Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ , ৮ ফাল্গুন ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.6/5 (8 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১১-১০-২০১২

দ্বিতীয় মেয়াদে বারাক ওবামা ও আগামী চার বছর

ফকির ইলিয়াস



	দ্বিতীয় মেয়াদে বারাক ওবামা ও আগামী চার বছর

এবিসি চ্যানেলে বিশিষ্ট সাংবাদিক বারবারা ওয়ালটারসের বক্তব্য শুনছিলাম। তিনি বললেন, মিট রমনির রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেলো। এখন তার গন্তব্য হয়তো অবসরে যাওয়া। না হয়, ছেলেদের ব্যবসা-বাণিজ্য দেখাশোনা করা। ৬ নভেম্বর রাতের আমেরিকান টিভি এভাবেই জানিয়ে দিলো ২৯০ ইলেকটোরাল ভোট পেয়ে পাস করেছেন দ্বিতীয় টার্মে বারাক ওবামা। ফাইনাল হিসাবে এই আসন সংখ্যা আরো বাড়বে। খুব শঙ্কা ছিল। কিন্তু সব শঙ্কা অতিক্রম করে ওবামাই হয়ে গেলেন আমেরিকার আগামী চার বছরের প্রেসিডেন্ট আর বিশ্বের নিয়ন্ত্রক। ওবামা পাস করবেন এ প্রত্যাশা ছিল সিংহভাগ সাধারণ মানুষের। কিন্তু ভয় ছিল ইলেকটোরাল ভোটগুলোকে।

 
স্যান্ডির ধকল সইছে আমেরিকা। আমি ৬ নভেম্বর মঙ্গলবার রাত সোয়া ৮টায় যখন ভোটকেন্দ্রে গেলাম তখন দেখলাম অনেক লম্বা লাইন। নতুন ব্যালট পদ্ধতিতে ভোট দিলাম। ব্যালট পেপার নিয়ে বুথে গিয়ে মার্ক দিতে হয়। তারপর মেশিনে ঢুকিয়ে দিলেই মেশিন স্ক্যান করে নেয়। রেজাল্ট এড হয়ে যায় তাৎক্ষণিক। আমি আপাদমস্তক ডেমোক্র্যাট। তাই আমার দলের সবাইকেই ভোট দিলাম বিনা দ্বিধায়। সুপারস্ট্রম ‘স্যান্ডি’ যে ধকল বইয়ে দিয়ে গেছেÑ তার রেশ টেনে উঠে দাঁড়াচ্ছে আমেরিকা। সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। উত্তাপ অনেকটা চুপসে গিয়েছিল হ্যারিকেনের কারণে। প্রেসিডেন্ট নিউজার্সি এসেছিলেন। বলেছেন যে কোনো দরকারে আপানারা ওয়াশিংটনে ফোন করবেন। আমরা সকল সাহায্য করতে প্রস্তুত।
 
বারাক ওবামার এ প্রচেষ্টা ফলও দিতে শুরু করেছিল তৎক্ষণিক। রিপাবলিকান শিবির থেকে এই তৎপরতার ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে। নিউজার্সি অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান গভর্নর ক্রিস ক্রিস্টি বরাবরই প্রেসিডেন্টের তীব্র সমালোচক। রিপাবলিকান ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের সংক্ষিপ্ত তালিকায়ও তার নাম ছিল। তবে ঝড়-পরবর্তী ওবামার তৎপরতা মত পরিবর্তনে বাধ্য করেছে তাকে। তিনি বলেছেন, ‘প্র্রেসিডেন্ট সব সময়ই আমাদের সঙ্গে ছিলেন। প্রশংসার যোগ্য দাবিদার তিনি। প্রেসিডেন্ট ও তার প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করা আমার জন্য দারুণ অভিজ্ঞতা।’ ওবামা ও ক্রিস্টির এ সহাবস্থান নিকট অতীতের আরেকটি ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে আমেরিকানদের। ২০০৫ সালে ক্যাটরিনা আঘাত হানলে ঝড়-পরবর্তী সরকারি তৎপরতা নিয়ে তিক্ত বাগ্বিত-ায় জড়িয়ে পড়েন তৎকালীন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ জুনিয়র এবং লুইজিয়ানার ডেমোক্র্যাট গভর্নর ক্যাথলিন ব্ল্যাঙ্কো। ওই সময় সংবাদ শিরোনামে পরিণত হয়েছিলেন তারা। অথচ নিউজার্সিতে তেমনটি হয়নি। এটা ছিল ওবামার জন্য ইতিবাচক দিক।
 
প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় স্যান্ডি চলে গেলেও এখনো ভয়াবহ জের রয়ে গেছে। এ পর্যন্ত শতাধিক জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। এ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। অর্থনীতিবিদরা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় চার হাজার ৫০০ কোটি (৪৫ বিলিয়ন) ডলার হবে বলে ধারণা করছেন। এ অংকও বাড়তে পারে। হ্যারিকেন স্যান্ডির তা-ব বর্তমান প্রেসিডেন্ট ওবামাকে দিয়েছে শেষ মুহূর্তে তার সরকারের কার্যকারিতা প্রমাণ করার সুযোগ। আর সেই সুযোগের ফায়দা তুলে তিনি দেখাতে পারেন দুর্যোগ মোকাবেলায় তার সরকারের তৎপরতা। এটা বলছেন বিশ্লেষকরা। যে বিষয়টা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী মিট রমনি প্রায়ই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে এসেছেন। এ মুহূর্তে ওবামা প্রশাসনের তৎপরতা হয়তো মার্কিন ভোটারদের মনে একটা তাৎক্ষণিক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
 
এমনিতেই আমেরিকার অর্থনীতি বেশ ভঙ্গুর সময় অতিক্রম করছিল। রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় মন্দা এখনো লেগে আছে। বেকারত্বের হার তুঙ্গে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মন্দা ক্রমশ চরমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় ধস নামার পর স্টক মার্কেটেও বিপর্যয় ওঠানামা করছিল। সব মিলিয়ে এক বিপন্ন সময় অতিক্রম করছে যুক্তরাষ্ট্র। এই অবস্থা শুরু হয় জর্জ বুশের শাসনকাল শেষ হওয়ার কিছুদিন আগে। এই চরম সংকটাপন্ন অবস্থা আরো বিষিয়ে তুলেছে নাগরিক জীবন। রাজনীতিতে মুখ্য আলোচনার বিষয় ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মন্দার ঘটনা। তাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ‘স্যান্ডি’। ডেমোক্রেটিক প্রার্থী প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, বুশ প্রশাসনের চরম ক্রান্তিকালের ধকল আমাকে কাটিয়ে উঠতে হচ্ছে। তার শাসনের ৮ বছর গোটা জাতিকে কয়েক যুগ পিছিয়ে দিয়েছে। বুশ প্রশাসন কখনই ভোক্তাদের স্বার্থরক্ষা করেনি। মধ্যশ্রেণীর জনজীবনের দিকে তাদের কোনো নজরই ছিল না। ফলে এখন আমরা এমন ঘোর সংকটে নিপতিত হয়েছি। রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মিট রমনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ভিত মজবুত করতে আমার পরিকল্পনার বিকল্প নেই।
 
এখন আমরা খুব ‘ডিফিকাল্ট টাইম’ অতিক্রম করছি। আমি প্রতিজ্ঞা করছি, আমরা কখনই জাতিকে আর এই দুঃসময়ের মুখোমুখি হতে দেবো না। আমরা ওয়াল স্ট্রিটের রমরমা অবস্থা দ্রুত ফিরিয়ে আনবো। বাড়িয়ে দেবো কর্মসংস্থান। রমনি এখন মনোযোগ দিচ্ছেন হ্যারিকেনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সাহায্যার্থে অর্থ সংগ্রহের দিকে। এরই মধ্যে প্রেসিডেন্ট ওবামার পাশাপাশি তিনিও যোগ দিয়েছেন রেডক্রসের অনুদান সংগ্রহ প্রকল্পে। হ্যারিকেন স্যান্ডির মুখে পড়া এলাকার মানুষের প্রতি সমবেদনাও জানিয়েছেন রমনি। তবে নির্বাচনী প্রচারণার শেষ সপ্তাহে প্রাকৃতিক এই দুর্যোগের কারণে রমনি অনেকখানিই আলোচনার বাইরে চলে গিয়েছিলেন। অনেক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ বলেছেন রমনি খেটে খাওয়া মানুষদের চটিয়ে রেখেছেন অনেক কথা বলে।
 
জর্জ বুশের শাসনের পর আমেরিকানরা অবসান চেয়েছিলেন রিপাবলিকান যুগের। জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে বারাক ওবামা এগিয়ে থাকলেও ইলেকটোরাল ভোট দিয়ে রমনিকে জিতিয়ে আনা হয় কিনা সেটাও প্রশ্ন ছিল জোরেশোরে।
 
আমাদের মনে আছে, একজন কৃষ্ণাঙ্গকে হোয়াইট হাউসের অধিকর্তা হিসেবে দেখতে মার্কিনি জাতি কতোটা প্রস্তুত আছে, সে প্রশ্ন বারবার করছিলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সেই আগল ভেঙে ওবামা প্রেসিডেন্ট হন। তিনি বলেছিলেন- আমরা পরিবর্তন আনবোই। তিনি গেলো চার বছরে কী পরিবর্তন এনেছেন, সেই প্রশ্ন তুলে বারাক ওবামার মূল ভোটের পুঁজিতে হানা দেয়ারও সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন মিট রমনি। আগেই জরিপে দেখা গেছে ইলেকটোরাল কলেজের ২৩৭ ভোট পেতে পারেন ওবামা। ২০৬টি পেতে পারেন রমনি। আর বাকি ৯৫ ভোটের জন্যই হবে তুমুল লড়াই। শেষ পর্যন্ত দেখা গেলো ওবামার পাল্লাই ভারী হলো। এটা সকলেই জানেন, যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ ভোটারদের দেয়া ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন না। এখানে বিভিন্ন রাজ্যের ভোটে নির্ধারিত হন কে হবেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। বিভিন্ন রাজ্যের গুরুত্ব আলাদা। ওহাইয়ো এবং ফ্লোরিডা তেমনই গুরুত্বপূর্ণ দুটি রাজ্য। আজ পর্যন্ত কোনো রিপাবলিকান প্রার্থীর ওহাইয়োতে না জিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার নজির নেই।
 
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, ইরাক-আফগান ইস্যু, স্বাস্থ্যনীতির উন্নয়ন, শিক্ষা উন্নয়ন, গোয়েন্দা শক্তি বৃদ্ধি প্রভৃতি ইস্যুতে বারাক ওবামা জনপ্রিয়তায় এগিয়ে আছেন। অন্যদিকে সন্ত্রাস দমন, স্বদেশের স্বার্থরক্ষা, অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব প্রভৃতি ইস্যুতে জনপ্রিয়তা পাবার চেষ্টা করেছেন মিট রমনি। দেশব্যাপী জরিপে এই মুহূর্তে ওবামা
 
৫৯ ভাগ এবং রমনি ৪৭ ভাগ জনপ্রিয়তা পেয়ে এগিয়ে ছিলেন। তবে তা প্রায় প্রতিদিন ওঠানামা করেছে। পাকিস্তানে যুদ্ধ শুরুর হুমকি, ইরানে আক্রমণ পরিচালনার অভিলাষ বারবারই নিন্দিত হচ্ছে। বিশেষ করে মার্কিনি জনজীবনে রিসেশনের রাহুগ্রাস, এই প্রজন্মকে রিপাবলিকানদের প্রতি আরো ঘৃণাপ্রবণ করে তুলেছে। আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি কেমন হবে, কোন প্রার্থী এই মন্দাপীড়িত অর্থনীতি চাঙ্গা করতে অধিক যোগ্য হবেন, কে অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমেরিকার সুদিন ফিরিয়ে আনতে পারবেন অথবা কার অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নতুন নতুন জব সৃষ্টি করতে পারবেন ভোটারদের কাছে- আপাতত এটাই বড় বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আর এ ক্ষেত্রে নিজেদের যোগ্য প্রমাণিত করতে গিয়ে ডেমোক্র্যাট ওবামা আর রিপাবলিকান মিট রমনি প্রতিদিনই জড়িয়ে পড়ছেন নতুন নতুন বিতর্কে। সবশেষ কথা হচ্ছে, রিপাবলিকানরা ক্ষমতায় এলেই আরেকটা নতুন যুদ্ধ বাধতে পারে। প্রজন্ম আর যুদ্ধ চাইছে না। তাই এবারো তারা ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বেছে নেবে- এই প্রত্যাশার ভিত খুব শক্ত ছিল। বিজয়ের খবরের পর বারাক ওবামা ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, এ বিজয় কেবল ভাগ্যের জোরে নয়, এটি কোনো দুর্ঘটনাও নয়। আপনারাই এ জয়ের নায়ক। মনুষের প্রতি তার এই যে বিশ্বাস এর প্রতিদান দিতে হবে বারাক ওবামাকেই। কারণ মানুষ শান্তির জন্যই তাকে আবার চার বছর সময় দিয়েছে। যুদ্ধ নয়, মতৈক্যের মাধ্যমেই সকল সমস্যার সমাধান করতে হবে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে। আগামী চার বছর বিশ্বমানবের জন্য শান্তিময় হোক। প্রেসিডেন্ট ওবামা, আপনাকে শুভেচ্ছা।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে