Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২০ , ৮ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 5.0/5 (1 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১১-২৪-২০১২

রাজনৈতিক দূরত্ব বাড়ছে, আলোর দিশা কোন দিকে

ফকির ইলিয়াস



	রাজনৈতিক দূরত্ব বাড়ছে, আলোর দিশা কোন দিকে

ফিলিস্তিনে বর্বর ইসরায়েলি হামলা চলেছে। যুদ্ধ বিরতি হয়েছে যদিও, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের কোনো আলামত বিশ্ববাসীর সামনে নেই। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন, ইউএস সেক্রেটারি অব স্টেটস হিলারি ক্লিনটন গাজা সফর করেছেন। গিয়েছিলেন, প্রাক্তন ইউএস প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারও। তার একটা খন্ড সাক্ষাৎকার আমেরিকার কাগজে পড়লাম। জিমি কার্টার বলেছেন, আমার মনে হচ্ছে- ইসরাইল কোনোমতেই স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র চায় না। আর সেটাই যদি সত্য হয়, তাহলে এই আগুন আর কতোদিন জিইয়ে থাকবে? সে প্রশ্নটি আসছে বারবার। বলার অপেক্ষা রাখে না খুবই শঙ্কা ও সংকটের মধ্য দিয়ে এগুচ্ছে বিশ্ব রাজনীতি। মায়ানমার সফর করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। তিনি আরাকান মুসলমানদের অধিকার নিয়ে কথা বলেছেন। অন্য দিকে শান্তির মানসকন্যা বলে কথিত অং সান সুচি রোহিঙ্গা মুসলমান ও বাংলাদেশ মিলিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা তার হীনমন্যতার বহিঃপ্রকাশই ঘটিয়েছে। এটা সুচির কাছে কোনোমতেই প্রত্যাশিত ছিল না। তারপরও তার কথা শুনে মনে হয়েছে সুচি এখন ক্ষমতার জন্য মরিয়া। তা না হলে তিনি একটি সম্প্রদায়কে কটাক্ষ করে এমন বক্তব্য দেবেন কেন?

 

 
রোহিঙ্গা ইস্যুতে মায়ানমারের বিরোধীদলীয় নেত্রী অং সান সুচির সাম্প্রতিক বক্তব্যে হতাশ বাংলাদেশ। এ নিয়ে সরকারের তরফে বিস্ময় প্রকাশ করা হয়েছে। সরকার মনে করে তার এ মন্তব্য দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যা সমাধানে মায়ানমার সরকার গৃহীত পদক্ষেপ ও অনুসৃত নীতির পরিপন্থী। ভারত সফরে গিয়ে টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশকে নিয়ে সুচি যে বক্তব্য দিয়েছেন তা তার রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা প্রকাশ করেছে। রোহিঙ্গা ও রাখাইনদের মধ্যে সাম্প্রতিক এই সংঘর্ষ-সহিংসতাকে ‘বড় ট্র্যাজেডি’ হিসেবে অভিহিত করেন সুচি। তিনি এই সহিংসতার জন্য রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অবৈধ অভিবাসী হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, ‘মায়ানমারে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অভিবাসীদের প্রবেশ বন্ধ করতে হবে।’
 
বাংলাদেশেও এখন চলছে একটি চরম অস্থিরতা। সেনাকুঞ্জের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীর দেখা হয়নি। দুবছর পর এই অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। দেখা না হওয়াটা, কিংবা কথা না হওয়াটা দুঃখজনক। এভাবে কোনো পরিশুদ্ধ রাজনীতি চলতে পারে না। দেশের কল্যাণের কথা ভাবলে ‘ডায়লগ’ চলতেই থাকে। সংলাপ ছাড়া কোনো উন্নয়নই হয় না। আর কেউ যদি দুর্নীতির পক্ষ নিয়ে, দুর্নীতিবাজদের প্রশ্রয় দিয়ে রাষ্ট্র চালাতে চানÑ তাহলে তো রাষ্ট্রকল্যাণের কথা বলে কোনো লাভই নেই। রাজনীতিতে গণমানুষের সঙ্গে দূরত্ব কথাটি আমরা প্রায়ই শুনি। সম্প্রতি টাঙ্গাইলে একটি উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী পাস করেছেন। বুঝা গেছে, সরকারের নীতিনির্ধারকরা প্রধানমন্ত্রীকে সঠিক তথ্য দিতে পারেননি। পারলে এভাবে পরাজয় ঘটতো না।
 
বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতারা একটি উষ্মা প্রকাশ করেছেন। এবং তার তা করেই যাচ্ছেন। তারা বলেছেন, স্থানীয় এমপিরা গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। তারা নিজ এলাকার মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন না। সংবাদটি খুব সুখকর নয়। কারণ তারা একটা কমিটমেন্ট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। তারা এসেছেন ভিশন ২০২১-কে সামনে রেখে। এসেছেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে। মহাজোট সরকারের গেলো চার বছর কেমন কেটেছে, তা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা যুক্তিতর্ক চলতেই পারে। তবে সব মিলিয়ে এই সরকার দেশকে একটি স্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যেতে চেয়েছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
 
একটি রাষ্ট্রযন্ত্র চালাতে বিভিন্ন বাহুর প্রয়োজন হয়। এ বাহুগুলোর সমন্বিত শক্তি চালনা করে রাষ্ট্রকে। এর একটি হচ্ছে দেশে ন্যায়বিচার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। এর জন্য একটা ধারাবাহিকতার প্রয়োজন হয়। মহাজোট সরকার তা রক্ষা করতে সচেষ্ট থেকেছে কিনা তা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
 
সরকারকে বিব্রত করতে বেশি তৎপর থেকেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনগুলোর কিছু নেতাকর্মীর দখলদারি মনোভাব। এরা দাঙ্গা বাধিয়েছে। জনগণের সামনে খুবই নগ্নভাবে নেমেছে হীন মতলব হাসিলের লক্ষ্যে।
 
॥ দুই॥
 
মনে পড়ছে ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে একটি বড় সেমিনার হয়েছিল বাংলাদেশ বিষয়ে। এই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল ওয়েন। এসেছিলেন ঢাকার তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টিও। এই সম্মেলনে বাংলাদেশে চলমান কিছু সংকট, এর উত্তরণের পথ এবং সম্ভাবনার ভবিষ্যৎ নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার হয়েছিল। সেমিনারগুলোতে যে সব বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছিল এর মধ্যে ছিলÑ ১. প্রশাসনকে দুর্নীতি ও শিক্ষাঙ্গনকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। ২. যোগ্যতার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। ৩. বাংলাদেশে বর্তমানে বিদ্যমান ৬টি শিক্ষানীতি সমন্বয় করে যুগোপযোগী শিক্ষানীতি চালু করতে হবে। ৪. মিডিয়া মালিকদের রাজনৈতিক বিশ্বাসকে তাদের মিডিয়ায় প্রতিফলিত না করে বার্তাকক্ষকে প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। ৫. রাজনৈতিক দলগুলোকে গণতন্ত্র চর্চায় ব্রতী হতে হবে। ৬. জলবায়ু পরিবর্তনে গৃহীত পদক্ষেপের সমর্থনে গোটা জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। ৭. পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের নামে সমস্ত বিনিয়োগে ক্ষমতাসীনদের কর্তৃত্ব পরিহার করতে হবে এবং জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার দ্বিগুণ করার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। ৮. একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অবকাঠামো উন্নয়ন ঘটানো, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিচার বিভাগকে যথাযথ স্বাধীনতা দিতে হবে। ৯. জনগণের সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তথাকথিত কেয়ারটেকার প্রথা বাতিল করতে হবে। ১০. ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। জেলা পরিষদে চেয়ারম্যান নিয়োগ দিতে হবে। ১১. সুষ্ঠু বিনিয়োগ প্রথা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সরিয়ে নিতে হবে।
 
দুদিনব্যাপী এই সম্মেলনে মিডিয়া সংক্রান্ত একটি সেমিনারে বাংলাদেশের মিডিয়া চিত্রের একটি বর্ণনা তুলে ধরেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি। ঢাকায় সঞ্চিত অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশে মিডিয়ার প্রসার ঘটছে খুব দ্রুতই। এ জন্যই দেশের মানুষ আরো বেশি সৎ ও সাহসী সাংবাদিক দেখতে চায়। যাদের মাধ্যমে দুর্নীতি, অনাচার, অপকর্মের সকল তথ্য দ্রুত উদঘাটিত হতে পারে। রাষ্ট্রদূত মরিয়ার্টি বলেছিলেন, সকল অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে মিডিয়া ‘ওয়াচ ডগ’-এর ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশে। তিনি বলেছিলেন সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেলের পাশাপাশি ওয়েবভিত্তিক সংবাদ মাধ্যমগুলোও বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। জেমস এফ মরিয়ার্টি বলেছিলেন, ফেসবুক হচ্ছে বাংলাদেশে আরেকটি জনপ্রিয় মাধ্যম। ফেসবুকের মাধ্যমে খুব দ্রুত সর্বসাধারণের মতামত বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। তিনি আরো বলেছিলেন, ব্লগও একটি জনপ্রিয় মিডিয়া। ব্লগের বিভিন্ন সাইটে লাখ লাখ বাংলাদেশী প্রতিদিন তাদের মতামত জানাচ্ছেন, লিখছেন। আমরা দেখছি, বাংলাদেশে- বিশ্বে সবখানেই মানুষের বোধশক্তি বাড়ছে। কিন্তু সেই অনুপাতে রাজনীতিকদের ঐক্য, আন্তরিকতা বাড়ছে না। আর তা না বাড়ার কারণেই অনেক গণমুক্তির এজেন্ডাও মুখ থুবড়ে পড়ছে।
 
দারিদ্র্যতা মানুষের জীবনে একটি চরম অভিশাপ। আর তা থেকে মুক্তির জন্য চাই অধ্যবসায় এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টা। বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেখানে মানুষকে সঠিক গাইড লাইন দেয়া খুবই জরুরি। সে সঙ্গে প্রয়োজন, লুটপাটকারী চক্রকে ঠেকানো। দারিদ্র্য বিমোচনের নামে স্বদেশ কিংবা বিদেশের বরাদ্দকৃত অর্থগুলো যদি ভোগবাদীদের উদরে চলে যায় তবে দরিদ্র মানুষের ভাগ্য কোনোদিনই বদলাবে না। বরং মানুষের ভাগ্যের সঙ্গে প্রতারণা করে গড়ে উঠবে এ দেশে আরো কয়েক হাজার কোটিপতি। এ বিষয়টি গভীরভাবে খেয়াল রাখতে হবে।
 
ক্ষুধা এবং দরিদ্রতা তাড়াবার প্রথম এবং প্রধান শক্তি হচ্ছে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব। এ বিষয়ে সংকীর্ণ মানসিকতা পরিহার করা অত্যন্ত জরুরি। মনে রাখা দরকার, এই দেশ-এই মাটি সকলের মাটি এবং মানুষের জন্যই সকল রাজনীতি, সকল মত, সকল আদর্শ। দ্বিমত, বহুমত রাজনীতিতে থাকবেই। কিন্তু যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেই বিশ্বাস করে না , তাদের সঙ্গে তো কোনো ঐক্য হতে পারে না।
 
আজ বড় প্রয়োজন একটি ঐক্য। একটি জাতীয় মোর্চা। মানুষের সপক্ষে, মাতৃভূমির সপক্ষে। গোটা বিশ্বে এখন যে অনুশীলন পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা হলো দায় নিয়ে রাজনীতির চর্চা। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া, চীনের মতো দেশও বিভিন্ন জনস্বার্থ বিষয়ে ঐক্যের প্লাটফরম গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে। ব্যক্তিগত রেষারেষি বাদ দিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াবার চেতনা শাণিত করতে হবে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের। না হয়, এই প্রজন্মই একদিন তাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে। আবারো বলি, বাঙালি জাতির আলো দিশা দরকার। এই আলোর দিশা হাতে রাজনীতিকদেরই এগিয়ে আসতে হবে।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে