Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২০ , ২৬ আষাঢ় ১৪২৭

গড় রেটিং: 2.6/5 (22 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ১০-২৫-২০১২

কোরবানির পশুর হাটে অর্থনৈতিক মন্দার ছায়া


	কোরবানির পশুর হাটে অর্থনৈতিক মন্দার ছায়া

ঈদ যতই ঘনিয়ে আসছে রাজধানীর কোরবানির পশুর হাটগুলোতে গরু-মহিষ-ছাগলের আমদানি ততই বাড়ছে। কোথাও কোথাও গবাদি পশুর ভিড় মূলহাট ছেড়ে আশপাশের পাড়া-মহল্লা, অলি-গলি, রাস্তা-ঘাট দখল করে নিয়েছে। কিন্তু কোনো হাটেই আশানুরূপ বেচাকেনা নেই। দলবেঁধে অনেকেই হাটের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত দর কষাকষি করে বেড়ালেও তাদের মাঝে ক্রেতার সংখ্যা খুবই কম। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ৫-৭ জন মিলে মাঝারি সাইজের একটি গরু কিনছেন। অবস্থা দেখে অভিজ্ঞজনরা বলছেন, অর্থনৈতিক মন্দার হাওয়া লেগেছে কোরবানির পশুরহাটে। তাদের ভাষ্য, রাজধানীর অধিকাংশ মানুষই শেয়ারবাজারে পুঁজি বিনিয়োগ করে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। আবার কেউ কেউ সেখানে বড় ধরনের গচ্চা দিয়ে টাকা তুলে ডেসটিনি, ইউনিপেটুইউ, ইউনিগেট, নিউওয়ে ও মিডওয়েসহ বিভিন্ন এমএলএম ব্যবসায় বিনিয়োগ করে সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসেছেন। ফলে লোকজনের হাতে এবার তেমন একটা পয়সা-কড়ি নেই। তার ওপর ছোট গরুর দাম চড়া হওয়ায় আগে যারা একাই একটি গরু কোরবানি দিতেন, তারা এবার চার-পাঁচজন মিলে একটি গরু কোরবানি দেয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন। তাই হাটগুলো মানুষের ভিড় জমলেও বেচা-বিক্রি খুবই কম। তবে হাটে ক্রেতার সংখ্যা কম থাকলেও দামের হাল ছাড়েনি পাইকার ও বেপারিরা। দেড় দুই বছরের ছোট সাইজের বাছুরের দামও হাঁকছেন ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। আর ছোটর ধাপ থেকে কিছুটা এগিয়ে থাকলেই ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা দাম চাওয়া হচ্ছে। বেপারিদের আশা, শেষ সময়ে ক্রেতারা কোরবানির পশু কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়বে; দাম কিছুটা চড়া হলেও লোকজন গরু কিনেই ঘরে ফিরবে। রাজধানীর বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট ও ভাড়া বাসা-বাড়িতে গরু রাখার জায়গা না থাকায় অনেকেই আগেভাগে গরু কিনছেন না বলে নিজেদের আশ্বস্ত করছেন বেপারিরা। তবে নগরীর বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের অনেকেই এবার একা এক গরু কোরবানির আশা ছেড়ে দিয়েছেন। মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকেই ভাগে কোরবানি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আবার কেউ কেউ সামর্থ্যের মধ্যে বিভিন্ন সাইজের ছাগল-ভেড়া কিনছেন। গ্রামে গরুর দাম কিছুটা কম হবে ভেবে অনেকেই আগেভাগেই কোরবানির নিয়ত করে সেখানে আত্মীয়-স্বজনের কাছে টাকা পাঠিয়ে দিয়েছেন। বুধবার সরেজমিন রাজধানীর গাবতলী, মেরাদিয়া, বনশ্রী, আফতাবনগর, কমলাপুর ও আরমানিটোলাসহ প্রায় এক ডজন কোরবানির পশুরহাট ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি হাটই গরু-ছাগল-মহিষে কানায় কানায় পূর্ণ। হাট ইজারাদাররা জানান, তাদের টার্গেটের এক থেকে দেড়গুণ বেশি গরু এবার হাটে এসেছে। ফলে তারা ঠিকমতো জায়গা দিতে পারছেন না। এরপরও বিভিন্ন স্থান থেকে সড়ক পথে ট্রাক এবং নৌপথে ট্রলারে ভরে গবাদি পশু আসছে। বুধবার সকালে আফতাবনগর হাটে গিয়ে দেখা গেছে, বেপারিরা তাদের আনা গরু বাঁধতে বাঁশ-খুঁটির জন্য হন্যে হয়ে হাট ইজারাদারদের পিছু পিছু ঘুরছেন। আর তারা দেই-দিচ্ছি বলে বেপারিদের নানা জায়গায় ঘুরিয়ে বেড়াচ্ছেন। হাটে গরু নামানোর জায়গা না পেয়ে বেপারিদের অনেকেই ট্রাকভর্তি গরু নিয়ে অন্য হাটে ছুটছেন। আবার কেউ কেউ অন্য হাটে পর্যাপ্ত সুবিধা না পেয়ে আফতাবনগর হাটে এসেছেন। পুরান ঢাকার সাদেক হোসেন খোকা মাঠের ইজারাদার মসিউর রহমান নিপু যায়যায়দিনকে জানান, ডিসিসির চুক্তি অনুযায়ী তিনি মাঠে ১২ হাজার গরু রাখতে পারবেন। কিন্তু গত কয়েকদিনে তার হাটে ২০ হাজারেরও বেশি গরু এসেছে। ফলে হাটের নির্ধারিত স্থানে অনেক গরুর বেপারিই জায়গা পাননি। ফলে তাদের হাট সংলগ্ন আশপাশের রাস্তা ও অলিগলিতে বসতে হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় একজন প্রভাবশালীর ইঙ্গিতে পুলিশ মঙ্গলবার রাতে তাদের মারধর করে সেখান থেকে তুলে দিয়েছে। এ সময় ছোটাছুটি করতে গিয়ে অনেকেই আহত হয়েছেন। কেউ কেউ নিজের গরু-ছাগলও হারিয়েছেন। এদিকে সাদেক হোসেন খোকা মাঠের অবৈধ অংশের হাট তুলে দিতে পুলিশ তৎপরতা চালালেও আরমানিটোলার হাটে তাদের নীরব থাকতে দেখা গেছে। সরেজমিন বুধবার আরমানিটোলার হাট ঘুরে দেখা গেছে, মূল অংশ ছাড়িয়ে হাটের পরিধি চারদিকে দেড় থেকে দুই কিলোমিটার বেড়েছে। কোতোয়ালি থানাধীন চিত্রামহল সিনেমা হলের সামনের পার্ক, বাবু বাজার, নয়াবাজারের মূল রাস্তায়, ফ্রেঞ্চ রোড, নর্থ-সাউথ রোড, কেপি ঘোষ স্ট্রিট, জিন্দাবাহার, মিটফোর্ড, তাঁতীবাজারের ভেতর পর্যন্ত বাঁশ, খুঁটি ও ব্যানার দিয়ে ঘিরে গরু-ছাগল রাখা হয়েছে। হাটে ১৫ হাজার পশু রাখার জন্য ডিসিসি ইজারা দিলেও সেখানে এখনই ২৫ থেকে ৩০ হাজার গরু-মহিষ-ছাগল রয়েছে। এরপরও প্রতিদিন বিভিন্ন স্থান থেকে ট্রাক ভরে গবাদি পশু আসছে। আরমানিটোলা হাটের ইজারাদার হাজী আরমান জানান, তাদের টার্গেটের প্রায় দ্বিগুণ গরু এসেছে। এছাড়াও অর্থনৈতিক মন্দার কারণে বেচাকেনা ভালো না হওয়ায় পশু রাখার জায়গা সঙ্কট দেখা দিয়েছে। প্রতিবছর ঈদের দুই-তিনদিন আগে যে গরু বিক্রি হয় তার তিনভাগের একভাগও হয়নি বলে বেপারিরা দাবি করেন। তাদের ভাষ্য, বেচাকেনা ভালো হলে হাটে জায়গা সঙ্কট হতো না। এক বেপারি গরু বিক্রি করে চলে গেলে অন্যজন সেখানে গরু বিক্রি করতে পারত। পাবনার গরুর বেপারি সাইজুদ্দিন জানান, গত সোমবার ২৮টি গরু আরমানিটোলার হাটে এনেছেন। এর মধ্যে বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে মাত্র ৭টি। এগুলো কিছুটা চড়া দামে বিক্রি করতে পারলেও বাকি গরু কী দামে বিক্রি করতে পারবেন তা নিয়ে তিনি রীতিমত উদ্বিগ্ন রয়েছেন। সাইজুদ্দিনের মতোই উদ্বিগ্ন ঝিনাইদহের গরুর পাইকার খলিল। তিনি জানান, চার ট্রাক গরু এনেছেন দু'দিন আগে। উপযুক্ত দাম না পাওয়ায় এখনো কোনো গরু বিক্রি করেননি। রাজধানীর হাটে যেভাবে গরুর ঢল নেমেছে তাতে সব বেপারি গরু বিক্রি করতে পারবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করেন খলিল। পঞ্চগড় সদরের ঝাকুয়াকালি থেকে বাড়িতে পোষা ৪টি গরুটি নিয়ে বনশ্রী হাটে এসেছেন সুরুজ মিয়া। গো-খাদ্যের দাম বাড়ায় ভেবেছিলেন ভালো দামে গরুগুলো বিক্রি করে গ্রামে কিছু চাষের জমি কিনবেন। কিন্তু হাটে গরুর ঢল নামলেও ক্রেতাদের আনাগোনা কম হওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি। কারণ গরু বাড়িতে ফেরত নিতে হলে ট্রাকভাড়া ১৫ হাজার টাকা গচ্চা যাবে। তবে রাজধানীর একমাত্র স্থায়ী পশুরহাট গাবতলীর গরুর পাইকাররা এতটা হতাশ নন। তাদের ভাষ্য, ঢাকা থেকে গরু ফেরত যাওয়ার কোনো নজির নেই। কোনো বছর ঈদের দু'তিনদিন আগেই বেচাকেনা জমে। আবার কখনো তা হয় একেবারে শেষ সময়ে। শেয়ারবাজার ধসের প্রথম বছরেও কোরবানির পশুরহাটে মন্দাভাবে দেখা দিলেও পরে বেশ চাঙ্গা হয়ে ওঠে বলে জানান একাধিক পাইকার। সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশি ও ভারতীয় মিলে ক্রেতার চেয়ে গরুর সমাগম বেশি। এ ছাড়া এবার গরু কিনতে ঢাকার বাইরে থেকে পাইকাররা কম আসছেন। এ জন্যই কিছুটা মন্দাভাব দেখা দিয়েছে। শিগগিরই এ সঙ্কট কেটে যাবে। গতকাল সরেজমিন কয়েকটি হাটে গিয়ে দেখা যায়, দেশি ও ভারতীয় গরুর বিপুল সমাহার। আছে ছাগল, ভেড়া, মহিষ এবং উট। মধ্যবিত্তরা ছোট ও মাঝারি সাইজের গরুর দামদর করলেও বিত্তশালীরা খুঁজছেন বিশাল দেহী দর্শনীয় গরু। দামে বনে যাওয়ায় তাদের কেউ কেউ গরু কিনেও বাড়ি ফিরছেন। আবার অনেকেই দরদামে পোষানোর পরও কোরবানির পশু কেনার আনন্দ উপভোগ করার জন্য দলেবলে এ হাট থেকে ও হাট ছুটে বেড়াচ্ছেন। কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে দুই দিন আগে গাবতলীর হাটে আসা গরুর বেপারি দেলোয়ার জানান, দুই ট্রাক গরু এনেছিলেন, সামান্য মুনাফায় সব বিক্রি করে দিয়েছেন। এখন হাট থেকেই পাইকারদের কাছ থেকে গরু কিনে খুচরা বিক্রি করছেন। দেলোয়ারের ভাষ্য, মুনাফা কিছুটা কমিয়ে দর হাঁকলে ক্রেতার অভাব হচ্ছে না। কিন্তু অধিকাংশ গরুর বেপারিই চড়া দরে গরু বিক্রির জন্য অপেক্ষা করছেন। আর ক্রেতারা তাকিয়ে আছেন কখন দর পড়বে-এ আশায়। বিশালদেহী দর্শনীয় দুটো গরু এনেছেন কুষ্টিয়ার ইসমাইল মিয়া। তিনি জানান, এগুলো নেপালি গরু; মাংস যে কোনো গরুর চেয়ে সুস্বাদু। তাই দামও কিছুটা বেশি। তিনি তার এক একেকটি গরুর দাম হাঁকছেন দুই লাখ টাকা। ইসমাইলের ধারণা, যারা এ গরু চেনে তারা অনায়াসেই এ দামে গরু কিনে নিয়ে যাবে। এদিকে রংপুরের গরু ব্যবসায়ী জয়নাল আবেদীন বলেন, ঢাকায় গরুর ট্রাক নিয়ে আসা ভুল হয়েছে। কারণ ঢাকার হাট জমতে আরো দু'-এক দিন সময় লাগবে। তারপরও এত বেশি গরু এসেছে, দাম কম হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তার ৫ মণ ওজনের একটি গরুর দাম চাওয়া হচ্ছে দেড় লাখ টাকা। কিন্তু এখন পর্যন্ত কেউ দাম বলেনি। জয়নাল আবেদীন জানান, বেশি দামে বিক্রির আশায় আগেভাগে রংপুর থেকে ঢাকার গাবতলীর গরুর হাটে আসা। আরেক গরু ব্যবসায়ী যশোর থেকে আসা এজাজুল জানান, এখন হাটে ক্রেতার সংখ্যা কম। গতবার যারা বেশি দামের কারণে ভালো গরু কোরবানি দিতে পারেননি, এবার তারাই আগেভাগে এসে হাটে দরদাম করেছেন। গাবতলীর হাটে উট ও দুম্বা ঘিরে মানুষের জটলা দেখা গেছে। কেউ কেউ মুঠোফোনে এগুলোর ছবিও তুলছেন। উটের তত্ত্বাবধায়ক সহিদুল জানান, উট দুটির মালিক মজিবর বেপারি। একেকটির দাম চাওয়া হয় চার লাখ টাকা। ভারতের রাজস্থান থেকে আনা হয়েছে এই উট দুটি। গতবারের চেয়ে এবার উটের দাম প্রায় দ্বিগুণ হবে বলে আশা করেন তিনি। কোরবানির হাটে প্রতি বছর উটের চাহিদা থাকায় রাজস্থান থেকে আরো উট আসছে বলে জানান ব্যবসায়ী তারিকুল ইসলাম।
 
 

জাতীয়

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে