logo

যাদব পায়েং: একা একা আস্ত এক বন তৈরি করে ফেলেছেন যে মানুষটি!

যাদব পায়েং: একা একা আস্ত এক বন তৈরি করে ফেলেছেন যে মানুষটি!

ভারতের আসামের মিশিং উপজাতি সম্প্রদায়ের লোক যাদব। পুরো নাম যাদব পায়েং। আর ডাকনাম মুলাই। তিনি বিখ্যাত হয়ে গেছেন বন তৈরি করে। একাই তৈরি করেছেন ১৫৫ হেক্টর জমিতে বিশাল এক ঘন বন। বনে রয়েছে বুনো জীব-জন্তু হাতী, বাঘ, হরিণ। আর তার বনায়নের কাহিনী সেদেশের বন কর্তৃপক্ষকে রীতিমত লজ্জায় ফেলে দিয়েছে। কারণ সংশ্লিষ্ট লোকেদের উদাসীনতা ও জনগণের সচেতনতার অভাবে ভারত উপমহাদেশে বনের পরিমাণ কমছে দ্রুত হারে। সে জায়গায় যাদব তাক লাগিয়ে দিয়েছেন সম্পূর্ণ একক প্রচেষ্টায়।


১৯৭৯ সালে যখন তার বয়স মাত্র ষোল বছর, তখন পায়েং একদিন সকালে ব্রহ্মপুত্রের বালির চড়ায় শতাধিক মৃত সাপ দেখতে পান। আগের দিনের হঠাৎ আসা জলের তোড়ে এদের সেখানে এনে ফেলে। তখন সেখানে কোনও গাছ ছিলো না। প্রচণ্ড তেতে ওঠা বালির তাপে ওই সাপগুলো মারা যায়। ক্লাস টেন-এ পড়া সেদিনের কিশোরের মনে এই ঘটনা প্রচণ্ড নাড়া দিয়ে যায়, যা তার লক্ষ্য, তার জীবন সবকিছু পাল্টে দেয়। পায়েং সেদিন ছুটে গিয়েছিল বন দফতরের কাছে, আবেদন করেছিল ওখানে গাছ লাগানোর জন্য। ছুটে গিয়েছিল সাধারণ স্থানীয় মানুষের কাছেও, কেউ বলেছেন ওখানে গাছ লাগালে বাঁচবে না, কেউ বলেছে ওটা ডুবে যাবে। কেউ তাকে পাত্তা দেয় নি।


পায়েং নিজের হাতেই দায়িত্ব নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি পড়াশোনা ছাড়লেন, ঘরও ছাড়লেন, এসে উপস্থিত হলেন ওই বালির চড়ায়। প্রথম দিকে লাগাতেন শুধুই বাঁশ ও ঘাস জাতীয় গাছ। তাদের বাঁচিয়ে রাখতে নিয়মিত সকাল বিকেল পানি দিতেন। ধীরে ধীরে অন্যান্য গাছপালাও গজিয়ে উঠতে শুরু করল। তিনি সেই উদ্যমে আজও একইভাবে কাজ করে চলেছেন।

শুধুমাত্র গাছ লাগানোর মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেন না যাদব। মাটিকে উর্বর রাখতে নিয়মিতভাবে উইপোকা, কেঁচো, পিঁপড়া ও কীটপতঙ্গ ছাড়েন তিনি। তার নিজের কথায়, 'মাটির উর্বরতা বাড়াতে উইপোকা ও পিঁপড়া খুবই উপকারী। এগুলো খুব কঠিন মাটিকেও নরম করে তোলে। ভারতের নর্থ ইস্টার্ন রিজিওনাল ইনস্টিটিউট অফ ওয়াটার এন্ড ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট-এর কর্মকর্তা রিতু ঠাকুর তার কথার সঙ্গে পুরোপুরি একমত 'পিঁপড়া মাটিকে চাষযোগ্য করে তোলে এবং ভৌতভাবে এর মান বাড়ায় আর উইপোকা কতিপয় এনজাইম (জীবন্ত প্রাণীর দেহকোষে উত্পন্ন জৈব রাসায়নিক পদার্থবিশেষ, যা নিজে পরিবর্তিত না হয়ে অন্য পদার্থের পরিবর্তন সাধনে সক্ষম) নিঃসৃত করে রাসায়নিকভাবে মাটির পরিস্থিতিকে উন্নত করে।'

ধীরে ধীরে ১৫৫ একর জমি জুড়ে তৈরি করেন এই মানব সৃষ্ট বন। আসাম সরকার তার ডাকনাম অনুসারে এই বনের নাম দেন মুলাই বন। এ বন নানা প্রাণীর বাসস্থান, এমনকি বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির একশৃঙ্গ গণ্ডার, রয়েল বেঙ্গল টাইগারও রয়েছে এই তালিকায়। নানা জাতের গাছ লাগিয়ে তিনি সৃষ্টি করেছেন উদ্ভিদ বৈচিত্রও। শিমূল, বাঁশ, শিশু, ডিমারু, ভেলকো, পাম, গামারি, সোনারু, কৃষ্ণচূড়া, সেগুন প্রভৃতি ছাড়াও আরও অসংখ্য প্রজাতির গাছ লাগিয়েছেন সেখানে।

যাদবের শখ বন তৈরি করা আর পেশা হচ্ছে গরু-মহিষ পালা। তার গোমহিষের সংখ্যা পঞ্চাশের মতো। জীবিকার তাগিদে নিজ গ্রামে প্রতিদিন সকালে ফেরি করে দুধ বিক্রি করেন তিনি। তার স্বপ্ন একটাই, আরো অনেক বন তৈরি করা। শুধুমাত্র আসাম সরকারই নয়, তার কর্মের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এবং বিখ্যাত বিজ্ঞানী ড: এপিজে আব্দুল কালাম। আসামের মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগই যাদব সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, 'এমন বনপ্রেমী লোক পৃথিবীতে আর আছে কিনা আমার জানা নেই। তিনি জীবন্ত কিংবদন্তী। সদিচ্ছার পাশাপাশি লক্ষ্যে অবিচল থাকলে একজন সাধারণ লোকও যে অসাধ্যকে সাধন করতে পারে, তা তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন। তার কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। সত্যিই তিনি পূজনীয়।'