Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২০ , ২৬ আষাঢ় ১৪২৭

গড় রেটিং: 3.0/5 (44 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১১-০৭-২০১২

এই সন্ত্রাস এই নাশকতা রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ

পীর হাবিবুর রহমান



	এই সন্ত্রাস এই নাশকতা রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ

এই সন্ত্রাস এই নাশকতা রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ। গত কদিন ধরেই জামায়াত-শিবির রণমূর্তি নিয়ে মাঠে নেমেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছে। পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশনে পুলিশের হাতে মারমুখী জামায়াত-শিবির কর্মীদের গ্রেফতার হতেই দেখা যায়নি, দেখা গেছে কীভাবে পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। কোথাও কোথাও জামায়াতের হামলার মুখে পুলিশের দৌড়ে পালানোর দৃশ্য ধরা পড়েছে ফটো সাংবাদিকদের ক্যামেরায়। ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসের আগে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জামায়াতের শীর্ষ চার নেতার বিচার সম্পন্ন হচ্ছে। এমন খবরে জামায়াত-শিবির তাদের পুরনো স্টাইলে আবিভর্ূত হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থা আগাম রিপোর্ট দিয়েছিল যে বিজয় দিবসের আগেই জামায়াত-শিবির নাশকতায় লিপ্ত হতে পারে বিচার বানচালের জন্য। প্রশ্ন উঠতে পারে, পুলিশ এত সতর্ক হওয়ার পরও কেমন করে জামায়াত-শিবির সারা দেশে ব্যাপক সংঘর্ষে লিপ্ত হতে পারল? যে পুলিশ প্রধান বিরোধী দল বিএনপির কর্মীদের রাস্তায় নামতে দেয় না, সংসদে বিরোধী দলের চিফ হুইপকে পিটিয়ে ঘরে উঠিয়ে দেয়; সেই পুলিশ রাজপথে মারমুখী শিবির কর্মীদের সামনে ছিল অসহায়।

 
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার নির্বাচনে যেসব ইস্যুতে গণরায় নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে তার অন্যতম ছিল যুদ্ধাপরাধ বিচারের ইস্যুটি। দেশবাসী চেয়েছে এই অমীমাংসিত ইস্যুর সমাধান হোক। দেশের তরুণরা ব্যালটবিপ্লবে দিন বদলের সনদের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধাপরাধের বিচার মাথায় নিয়ে গণরায় দিয়েছে। যুদ্ধাপরাধের বিচার একটি জাতির গণতান্ত্রিক শক্তির দীর্ঘ দিনের সংগ্রামের ফসল। এত দিন মানুষ প্রশ্ন তুলেছে বিচার এত বিলম্ব কেন? ট্রাইব্যুনাল করছেটা কী? আজ যখন বিচারের রায় দোরগোড়ায় তখন বেপরোয়া জামায়াতের তাণ্ডবের মুখে তারা যেন নীরব!
 
আমাদের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তস্নাত অহঙ্কার। সেদিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তার এ-দেশীয় দোসররা নিরস্ত্র বাঙালি জাতির ওপর আক্রমণই চালায়নি, নৃশংস হত্যাকাণ্ডও ঘটিয়েছে। সেদিনের হানাদার বাহিনী ও তার দোসরদের অন্যতম জামায়াত এবং তাদের তৎকালীন ছাত্র সংগঠন ছাত্রসংঘ নানা বাহিনী গঠন করে মুক্তিকামী বাঙালির ঘরবাড়ি লুণ্ঠন করেছে, পুড়িয়ে দিয়েছে। আমাদের কুলবধূরা, বোনেরা, মায়েরা সেদিন অসহায়ের মতো বর্বর হানাদারদের কাছে সতীত্ব হারিয়ে জীবন নিঃশেষ করেছে। আমরা কি কল্পনায় সেই মানবতাবিরোধী জঘন্য অপরাধের চিত্র ক্যানভাসে এঁকে দেখতে পারি? তারা কতটা ভয়ঙ্কর ছিল? সে কথা কি ভুলে যেতে পারি? মায়ের বুক থেকে সন্তানকে কেড়ে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। অবুঝ সন্তানের কান্না উপেক্ষা করে তার মাকে তুলে নেওয়া হয়েছে। পিতার কাছ থেকে কন্যাকে তুলে নিয়ে আটকে রেখে পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। হানাদার বাহিনীর হাতে আটক মুক্তিযোদ্ধাদের কি অমানবিক, অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়েই না হত্যা করা হয়েছে। সেদিন শান্তির ধর্ম ইসলামের নামে, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির নামে ধর্মব্যবসায়ীরা হানাদার বাহিনীর দালালিই করেনি, তাদের সঙ্গে অস্ত্র নিয়ে আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। ওরা আলবদর, আলশামস, রাজাকার। ওরা পাক হানাদার বাহিনীর সহযোগী হয়ে অতি উৎসাহের সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর বাড়িঘর চিনিয়ে দিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের ধরিয়ে দিয়েছে। ওরা গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে। হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, নারী ও শিশু হত্যাকে সেদিন উল্লসিত নয়নে সমর্থন জুগিয়েছে, ভূমিকা রেখেছে। যারা মানবতার বিরুদ্ধে প্রকৃত অপরাধ করেছে আজ তাদের বিচার চাইছে বাংলাদেশ। ৩০ লাখ শহীদের আত্দা ৪০ বছর ধরে ক্রন্দন করছে হানাদার বাহিনীর দোসরদের বিচারের জন্য। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের গণতন্ত্রের সংগ্রামে সাহসী মিছিল থেকে বার বার এই বিচারের ডাক এসেছে। জাতিকে মেধাশূন্য করতে বিজয়ের লগ্নে দেশের বুদ্ধিজীবীদের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে হানাদার বাহিনীর হাতে যারা তুলে দিয়েছিল তারাও এ দেশের সন্তান। তবুও তারা সেদিন বাংলাদেশ চায়নি। তারা হানাদার বাহিনীর হয়ে পাকিস্তানের জন্য লড়েছে। বীর বাঙালিদের কবর দেওয়ার স্বপ্নে তারা ধর্মের নামে লড়েছে। সেই যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে আজ জামায়াত-শিবির লড়ছে। এই শক্তি অশুভ শক্তি। এই শক্তি এক দিনে মাথা তুলে দাঁড়ায়নি। স্বাধীনতা-উত্তর বাহাত্তরের সংবিধান এদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করে দিলে সেনা শাসকরাই তাদের পুনর্বাসিত করেছিলেন। পরবর্তীতে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি আশ্রয়, ছায়া ও বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছিল। অন্যদিকে জামায়াতের জনরায় নিয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার অর্জন ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের গণতান্ত্রিক শক্তির রাজনৈতিক ব্যর্থতা। অপর দিকে সেই ধারাবাহিকতায় '৯৪ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আওয়ামী লীগের মতো মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলের জামায়াতকে আন্দোলনের সঙ্গে টানা, সংসদের ভেতরে-বাইরে বৈঠক করা ছিল বিস্ময়কর ঘটনা। এ ঘটনা রাজনীতিতে জামায়াতকে জাতে উঠিয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় ২০০১ সালের নির্বাচনে আগে 'একাত্তর' প্রশ্নে সবচেয়ে বিতর্কিত অভিযুক্ত জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযমকে পাশে নিয়ে বিএনপির এক মঞ্চ থেকে জোট গঠন, আন্দোলন, নির্বাচন ও পরবর্তীতে সরকার গঠনই নয় নিজামী-মুজাহিদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দেওয়ার ঘটনা ছিল দুঃখজনক। ক্ষমতার রাজনীতিতে কৌশল শব্দের প্রয়োগ ঘটিয়ে আদর্শহীন রাজনীতির অন্ধকার পথে জামায়াতের সঙ্গে দিনরাতের সমঝোতার খেলা অনেকেই খেলেছেন। জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবির এই সুযোগে বার বার অস্ত্রনির্ভর রাজনীতির পথে রগ কাটা নৃশংসতা দেখিয়ে শিক্ষাঙ্গনে স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হয়েছে। ছাত্রশিবির শিক্ষাঙ্গনে এক ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসের প্রতীকী রূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে বার বার। সম্প্রতি একদিকে সরকারের দমন-পীড়ন অন্যদিকে জামায়াতের জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিএনপিকে নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে সরে থাকা, যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রশ্নে বিরোধী অবস্থানে না যাওয়া এবং সর্বশেষ ভারত সফর করে বাংলাদেশের মাটি ভবিষ্যতে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ব্যবহারের সুযোগ না দেওয়ার অঙ্গীকার করে সেখানকার আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে দেশে ফেরায় জামায়াত-শিবির সর্বশক্তি দিয়ে মাঠে নেমে শুধু বিচার বানচালের হুমকিই নয়, বিএনপিকেও তাদের শক্তি প্রদর্শন করে দেখিয়েছে।
 
স্বাধীনতা-উত্তর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিকে যে দুটি ধারা অস্থির অশান্ত করেছে বার বার তার একটি উগ্রপন্থি, অতি বাম অন্যটি দক্ষিণপন্থি জামায়াত। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে এসব বাম-ডানের বোঝা কাঁধে না নিয়ে নিজ শক্তিতে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক চেতনায় রাজনীতিতে হাঁটা উচিত। ভোটের লড়াইয়ে নিঃস্ব বাম ও ভোটারবিহীন অস্ত্রনির্ভর ডানদের বাদ দিয়ে জনগণের শক্তিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সংসদীয় রাজনীতির পতাকা ঊধের্্ব তুলে ধরে না হাঁটলে রাজনীতিতে জনসমর্থনহারা বামের বড় কথা ও ডানের দাপট শেষ হবে না।
 
জামায়াত নিষিদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দল নয়। জামায়াতের স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর বাধানিষেধ, দমন-পীড়ন, দলীয় কার্যালয় বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা থেকে সরকারকে সরে আসা উচিত। কারণ সংসদীয় গণতন্ত্রের সাংবিধানিক বা আইনগতভাবে জামায়াত যতক্ষণ বেআইনি দল হিসেবে নিষিদ্ধ না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, সভা-সমাবেশের অধিকার খর্ব করার সুযোগ গণতান্ত্রিক সরকারের নেই। জামায়াত-শিবিরের যারা অস্ত্রনির্ভর রাজনীতি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সরকারের দায়িত্ব। অন্যথায় গণতান্ত্রিক সমাজে সরকারের অগণতান্ত্রিক পুলিশি আচরণ তাদের বিপথে ঠেলে দিতে পারে। কোনো রাজনৈতিক শক্তির অন্ধকার পথ গ্রহণ অতীতে যেমন সুখকর হয়নি তেমনি ভবিষ্যতেও হবে না।
 
জামায়াত-শিবিরের স্বাধীনতা-উত্তর প্রজন্ম যাদের মুক্তিযুদ্ধে কোনো ভূমিকা নেই বা সে সময় এ দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না তাদেরও উপলব্ধি করতে হবে সন্ত্রাস, নাশকতা, রগ কাটা, মুক্তিযুদ্ধের ৪০ বছর পর এসেও স্বাধীনতাসংগ্রামে ভূমিকার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা না চাওয়া এবং স্বাধীনতাবিরোধী চেতনা জামায়াতকে দিন দিন জনবিচ্ছিন্ন থেকে গণ-অসন্তোষের মুখেই ঠেলে দিয়েছে। ভোটের বাজার করুণ। ব্যবসা-বাণিজ্যে উন্নতি হলেও সামাজিকভাবে মানুষের কাছে নিগৃহীত। '৭১-এ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর হিসেবে যারা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে, মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে তাদের দায় আজকের প্রজন্ম নেবে কেন? বিচারের রায় আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেই সবার মেনে নেওয়া উচিত। বিচার বানচাল বা অভিযুক্তদের কাঠগড়া থেকে রক্ষায় রাজপথে নেমে সহিংসতায় লিপ্ত হলে সরকার যেমন কঠোর পদক্ষেপ নেবে তেমনি জনগণও বিক্ষুব্ধ হয়ে রুখে দাঁড়াবে। জনবিচ্ছিন্ন হয়ে জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে রাজনীতির সুযোগ নেই। অতীতে যেমন লোকসান গুনতে হয়েছে ভবিষ্যতে চড়া মাশুল দিতে হতে পারে। যে কেউ ডাক দিতে পারে এই সন্ত্রাস এই নাশকতা রুখে দাঁড়াও। যুদ্ধাপরাধের বিচার আওয়ামী লীগের দাবি নয়, এ দাবি জনগণের। এই বিচার হতে হবে।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে