Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ২১ আগস্ট, ২০১৯ , ৬ ভাদ্র ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (25 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৭-২২-২০১৭

হুমায়ুন আজাদের কুৎসিত বইটা পড়লে যে কেউ আহত হবে: হুমায়ূন আহমেদ

হুমায়ুন আজাদের কুৎসিত বইটা পড়লে যে কেউ আহত হবে: হুমায়ূন আহমেদ

১৮ জুলাই ২০০৮ সালে সুইডেনে হুমায়ূন আহমেদের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। দেশে বিদেশে'র পাঠকদের আগ্রহের কথা বিবেচনা করে সাক্ষাৎকারের বাছাই অংশ প্রকাশিত হলো

প্রশ্ন: সুইডেনে আপনি আগেও এসেছেন। সুইডেন এবং বাংলাদেশের মধ্যে কোথায় মিল আর কোথায় অমিল?

হুমায়ূন: মিল তেমন কিছু নেই। বাংলাদেশের মানুষ খুব সুখী মানুষ। ধর, বন্যায় ঘর ডুবে গেছে, ঘরের চালের ওপর আশ্রয় নিয়েছে মানুষ, ঠিক তখন সেখান দিয়ে দেশি বা বিদেশি কোনো টিভি টিম যাচ্ছে, তখন তারা কী করবে? হাসবে অথবা হাত নাড়বে। এ ঘটনা সুইডেনে কখনোই সম্ভব নয়। এটা শুধুই আমাদের দেশে সম্ভব। আবার পেটে ভাত নেই, নৌকায় কোথাও যাচ্ছে। নৌকায় চড়েও দেখবেন একটা গান ধরছে। এটা আমাদের দেশেই সম্ভব। সুইডিশরা তা পারবে না।

প্রশ্ন: আপনি বলতে চান যে, বাংলাদেশের মানুষ আসলেই খুব সুখী।

হুমায়ূন: অবশ্যই। কিছুদিন আগে বিশেষ খবর সবচেয়ে সুখী মানুষদের দেশের একটা তালিকা বের করা হয়েছিল। সেখানে বাংলাদেশ ছিল পাঁচ নম্বরে।

প্রশ্ন: আপনি তো মূলত একজন লেখক। কিন্তু আপনি একইসঙ্গে নাট্যকার ও চলচ্চিত্র পরিচালক। আপনি নিজেকে কী হিসেবে দেখতে ভালোবাসেন?

হুমায়ূন: আমি আসলেই একজন লেখক। আমি নিজেকে বলি ফিকশন রাইটার। কখনোই আমি নিজেকে ফিল্ক্মমেকার বলি না। ছবি দেখার প্রতি ছোটবেলা থেকেই আমার খুব আগ্রহ ছিল। আমি কত সুন্দর সুন্দর ছবি দেখি, কিন্তু আমাদের দেশে কেউ সে রকম বানাতে পারছে না। এত বড় একটা মুক্তিযুদ্ধ হলো, অথচ মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটা ছবিও নেই। এ আফসোস থেকেই প্রথম মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটা ছবি বানালাম ‘আগুনের পরশমণি’। খরচ দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। তারপর থেকে চালিয়ে যাচ্ছে ছবি বানানো। আসলে ছবির লাইনটা হচ্ছে একটা নেশার মতো। সিগারেটের যেমন নেশা, গাঁজার যেমন নেশা, সিনেমা বানানোর নেশা তার চেয়েও বেশি।

প্রশ্ন: আপনি থামবেন কোথায়? লেখালেখিতে, সিনেমায় না অন্য কিছুতে? নাকি সবকিছু একসঙ্গে নিয়ে চলবেন? শিক্ষকতায় ফিরে যাবেন কি?

হুমায়ূন: আমি লিখে যাব। অন্য কিছুর কী হবে জানি না, তবে লেখালেখি থামবে না। আর আমরা তো ভবিষ্যতের ব্যাপারে খুব একটা ভাবি না। তাই জানি না, শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামব। আমরা হচ্ছে, প্রডাক্ট অব দ্য প্রেজেন্ট! প্রেজেন্ট নিয়েই আমাদের সমস্যা বেশি।

প্রশ্ন: আপনি কিছুক্ষণ আগে বলেছেন, আমরা খুব স্টে্না জাতি। এটা যদি আমাদের জন্য একটা নেতিবাচক দিক হয়, তাহলে আমাদের ঠিক হওয়ার জন্য কী করা উচিত?

হুমায়ূন: এটাকে ঠিক করার কিছু নেই। এটা যেমন তেমনই থাকবে। এর মাঝখান থেকে নতুন নতুন ছেলেপেলে বেরোচ্ছে বাংলাদেশ থেকে। তারা খুবই স্মার্ট, খুবই আধুনিক। বাংলাদেশকে পরির্বতন করার দায়িত্ব এদের। এরা করবে।

প্রশ্ন: আপনি তো বাংলাদেশে প্রচন্ড জনপ্রিয়। আপনার এ জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে দেশের সমস্যা সমাধানের লক্ষে কিছু করা যায় না?

হুমায়ূন: একজন লেখক সমস্যার প্রতি ইঙ্গিত করতে পারেন, কিন্তু সমস্যার সমাধান তিনি দেবেন না, এটা তার দায়িত্ব নয়।

প্রশ্ন: এটা কার দায়িত্ব?

হুমায়ূন: দায়িত্বটা রাজনীতিবিদদের, সমাজ সংস্কারদের। একজন লেখক রাজনীতিবিদ নয় বা সমাজ সংস্কারক নয়। এটা তার দায়িত্বও নয়।

প্রশ্ন: ইঙ্গিত থাকবে কিন্তু প্রস্তাব থাকবে না, এটা কি ঠিক?

হুমায়ূন: ইঙ্গিতের ভেতরেই তো প্রস্তাব থাকে।

প্রশ্ন: আমাদের রাজনীতিবিদরা বা প্রশাসন কি এ ইঙ্গিত বা প্রস্তাব যাচাই করেন?

হুমায়ূন: না না না। এসব ইঙ্গিত বা প্রস্তাবকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার কিছু নেই। আমাদের মুসলমানদের কথাই যদি ধরি। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ পবিত্র গ্রন্থ কোরআন যদি আমাদের চেঞ্জ করতে না পারে, একজন ঔপন্যাসিক কি একটা উপন্যাস লিখে তাদের চেঞ্জ করতে পারবেন? সো কীভাবে সম্ভব?

প্রশ্ন: লেখক হুমায়হৃন আহমেদের সমাজের প্রতি অঙ্গীকার বা দায়বদ্ধতা কী?

হুমায়ূন: লেখক হিসেবে আমার অঙ্গীকার একটাই, যে মুক্তিযুদ্ধের সময়টায় আমাদের জন্ম, সেই মুক্তিযুদ্ধের কথা সবাইকে জানিয়ে রাখা। আমি তখন একজন যুবক, সেই যুবকের দৃষ্টি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি।

প্রশ্ন: আপনি তো মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন। আপনার দৃষ্টিতে একাত্তরের মৌলবাদ ও মৌলবাদী এবং র্বতমানের মৌলবাদ ও মৌলবাদীর মধ্যে তফাত কোথায়?

হুমায়ূন: একাত্তরের মৌলবাদ ও মৌলবাদীরা ছিল একটা বিদেশি শক্তির অর্থাৎ পাকিস্তানের অংশ। কিন্তু র্বতমানে বাংলাদেশের মৌলবাদ ও মৌলবাদীরা কোনো বিদেশি শক্তির অংশ নয়। এটাই পার্থক্য। তবে আমাদের এত মৌলবাদ-মৌলবাদী বলে চিৎকার করে লাভ নেই, কারণ বিশেষ খবর সব দেশেই এখন এসব আছে। ইন্ডিয়ায় আছে বিজেপি, আমেরিকায় আছে ক্লু ক্লাক্স ক্লান। সারা পৃথিবীতেই আছে মৌলবাদী।

প্রশ্ন: বাংলাদেশে মৌলবাদের সমস্যা কি সমস্যা নয়? বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময়ে বাংলাভাই, শায়খুল হাদিস, ৬৩টি জেলায় একসঙ্গে বোমাবাজি এসব কি সমস্যার আওতায় পড়ে না?

হুমায়ূন: আমি মনে করি না। বাংলাদেশে মৌলবাদের সমস্যা বড় কোনো সমস্যা এখনো হয়নি। জনগণ যদি ভোট দিয়ে মৌলবাদীদের নির্বাচন করে, তাহলে গণতান্ত্রিকভাবে কি তাদের বাদ দেওয়া যায়? হোক না তারা মৌলবাদী।

প্রশ্ন: বাংলাদেশ থেকে মৌলবাদ বিতাড়নের উপায় কী?

হুমায়ূন: বাঙালিদের শিক্ষিত হতে হবে। মাদ্রাসা শিক্ষা নয়, আমি সাধারণ বিজ্ঞান শিক্ষার কথা বলছি। যদি সাধারণ শিক্ষায় বাংলাদেশিরা শিক্ষিত হয়, তাহলে বাংলার মাটিতে মৌলবাদীদের চিহ্ন থাকবে না। অশিক্ষিতকেই একজন মৌলবাদীর পক্ষে সম্ভব ভুল বোঝানো। ধর্মীয় শিক্ষার জন্য তো আমার ঘরই যথেষ্ঠ। মাদ্রাসায় গিয়ে পড়তে হবে কেন? আমাদের যদি যেতে হয়, তাহলে সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়েই শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে।

প্রশ্ন: বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকারকে দেখা গেছে, মৌলবাদীদের সঙ্গে আঁতাত করতে। কেন তারা মৌলবাদের সঙ্গে আঁতাত করে?

হুমায়ূন: আঁতাতটা হয় মূলত ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য। দেখেছেন না, আওয়ামী লীগ কীভাবে খেলাফত আন্দোলনের সঙ্গে পাঁচ দফার চুক্তি করেছিল। কেন করেছিল? মৌলবাদীদের সঙ্গে আঁতাত করে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য। বিএনপি তো মৌলবাদীদের সঙ্গে আঁতাত করবেই। কারণ তারা সেই ধরনেরই রাজনীতি করে। কিন্তু যে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য নেতৃত্ব দিয়েছে,

প্রশ্ন: আপনি এখন সুইডেনে। তসলিমা নাসরিনের সঙ্গে কি আপনার যোগাযোগ হয়েছে?

হুমায়ূন: না, হয়নি।

প্রশ্ন: কিছুদিন আগে আমেরিকায় একটা অনুষ্ঠানে পশ্চিমবঙ্গের কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তসলিমাকে একজন বিতর্কিত লেখিকা বলেছেন। আপনি কি এ ব্যাপারে একমত?

হুমায়ূন: হ্যা, আমার মনে হয়, উনি একজন বিতর্কিত লেখিকা। কারণ ওনার লেখা দিয়ে উনি নিজেই নিজেকে বিতর্কিত করেছেন। তবে তসলিমা নাসরিন যে নিজের দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে আছেন, সেজন্য আমি খারাপ বোধ করি। কারণ একজন লেখক তার মাতৃভূমিতে বসবাসের অধিকার রাখে। তসলিমাকে দেশে ফিরতে দেওয়া উচিত।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের লেখকরা কি স্বাধীন?

হুমায়ূন: হ্যা, বাংলাদেশের লেখকরা স্বাধীন।

প্রশ্ন: তাহলে ড. হুমায়ুন আজাদকে মরতে হলো কেন?

হুমায়ূন: কারণ যে বইটা তিনি লিখেছিলেন, তা এতই কুৎসিত যে, যে কেউ বইটা পড়লে আহত হবে। তার জন্য মৌলবাদী হতে হয় না।

প্রশ্ন: ঠিক একই কারণে কি তসলিমা নাসরিন দেশ থেকে বিতাড়িত?

হুমায়ূন: হয়তোবা।

হুমায়ূন আহমেদের বিতর্কিত মন্তব্য ও  নিন্দার ঝড়

১৮ জুলাই ২০০৮ সালে  সুইডেন থেকে সাব্বির রহমান খানের সাথে জনপ্রিয় লেখক হুমায়ুন আহমেদের সাক্ষাতকার যা  দৈনিক সমকালে প্রকাশিত হয়, তা নিয়ে দেশে বিদেশে বিতর্কের ঝড় বয়ে যায়। লেখকের স্বাধীনতা, ভাষাবিজ্ঞানী হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা, শহীদ জননী জাহানারা ইমামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা এবং রাজনীতি নিয়ে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের বিতর্কিত মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন লেখক, সাহিত্যিক, শিক্ষক, সাংবাদিক ও রাজনীতিকরা। বিডিনিউজে ১৮ জুলাই ২০০৮ সালে  প্রকাশিত প্রতিবেদনটি  তুলে ধরা হলো।

কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক:  প্রকাশিত হুমায়ূন আহমেদের সাক্ষাৎকারে বলা নানা মন্তব্যের আকস্মিকতায় দৃশ্যত বিব্রত কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক  বলেন, “হুমায়ূন কী ভেবে, কোন চিন্তা থেকে এসব কথা বলেছেন তা আমি জানি না।”

সাক্ষাৎকারে হুমায়ূন আহমেদ দাবি করেন বাংলাদেশের লেখকরা স্বাধীন। “তাহলে হুমায়ুন আজাদকে মরতে হলো কেন?” পত্রিকাটির এই প্রশ্নের জবাবে প্রয়াত সাহিত্যিকের এককালের বন্ধু ও সহকর্মী হুমায়ূন বলেন, “কারণ যে বইটা তিনি লিখেছিলেন, তা এতই কুৎসিত যে, যে কেউ বইটা পড়লে আহত হবে। তার জন্য মৌলবাদী হতে হয় না।”

দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এ নাট্যকারের এমন বক্তব্যে বিস্মিত আজিজুল হক বলেন, “এ ধরনের মতামত উনি করেছেন; তা বিশ্বাস করা কঠিন। বর্তমান বাস্তবতায় এ ধরনের মতামত ১৫ কোটি মানুষের দিকে তীর ছুড়ে দেয়ার মতো।”

শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে চলচ্চিত্রে নির্মাণেও সমান সফল হুমায়ূনের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, “এসব বক্তব্য এতোই তুচ্ছ ও হাস্যকর যে এর ওপর আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। মন্তব্য করে এসব লোককে গুরুত্বও দিতে চাই না।”

এ ব্যাপারে প্রয়াত হুমায়ুন আজাদের স্ত্রী লতিফা কোহিনূর বলেন, “এটা হুমায়ূন আহমেদের নিজস্ব মত। হুমায়ুন আজাদের ৯০ শতাংশ পাঠকই এই মত সমর্থন করবে না।”

প্রয়াত হুমায়ুন আজাদের সহকর্মী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, “সহকর্মী হিসেবে বলতে পারি, হুমায়ুন আজাদ যা করেছেন তা সমাজের জন্যই করেছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের কথা বলেছেন এবং কখনোই স্বার্থ বা টাকা পয়সার মোহে কিছু করেননি। মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীরা যেসব কুৎসিত কাজ করেছে, সেটাই তুলে ধরেছেন হুমায়ুন আজাদ। এখন যদি তার মৃত্যুকে এভাবে জাস্টিফাইড করা হয়, তাহলে সেটা খুবই দুঃখজনক।”

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম দেশদ্রোহিতার মামলা মাথায় নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। ওনার অপরাধ কী ছিল- সমকালের এ প্রশ্নের উত্তরে হুমায়ূন আহমেদ বলেন, “ওনাকে কেউ তো খুন করেনি। উনিতো ক্যান্সারে মারা গিয়েছেন। ওনাকে দেশদ্রোহী কখনোই বলা হয়নি। দেশদ্রোহী কথাটা ভুল ইনফরমেশন। তার বিরুদ্ধে কখনোই দেশদ্রোহীর মামলা হয়নি। তাছাড়া পুরো ব্যাপারটিই ছিল এত তুচ্ছ, আমরা জানি যে, পুরোটাই ছিল একটা সাজানো খেলা।…”

তিনি বলেন, “বাংলাদেশে মৌলবাদের সমস্যা- বড় কোনো সমস্যা এখনো হয়নি। জনগণ যদি ভোট দিয়ে মৌলবাদীদের নির্বাচন করে, তাহলে গণতান্ত্রিকভাবে কি তাদের বাদ দেওয়া যায়? হোক না তারা মৌলবাদী।”

এ বক্তব্যে ক্ষুব্ধ একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবীর  বলেন, “জাহানারা ইমামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা ছিল না, এটা বলা হুমায়ূন আহমেদের অজ্ঞতা। জাহানারা ইমামসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা ছিল, আমিও একজন আসামি ছিলাম।”

শাহরিয়ার কবীর বলেন, “জাহানারা ইমামের বিষয়টি সাজানো খেলা, এটা অত্যন্ত আপত্তিকর কথা। ওই আন্দোলনের জন্য ওনাকে পুলিশ রাস্তায় পিটিয়েছে, হাসপাতালে যেতে হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে এত বড় আন্দোলন আর কখনো হয়নি। জামায়াত শিবির ও যুদ্ধাপরাধীরাই এটাকে কেবল সাজানো খেলা বলতে পারে। হুমায়ূন আহমেদের মতো একজন লেখকের এ ধরনের বক্তব্য জামায়াত শিবিরের পক্ষেই যায়।”

লেখকরা স্বাধীন কি না- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “তিনি (হুমায়ূন) নিজে স্বাধীন হতে পারেন। কারণ তিনি সবসময়ই এস্টাবলিশমেন্টের পক্ষে কথা বলেন। যারা এস্টাবলিশমেন্টের বিপক্ষে বলেন, তাদের সবাইকেই কমবেশি নিগৃহীত হতে হয়।”

হুমায়ূন আহমেদের বন্ধু ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, “হুমায়ূন আহমেদের কথা আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে। তার বক্তব্য আমাকে চরমভাবে ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ করেছে। হুমায়ূন আহমেদ সেনা গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করছে কি না- সন্দেহ হচ্ছে।”

লেখক ও শিক্ষক আজফার হোসেন বলেন, “লেখকের স্বাধীনতা সম্পর্কে হুমায়ূন আহমেদ ভুল বলেছেন। তিনি ইতিহাসের দিকে তাকাননি এবং বর্তমান অবস্থা সম্পর্কেও জানেন না। কত লেখককে যে কত সময় হত্যাসহ নানারকম হুমকি দেওয়া হয়েছে তা তিনি জানেনই না। কারণ তিনি একটা বিচ্ছিন্নতার মধ্যে বাস করেন এবং এস্টাবলিশমেন্টের একজন ভাড়া-খাটা লেখকের মতোই কথা বলেছেন। এতে আমি আশ্চর্য হইনি।”

দুর্মূল্যের বাজারে বাংলাদেশের মানুষ এখন কেমন আছে- এ প্রশ্নের জবাবে সাক্ষাৎকারে হুমায়ূন আহমেদ বলেন, “সবাই খুব ভালো আছে। বিশ্বের সব জায়গাতেই দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি। এখনো বাংলাদেশে চালের দাম বিশ্বের যে কোন জায়গার চেয়ে কম।”

বাংলাদেশের বর্তমান সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে আপনি কোন দৃষ্টিতে দেখেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি তাদের খুব ভালো দৃষ্টিতে দেখি। তারা খুব ভালো কাজ করছে।”

দেশে এতদিন জরুরি অবস্থা জারি করে রাখা কি উচিৎ- প্রশ্নে হুমায়ূন আহমেদের উত্তর, “আমাদের সরকার ও রাজনীতিবিদরা এতদিন দেশটার যে অবস্থা করে রেখেছিল, আগামী আরো দুবছরও যদি জরুরি অবস্থা জারি থাকে, আমি তার বিরুদ্ধে একটি কথাও বলবো না।”

বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার যথাসম্ভব সংবিধান মেনে চলছে এ অভিমত দিয়ে রাজনীতি থেকে দুই নেত্রীকে বাদ দেওয়ার বহুল আলোচিত প্রসঙ্গে এই লেখক বলেন, “এ সরকারের আগে দেশের যে অবস্থা হয়েছিল, তাতে দেশের সাধারণ মানুষই বলতো, দুই নেত্রীকে বাদ দিয়ে দেশ পরিচালনার কথা। এটা এ সরকারের কোনো কথা নয়। এটা বাংলাদেশের মানুষেরই কথা।”

হুমায়ূন আহমেদের এ কথার প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, “আমি ওনার মন্তব্যের সঙ্গে একমত নই। জরুরি অবস্থা থেকে জনগণ সুফল পাচ্ছে না। জরুরি অবস্থা জারি রাখার মতো কোনো অবস্থা দেখছি না। জরুরি অবস্থা এখনি প্রত্যাহার করা উচিত।”

তথাকথিত ‘মাইনাস-টু ফর্মুলা’ সম্পর্কে হুমায়ূন আহমেদের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় সাবের হোসেন চৌধুরী বলেছেন, “আমার মতে, শেখ হাসিনার সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করেই দেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন সম্ভব।”

চালের দাম নিয়ে জনপ্রিয় এই লেখকের কথার জবাবে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বলেছেন, “সরকারের অনেক ইতিবাচক পদক্ষেপ সত্ত্বেও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার জন্য জনগণ অন্যভাবে দেখছে। ক্রয়ক্ষমতার তুলনায় আমাদের দেশে দ্রব্যমূল্য অনেক বেশি। অন্যান্য দেশে চালের দাম আমাদের চেয়ে বেশি হলেও সেখানে মাথাপিছু আয় আমাদের চেয়ে অনেক বেশি।”

আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এবং আলোচিত লেখকের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর বলেছেন, “হুমায়ূন আহমেদ একজন লেখক। সর্বোপরি উনি একজন আবেগপ্রবণ মানুষ। রাজনীতির অনেক জিনিসই ওনার কাছে স্পষ্ট নয়। উনি একজন সৃজনশীল লেখক। রাজনীতির অনেক বিষয়ই ওনার জন্য অনুধাবন করা কঠিন। এই জন্যই উনি বিভ্রান্ত হয়েই রাজনীতি সম্পর্কে কিছু মন্তব্য করেছেন।”

‘আরো দু’বছর জরুরি অবস্থা চললেও তার বিরোধিতা করব না’- হুমায়ূন আহমদের এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় নূর বলেন, “জরুরি অবস্থার মধ্যে নির্বাচন হলে কী অসুবিধা তা একজন লেখকের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। উনি এটা জানেন না বলেই এই মন্তব্য করেছেন। জরুরি অবস্থার মধ্যে স্বাভাবিক প্রচারণা চালানো সম্ভব নয়।”

‘মাইনাস-টু ফর্মুলা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নয়। এটা জনগণের ফর্মুলা’- জনপ্রিয় এই লেখকের কথার জবাবে জনপ্রিয় এই অভিনেতা বলেন, “আমি মনে করি, এটা হুমায়ূন আহমেদের একান্তই ব্যক্তিগত মতামত। দু’নেত্রীর বিষয়ে দেশের মানুষ যে সিদ্ধান্ত নেবে তাই হবে। কাউকে গায়ের জোরে মাইনাস করা যায় না। দু’নেত্রীকে জনগণ চায় কি, চায় না তা তো আমরা দেখতেই পারছি। তাদের বাদ দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো কিছুই সম্ভব নয়।”

‘এখনো বাংলাদেশে চালের দাম বিশ্বের যে কোনো জায়গার চেয়ে কম’ – হুমায়ূন আহমেদের এই কথার জবাব দিতে গিয়ে আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক বলেন, “সব দেশে দ্রব্যমূল্য এভাবে বাড়েনি। অন্যান্য দেশে দ্রব্যমূল্য যেনো সহনীয় পর্যায়ে থাকে সেজন্য সে সব দেশের সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে আমাদের এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।”

মাইনাস টু ফর্মুলা সম্পর্কে প্রসঙ্গে শিক্ষক আরেফিন সিদ্দিক বলেন, “মাইনাস টু ফর্মুলা যদি জনগণের হতো, তাহলে শেখ হাসিনার মুক্তির জন্য আন্দোলন হতো না। জনগণের প্রতিনিধিত্বের কথা যেখানে বলা হয় সেখানে মাইনাস প্লাস বলে কিছু থাকে। মাইনাস করার ষড়যন্ত্র একটা মহল থেকে করা হয়েছে। হুমায়ূন আহমেদ সেই মহলেরই লোক বলে মনে হচ্ছে।”

এখনই জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করা উচিৎ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “কোনো সভ্য দেশে বছরের পর বছর জরুরি অবস্থা থাকতে পারে না। যুদ্ধ ও দাঙ্গাহাঙ্গামার সময় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। নির্বাচনের দেওয়া মানেই সেখানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক। কিন্তু জরুরি অবস্থা রেখে নির্বাচন করার মধ্যে এক ধরনের ষড়যন্ত্র থাকে।”

ইংরেজি দৈনিক নিউএজ সম্পাদক নুরুল কবীর বলেন,”হুমায়ূন আহমেদ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে যেসব কথা বলেছেন, তা ঠিক নয়।”

তিনি বলেন, “আরো দুই বছর জরুরি অবস্থা থাকার কথা বলেছেন হুমায়ূন, এতে করে মানুষের মৌলিক অধিকার আরও দুই বছর থাকবে না। মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা থাকবে না। একজন সৃষ্টিশীল লেখক কিভাবে এই দাবি করলেন তা ভেবে আমি আশ্চর্য হয়েছি।”

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও মানুষের সুখে থাকা প্রসঙ্গে নুরুল কবীর বলেন, “এটাও বিভ্রান্তিমূলক। বাংলাদেশে দ্রব্যমূল্য বেড়েছে। কিন্তু মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়েনি। এতে করে মানুষ কষ্টে আছে। হুমায়ূন আহমেদের মতো জনপ্রিয় ব্যক্তির প্রতি মানুষের যে প্রত্যাশা তার সঙ্গে এই বক্তব্য সঙ্গতিপূর্ণ নয়।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক রফিক উল্লাহ খান বলেন, “সাক্ষাৎকারে হুমায়ূন আহমেদের কিছু উত্তর দেখে মনে হয়েছে, আত্মপ্রচার ছাড়া সেখানে কিছুই নেই। তার বক্তব্যে বারবার নিজেকে শিক্ষক বলা হলেও বক্তব্যের মধ্যে কোনো মননশীলতা নেই।”

হুমায়ুন আজাদের লেখাকে কুৎসিত বলা প্রসঙ্গে বাংলা সাহিত্যের এই শিক্ষক বলেন, “কুৎসিত জীবনের বাস্তবতা লিখতে হলে তা কুৎসিতই হবে। না লিখলে লেখক প্রতারণা করবে। মুক্ত চেতনার জন্যই হুমায়ুন আজাদ আক্রমণের শিকার হয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই লেখকের স্বাধীনতা ক্রমায়ন্বয়ে সংকুচিত হয়েছে। তার দৃষ্টান্ত হুমায়ুন আজাদ।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার বলেন, “এটা হুমায়ূন আহমেদের নিজস্ব বক্তব্য, এটা দেওয়ার অধিকার তার আছে। তবে বক্তব্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে আমি জোরালো দ্বিমত পোষণ করছি। বাংলাদেশের লেখকরা স্বাধীন এটা বিশ্বাস করি না।”

তিনি বলেন, “হুমায়ুন আজাদের লেখায় শোভন-অশোভন থাকতেই পারে। এটা তার নিজস্ব ব্যাপার। তার জন্য যদি প্রাণ দিতে হয়, আক্রমণের শিকার হতে হয়, তাতে এটাই প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের লেখকদের যতটুকু স্বাধীনতা দরকার ততটুকু নেই।”

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগের শিক্ষক সেলিম রেজা নিউটন বলেন, “স্বাধীনতা কখনই দিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়, তা সংগ্রাম করে আদায় করে নিতে হয়। বাংলাদেশের লেখকরাও এই সংগ্রামের মধ্যে আছেন। জরুরি অবস্থায় লেখকদের স্বাধীনতা কমে, এবারও তাই হয়েছে। তবে হূমায়ূন আহমেদের মতো লেখকেরা সব সময়ই স্বাধীন। তার একার জন্য যদি রাষ্ট্র থাকত এবং সেখানে আজীবন জরুরি অবস্থা থাকত তাহলে আমার কোনো আপত্তি থাকত না।”

তিনি আরো বলেন, “পৃথিবীর কোনো দেশেই জরুরি অবস্থা গ্রহণযোগ্য নয়। এমনকি যুদ্ধের সময়ও জনগণকে যদি সত্যি সত্যি ঐক্যবদ্ধ করতে হয় তাহলে জনগণের মধ্যে কথাবার্তা বলা ও মতামতের স্বাধীনতা থাকতে হবে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়ই স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারকে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে হয়নি।”

হুমায়ুন আজাদ আক্রান্ত হওয়ার পর গড়ে ওঠা ছাত্র আন্দোলন মোর্চা ‘মুক্তচিন্তা রক্ষা ও অগণতান্ত্রিক শক্তি প্রতিরোধ হুমায়ুন আজাদ মঞ্চ’ এর অন্যতম সংগঠক আহমেদ মুনীরুদ্দীন তপু বলেন, “হুমায়ূন আহমেদের মতো লোকরাও লেখক-শিল্পীর স্বাধীনতার বিষয়টি বোঝেন না বলেই আমাদের দেশে সা¤প্রদায়িক শক্তি পেশী প্রদর্শনের সুযোগ পায়।”

হুমায়ূন আহমেদের বক্তব্যকে এক ধরনের প্রলাপ আখ্যা দিয়ে হুমায়ুন আজাদের একজন পাঠক নুসরাত সুলতানা বলেন, “লেখকের স্বাধীনতা নিয়ে হুমায়ুন আহমেদ যে মন্তব্য করেছেন তা আত্মঘাতী। তিনি সাধারণ ব্যক্তি না হওয়ায় এই বক্তব্য সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতার শিক্ষক আতিকুর রহমান কয়েকদিন আগে সৌদি আরবের প্রধান মুফতির দেওয়া বক্তব্য ‘লেখকদের ওপর ফতোয়া জারি করা যাবে না’ তুলে ধরে বলেন, “হুমায়ূন আহমেদের বক্তব্যে মনে হয়েছে, আমাদের এই বিজ্ঞানের অধ্যাপকটির চেয়ে সৌদি আরবের প্রধান ইমামও বেশি বিজ্ঞানমনস্ক।”

বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) আহ্বায়ক খালেকুজ্জামান বলেন, “হুমায়ুন আহমেদ সাক্ষাতকারে অনেক বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন, তিনি অতীতের দিকে যতটুকু দৃষ্টি দিয়েছেন, দুঃসহ বর্তমানের প্রতি ততটাই উদাসীন থাকতে চেয়েছেন। একজন সচেতন মানুষের জন্য এটা এক ধরনের দায়িত্বহীনতা। স্বাধীনতার ওপর ছবি (সিনেমা) করার দাবিদার হুমায়ূন আহমেদের এ বিষয়ে আরো সচেতন থাকা উচিত ছিল বলে মনে হয়।”

এমএ/ ০৮:১৩/ ২২ জুলাই

সাক্ষাতকার

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে