Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২০ , ২৯ আষাঢ় ১৪২৭

গড় রেটিং: 2.7/5 (65 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১০-২৯-২০১২

ড. কামাল হোসেনের ওপর এত রাগ কেন!

পীর হাবিবুর রহমান



	ড. কামাল হোসেনের ওপর এত রাগ কেন!

 

ড. কামাল হোসেনের ওপর আওয়ামী লীগের এত রাগ কেন? '৯১ সালের নির্বাচনের পর থেকেই ড. কামাল হোসেনের প্রতি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের রাগ ও ক্ষোভ বার বার দৃশ্যমান হয়েছে। বিশেষ করে '৯৩ সালে আওয়ামী লীগ থেকে পদত্যাগ করে গণফোরাম গঠন করে আলাদা হয়ে যাওয়ার পর বার বার তার প্রতি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের তির্যক মন্তব্য ও সমালোচনার তীর ছুটে এসেছে। বিষাক্ত তীরের যন্ত্রণা যাই হোক, বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য সহচর ড. কামাল হোসেন বার বারই ব্যথিত চিত্তে সয়ে গেছেন। পাল্টা জবাব দিয়ে হৈচৈ বাধাতে যাননি। গত ২৬ অক্টোবর গণভবনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সভায় গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনকে সাবেক রাষ্ট্রপতি বিকল্পধারার চেয়ারম্যান অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সঙ্গে সমালোচনার তীরে ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে। এক মঞ্চ থেকে তারা দুজন জাতীয় ঐক্যের ডাক দেওয়ায় এই আক্রমণের শিকার হয়েছেন। সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিপোর্টে পাওয়া যায়, দলের এক প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রথম জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে দুই নেতার নতুন ফ্রন্ট খোলার সমালোচনা করেন। পরে দলীয় সভানেত্রী বলেন, বি চৌধুরী বিএনপির মহাসচিব ও রাষ্ট্রপতি ছিলেন। এরপর বহিষ্কৃত ও লাঞ্ছিত হন। তার বিকল্পধারার কোনো গতি হয়নি। আর ড. কামাল '৭১-এ অনুপস্থিত, '৭৫-এও অনুপস্থিত। সংকটকালে তাকে পাওয়া যায় না। এ দুজনের ঐক্যের ফলে আন্দোলন হবে না, ষড়যন্ত্র হতে পারে। ওয়ান-ইলেভেনের মতো কিছু করা যায় কি না, এ দুজনের এমন চিন্তা থাকতে পারে। তবে এতে তারা সফল হবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন। বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ফ্রন্ট গঠনের উদ্যোগ শুভ হলে আমরা স্বাগত জানাব। আর এটা যদি আরেকটি ওয়ান-ইলেভেন গঠনের জন্য হয় তাহলে খুবই খারাপ হবে এবং আওয়ামী লীগ সর্বশক্তি দিয়ে তা প্রতিহত করবে। সৈয়দ আশরাফ একদিকে আশা প্রকাশ করেন ড. কামাল হোসেন ও বি চৌধুরী ওয়ান-ইলেভেন সৃষ্টির প্রয়াস চালাবেন না। অন্যদিকে এ দুই রাজনীতিবিদকে 'রাজনীতির উচ্ছিষ্ট' বলে তির্যক মন্তব্য করেন।
 
ড. কামাল হোসেন বললেই বোঝায় দেশের সংবিধানপ্রণেতা ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবীর নাম। ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক এবং সম্ভাবনাময় এই মেধাবী আইনজীবীকে আওয়ামী লীগই নয়, রীতিমতো স্নেহছায়া দিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কাছে টেনেছিলেন। ফৌজিশাসক আইয়ুব খানের দুঃশাসনের সেই অন্ধকার সময়ে ড. কামাল হোসেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও নেতৃত্বের প্রতি মুগ্ধ হয়ে একজন গণতান্ত্রিক কর্মী হিসেবে স্বাধীনতার সংগ্রামে শরিক হয়েছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু দেশের এই কৃতী সন্তানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তিনিও নির্বাসিত জীবনে চলে যান। দেশে ফিরে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ নামের দলটির সঙ্গেই নিজেকে সক্রিয় করেন। '৮১ সালে দলের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে তার ভূমিকাও খাটো করে দেখার মতো নয়। বঙ্গবন্ধুকন্যা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব কাঁধে নিয়ে দেশে ফিরে বৈরী সে াতের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র মুক্তির যে সংগ্রাম শুরু করেন সেখানে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. কামাল হোসেনকেও পাশে পান। এই সংগ্রামের পথে '৮১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ড. কামাল হোসেনকে প্রার্থী করে ভোট লড়াইয়ে গ্রামে-গঞ্জে নেমে পড়ে। সেনাশাসক এরশাদের বিরুদ্ধেও ড. কামাল হোসেন আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলেন সামনের কাতারে। এখন পর্যন্ত তিনি তার এই নীতির প্রশ্নে আপস করেননি। এমনকি সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী পল্টনে মহাজোটের মঞ্চে এরশাদের সঙ্গে বসেছেন, তার বাড়িতে গেছেন। কিন্তু ড. কামাল হোসেন এরশাদের সঙ্গে পল্টনের মঞ্চ দূরে থাক, বাইরেও কোথাও বসেননি। বি চৌধুরী একজন দেশবরেণ্য চিকিৎসকই নন, রাজনীতির এক পরিশীলিত মানুষ হিসেবে বিএনপির রাজনীতিতে সামনের কাতারে যেমন ছিলেন, তেমনি দলের অভ্যন্তরে ইতিবাচক রাজনীতির ধারাও চালুর চেষ্টা করেছেন। রাষ্ট্রপতি হয়ে বঙ্গভবনকে দলীয় মোহের ঊধের্্ব রাখার চেষ্টা যেমন করেছেন, তেমনি নিজেকে শুধু জানাজা আর কবর জিয়ারতের আনুষ্ঠানিকতায় বন্দী না রেখে সমাজের জন্য কিছু করার চেষ্টা করেছেন। যাদের জন্য তাকে বঙ্গভবন, বিএনপি ছাড়তে হয়েছে, রেললাইন ধরে দৌড়াতে হয়েছিল তাদের রাজনীতির পরিণতিও শুভ হয়নি। যাই হোক, এরশাদের সঙ্গে ড. কামাল হোসেন না বসায় রাজনীতির কিছু এসে না গেলেও তার নীতি নিয়ে ঘরে বসে থেকেছেন। এটা সম্ভব হয়েছে ড. কামাল ক্ষমতার রাজনীতি নয়, আদর্শের রাজনীতির পথে হাঁটছেন বলে। অনেকে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে মেধা ও পাণ্ডিত্যের নিরিখে ড. কামাল হোসেনকে বিচার করে থাকেন। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্দজীবনীতে একজন নেতা হিসেবে যে সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক চরিত্র ফুটে উঠেছে তা আমি ড. কামাল হোসেনের মধ্যে না দেখলেও তার সততা, সাদামাটা নিরাবরণ জীবন ও আদর্শের পথে অন্তহীন যাত্রাকে খাটো করে দেখি না। সোহরাওয়ার্দী বঙ্গবন্ধুর মতো কর্মী পেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু শত বছরেও একজন আসেন না। ড. কামাল হোসেন গণফোরাম গঠনকালে পেয়েছিলেন একদল জনবিচ্ছিন্ন দেউলিয়া কমিউনিস্ট ও বাম, অন্যদিকে যেভাবে সংগঠন করার জন্য মানুষের প্রয়োজনীয় উপাদান নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘোরার কথা ছিল সেটিও করতে পারেননি। কিন্তু তিনি রাজনীতিতে সৎ মানুষের যে স্লোগান ছড়িয়েছিলেন তা বিফলে যায়নি। মানুষ সেই সৎ মানুষদেরই আজ রাজনীতিতে চায়, যাদের নিয়ে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের বিকাশ ঘটিয়েছিলেন, সাধারণ পরিবার থেকে এনে '৭০ সালে মনোনয়ন দিয়ে বনেদি পরিবারের সন্তানদের ভরাডুবি ঘটিয়েছিলেন এবং গণমানুষের রাজনীতিতে আস্থা অর্জন করে স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। সেই সৎ মানুষের সৎ-সুস্থ ধারার রাজনীতির আজ বড়ই আকাল। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে দলে দলে একদিকে যেমন সেই সৎ মানুষের সৎ রাজনীতির অভাব, তেমনি দলীয় গণতন্ত্র প্রায় তিরোহিত। পড়ে আছে কেবল নীতিহীন শাসন আর লুণ্ঠন। এই নীতিহীন শাসন-লুণ্ঠনের অংশীদারেরা সংখ্যালঘু। সংখ্যাগুরু রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা এখনো সৎ ও সুস্থ ধারার রাজনীতির অনুসারী। তাদের পথ সংখ্যালঘু নীতিহীনদের দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে কেবল। তাই ওয়ান-ইলেভেনের উদ্বেগ কাটে না।
 
'৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য বলে পরাজয়ের রায় মেনে নেওয়ায় পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্রী ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে তার দলের নেতৃত্বের বিরোধ প্রথম প্রকাশ্যে আসে। সেই সময় দলের একদল অন্ধ কর্মীর অসভ্য আচরণের মুখোমুখিও তাকে হতে হয়েছে। এমনকি ওই সময় দলের বর্ধিত সভায় '৯১ সালের ভোটযুদ্ধের পরাজয়ের কারণ চিহ্নিত করে তিনি ৪৫ মিনিটের যে বক্তৃতা করেন তার জবাব দিতে দাঁড়িয়ে যে নেতারা মারমুখী আচরণ করেছিলেন পরবর্তীতে দলীয় রাজনীতিতে তাদের অবস্থা সুখকর দূরে থাক, হয়েছে করুণ। এবার প্রেসিডিয়াম বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক যখন তাকে 'উচ্ছিষ্ট' বলেন তখন ড. কামাল হোসেন ব্যথিত চিত্তে শুধু এটুকুই বলেছেন, 'আমাকে চাচা বলে ডাকতেন। ভাতিজার কী হয়েছে জানি না। চাই তিনি ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।' ঈদের পর দিন ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করতে তার বেইলি রোডের বাসভবনে গিয়েছিলাম। সেখানে আলাপে আলাপে এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের মন্তব্য নিয়ে তার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বললেন, এসব নিয়ে পাল্টা বক্তব্য দিয়ে রাজনীতি করতে হলে সেই রাজনীতি তিনি করবেন না। প্রয়োজনে অবসরে যাবেন। মনে হলো মনটা তার ব্যথিত। শালীনতা হারিয়ে রাজনীতি তিনি করতে পারবেন না। বঙ্গবন্ধুর ছবিখানি তার বেডরুমে রাখেন। বঙ্গবন্ধুর গা থেকে খুলে তাকে দেওয়া মুজিবকোটখানি সমাদরে রেখেছেন তুলে। তার এক কথা_ রাজনীতিতে সততা, সভ্যতা হারিয়ে যেতে দেওয়া যায় না। ফিরিয়ে আনতেই হবে।
 
'৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে নির্মম, নৃশংসভাবে পরিবার-পরিজনসহ হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক দুর্যোগ নামানো হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ওপর জেল-জুলুম, নির্যাতন, রিমান্ডের অবর্ণনীয়, অমানবিক কর্মযজ্ঞ চালানো হয়েছিল। জেলখানায় চার নেতাকে হত্যা করেও আওয়ামী লীগকে স্তব্ধ করার পথ সেদিন বন্ধ হয়নি। সেদিন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের পিতা স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সর্বজনশ্রদ্ধেয় সৈয়দ নজরুল ইসলাম নিহত হলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কর্মীরাই প্রতিবাদ সংগ্রামে নেমেছিলেন। '৮১ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশে ফিরে সেই নেতৃত্ব নিলেও আজকের আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক দেশে ফেরেননি। রাজনীতিতে সৈয়দ আশরাফ অর্থনৈতিক দিক থেকে পিতার সততা ও ভদ্র, বিনয়ী আচরণের জন্য সমাদৃত। মন্ত্রী ও দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তার বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ আনা গেলেও তার শত্রুও দুর্নীতির অভিযোগ আনবেন না। সেই আশরাফ যখন তার পিতার রাজনৈতিক সহকর্মী ড. কামাল হোসেনকে আক্রমণ করে কথা বলেন তখন তা দুঃখজনক ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। রাজনীতিতে শিষ্টাচারের ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকেই উদ্যোগী হতে হবে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী, প্রধানমন্ত্রীর চেয়েও দেশের মানুষের কাছে তার বড় পরিচয় তিনি জাতির জনকের কন্যা। বঙ্গবন্ধুকন্যার চারপাশে আজ যারা অবস্থান করেন আস্থা ও বিশ্বাসে তাদের পাওনার হিসাবটা নিয়ে এতই ব্যস্ত থাকেন যে সত্য জানানোর যোগ্যতাও রাখেন না অনেকে। কারণ তারা সত্য থেকে অনেক দূরে বাস করেন। ক্ষমতার কাছাকাছি ও ছায়ায় থাকায় মানুষের ভাষা শোনার ভাগ্য হারিয়ে ফেলেছেন। কোথায় কী ঘটছে, কোথায় কী আলোচনা হচ্ছে, কোথায় কে কী লিখছেন, কী বলছেন তা নিয়ে উজিরে খামোখাদের আমলে না নিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যার সুযোগ রয়েছে তাদের সঙ্গে আলোচনার। ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, এ বি এম মূসার মতো প্রবীণ ও জাতীয় পর্যায়ের মুরুবি্বদের চা-পানের আমন্ত্রণ জানিয়ে খোলামেলা আলোচনা করার সুযোগ কেন তিনি হারাচ্ছেন? তার সরকার ও দেশের কল্যাণে সব মহলের সঙ্গে মাঝেমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বসতে পারেন। মরহুম বামপন্থি রাজনীতিবিদ পীর হবিবুর রহমান ক্ষমতার রাজনীতির প্রতি আগ্রহী ছিলেন না। গণমানুষের স্বার্থ রক্ষায় নিরন্তর সংগ্রাম করে গেছেন। ব্যক্তিগতভাবে মুজিবকন্যা শেখ হাসিনার প্রতি তিনি ছিলেন ভীষণ সহানুভূতিশীল। শেখ হাসিনার প্রথম শাসনামলে তিনি গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে ২০ জন দেশবরেণ্য মানুষের তালিকা দিয়ে নাকি বলেছিলেন এদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে চা-চক্রে বসতে। রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতে। সেই শাসনামলে পীর হবিবুর রহমান নিজেই তার সিলেটের দক্ষিণ সুরমার জালালপুরের গ্রামের বাড়িতে আমাকে এ কথা বলেছিলেন।
 
'৭১ ও '৭৫-এর ভূমিকার প্রশ্নই যদি আসে তাহলে বার বার আমার জানতে ইচ্ছে করে দুনিয়াজুড়ে বীরত্বের জন্য খ্যাতি কুড়ানো এবং বঙ্গবন্ধুর হৃদয়ে আসন নেওয়া বাঘা সিদ্দিকী বা কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তমকে আওয়ামী লীগ কি তার প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছিল? বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে মুজিব হত্যার প্রতিবাদে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলা সেদিনের ১৭ হাজার তরুণ প্রাণ আওয়ামী লীগের কাছে কতটা সমাদর পেয়েছেন? শতাধিক শহীদের ভাগ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কী জুটেছে? একটি শোকপ্রস্তাবও কেন জোটেনি? আজকের আওয়ামী লীগ ও সরকারে যাদের দাপট দেশবাসীর সামনে উন্মোচিত বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতির জন্য ষাটের দশক থেকে পঁচাত্তর-উত্তর সময় পর্যন্ত তারা কি সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, আমির হোসেন আমু, মরহুম আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, নূরে আলম সিদ্দিকী, আবদুল জলিল, মরহুম আবদুল কুদ্দুস মাখন, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মোস্তফা মহসীন মন্টু, চট্টগ্রামের এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীদের চেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছিলেন? তাহলে কেন আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে এদের অনেকেরই যোগ্য আসন মিলল না? আমু, মরহুম রাজ্জাক, তোফায়েল না হয় সংস্কারবাদী, আবদুল জলিল তো ছিলেন নির্যাতিত! শেখ ফজলুল করিম সেলিম তো আগের শাসনামলে সফল স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন? মোস্তফা মহসীন মন্টু আইয়ুব-ইয়াহিয়া থেকে জিয়া-এরশাদের সেনা শাসনামলে যে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তার ফলাফল কি ভোগ করেছেন?
 
ওয়ান-ইলেভেন ড. কামাল হোসেনরা আনেন না। ড. কামাল হোসেনরা আইয়ুব শাসনামল থেকে জিয়া-এরশাদ শাসনামল পর্যন্ত গণতন্ত্রের সংগ্রাম করেছেন। বিচারপতি সাত্তার সরকারের চরম ব্যর্থতা, নৈরাজ্য, দুর্নীতি ও কোন্দলের পথে সেনাশাসক এরশাদ ক্ষমতায় এসেছিলেন জনসমর্থন নিয়ে। আওয়ামী লীগ সেদিন এরশাদের মার্শাল ল-কে আনেনি। কাদের সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে যে যত অভিযোগ আনুন তার '৭১ ও '৭৫-এর বীরত্বের কাছে সব কি মুছে যায়? এখনো যে মানুষটি মাংস খান না সেই আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রের সংগ্রামই করে গেছে। ওয়ান-ইলেভেন এসেছিল দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের রক্তাক্ত সহিংস রাজনীতির পথে। সেদিন দেশ অবরুদ্ধ অচল করে দিয়েও বিএনপি একদলীয় নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার জন্য লজ্জাশরমের মাথা খুইয়ে বসেছিল। রাজনৈতিক সমঝোতার সব পথ বন্ধ করে দেওয়ায় গণসমর্থনের মুখে ওয়ান-ইলেভেন এসেছিল। ওয়ান-ইলেভেনের প্রতি সরকার বা শাসক দলের অনাস্থা থাকলে, কেন আজ সেসব কুশীলবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, যারা দুই নেত্রীসহ রাজনীতিবিদদের জেল, রিমান্ড দিয়েছিলেন কিংবা দেশত্যাগে বাধ্য করেছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে বা সেসব কুশীলবকে রাষ্ট্রদূতের মতো লাভজনক পদে বহাল রেখে সরকারি দলের ওয়ান-ইলেভেনবিরোধী কথাবার্তা কি আদৌ মানায়? সে সময় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোর করে নেওয়া টাকা ফিরিয়ে না দিয়ে ওয়ান-ইলেভেনের বিরোধিতা কতটা যৌক্তিক? ড. কামাল হোসেন ও বি চৌধুরী সন্ত্রাস, দুর্নীতি, অপশাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। তাদের ডাকে মানুষ কতটা ঝাঁপিয়ে পড়বে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। কারণ তাদের রাজনৈতিক দলের গণভিত্তি বলে কিছু নেই। বিএনপি-জামায়াত জমানায় আওয়ামী লীগ এমন ডাক অনেকবার দিয়েছে। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় ছোট-বড় সব দলের তো বটেই সাধারণ মানুষেরও বড় তৃপ্তি যে কথা বলার অবাধ স্বাধীনতা থাকে। ড. কামাল হোসেনের ডাকে কেউ ভালো লাগলে যাবেন, ভালো না লাগলে যাবেন না। তবে তার বক্তব্য গণমানুষের পক্ষেই গেছে। ওয়ান-ইলেভেন সেদিন তারাই এনেছিলেন যারা জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদকে মদদ ও ছায়া দিয়েছিলেন। দুর্নীতিতে ডুবেছিলেন। আজ সরকারের নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান রাতের টকশোতে গিয়ে বিএনপি দলীয় সাবেক মন্ত্রী রফিকুল ইসলাম মিয়াকে যেভাবে চোখ উপড়ে ফেলাসহ নানা আক্রমণাত্দক ভাষায় কথা বলেছেন তা গণতান্ত্রিক সমাজে কল্পনারও অতীত। এরাই ওয়ান-ইলেভেন ডেকে আনেন। সেনাশাসকদের মন্ত্রীরাও এমন আচরণ করেননি। পঁচাত্তর-উত্তর সেই সময়ে মাদারীপুর নাজিমউদ্দিন কলেজে ছাত্রলীগের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বোস অধ্যাপক আবদুল মতিন চৌধুরী, ফণীভূষণ মজুমদার বিশেষ অতিথি হয়ে গিয়েছিলেন। প্রধান বক্তা ছিলেন ফজলুর রহমান। বিশেষ বক্তা খ ম জাহাঙ্গীর। সে সময়ের জাসদ নেতা শাজাহান খান গণবাহিনীর অস্ত্রবাজদের পাঠিয়ে ছাত্রলীগের নবীনবরণ পণ্ড করে দেন। সেই হামলায় তার পিতা জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আসমত আলী খানও আহত হন অতিথিদের রক্ষা করতে গিয়ে। আবদুল মতিন ও ফণীভূষণ মজুমদারকে পুলিশ নিয়ে যায় সার্কিট হাউসে। একটি টেবিলে দাঁড়িয়ে সেদিন ফজলুর রহমান বক্তৃতা করেন। ফজলু ও জাহাঙ্গীর দুজনের পরিণতি কি আওয়ামী লীগে সুখকর হয়েছে? আওয়ামী লীগ এই উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। আওয়ামী লীগের কাছে মানুষ গণমানুষের রাজনীতির চরিত্র আশা করে। আওয়ামী লীগের কাছে মানুষ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মানবিক আচরণ ও সততার রাজনীতি এবং বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা_ রাজনৈতিক শিষ্টাচার, শালীনতা আশা করে। নেতা-কর্মীরা তাদের মূল্যায়ন আশা করেন। আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামীরা একে একে অনেকে চলে গেছেন। যারা আছেন অনাদর, অবহেলা অন্তহীন দহনের শিকার। আমাদের পেশাজীবীরা দলকানা হতে হতে ঐতিহ্যের গৌরব হারিয়েছেন। সুপ্রিমকোর্ট আঙিনায় জাতির দুঃসময়ে পাশে পাওয়া অ্যাডভোকেট শামসুল হক চৌধুরী, ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদরা চলে গেছেন। সবেধন নীলমণি ড. কামাল হোসেন কালের সাক্ষী হয়ে এখনো আল্লাহর রহমতে আমাদের মাঝে আছেন। আমাদের মাঝে বলতে গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবিকতার পাশে। বিএনপি জমানায় অনেক বড় বড় নেতা যখন মুখ খোলেননি তখন প্রথম হাওয়া ভবনের বিরুদ্ধে অভিযোগের তীর ছুড়েছিলেন এই ড. কামাল হোসেনই। সেদিন কথায় কথায় বললেন, রাজনীতিতে 'হাওয়া ভবন' 'পাওয়া ভবন নয়', 'দেওয়া ভবন' হোক। যাতে জনগণ সেখান থেকে পায়। বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগকে তৈরি করেছিলেন তার জনগণকে দেওয়ার জন্য। আজ আওয়ামী লীগে আওয়ামী লীগারও কমে যাচ্ছে। কমিউনিস্ট বামেরা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এমনি অবস্থায় মুজিবকন্যাই পারেন তার দলকে 'দেওয়া ভবন' বানাতে, সুবিধাবাদীদের বিতাড়িত করে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সব সময় বলেন, আওয়ামী লীগ এলে জনগণ কিছু পায়, অন্যরা এলে আখের গোছায়। যারা আখের গোছায় তারাই ওয়ান-ইলেভেন আনে। যারা শেয়ার মার্কেটে গরিবের টাকা লুটে নিয়ে যায় তারাই গণতন্ত্রের শত্রু। হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে যারা ছায়া দেয়, সায় দেয় তারাই গণতন্ত্রের শত্রু। এই শত্রুদের চিহ্নিত ও দমন করার দায়িত্ব পালনে মুজিবকন্যার সরকার আরও কার্যকর হোক_ সেই প্রত্যাশা মানুষের। আমাদের।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে