Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২০ , ২৯ আষাঢ় ১৪২৭

গড় রেটিং: 3.0/5 (52 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১১-০৪-২০১২

আওয়ামী লীগই শেখ হাসিনার চ্যালেঞ্জ

পীর হাবিবুর রহমান



	আওয়ামী লীগই শেখ হাসিনার চ্যালেঞ্জ

সরকারের সাড়ে তিন বছরের মাথায় এসে আগামী দিনের রাজনীতি ও নির্বাচন প্রশ্নে আওয়ামী লীগই এখন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। দলের অভ্যন্তরে তো বটেই, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের সামনেও ২৯ ডিসেম্বরের আসন্ন কাউন্সিল নানামুখী চিন্তা ও ভাবনার খোরাক জুগিয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তো বটেই, উপমহাদেশেও ভারতের কংগ্রেসের পর আওয়ামী লীগই ঐতিহ্যবাহী এক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের নাম। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই মুসলিম লীগের গণবিরোধী কর্মকাণ্ডে নিশ্চিত হয়ে যান তাদের দিন ফুরিয়ে এসেছে। তার এ মূল্যায়ন ও উপলব্ধি অসমাপ্ত আত্দজীবনীতে ফুটে উঠেছে এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ের মাধ্যমে মুসলিম লীগের কবর রচিতই হয়নি, দূরদর্শী মুজিবের সংগ্রামের বিজয়ও সূচিত হয়েছে। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও শামসুল হক দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক হলেও শেখ মুজিবুর রহমানের সাংগঠনিক দক্ষতা ও নেতৃত্বেই শত বাধা, বিপত্তি ও শাসকদের আঘাতের মুখেও আওয়ামী লীগ নামের দলটি তৃণমূল বিস্তৃত গণমুখী সংগঠনে পরিণত হয়েছিল। মুসলিম লীগ যেখানে নবাব বাহাদুরদের সংগঠনে পরিণত হয়ে ক্ষয়ে গিয়েছিল সেখানে শেখ মুজিব মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের রাজনৈতিক সচেতন কর্মীদের নিয়ে আওয়ামী লীগকে এক শক্তিশালী সংগঠনে পরিণত করেছিলেন। সংগঠনের মূল শক্তি ছিল কর্মীদের আদর্শবোধ। ত্যাগের মহিমা। সাধারণ জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হয়ে মানুষের সঙ্গে চলাফেরা করার ক্ষমতা। মানুষের সঙ্গে একাত্দ হয়ে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে স্বাধীনতার সংগ্রামে গণমানুষকে সম্পৃক্ত করে পথ হাঁটা। ছাত্রলীগ নামের ঐতিহ্যবাহী সংগঠনটি ছিল আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবের রাজনীতির প্রাণশক্তি। ভাসানী চলে গেছেন সমাজতন্ত্রের পথে ন্যাপ নিয়ে। শেখ মুজিবের রাজনীতির শিক্ষক হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর আকস্মিক রহস্যজনক মৃত্যু এ দলটিকে স্তব্ধ করতে পারেনি। শেখ মুজিবই নতুন করে সংগঠিত করেছেন। ছয় দফা নিয়ে তার স্বাধিকারের সংগ্রাম স্বাধীনতার পথে টেনে নিয়েছে জাতিকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সত্তরের গণরায় নিয়ে সেই ৭ মার্চে জাতিকে এক সুতোয় বেঁধে স্বাধীনতার ডাক দিয়ে গোটা বাংলাকে উত্তাল করেছিলেন। স্বাধীনতা-উত্তরকালে আওয়ামী লীগের ছায়ায় ঠাঁই নেওয়া এক দল সুবিধাবাদী ও কিছু নেতা-কর্মীর চরিত্র খোয়ানো আস্ফালন, দুর্নীতি, যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুকে অসহায় করে দেয়। শক্তিহীন করে দেয়। অন্যদিকে অতি বিপ্লবী উগ্রপন্থিদের নাশকতা, হটকারিতা পরিস্থিতিকে টালমাটাল করে দেয়। সেই ষাটের দুঃসময়ে যারা বঙ্গবন্ধুকে সিআইয়ের দালাল, মূর্খ ও ছয় দফাকে সিআইয়ের দলিল বলেছেন কিংবা যারা ভারতের চর বলে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন তাদের সঙ্গেও লড়ে জাতির জনক শেখ মুজিব তার লক্ষ্য অর্জন করেছেন।

 
কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তরকালে সেই বামপন্থিরা যেমন বঙ্গবন্ধুর চামড়া দিয়ে ঢোল, হাড্ডি দিয়ে ডুগডুগি বাজানোর ঔদ্ধত্য দেখিয়েছে, উদার গণতন্ত্রী শেখ মুজিব উগ্রপন্থি ও তার সরকারকে উৎখাতকারীদের সঙ্গে তাদের ক্ষমা করে দিলেও এই মস্কোপন্থিরাই কার্যকর বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন না করে স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বঙ্গবন্ধু ও তার সরকারের প্রতি নজিরবিহীন দাসত্ব দেখিয়েছে। কমিউনিস্ট পার্টির মতো সংগঠনের নাম মুছে দুনিয়ার কমিউনিস্ট রাজনীতিকে চমকে দিয়ে মস্কোর প্রেসক্রিপশনে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মহান নেতা বঙ্গবন্ধুকে তার সারা জীবনের সংগ্রামের দর্শন গণতন্ত্রের আলোকিত পথ থেকে সমাজতন্ত্রের একদলীয় অন্ধকার পথে টেনে নিয়ে গেছে। সে দিন সৈয়দ নজরুল ইসলামের বাসভবনে দলের ৩৪ জন সংসদ সদস্য মিলিত হয়ে এ পথ থেকে ফেরানোর কথা বললেও বঙ্গবন্ধুর সামনে বাকশাল বিশ্বাস না করেও কেউ দল ও দেশের স্বার্থে সত্য বলতে সাহস করেননি। একজন শেখ মুজিবের ছায়ায় উঠে আসা স্বাধীনতা সংগ্রামী নূরে আলম সিদ্দিকী বাকশালের বিরুদ্ধে না যেতে যুক্তি ও আবেগনির্ভর বক্তৃতায় সংসদে পিনপতন নীরবতা এনে তার নেতাকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। জেনারেল ওসমানী ও ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন সংসদ থেকে পদত্যাগ করলেও সেই অর্জনকে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সঙ্গে মুছে দিয়ে যান একজন খুনি মোশতাকের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা হয়ে ও অন্য জন খুনির দল ডেমোক্র্যাটিক লীগে যোগ দিয়ে জেল খেটে। নূরে আলম সিদ্দিকী পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর দীর্ঘ জেল খেটেছেন, আদর্শচ্যুত হননি। বঙ্গবন্ধুর চার সহচর কারাগারে জীবন দিয়েছেন, মাথা নত করেননি। এমনকি সারা দেশের নেতা-কর্মীরা রিমান্ড, নির্যাতন ও কারাজীবন ভোগ করেছেন। আজকের রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, মরহুম আবদুর রাজ্জাক, আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদসহ দলের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির নেতাদেরও জেলে নেওয়া হয়েছে। '৬৯-এর নায়ক তোফায়েলকে খুনিরা শারীরিকভাবে নির্যাতন করেছে, যা আইয়ুব সাহস করেননি। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ওপর সে কি নির্যাতন! যেন আজ আওয়ামী লীগও ভুলে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগারদের জন্য তখন জেলই ছিল ঠিকানা। যারা বাকশালে এসেছিলেন, যারা বঙ্গবন্ধুকে তখনকার দুই সুপার পাওয়ারের অন্যতম আমেরিকার রোষানলে ঠেলে দিয়েছিলেন, সেই কমিউনিস্টরা সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের খাল কাটা বিপ্লবে গেলেন।
 
মস্কোপন্থি বামদের কেউ কেউ সেনাশাসক জিয়ার অনুকম্পা নিয়ে '৭৯-এর সংসদে এলেন। সেদিন চারণের মতো অকাল বৈধব্যের শোক নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করতে সারা দেশ ঘুরেছেন সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন। মরহুম আবদুর রাজ্জাককে মধ্যমণি করে ত্যাগ ও আদর্শবাদের চেতনায় সারা দেশের মুজিব অন্তপ্রাণ তরুণরা কাদের-চুন্নুর নেতৃত্বে সেনাশাসক ও উগ্রপন্থিদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজসহ সারা দেশে ছাত্রলীগের নবজন্ম দেয়। তোফায়েল আহমেদের নাম আবদুর রাজ্জাকের পাশাপাশি উঠে আসে। মরহুম মিজানুর রহমান চৌধুরী, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, আমির হোসেন আমু, মোহাম্মদ হানিফ, মোজাফফর হোসেন পল্টু, হাসিম উদ্দিন হায়দার পাহাড়ি_ কে যাননি কারাগারে? কে নামেননি মাঠে? এ দলের রাজনীতিতে বার বার দুঃসময়ে সাহস জুগিয়েছে মোস্তফা মহসিন মন্টুর নাম। রাজ্জাক-তোফায়েলরা আওয়ামী লীগকে ঘুরে দাঁড় করিয়েছিলেন। আবদুল মালেক উকিল দলের সভাপতি হয়ে সংগ্রাম করেছেন।
 
বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা লাখ লাখ নেতা-কর্মীর আবেগ, অনুভূতি ও হৃদয়ে জায়গা নিয়ে ঐক্যের প্রতীক হয়ে স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে ১৯৮১ সালে দলের কাণ্ডারি হিসেবে দেশে ফিরে যে সংগ্রাম শুরু করেছিলেন সেই সংগ্রামের পথে বার বার দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের আঘাত এলেও তার নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় দফা শক্তিশালী সংগঠন হিসেবে জনগণের আস্থা নিয়ে দুই-দু'বার ক্ষমতায় এসেছে। ক্ষমতায় আসার এ সংগ্রামে '৯৪ সালের মেয়র নির্বাচনে ঢাকায় মোহাম্মদ হানিফ ও চট্টগ্রামে এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিজয় ছিল মাইলফলক। সেসব দিনে রাজপথে প্রতিবাদী গণমিছিলের প্রতীকী মুখ হয়েছিলেন মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া (বীরবিক্রম)। আওয়ামী লীগ রাজনীতির হৃৎপিণ্ড, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ রাজনীতির প্রাণ ছিলেন মায়া। দলের রাজনীতিতে মায়ার অবস্থান কেন বিবর্ণ? সারা দেশে এ ধরনের প্রতিবাদী দলীয় মিছিলের নেতৃত্ব যেন নির্বাসিত হয়ে গেছে। পঁচাত্তর-উত্তর দুঃসময়ে যারা ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সারা দেশে উঠে এসেছিলেন, আওয়ামী লীগ তাদের মাঠের রাজনীতিতে ধারণ করতে পূর্ণাঙ্গ সফলতা অর্জন করতে পারেনি। মন থেকে সারাজীবন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের গ্রহণ করতে পারেননি, নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেছেন সেই বামরা কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত কীভাবে জানি দলে প্রভাব বিস্তার করে ফেলছেন। তাদের ন্যাপ-কমিউনিস্ট বিলুপ্ত হওয়ায় মোসাহেবরা কোরাস গেয়ে দলে এসে ঠাঁই নেন। বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগে যারা জেলা সভাপতি ছিলেন, সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, এমপি ছিলেন তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অতি সাধারণ পরিবার থেকে এসেছিলেন হয় ওকালতি, না হয় স্কুল মাস্টারি অথবা গৃহস্থালি কিংবা ফুলটাইম রাজনৈতিক কর্মীর পরিচয় নিয়ে। রাজনীতিতে যেমন টাকার খেলা ছিল না তেমনি তাদের মাথায়ও রাজনীতি করে বিত্ত-বেসাত, প্রাচুর্যের প্রাসাদ গড়ার স্বপ্ন ছিল না। আওয়ামী লীগ যেখানে বার বার সেনাশাসকদের ছায়ায় জন্ম নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি মূল্যবোধহীন অবক্ষয়ের রাজনীতির লালন-পালন ও দুর্নীতির অভিযোগ এনেছে সেখানে নিজেরাই যখন মনোনয়নবাণিজ্য, কখনো-সখনো কমিটিবাণিজ্য কিংবা মন্ত্রী-এমপিরা দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, পরিবারপ্রীতি ও বিলাসিতায় আচ্ছন্ন হয়ে যান তখন তার রং ধূসর বর্ণ নেয়। আওয়ামী লীগ নামের চিরসবুজ দলটি গণমুখী চরিত্র হারিয়ে গণবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ নামের দলটি শক্তিহীন হয়ে পড়লে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শোষণমুক্ত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন দুর্বল হয়ে যায়, তেমনি জনগণেরও রাজনীতির প্রতি, রাজনীতিবিদদের প্রতি আস্থা হারিয়ে যায়। আর তখনই অশুভ শক্তি আঘাত হানতে সুবিধা পায়। গণতান্ত্রিক ধারা হোঁচট খায়। আওয়ামী লীগ রাজনীতি যদি হয় নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে আদর্শনির্ভর, যদি হয় ব্যবসায়ী ও কমিউনিস্ট প্রভাবমুক্ত আওয়ামী লীগ দ্বারা সুসংগঠিত, তাহলে এ দল তার গণমুখী চরিত্রের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য ফিরে পাবে। কথায় আছে, আওয়ামী লীগ হয়ে জন্মাতে হয়, আওয়ামী লীগ হওয়া যায় না_ এই নীতিতেই কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত ছাত্রলীগের রাজনীতি থেকে উঠে আসা কিংবা আওয়ামী লীগ দিয়ে রাজনীতিতে অভিষিক্ত হওয়া গ্রহণযোগ্য আদর্শবান নেতা-কর্মীদের দিয়েই দলকে ঢেলে সাজানোর চ্যালেঞ্জ সামনে শেখ হাসিনার ওপর। এমনকি ভবিষ্যতে শেখ হাসিনার ছায়ায় দলের উত্তরাধিকারিত্ব নিয়ে বঙ্গবন্ধু পরিবারের কেউ যদি হাল ধরতে আসেন, তাহলে চাই পায়ের নিচে শক্ত মাটি। অর্থাৎ শক্তিশালী আওয়ামী লীগ।
 
বঙ্গবন্ধুকন্যা কাণ্ডারি হিসেবে যেদিন দলের দায়িত্ব নিয়ে এসেছিলেন সেদিন ভাইয়ের হৃদয় নিয়ে আদর্শিক নেতা-কর্মীরা তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তারা সুবিধাবাদী ছিলেন না। তারা আশ্রিত হওয়ার সুযোগে বেনিফিসিয়ারি ছিলেন না। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিশাল গণরায় নিয়ে ওয়ান-ইলেভেনের শিক্ষায়ই হোক আর এঙ্পেরিমেন্টের কারণেই হোক যে মন্ত্রিসভা শেখ হাসিনা উপহার দিয়েছিলেন তা দেশ ও দলের জন্য সুখকর হয়নি। অচেনা মন্ত্রীদের সঙ্গে সাড়ে তিন বছরে দলের যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে তা '৯৬ সালের শেখ হাসিনার শাসনামলে হয়নি। সেবার যেমন ছিল দল ও সরকারের সমন্বয়, তেমনি মন্ত্রীরা ছিলেন কর্মীদের দীর্ঘ পথচলায় সামনে পাওয়া মুখ। সেই মন্ত্রীদের সঙ্গে সারা দেশের নেতা-কর্মীদের যোগাযোগ ছিল। সেবার শুরুতে যেমন মন্ত্রিসভা শক্তিশালী ছিল তেমনি পরবর্তীতে মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দেওয়া আমির হোসেন আমু, আবদুল জলিল ও শেখ ফজলুল করিম সেলিম ছিলেন সফল। আবদুস সামাদ আজাদ, জিল্লুর রহমান, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, আমির হোসেন আমু, মরহুম আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, মো?হাম্মদ নাসিমসহ সব মন্ত্রী যেমন ছিলেন সফল, তেমনি দলীয় কর্মকাণ্ডে ছিলেন সচল। সরকার ও দলের সমন্বয় ছিল স্মরণ করার মতো। সেবার শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রিত্বের আসনে প্রথমবার বসেই পার্বত্য শান্তিচুক্তিই নয়, '৯৮ সালের বন্যা মোকাবিলা ও জাতীয় দিবসে নেলসন ম্যান্ডেলা, ইয়াসির আরাফাত, সোলেমান ডেমিরেলের মতো ইতিহাসজয়ী আন্তর্জাতিক তারকাদের ছাড়াও মার্কিন রাষ্ট্রপতি বিল ক্লিনটনকে ঢাকায় এনে প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। পাক-ভারত পারমাণবিক মহড়ার মনস্তাত্তি্বক দ্বন্দ্বের মুখে শান্তির উদ্যোগ নিয়ে দুই দেশের সরকারপ্রধানদের বৈঠকও করিয়েছিলেন। অনেকে বলবেন, এত সাফল্যের পরও ২০০১ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় ফিরতে পারেননি শেখ হাসিনা। কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতিতে এ দেশে এক সরকার দ্বিতীয়বার আসার নজির এখনো হয়নি। অন্যদিকে সেই হিসাব আলাদা।
 
কিন্তু বিষয় যদি হয় দল ও রাজনীতি, তাহলে শেখ হাসিনা সেদিন ঠকেননি। আওয়ামী লীগ সরকার আজকের মতো এতটা কর্মীবিচ্ছিন্ন যেমন হয়নি, তেমনি আওয়ামী লীগ নামের দলটিও এত দুর্বলতা কুড়ায়নি। ২০০৮-এর পর মন্ত্রিসভা গঠন বাদ দিলেও ২০০৯ সালের ২৪ জুলাই অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ কাউন্সিল-উত্তর গঠিত ওয়ার্কিং কমিটি সাময়িকভাবে বাম আত্দাকে শয়তানের হাসি হাসালেও দলের জন্য সুখকর হয়নি। যতদূর জানা যায়, বঙ্গবন্ধুকন্যা ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সেই কমিটি থেকে দলের দীর্ঘ পোড় খাওয়া প্রভাবশালী নেতাদের বাদ দিতে গিয়ে টানা দুই সপ্তাহ চিন্তা-ভাবনা করেছেন। আরও জানা যায়, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ থেকে এসব প্রভাবশালী নেতার সবাইকে সংস্কারের অভিযোগে বাদ দিতে চাননি। কিন্তু সেদিন যারা তার ওপর ভর করেছিলেন, পরামর্শের নামে বিভ্রান্ত করেছিলেন, তাদের ব্যর্থতার চিত্র আজ কর্মীদের সামনেই নয়, দেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের কাছেও উন্মোচিত হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, সংস্কারবাদীরা যদি বাদই পড়লেন, তাহলে ওয়ার্কিং কমিটিতে ওয়ান-ইলেভেনে নির্যাতিত আবদুল জলিলের অবস্থান এত করুণ হলো কেন? জেল খেটে চট্টগ্রামের এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী বাদ পড়লেন কেন? বার বার বিপদে তাড়া খাওয়া মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ারা দলে পদোন্নতি পেলেন না কেন? কর্মীদের নানা হিসাবের পথ হেঁটে আজ বলাবলি হচ্ছে, বরাবরই প্রবীণের হাত ধরে কেন্দ্র ও তৃণমূলে নতুনরা উঠে আসেন। বিগত কাউন্সিলে সেই ধারা হোঁচট খেয়েছে। আকস্মিক যাদের কেন্দ্রে এনে গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাদের অনেকেই নিজেরা যেমন এত বড় পদ হজম করতে পারেননি, তেমনি মাঠের নেতা-কর্মীরাও গ্রহণ করতে পারেননি। মাঝখানে মাঠকর্মীরা হতাশ ও নিষ্ক্রিয়ই হয়ে পড়েননি, এই কমিটি সাড়ে তিন বছরে একটি জেলা সম্মেলনও করতে পারেনি। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক পদে বর্ষীয়ান নেতা জিল্লুর রহমান থাকাকালেও কর্মীরা কাছে পেয়েছে। আবদুল জলিল অসুস্থ শরীর নিয়েও সারা দেশ ঘুরেছেন। কর্মীদের মাঝে থেকেছেন। আন্দোলন গড়েছেন। আজকের সাধারণ সম্পাদকের খোঁজই পায় না মাঠের নেতারা। সাড়ে তিন বছরে জেলা সফরের প্রয়োজনও মনে করেননি তিনি।
 
আওয়ামী লীগে এমন রাজনীতি পঁচাত্তর-উত্তর দুঃসময়েও আসেনি। ব্যবসায়ী, আমলাদের বদলে এখনো আওয়ামী লীগ কর্মীদের কাছে দলীয় কাঠামোতে তাদের পোড় খাওয়া নেতারাই পছন্দের। এখনো আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামে কর্মীরা আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, আবদুল জলিল, মোহাম্মদ নাসিমদের দেখতে আগ্রহী। ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও ডাকসু ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ, আবদুল মান্নান, খ ম জাহাঙ্গীর, আখতারুজ্জামানকে মুজিবকন্যার পাশে দেখতে চায়। এমনকি দলে এখনো অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, মাহমুদুর রহমান মান্না, মুকুল বোস, মোজাফফর হোসেন পল্টু, হাবিবুর রহমান খানদের কদর ফুরিয়ে যায়নি। দলটি যদি হয় ঐতিহ্যবাহী আওয়ামী লীগ তাহলে এখনো এই দলে আবুল হাসান চৌধুরী কায়সারের মতো মেধাবী মানুষের প্রয়োজন। নূরে আলম সিদ্দিকীর মতো স্বাধীনতা সংগ্রামীর অভিজ্ঞতা দল কাজে লাগাতে পারে।
 
কংগ্রেস যদি রাজীব গান্ধীর সঙ্গে বিরোধিতা করে বেরিয়ে যাওয়া প্রণব মুখার্জিকে ফিরিয়ে এনে দলের নীতিনির্ধারকই নয়, গান্ধী পরিবারের স্বজনই নয়, প্রভাবশালী মন্ত্রী থেকে রাষ্ট্রপতি করতে পারে, তাহলে সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন ও একাত্তর আর পঁচাত্তরের দুঃসময়ের অগি্নপরীক্ষায় উত্তীর্ণ বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর-উত্তমদের দলে ফিরিয়ে আনার কথা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বিবেচনা করতে পারবেন না কেন? যারা বঙ্গবন্ধুকে আঘাত করে কথা বলেছেন, যারা মুজিব সরকারকে উৎখাতের জন্য জীবন-যৌবন উৎসর্গ করে এমন কাজ নেই যা করেননি, তারা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পরও নৌকায় তুলে যদি এমপি-মন্ত্রী করা যায়, দুঃসময়ে দল ছেড়ে সেনাশাসকদের দলে চলে যাওয়াদের এনে নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পরও প্রেসিডিয়ামে ঠাঁই দেওয়া যায়, তাহলে আজীবন বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে পরীক্ষিত গণমুখী চরিত্রের রাজনৈতিক নেতাদের দলীয় কাঠামোতে ফিরিয়ে নেওয়ার চিন্তা করা যাবে না কেন? বঙ্গবন্ধু যদি দল ছেড়ে যাওয়া আবদুস সামাদ আজাদ, রংপুরের মতিউর রহমান, যশোরের মশিউর রহমানদের আনতে পারেন, তাহলে কেন আজ পারা যাবে না!
 
এই যে জাতীয় কমিটিতে নেওয়া হলো আমু-তোফায়েল জলিলকে, এই যে জেলা সম্মেলনের দায়িত্ব দেওয়া হলো আমু-তোফায়েলকে_ এতে দলের মানুষই নন, সাধারণ মানুষও খুশি।
 
আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যের ধারা ও প্রাণশক্তি ফিরিয়ে আনতে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকেই সামগ্রিক দিক বিবেচনায় নিয়ে আসন্ন কাউন্সিলে দলকে গণমানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী দাঁড় করাতে হবে। আওয়ামী লীগের আজকের নীতিহীন রাজনীতি ও ভোগবিলাসী কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকলে এই দল ধীরে ধীরে গণসমর্থন হারিয়ে ক্ষয়ে যাবে। আওয়ামী লীগ মানে সেসব নেতা-কর্মীর দল, যারা এক পারিবারিক বন্ধনের মতো খাবার ভাগাভাগি করে দল করেন। সেই আওয়ামী লীগকে পুনঃপ্রতিষ্ঠায় অভিজ্ঞদের সঙ্গে নতুনদের যোগফলেই করতে হবে। আওয়ামী লীগ মানেই জীবন-যাপনে নেতা-কর্মীর স্বচ্ছতা, সাংগঠনিক দক্ষতায় নেতৃত্ব লাভ, জনগণের ভালোবাসা অর্জন করে মনোনয়ন পাওয়া। আওয়ামী লীগ কখনোই কমিশন খাওয়া মন্ত্রী, টেন্ডারবাজি ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া এমপি, কর্মীর সঙ্গে মিলে ধান্ধা-ফিকিরে ব্যস্ত নেতার দল হতে পারে না। বঙ্গবন্ধুর আত্দজীবনীর পরতে পরতেই নয়, আওয়ামী লীগের অতীত ইতিহাসেও সেই শিক্ষা রয়েছে। বঙ্গবন্ধু দল ও রাজনীতির জন্য পঞ্চাশের দশকে মন্ত্রিত্ব ছেড়েছিলেন। স্বাধীনতা-উত্তরকালে দলের নেতৃত্ব ছেড়েছিলেন। আজ আওয়ামী লীগে প্রেসিডিয়াম, সাধারণ সম্পাদক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকরা দলেও আছেন, সরকারেও আছেন। সরকার ও দল লেজে-গোবরে অবস্থা। মাঝখানে সংগঠন দুর্বল। আসন্ন কাউন্সিলে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনাকেই সার্বিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতাদের পরামর্শ নিয়ে একটি নতুন আওয়ামী লীগ দিতে পারেন। যেখানে ফুটে উঠবে আওয়ামী লীগে আওয়ামী লীগারদের নেতৃত্ব। যেখানে সবার মতামতের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে আওয়ামী লীগ নামের দল। যেখানে দলের মাঠকর্মীদের দায়বদ্ধতা থাকবে। ব্যবসায়ী, লুটেরা, সুবিধাবাদী, তদবিরবাজদের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দলীয় নেতৃত্বের দূরে রাখতে হবে। সাবেক ছাত্রলীগের অনেক মাঠের লড়াকু আদর্শবান নেতা-কর্মী দলীয় পরিচয়হীন অবস্থায় পড়ে আছেন। তাদের অনেককে দলের কেন্দ্রীয় ওয়ার্কিং কমিটিতে আনা সময়ের দাবি। দাবি পূরণে ওয়ার্কিং কমিটির কলেবরও কিছুটা বাড়াতে হয়। আজ এমনি পরিস্থিতিতে কী করবেন দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা? কেমন আওয়ামী লীগ আসবে সামনে?
 
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন
 

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে