Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২০ , ১১ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.2/5 (24 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১১-১৭-২০১২

জাতিসত্তা, জঙ্গিবাদ ও প্রজন্মের আনুগত্য

ফকির ইলিয়াস



	জাতিসত্তা, জঙ্গিবাদ ও প্রজন্মের আনুগত্য

চারদিকে জঙ্গিবাদের একটি দৃশ্যমান মহড়া। মনে হচ্ছে যেন হরিলুটের উৎসব চলছে। এই তো মুখ্য সময়! এর জন্যই কি ৩০ লাখ শহীদ প্রাণ দিয়েছিলেন, সে প্রশ্নটিও করছেন কেউ কেউ। না কোনো জবাব নেই। যারা ক্ষমতায় যেতে চাইছেন তারা তালি বাজাচ্ছেন। আর যারা ক্ষমতায় আছেন, তাদের কেউ কেউ ভাগবাটোয়ারা নিয়ে ব্যস্ত। সবকিছুই যেন ‘গায়ে সওয়া’ হয়ে গেছে। কোনো জবাবদিহিতা নেই। এভাবে কি একটা দেশ চলতে পারে? না পারে না। আমরা বাঙালি কিংবা বাংলাদেশী- যে দাবিদারই হই না কেন, এ দেশের প্রতি একটা দায় আছে- তা মানতেই যদি হয়, তবে আমরা করছিটা কী! ক্ষমতায় থাকা কিংবা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য আকুলতা নতুন নয়। কিন্তু এর প্রক্রিয়া কি এভাবে হতে পারে?

দেশে একটি ধর্মীয় মৌলবাদী দলের সহিংস আচরণ আবারো টালমাটাল হয়ে উঠেছে। তারা পুলিশকে আক্রমণ করছে যত্রতত্র। এরা কতোটা ভয়ঙ্কর, তা অতীত ইতিহাস থেকে আমরা মনে করতে পারি। এরই সূত্র ধরে মহান জাতীয় সংসদে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘রাজনীতিতে ধর্মের যোগ বা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ইতোমধ্যেই এক রাজনৈতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ধর্মীয় রাজনৈতিক উন্মাদনার মধ্যে নিহিত থাকা সাম্প্রদায়িকতার বীজ মাথাচাড়া দেবে সেটাই স্বাভাবিক।’ এদিকে খবর বেরিয়েছে, রাজশাহী মহানগরী ও এর আশপাশের অর্ধশতাধিক স্থানে অন্তত ৫ হাজার শিবির ক্যাডার অবস্থান করছে। নেতাদের নির্দেশে দিনের যে কোনো সময় বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে তারা নগরীতে চোরাগোপ্তা হামলা করার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে বলে জানা গেছে। তবে পুলিশ তাদের সঠিক অবস্থান না জানার কারণে বড় ধরনের গ্রেপ্তার অভিযান চালাতে পারছে না। গেলো কয়েকদিনে এসব ক্যাডার গোটা দেশে যে অরাজকতা তৈরি করেছে, তা কি প্রমাণ করে না- একটি মহল যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে অনেক তৎপর রয়েছে। এরা রাজনৈতিক শক্তি কোথা থেকে পাচ্ছে, সেটা দেখার বিষয় অবশ্যই।
 
রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় আইনমন্ত্রীর গাড়ি বহরে হামলা করে জামাত-শিবিরের ক্যাডাররা। এর তীব্র প্রতিবাদ হচ্ছে গোটা দেশজুড়ে। সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদের আহ্বায়ক ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম বলেন, ‘এটা একটা খারাপ আলামত। বিরোধী দলও যেন এ হামলার প্রতিবাদ জানায়। আর যদি প্রতিবাদ না জানায়, তাহলে এটা গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক হবে।’ এ হামলার প্রতিবাদে আগামী রোববার সারা দেশে ‘প্রতিবাদ দিবস’ পালনের ঘোষণা দেন তিনি। সাবেক আইনমন্ত্রী আব্দুল মতিন খসরু বলেন, ‘গত ৫০ বছরেও এ ধরনের দুঃসাহস কেউ দেখাতে পারেনি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যখন শেষ পর্যায়ে তখনই তারা এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে। ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের ওপর হামলা মানে সরকারকে আঘাত করা। এ সাহস তারা কোথায় পায়?’ খেয়াল করলেই মৌলবাদী ডানপন্থীদের সহজে চেনা যায়। কিন্তু মধ্যপন্থীদের খুব সহজে চেনা যায় না। জানা যায় না তাদের প্রকৃত মতলব। এরা নিজেকে খুব রহস্যময় করে রাখতে চায়। লুকিয়ে থাকে। কখনো প্রগতিবাদী, আবার কখনো পতিতদের সঙ্গে ওঠাবসা করে। সবই করে নিজেদের হীনস্বার্থের জন্য। এই স্বার্থ মৌলবাদের চেয়েও ভয়ঙ্কর। এই দীনতা কলুষিত করতে চায় সমাজকে। প্রজন্মের প্রত্যয়ে আঘাত হানার চেষ্টা করে। এরা বিভ্রান্ত করতে চায় গোটা ইতিহাসকে।
 
এই বিভ্রান্তবাদীদের প্রচেষ্টা বাংলাদেশে নতুন নয়। এরা বারবার হীন চেষ্টা করেছে। এখনো করে যাচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মহান মুক্তিসংগ্রামকে নিয়ে তাদের যতো গা-জ্বালা। কারণ তারা একাত্তরে পরাজিত হয়েছিল। বাংলার মানুষ তাদের হারিয়ে দিয়েছিল। সেই বেদনা তারা এখনো ভোলেনি। তাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা এলেই তারা নানা মিথ্যার বেসাতি ছড়ায়। নানাভাবে বলতে চায়, পাকিস্তানের অখ-তাই ছিল শান্তির আবাসস্থল। কী সাংঘাতিক কথাবার্তা! এরা ইতিহাস বিকৃত করার জন্য নানা মিথ্যা, উদ্দেশ্যমূলক, বানোয়াট তথ্য ও অনুমান হাজির করে। বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে চায়। শহীদদের পবিত্র রক্তের সঙ্গে বেইমানি করার ধৃষ্টতা দেখায়। খুব কৌশলে নানা কথা বলে। এসব রাজাকারের সৌভাগ্য, তারা এখনো বাংলার মাটিতে অবস্থান করে মিথ্যা অপপ্রচার করতে পারছে। এই ২০১২ সালেও তারা বলছে, ‘ওসব যুদ্ধাপরাধী’- বলে জাতিকে বিভক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে! বাংলাদেশে মধ্যপন্থীদের প্রধান এবং শেষ আশ্রয়স্থল হচ্ছে ডানপন্থী মৌলবাদীরা। কিছু বুদ্ধিজীবী আছেন, যারা ‘মানবতা’, ‘আধ্যাত্মিকতা’ এবং ‘বিবর্তন’-এর লেবাস পরে মূলত ডানপন্থী মৌলবাদীর পক্ষে কাজ করে যান। তারা ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মপালন না করলেও আড়ালে-আবডালে ধর্মের ধ্বজা ধরে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার প্রয়াসী হন। এসব ‘আধুনিক চিন্তার’ ঝান্ডাধারীরা প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে রাজাকার-আলবদরদের ইচ্ছাকেই বাঁচিয়ে রাখতে নানাভাবে মাঠে কাজ করে যাচ্ছে।
 
একাত্তরের নরঘাতক গোলাম আযম প্রকাশ্যে বলেছেন, ওই সময় রাজাকার বাহিনী তৈরি করা না হলে নাকি পূর্ব পাকিস্তানের পাঁচ কোটি মানুষকেই প্রাণ দিতে হতো। যারা একাত্তর দেখেছেন, তারা কি তার এই তত্ত্বটি মানবেন?
 
প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে বলতে পারি, রাজাকাররা পাকিস্তানি বাহিনীর ‘খোশ তোয়াজ’ করা ছাড়া আর কোনো মহৎ (!) কাজই করেনি। পাকিস্তানি বাহিনীর ছত্রছায়ায় তারা লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, ব্যভিচারের মতো জঘন্য কাজের পাহারা দিয়েছে। তাদের প্রভুদের মনোরঞ্জন করেছে। এখন তারা বলছে, তারাই নাকি ছিল মাতৃভূমির রক্ষক। ভ-ামি আর কাকে বলে! বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কার্যক্রম যখন চলছে তখন সেইসব ঘাতক আলবদররা বলছে, তারা নাকি তা রাজপথেই মোকাবেলা করবে। লাখো শহীদের রক্তে ভেজা বাংলার রাজপথটি যেন তাদের তালুকের সম্পত্তি। অথচ এই রাজপথে এখনো বাংলার অধিকারকামী মানুষ সহস্রগুণ সোচ্চার রয়েছেন। স্বাধীনতাবিরোধী এই চক্রটি এখন বলে বেড়াচ্ছে, বিজয়ের মূল লক্ষ্য- অর্থনৈতিক মুক্তি সাধিত হয়নি। যদি এর পেছনে ফিরে তাকানো যায় তবে দেখা যাবে, অর্থনৈতিক মুক্তির প্রধান অন্তরায় হয়েছে বাংলাদেশে সামরিক জান্তাদের শাসন। যা ক্রমশ ঘাতক দালালদের রাজনীতিকে পুনর্বাসিত করেছে। দেশে মৌলবাদের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ধর্মের দোহাইয়ের নামে জঙ্গিবাদী তৈরি করেছে। সন্ত্রাসীদের প্রত্যক্ষ ম“ দিয়েছে। এই অপতৎপরতা বাঁচিয়ে রাখতে এখনো তারা কাজ করে যাচ্ছে নিরন্তর। তাদের স্বপ্ন বাংলাদেশেও ‘তালেবানি শাসন’ কায়েম হবে। মধ্যপন্থীরা, বাংলাদেশে বিভ্রান্তির ঘর দরজা তৈরি করতে চাইছে খুব কৌশলে। এজন্য তারা স্যুট-টাই পরা কিছু এজেন্টও নিয়োগ করেছে মোটা অঙ্কের মাসোহারা দিয়ে। যেসব তাত্ত্বিক সময়ে-সুযোগে জাতীয় সঙ্গীত, রাষ্ট্রীয় ভাস্কর্য, মহান মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালির জাতিসত্তার চেতনা, বাঙালি সংস্কৃতির শিকড় প্রভৃতির বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে। নগ্ন মিথ্যাচার করছে। তারা প্রজন্মকে উপদেশবাণী শোনাচ্ছে- ‘নিরপেক্ষ’ ব্যক্তিদের কাছ থেকে সঠিক ইতিহাস জানার। এই ‘নিরপেক্ষ’ ব্যক্তিগুলো কারা? একাত্তরে কোনো দেশপ্রেমিক বাঙালিই নিরপেক্ষ ছিলেন না। ছিলেন জন্মমাটির পক্ষে। আর বিপক্ষে ছিল আলবদর, রাজাকার ও আল-শামসরা। এই নিরপেক্ষতার ধুয়া যারা তুলতে চায় এরাও রাজাকারের উত্তরসূরি, বিষয়টি প্রজন্মকে মনে রাখতে হবে।
 
মনে রাখতে হবে আমরা যদি আমাদের জাতিসত্তার প্রতি অনুগত না হই, তবে গোটা রাষ্ট্র-সমাজ-রাজনীতি মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। যারা এর আগে আলবদর-রাজাকারদের মন্ত্রী বানিয়ে এদেশে কায়েমি শাসন চেয়েছিলেন, আজো তাদের গরজ খুব বেশি থাকবে তা আশা করা যায় না। এগিয়ে আসতে হবে এদেশের মুক্তিসংগ্রামের পক্ষের প্রজন্মকে। আর যারা ক্ষমতায় আছেন- তাদের সবিনয়ে বলি, একটু বিবেচনা খাটিয়ে শেষ সময়টুকু শাসন করুন। কারণ এ দেশে তালেবানি আগ্রাসন চায় না বর্তমান প্রজন্ম। আর সেই দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালনের জন্যই তো আপনাদের ক্ষমতায় বসানো হয়েছিল। বর্তমান প্রজন্ম বাংলাদেশের জাতিসত্তার বিকিরণ চায়। আর মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তাদের জন্য পাথেয় হয়েই আছে।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে