Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট, ২০১৯ , ৪ ভাদ্র ১৪২৬

গড় রেটিং: 4.8/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ০৭-১৮-২০১৭

আমাদের হুমায়ূন আহমেদ

সালমান তারেক শাকিল


আমাদের হুমায়ূন আহমেদ

'মানুষের সঙ্গে গাছের অনেক মিল আছে। সবচেয়ে বড় মিল হলো, গাছের মত মানুষেরও শিকড় আছে। শিকড় উপড়ে ফেললে গাছের মৃত্যু হয়, মানুষেরও এক ধরনের মৃত্যু হয়। মানুষের নিয়তি হচ্ছে তাকে অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মৃত্যুর ভেতর দিয়ে অগ্রসর হতে হয় চূড়ান্ত মৃত্যুর দিকে' 

হুমায়ূন আহমেদ আর নেই। শব্দটা খুব অচেনা-বেমানান। অতি বানোয়াট মনে হয়। এই মানুষটা প্রতি ঈদে প্রতিটি দৈনিকের সংখ্যা আলোকিত করে রাখতেন হাসি-ঠাট্টা আর বিনোদনে। কী ঘরে, কী বাইরে। বৃহস্পতিবার রাত ১১টা ২০ মিনিটে, একেবারেই চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

প্রথম সংবাদটা দেয় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কলেজ কার্যক্রমের বন্ধু নিশাত রহমান শারিকা। শাকিল, হুমায়ূন আহমেদ আর নেই। বোঝা যায়, নিশাত এর চেয়ে বেশি কথা বলবে না।

কিন্তু আগ বাড়িয়ে বলি_ তোর কি প্রিয় ছিল? নিশাত উত্তরে বলে, 'না না তার তো চানি্ন পসর রাইতে যাওয়ার কথা। তার তো দেয়াল আমাদের হাতে তুলে দেওয়ার কথা'_ নিশাতের ফোনলাইন কেটে যায়।

আমি স্থবির হয়ে মিনিট দশেক বসে থাকি জানালার পাশে বিছানায়। দু'পাশের জানালা দিয়ে হু হু করে বাতাস ঢুকছে, খুব বিরক্ত হয়ে উঠি। বাতাসের শব্দ ভালো লাগে না। হঠাৎ পাশের রুম থেকে সুর ভেসে আসে, যদি মন কাঁদে, তবে চলে এসো, চলে এসো এক বরষায়। গানের সুরে বাইরের প্রকৃতির আধা বৃষ্টিতে চোখ যায়, মনে পড়ে সারাদিন ঘ্যানঘ্যান বৃষ্টির কথা। এ বরষাতেই কি হুমায়ূনের মন কেঁদেছিল! নিজের লেখা গানের সুর-তাল-লয়ের সঙ্গে চলে গেলেন একেবারে।

হুমায়ূনের স্ত্রী শাওনের কণ্ঠে এই গান পাশের রুমের প্রতাপ, তনু, তাপসরা শুনছে। দু'পা ফেলে ওদের রুমে প্রবেশ করি। রুমের ভেতর পুরোটাজুড়েই আট দশজন বসে আছে। তনুর ডেস্কটপে শাওনের গানে সবার কান। অবলীলায় বসে পড়ি ওদের মাঝে।

খুব দেখার ইচ্ছা ছিল হুমায়ূন আহমেদকে। এখন তার লাশটাই দেখতে হবে_ প্রতাপের কণ্ঠে যন্ত্রণা ঝরে পড়ে। ওর পাশে বসা তৈয়ব শেখ প্রতি রাতেই বাসায় ফিরে হুমায়ূনের বইয়ে চোখ দিতেন_ কী বলতেই 'নো কমেন্টস' বলে বিছানায় পাশ ফেরেন।

বোঝা যায় অনেক হতবাক-বিমূঢ় খবরে কারও স্বস্তি নেই। সারাদিন যাদের হিন্দি গানেই ভালো লাগা, তাদের কাছে হুমায়ূন এতটা প্রিয়, আনন্দ এসে গেল।

প্রতাপ বলে, ওর 'আমার আছে জল' গানটা শুনেই একটা প্রিয় অনুভূতি কাজ করে প্রথম।

হুমায়ূন আহমেদের প্রশংসার চেয়ে আমার কাছে তার সমালোচনাই বেশি। বাংলা সাহিত্যে নির্জীব-চিন্তাহীন পাঠক তৈরির একটা বড় অবদান তার। কোনো রকম ভাবনা-চিন্তা ছাড়া দৈনন্দিন কাজকর্ম-ব্যবহারের খুনসুটি দিয়ে তার তরুণতর পাঠক শ্রেণিকে আটকে রেখেছেন দিনের পর দিন। সাহিত্যের মূল্যবোধ তৈরিতে তার বিশাল অনিচ্ছা। প্রায়ই বলতেন, আমি তো শিক্ষক নয়ই সাহিত্য দিয়ে শিক্ষা দিব, এটা একটা বিনোদন। আর বিনোদন দেওয়াই আমার কাজ।

এই সমালোচনা বোধ নিজের মধ্যে ধারণ করেও প্রতি বছর হুমায়ূূনের প্রতিটি বইয়ে ছিল আমার নজর; তার ছবিতে ছিল দৃষ্টি, কখন মুক্তি পাবে তার নতুন কোনো ছবি। কোনো কোটেশন না দিয়ে কেবল অনুভূতি আজ দিতে চাই ছড়িয়ে। ছোট ছোট মানুষ, মধ্যবিত্ত মানুষ, রিকশাওয়ালা, তরুণ বেকার, লাল শাড়ির যুবতী, সবার মনে ছোট ছোট কথা, একটু ব্যথা, বেশ সমাদরেই তুলে আনতেন নিজের গল্প, উপন্যাস, ছবি, নাটক ও গানে।

এতটা কোমল-হাস্যরসের খেয়ায় চড়িয়ে খুব কম সাহিত্যিকই পেরেছেন সাধারণ পাঠকের কাছে অসাধারণ আবেদন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। তার মৃত্যুর পর তাই ফেসবুকে এক পাঠক লিখেন, 'আপনাকেই পড়ে মনে গহিন কোণে একটু একটু ভালোবাসা টের পাচ্ছিলাম। ভালোবাসা জিনিসটা বুঝতে শিখছিলাম। আজ না বলে চলে গেলেন, খুব কষ্ট এবং মানতে পারছি না।'

স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে কোটি কোটি তরুণের। বইমেলায় লাইন ধরে তার অটোগ্রাফ আর নিতে পারবে না। ফটোশিকারিরা ছবি তুলতে মারামারি করবে না। বইমেলার দায়িত্বরত পুলিশদের আর বাড়তি পরিশ্রম করতেও হবে না। বড় বড় লেখকরা অভিযোগ তুলবেন না_ 'হুমায়ূূনের কারণে মেলায় হাঁটা যায় না। মেলার পরিবেশটা গেল।'

মহামান্য বিচারপতি প্রশ্ন তুলে রুল জারি করবেন না, 'দেয়াল উপন্যাসটা সংশোধন করার।'

একেবারে সবার অনুযোগ-অভিযোগ-রক্তচোখ রাঙ্গানিকে উপড়ে ফেলে চলে গেলেন প্রশ্নহীন দেশে। একেবারেই তিনি একা, নিজের মতো এখন বাস করবেন হুমায়ূন। নাস্তিকতা কিংবা আস্তিকতার ক্যালকুলেশন ছাড়িয়ে। কার দলে কতদিন ছিলেন হুমায়ূন, এখন সে হিসেবে পানি ঢেলে দিলেন নিজেই। তাই অপেক্ষা তার প্রতিটি সৃষ্টিকর্মের পরশমণির ছোঁয়ায় কতদূর আলো দেখব আমরা। 

এমএ/ ১৩:৩৪/ ১৮ জুলাই

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে