বই লিখেছ! অত অত বই সব পড়তে পারি না। কিন্তু তাকে আর পাচ্ছি কই! তিনিই আজ ইতিহাস। গত ২৮ জুলাই ২০১৬ তারিখে মহাশ্বেতা দেবী আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। কিন্তু তারও আগে তিনি সমৃদ্ধ করে গেছেন বাংলা সাহিত্যকে। তার বিপুল সাহিত্যকর্মই তাকে আজ অমর করে রেখেছে।

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে