Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২০ , ১০ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (30 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ০৭-৩০-২০১৭

ওরা নাকি স্বামীখেকো, ওদের ঠাঁই নেই শ্বশুরবাড়িতে!

এসএম শহীদুল ইসলাম


ওরা নাকি স্বামীখেকো, ওদের ঠাঁই নেই শ্বশুরবাড়িতে!

সাতক্ষীরা, ৩০ জুলাই- সুন্দরবনে মধু কিম্বা কাঠ সংগ্রহ অথবা মাছ ধরতে গিয়ে যিনি বাঘের আহার হয়েছেন তার স্ত্রীকে বলা হয় বাঘবিধবা। স্বামীর মৃত্যুর জন্য দায়ী করা হয় বাঘবিধবাকে। আর সে কারণেই তার কপালে জোটে ‘স্বামী খেকো’ অপবাদ।

সামাজিক কোনো অনুষ্ঠানে তাদের উপস্থিতিই যেন ‘অলক্ষুণে' ‘অপয়া’ হয়ে। এসব নারীর বেশির ভাগেরই তাই ঠাঁই মেলে না শ্বশুরবাড়িতে। সমাজে তারা ‘একঘরে’। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও বাঘের আক্রমণে নিহত ব্যক্তিদের স্ত্রীর এমনই পরিণতি বরণ করতে হচ্ছে সুন্দরবনের আশপাশের এলাকাগুলোতে।

সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ এলাকায় গিয়ে এমনই চিত্র দেখা গেছে। কথা হয়েছে কয়েকজন ‘বাঘ বিধাবা’র সঙ্গেও। তারা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে জীবিত থেকেও মৃতের মতো জীবন কাটাতে হচ্ছে তাদের।

সুন্দরবন নিয়ে কাজ করা ব্যক্তি ও সংস্থাগুলো বলছে, সুন্দরবনকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরণের কুসংস্কার লালন-পালন করে আসা স্থানীয়দের মধ্যে এখন প্রবণতা খানিকটা হলেও কমেছে। এসব বিষয়ে স্থানীয়দের সচেতন করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।


বাঘবিধবা শাহিদা বেগম

সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার আলোচিত মুখ সোনামনি। তার দুই স্বামীকে জীবন দিতে হয়েছে বাঘের আক্রমণে। তার মুখ দেখলে তাই কেউ শুভ কাজে বের হয় না বলে জানান তিনি। সোনামনি বলেন, ‘১৯৯৯ সালে আমার স্বামীকে বাঘে ধরে নিয়ে যায়।

সে কারণে কোলের একমাস বয়সী বাচ্চাসহ আমার শাশুড়ি আমাকে তাড়িয়ে দেন। তখন আমাকে বাচ্চা নিয়ে পথে পথে ঘুরতে হয়েছে। পরে আমার দেবর আমাকে বিয়ে করে। ২০০৩ সালে তাকেও বাঘে ধরে। এরপর থেকেই আমাকে ‘অপায়া’, ‘অলক্ষ্মী’, ‘স্বামীখেকো’ অপবাদ মাথায় নিয়ে থাকতে হয়। কোনো অনুষ্ঠানে দাওয়াত দিলেও খেতে দেয় সবার শেষে।’

সোনামনি আরো বলেন, ‘সকালে উঠে যেন আগে আমার মুখ দেখতে না হয়, তাই শাশুড়ি আমাকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখেন। এ জীবন তো মৃত্যুর মতোই। স্বামী গেল বাঘের পেটে, আমাকেও মেরে রেখে গেল।’

আরেক ‘বাঘ বিধবা’ বুলি দাশী বলেন, ‘আমার স্বামী অরুণ মন্ডল ২০০২ সালে সুন্দরবনের নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে নিহত হয়। এর জন্য আমাকেই দায়ী করে নির্যাতন করতে থাকেন শাশুড়ি। এক পর্যায়ে বাড়ি থেকেই তাড়িয়ে দেন। আমার বাবা মারা গেছে অনেক আগে। তাই ভাইয়ের বাড়ি গিয়ে উঠি। কিন্তু ভাইও তো গরিব, তাই নদীতে রেণু পোনা ও কাঁকড়া ধরে সংসার চালাতে শুরু করি। এভাবেই ছেলে-মেয়েদের বড় করেছি।’

বুলি দাশী আরও বলেন, ‘আমার মতো এমন অনেক মেয়ে আছে, যাদের স্বামীরা বাঘের হাতে মারা যাওয়ার পর তাদের `অপয়া' বলে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আমার স্বামীর ছোট ভাইও বাঘের আক্রমণে মারা যায়। তার বউ দিপালিকেও বাপের বাড়ি তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে।’


সখিনা বিবি

শাহিদা খাতুন নামে আরেক ‘বাঘ বিধবা’ও জানালেন, তাকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে শ্বশুর বাড়ি থেকে। নদীতে জাল টেনে আর অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে সংসার চালান এই নারী।

সুন্দরবনের আশপাশের এলাকায় বসবাসরত ‘বাঘ বিধবা’দের সামাজিক মর্যাদা ও পুনর্বাসন নিয়ে কাজ করছে অনির্বাণ, দুর্জয়, জাগ্রত বাঘ বিধবা, নারী সংঠগন লির্ডাস প্রভৃতি সংগঠন। এসব সংগঠনও বলছে, তারা বিধবাদের নিয়ে কাজ করলেও তাতে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে খুবই ধীরে।

বেসরকারি সংস্থা লিডার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে বাঘের আক্রমণে মারা গেছে এক হাজারেরও বেশি বনজীবী। ২০১২ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাঘের আক্রমণে কারও নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে ২০১৭ সালে তিন জন নিহত ও একজন আহত হওয়ার খবর জানা গেছে। আর সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় প্রায় সাড়ে এগারশ বাঘ বিধবা নারী রয়েছেন বলে জানিয়েছেন লিডার্সের কর্মকর্তা মোহন কুমার মন্ডল।

তবে সরকারি হিসাবে সুন্দরবনে বাঘের হামলায় প্রাণ হারানো মানুষের সংখ্যা অনেক কম। কারণ হিসেবে সুন্দরবন নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলো বলছে, মধু সংগ্রহ বা মাছ ধরার মতো কাজে যারা সুন্দরবনে যান, তাদের অনেকে সরকারি নিয়ম অনুসরণ করেন না। অনেকেই অন্যের পাস ব্যবহার করে প্রবেশ করেন সুন্দরবনে। তারা সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে মারা গেলেও তাদের নাম সরকারি হিসাবে ওঠে না।


বুলি দাশী

সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ পিযূশ বাউলিয়া পিন্টু বলেন, ‘সুন্দরবনে প্রবেশের আগে বনজীবীরা ‘বনবিবি’র পূজা করে। এর বাইরেও তাদের মধ্যে আরও অনেক কুসংস্কারই আছে। যেমন- কারও স্বামী সুন্দরবনে গেলে সেই নারী অন্য পুরুষের সঙ্গে কথা বলতে পারেন না, চুল আঁচড়াতে পারেন না, শরীরে তেলও মাখতে পারেন না। বিভিন্ন ধরনের সচেতনতা কার্যক্রমে এসব কুসংস্কার অনেকটা কমেছে। তবে এখনও অনেক পরিবার এসব কুসংস্কার মেনে চলে।’’

পিন্টু আরও বলেন, ‘বাঘের হামলায় নিহত হলে পারিবারকে ১ লাখ টাকা ও আহত হলে চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা দেয়ার সরকারি নিয়ম আছে। কিন্তু অনেকেই অন্যের নামের পাস নিয়ে বনে যান। তাদের জন্য সরকারি কোনো সুবিধা নেই।’

তবে ‘বাঘ বিধবাদের পরিস্থিতি খানিকটা বদলেছে বলে জানালেন মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আবুল কাশেম মোড়ল। তিনি বলেন, ‘আমাদের এলাকার মানুষের শিক্ষার হার অনেক কম ছিল। আগে স্বামীকে বাঘে ধরলে তার দোষ স্ত্রীর ওপর চাপিয়ে তাকে বাধ্যতামূলকভাবে শ্বশুর বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হতো। এখন পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে। এমন ঘটনার কথা এখন আর শোনা যায় না।’

জানতে চাইলে শ্যামনগরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কামরুজ্জামান বলেন, ‘আমি কিছুদিন হলো এখানে যোগ দিয়েছি। আমি আসার পর বাঘের হামলায় একজন আহত হওয়ার খবর শুনেছি। তবে স্থানীয়দের কাছে জেনেছি এখানকার কুসংস্কারাচ্ছন্ন প্রথার কথা। আমরা এসব কুসংস্কার দূর করার চেষ্টা করছি।’

শ্যামনগরের সাবেক ইউএনও ও খুলনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আবু সায়েদ মো. মনজুর আলম বলেন, ‘গত কয়েকবছর এখানে বাঘের আক্রমণে নিহতের ঘটনা খুব একটা শোনা যায়নি। তবে বাঘের আক্রমণে কেউ নিহত হলে তার স্ত্রীকে তাড়িয়ে দেয়ার প্রথা ছিল। সেটি এখন আর আগের মতো নেই।

আর/১০:১৪/৩০ জুলাই

সাতক্ষীরা

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে