logo

হুডতোলা রিকশা

মুজতবা আহমেদ মুরশেদ


হুডতোলা রিকশা

বুকের অলিন্দ পেরিয়ে প্রত্যেকের আপন মতো একটা সবুজ চত্বর থাকে। একটা প্রশান্ত দীঘি সবারই থাকে। কিন্তু অলিন্দের ওপারে জানালাটা খুলে সহজে কেউ সেই সবুজ চত্বর, সেই প্রশান্ত দীঘি মেলে দেখায় না! সেসব একান্তই আপন। নিজের অস্তিত্ব! সেখানে এক চিনচিন করা ব্যথা বহতা নদীর মতো স্রোত তুলে। আর মানুষেরা আপন হৃদয়ের সেই চিনচিন করা হৃদয়টা এক নির্জন সময়ে আপন করে উল্টেপাল্টে দেখে। সে ব্যথার রঙ ছোঁয়। শুঁকে দেখে। কেউ হয়তো দীর্ঘশ্বাস ফেলে, কেউ আরও গহিনে তাকে ঠেলে লুকিয়ে রাখে। ওখানে অন্যদের প্রবেশাধিকার নিষেধ! বাইরে সাতাশশ' ভোল্টে শক খেয়ে মরে যাওয়ার ভয় দেখিয়ে মানুষের মাথার খুলি এঁকে লালরঙা সাইন লাগানো। আসবে না। খবরদার কিন্তু!

দূর নক্ষত্রের মতো এসব অস্পর্শিত ব্যথার শুরু হয় কোনো একচিলতে বারান্দার শেষ বিকেলে। কিংবা ঝুমবৃষ্টিতে হুড তোলা রিকশায় শ্বাসঘন দূরত্বে। অথবা জমাট কুয়াশার পোঁচ দেওয়া পার্কে, লেকের ধারে নিশ্চুপে। আবার এসবের উৎস হতে পারে কৈশোর পেরোনো প্রথম যৌবনের একতরফা উচ্ছ্বাসে।

মনের শত বিপত্তি, শত কুহেলিকা, শত জিঞ্জির পেরিয়ে এমন কোনো স্মৃতি-কাতরতা জনসমক্ষে আসতে পারে কি? পারে হয়তো, হয়তো নয়। পারলে সেসবের আদলটা নানা রকম। নানা রকমের ভেতর একটা রকম হয়তো এমন। বলি? জানাই?

সে ছিল এক দুপুর। ম্যাটম্যাটে দুপুর। ফিকে আলো। আকাশে পরত নেওয়া কিছু সিসরঙা মেঘ। সেই ম্যাটম্যাটে দুপুরে উড়তে থাকা থোকা থোকা ফিনফিনে বাতাস এদিক-সেদিক খেয়ালি। দিন-তারিখ তেমন মনে নেই। তবে এটা তো মনে আছেই, দেশ কেবল স্বাধীন। ফেব্রুয়ারিতে শীতের ঘ্রাণ মাটিতে। বাতাসে তখনও মুক্তিযুদ্ধে খুন হয়ে হারিয়ে যাওয়া মানুষদের হাহাকার। সে সময়ে আমরা ভারত থেকে শরণার্থীর জীবন ফেলে দিনাজপুর শহরের বালুবাড়ি পাড়ায় এসে উঠলাম মেজরের বাড়ি। বিঘা কয়েক জমিতে সুবিশাল জমিদারবাড়ি। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাহাড়পুরে আমাদের বাড়ি পাকিস্তানি সৈন্যরা ধ্বংস করে দেওয়ায়, দিনাজপুরে রাজনৈতিক প্রটোকলের কারণে আব্বাকে সপরিবারে এমন বাড়িতেই থাকতে দেওয়া হলো। সে পাড়াতেই ওর সঙ্গে দেখা। প্রথম দেখায় নিজে কিছু বুঝে উঠিনি। কিন্তু নতুন করে তৈরি হওয়া বন্ধু শাহিন সে মেয়েটির দিকেই আমার দৃষ্টি ফেরাল।

শোনো না, একটা কথা। ওই যে ওদিকের বাড়িতে আমরা গেলাম, সে বাড়ির মেয়েটা তোমাকে খুব দেখছিল। 

আমি অবাক শাহিনের কথায়! কেননা, এ দেখার কি অর্থ, তা বোধের বাইরে আমার। আমার অবাক চাহনির একটা আজব ব্যাখ্যা দিল সে। তোমাকে পছন্দ করেছে ও। 

এই পছন্দ বিষয়টিরও তেমন কোনো নিগূঢ় মানে জানি না আমি। প্রশ্ন করি, মানে? বুঝিনি।

বোঝোনি! শাহিন অবাক ভাবটা কাটিয়ে বলল, তুমি তো এনএনএর ছেলে। তাই তোমাকে পছন্দ। এরপর নিজেই প্রশ্ন দাঁড় করাল, ওর নাম জানো?

না তো।

শেলী।

সেই দিয়ে শুরু। সন্ধ্যায় সে মুখটাই চোখের সামনে হাজির। শাহিনের কথা বুকে ঘচাৎ করে পোঁচ দেয়, 'শেলী তোমাকে পছন্দ করে!' এ ধ্বনি এ কান হয়ে নিজেরই দু'কানে বিস্তৃত হয়। কান থেকে হূৎপিণ্ডে আজব এক আচরণের ফিসফিস। কিছু মাস পরেই মুশকিল হয়ে উঠল, পাঠ্যবইয়ে কবি পিবি শেলীর কবিতা পড়তে গিয়ে, কবির নাম উচ্চারণে বুকটা ধরাস করে ওঠে। কবি পারসি বিসি শেলী। শেলী নামটা উচ্চারিত হতেই লাখো, কোটি রক্তকণিকা মুখের ওপর দখল নেয়। সকল মানুষের অনুপস্থিতির মধ্যে শূন্যতার ভেতরেই এদিক-ওদিক তাকাই। শেলী নামের উচ্চারণ বুঝি কেউ শুনে ফেলল। জেনে গেল আমাকে আরক্তিম করে দেওয়ার জাদুকরি নাম। 

এরপর বছর বাদে পাড়ার ছেলেমেয়ে সকলেই মিলে দাঁড়িয়াবান্ধা খেলা। খেয়াল করলাম, ছেলেরা সবাই আমার পাল্লায় শেলীকেই ছেড়ে দেয়। কেউ ওকে আগলে রাখে না। হাত মেলে আটকানোর খেলাটায় মুখোমুখি দু'জন কিশোর-কিশোরী। দুটো সলাজ হাসিমুখ। চোখের সঙ্গে চোখ রেখেই ঘাসের চওড়া লাইনের এ-মাথা থেকে ও-মাথায় দৌড়। খিলখিল করে হাসতে হাসতে সেও আমার বিস্তারিত দু'হাতের ফাঁক গলে অন্য খোপে প্রবেশের চেষ্টা নেয়। 

আটকে বাধা দিতে গেলে স্পর্শ লাগে পরস্পর। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই ঝম করে ওঠে না মন। টুংটাং করে বাজনা বাজে না তখন চারদিকে। বিকেল ফুরোলে, সন্ধ্যা পেরোলে, রাত গভীর হলে ওর হাতের স্পর্শটা ফিরে আসত। ফিরে আসত প্রাণময় হয়ে। 

দুই.

এরই মধ্যে বছরগুলো ফাগুনকে সঙ্গে করে পলাতক হচ্ছে অতিদ্রুততায়। শেলীর দুধআলতা মেশানো লালিমাময় নিটোল গালে দু-তিনটে লালাভ পিমপলস। মেয়েটিকে এখন গৃহে বানানো একঝাঁক বিধির খÿ ঘা মারে। খেলতে আসা পায়ে বেড়ি বেশ শক্তপোক্ত হয়ে ওঠে। আমাদের সঙ্গে ওর আর দেখা হয় না। এখন আমরা শুধু ছেলেরা একটা দল। মেয়েরা আড়ালে। শেলীকে কি আমার দেখার তৃষ্ণা হতো? হয়তো হতো। এর উত্তর না পাওয়া গেলেও দলবেঁধে ওদের বাড়ির সামনে দিয়ে গেলেই আমার বন্ধুরা একসঙ্গে কোরাস করে, সুর ধরে, 'মুরশেদ। মুরশেদ।' এমন কোরাসের ডাকে গোধূলি আলোয় জানালার পর্দাটা দুলে ওঠে আচমকা। টের পাই ভেতরে হয়তো একজোড়া পায়েলের মৃদু সিম্ম্ফনি আড়াল নেয়। আমার বুকে দামামা। বুকের গহিনে নিজের হূৎপিণ্ড যে এত শব্দ করতে পারে, তা জানাই হতো না এমন না হলে! 

আরেকটু বড় হলাম সবাই। বাংলাদেশেও উনিশশ পঁচাত্তরের আগস্টে কালরাত নেমে এলো। বঙ্গবন্ধু খুন হলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে আমরা এ বাসা থেকে আরেক বাসায়। ছোট্ট বাসা। মার্চের গনগনে রোদ তখন। বাসার সামনে শুকনো পাতারা যূথবদ্ধ হয়ে খসখস করে ঘূর্ণি খেয়ে নাচে। তেমনি একদিনে বাসায় ষোড়শী শেলী এলো, সঙ্গে পাড়ার আরও দু'জন মেয়ে। আমার ছোট বোন ওদের সঙ্গেই স্কুলে যাবে বলে ওকে নিতে এসেছে। ঠিক তখনই বইপত্রে ঠাসা পুরনো গন্ধময় ঘরটা পেরিয়ে মুখোমুখি আমরা। অনেক কটা বছর পর দেখা। বিহ্বলতায় শোবার বিছানাটার সঙ্গে প্রায় সেঁটে গেছি। 

শেলীর শরীরে ভিন্ন ছন্দ। পুরো নারী অবয়ব। সে কাঠামোতে চোখ যেতেই দম আটকে যাওয়ার মতো দশা হলো আমার। সেখান হতে চোখ স্থাপিত ওর চোখে। অসীম সংকোচে পাটকরা ওড়না একটু টেনে নেয়। সেফটিপিনে আটকানো সাদা ওড়না স্থির থাকে। আমার নাকে অপরিচিত মিষ্টি খোশবু শিস কেটে ওঠে। সম্মোহনে আবৃত একপশলা বেসামাল খোশবু। চার চোখে চকমকি ঠুকে ছলকে ওঠে দ্যুতি। একটুখানি লম্বাটে মুখশ্রীর শেলী মুহূর্তে টকটকে লাল। অস্থিরতায় কোথায় পালাই, বুঝে উঠতে পারলাম না। মন চাইছে, এই তো সময়, জিজ্ঞেস করি কেমন আছো? অথবা কী খবর? কিন্তু আড়ষ্ঠ দুটো প্রাণ। নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার জোগাড়। এমন কোনো কথাই এলো না মুখে। 

শেলীই জিজ্ঞেস করল, ভালো আছো? এখন শরীর কেমন তোমার? কবিতার মতো ধ্বনিত ওর কণ্ঠ। 

আমার শরীর? আমার শরীরে বারো মাসে তেরো পার্বণের মতো রোগ-বিসুখ লেগেই থাকে। খবরটা ও পেয়েছে। বড় মমতায় ও প্রশ্নটা করে। 

বললাম, ভালো এখন।

কিন্তু আর কিছু বলা হলো না। ঘামছি। বুকের ভেতর এত ঢিপঢিপ শব্দ হলে তো ও শুনতে পাবে। 

ওর সামনে থেকে একরকম পালিয়েই গেলাম। 

পুরো বিষয়টাই অদ্ভুত! দু'জনেই একসঙ্গে খেলতাম। দু'জনেই দু'জনকে চিনি। খেলার জন্য ঝগড়ায় মেতেছি কতবার। আর এই নবীন বসন্তে এখন এমন হলো, যেন সাঁতার কাটছি দুটো অনিবার্য ভিন্ন স্রোতে। পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে কথা বলাই পাপ। অলঙ্ঘনীয় কোনো আদেশে আমরা শিকলে বন্দি হয়ে খাঁচায় পোরা। 

খাঁচার মধ্যে থেকে যাওয়ার সেদিনের সেই দৃশ্য-সিনেমার বারম্বার আয়োজন, আমার চোখে অবতরণ করে আমাকে সম্মোহিত করেছে কতবার! কোনো জোছনায়, অথবা স্কুল ফেরা কোনো নিপাট বিকেলে সেই দৃশ্য আমার কাছে এসে কতবার আমাকে কাতর করেছে ওকে দেখার তৃষ্ণায়! এমন বোধের অলিন্দে যখন ঘুরপাক, তখন অতি নীরবে একদিন জানলাম শেলীর বিয়ে হয়ে গেছে। 

বন্ধু আমার, বন্ধু ছিল ও। ও আর কিছু কি ছিল আমার? জানিনি তো! নিজের সঙ্গে নিজের আলাপন যুক্ত হলেও, জানিনি কোনোদিন। 

তিন.

মাঠের কচি ঘাস মাড়িয়ে, ঘাসের গন্ধে ম ম করা হাত বিস্তার করে হাতি উড়ে, চিল উড়ে, বাদুর উড়ে, পাখি উড়ে খেলার জীবনেরও বেশ কিছু বছর পর উনিশশ আশি সালের একুশে ফেব্রুয়ারি। ফাগুন এলেও শীতের আমেজ পুরো কাটেনি। দিনাজপুর নবরূপী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের আয়োজন। হালকা শীত শীত আমেজের মাঝে মাটির তৈরি পুরনো বাড়িটার পেছনে বেলতলায় মঞ্চ। মঞ্চের আশপাশজুড়ে সন্ধ্যায় বড় বড় বাতি লাগিয়ে মস্ত খোলা জায়গায় ফরাস বিছানো। ফরাসে শতখানেক বাচ্চা-কাচ্চা, তরুণ-যুবা বসা। তাদের পেছনে সার করে দাঁড়ানো আরও মানুষ। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন হলো। বক্তৃতা পর্ব চলছে। ফরাসে বসেই আমাদের সাংস্কৃতিক গুরু নাট্যজন মাজেদ রানা ও শাহজাহান শাহর কথা গভীর মনোযোগে শুনছি। 

কিছু পরেই মাজেদ স্যার জলদগম্ভীর কণ্ঠে মাইকে ঘোষণা করলেন, এবারে ছোটগল্পে প্রথম পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে আমাদের তরুণ কবি ও নবীন গল্পকার মুজতবা আহমেদ মুরশেদকে। চমকে উঠলাম। একেবারেই বিস্ময়ে হতবাক আমি! কিন্তু চারদিকে করতালি। দিনাজপুর শহরে আমার বিপুল পরিচিতি সে সময়ে। সুতরাং লোকেদের করতালি চলছেই। তবুও আমার সম্বিত ফিরে না। কেননা, আমার কাছে গল্প উনারা নিয়েছিলেন বটে, কিন্তু জানতাম না এমন কিছুর আয়োজন ছিল। 

মঞ্চে যাওয়ার ডাক পড়ছে। হাত ইশারায় মঞ্চে যেতে ডাকছে পুরস্কার নিতে। ফরাস ছেড়ে মঞ্চে। পুরস্কার গ্রহণ করলাম। করতালি চলছেই। কাঁধ ছোঁয়া চুল আর সাদা খদ্দরের চাদর জড়ানো শরীর নিয়ে দর্শকদের দিকে মুখ করে ঘুরে দাঁড়ালাম। হাত নেড়ে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। চোখ চলে গেল ফরাস পেরিয়ে দাঁড়ানো লোকদের সারিতে। 

অনেক লোকের ভিড়ে ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে প্রবল আবেগে আর উচ্ছ্বাসে হেসে হেসে হাততালি দিচ্ছে স্বল্প সোনালি কাজে তৈরি মেরুনরঙা শাল জড়ানো অপূর্ব রূপসী এক নারী। নিয়নের আলোয় সে এক উদ্ভাসিত অবয়ব। আমার নিজের ভেতর এক বিস্ময় হুড়মুড় করে উঠল! শেলী! শেলীই তো! ওর পাশে স্যুটপরা সুবেসি ভদ্রলোক। নিশ্চয়ই ওর বর। বাহ! বেশ মানিয়েছে তো দু'জনকে! মঞ্চে দাঁড়িয়ে মুহূর্ত কতক আমি স্থির শেলীর চোখ বরাবর। মাঝেমধ্যে টুপটুপ করে ঝরে পড়া বেলপাতার মাঝেই ওর চোখের মণিতে নেচে ওঠা চিকচিক দেখতে পাচ্ছি। ওর আনন্দ আমাকে উষ্ণতায় আলিঙ্গন করছে। 

প্রতিটি মুহূর্তগুলো ভাঙছে লক্ষ কোটি উপায়ে। ভেঙে ভেঙে অণু-পরমাণুতে মিলে মালা গেঁথে আমাকে টানছে। সেই অমোঘ টানে আমরা দু'জন দাঁড়িয়াবান্ধা খেলায় উচ্ছ্বাসময় হাসিতে হাসিতে ফেটে পড়ছি। দু'জনেই কারও দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে মুখোমুখি হাত মেলছি- হাতি উড়ে, চিল উড়ে, বাদুর উড়ে, পাখি উড়ে। 

মাতাল স্মৃতির ভিড়ে মঞ্চের আশপাশে কারও দিকেই আমার আর কোনো খেয়াল নেই। হালকা করে মাথা ঝুঁকিয়ে ওকেই বোঝানোর চেষ্টা আমার। আমি বুঝেছি তোমার ভাষা। আমি দেখেছি তোমাকে! দেখেছি। জেনো, এ সাহিত্য পুরস্কার আজ আমি তোমাকে দিলাম।

প্রিয় পাঠক, শুনুন- সে দেখাটা সত্যি ছিল। সত্যি দেখা হয়েছিল অতিদূর হতে ওর সঙ্গে।

এমএ/ ০০:২২/ ০৮ মার্চ