সম্পাদকের পাতা

প্রতারণা : কানাডিয়ান স্টাইল

নজরুল মিন্টো

প্রতারণা হলো সভ্যতার সবচেয়ে পুরোনো শিল্প। সেই আদম-হাওয়া থেকে শুরু করে আজকের ডিজিটাল দুনিয়া পর্যন্ত- যত উন্নত হচ্ছে সভ্যতা, ততই উন্নত হচ্ছে প্রতারণার কৌশল। কানাডার প্রতারণাগুলো একটু বেশি ‘পলিশড’, একটু বেশি ভদ্র এবং সর্বোপরি একটু বেশি ‘কানাডিয়ান’ স্টাইলের।

আইনের দেশ হওয়া সত্ত্বেও আইনকে ফাঁকি দেওয়ার ঘটনা এদেশে হরহামেশাই ঘটছে। কোথাও কোথাও এটা বৈধ বা লিগ্যাল হয়ে গেছেও বলা যায়। ফ্রড আর ট্রিকের ইংরেজী বানান ছাড়া আভিধানিক অর্থে তেমন কোন পার্থক্য যদিও নেই তবুও কানাডার লোকেরা সহজে ফ্রড শব্দটা ব্যবহার করে না। ট্রিকি হতে পারার মধ্যে কোথাও যেন বাহাদুরী আছে! গাড়ি কিনতে যান, বাড়ি কিনতে যান, বীমার পলিসি কিনুন অথবা আইনজীবীর কাছে যান সবখানেই একই অবস্থা। আপনাকে সতর্ক হয়ে কথা বলতে হবে। বুঝতে হবে। ধীরে সুস্থে এগুতে হবে। তারপর পকেটে হাত দিন অথবা কলম বের করুন। আবেগে আপ্লুত হলেই কিন্তু গচ্চা!

গ্রাহকদের আকৃষ্ট করার জন্য এখানে নানা পন্থা অবলম্বন করা হয়। যেমন কোন কোন দোকানের সামনে লাগানো আছে ‘মেগা সেল, আপ টু ৯০%’। গিয়ে দেখা যাবে সব ক’টাতেই লাগানো আছে ১০% অফ। ফটো কপির দোকানে লেখা প্রতি কপি মাত্র ৩ সেন্ট। কাজ করিয়ে পয়সা দিতে গেলে দেখা যায় নিয়েছে ট্যাক্সহ ২২ সেন্ট। জিজ্ঞেস করলে হেসে হেসে বলবে এক হাজার কপির উর্ধ্বে ফটোকপি করলে তখন ৩ সেন্ট। এসব হচ্ছে ট্রিকস্।

চাকুরির বিজ্ঞাপনগুলো আরও নাটকীয়। টরন্টোর রাস্তায়, সাবওয়েতে, ক্যাফেতে সর্বত্র ছড়িয়ে আছে চাকুরির বিজ্ঞাপন। এমনিতে দেখবেন বাজারে চাকুরি নেই কিন্তু বিজ্ঞাপন দেখলে মনে হবে চাকুরির অভাবই নেই। প্রথম প্রথম কানাডায় এসে এসব বিজ্ঞাপন দেখে বন্ধু বান্ধবদের সাথে তর্ক জুড়ে দিতাম। পরে দেখলাম এখানে চাকুরী দেওয়ার জন্য প্রচুর এজেন্সী রয়েছে। আর এজেন্সীর বিজ্ঞাপনই সারা দেশে সয়লাব।

চাকুরির নামে ব্যবসা! আপনি ফরম ফিল-আপ করবেন, আপনার ইন্টারভিউ নেওয়া হবে, আপনি ইন্টারভিউতে পাসও করবেন। তারপর আপনাকে বলা হবে ফাইল প্রসেসিং ফি দেয়ার জন্য। স্থানভেদে ২৫০ অথবা ৩০০ ডলার হতে পারে। এ কথা শুনে আপনি আশ্চর্য হতে পারেন! আবার লোকজনের ভিড় দেখে মনে হতে পারে সবাইতো আর আপনার মতো বেকুব নয়। আপনি ফি দেবেন। অতঃপর সত্যিকার অর্থে বেকুবদের খাতায় নাম লিখিয়ে ঘরে ফিরবেন।

শত শত বিজ্ঞাপণের ফাঁকে ফাঁকে রয়েছে বিভিন্ন সার্ভিসেস, মডেলিং এজেন্সী, বিভিন্ন বানিজ্যিক শিক্ষালয় এবং অর্থ ধার দেয়ার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপণ। বিজ্ঞাপনদাতারা তাদের টার্গেট ক্লায়েন্টদের উদ্দেশ্য করেই সুন্দর করে শব্দ সাজায়। যেমন, অর্থ ধার দেওয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন হচ্ছে ‘আপনার আর্থিক রেকর্ড ভালো মন্দ যাই থাকুক না কেন, কোন ধরনের তদন্ত ছাড়াই আমরা আপনাকে ধার দিতে পারি। কোন জামানত দিতে হবে না। নিশ্চয়তাকারী বা কোন জামিনদার লাগবে না। ২৪ ঘন্টা আমরা সার্ভিস দিয়ে থাকি। ফোন করুন…।’

আমার এক পরিচিত বাঙালি একবার অতি উৎসাহে এক কোম্পানীকে ফোন করে পাঁচ হাজার ডলার চাইলো। সাথে সাথে অ্যাপোয়েন্টম্যান্ট। যাওয়ার পর ঐ কোম্পানীর কর্মকর্তা একজন বললো, ‘কোন অসুবিধা নেই, সঠিক সময়ে সঠিক স্থানে এসেছো। এই ফরমটা পূরণ করে ২৫০ ডলার ফি হিসেবে জমা দিলে এখনই তোমার ফাইল প্রসেসিং শুরু করে দিতে পারি। আমরা প্রথম দু’মাসের সুদ নিই না। অতএব তুমি অতিরিক্ত কোন টাকা দিচ্ছো বলে মনে করো না!’

আমার সেই পরিচিতজন খুশীতে গদগদ হয়ে তৎক্ষনাৎ ২৫০ ডলার দিয়ে ফরম পূরণ করে বাড়ি এসে দিল লম্বা ঘুম। পাঁচ হাজার ডলার দিয়ে কি কি করবে তার একটা লিষ্টও ঐ রাতে তৈরি করে ফেললো।

একদিন যায়। দু’দিন যায়। ফোন করে। আজ পিটার নেই, কাল জেমস নেই, পরশু অ্যাপ্লিকেশন প্রসেসিং-এ আছে। …অতঃপর দুই সপ্তাহ পরে জানা গেলো অনিবার্য কারনবশতঃ এ অ্যাপ্লিকেশন অনুমোদন হয়নি।

সাথে সাথে ভদ্রলোক ছুটলো সে অফিসে। বললো আমার ২৫০ ডলার ফেরৎ দাও। কোম্পানীর কর্মকর্তা আশ্চর্য হয়ে বললো, এটাতো তুমি আমাদের প্রসেসিং ফি হিসেবে দিয়েছো। কাগজটা পড়োনি? এই যে তোমার দস্তখত! ফি-র টাকা ফেরৎ দেওয়ার নিয়ম কোম্পানীর পলিসিতে নেই।

শপিং মলগুলোর মধ্যেও এমন প্রতারণার কৌশল রয়েছে। ছুটির মৌসুমে ‘বড় ডিসকাউন্ট’ দিয়ে পুরনো, নষ্ট বা কম মানের পণ্য বিক্রি করা হয়। অনেকে ফাঁদে পড়ে যায়, বিশেষ করে নতুন অভিবাসীরা।

অনেক দোকানে কুপন বা মেম্বারশিপের নামে অতিরিক্ত চার্জ নেওয়া হয়, যা পরে বোঝা যায়। অনলাইন কেনাকাটার ক্ষেত্রেও জাল ওয়েবসাইট বা স্ক্যাম ব্যবসায়ীরা আছে, যারা নকল পণ্য পাঠায়।

গাড়ি কিনতে যান- বুঝতে পারবেন ধান্দা কত প্রকার ও কি কি! ডিলাররা পুরনো গাড়ির দাম নতুন গাড়ির মূল্যের সঙ্গে সমন্বয়ের কথা বলে। কিন্তু আসলে এটা ফাঁকি। কয়েকটি দোকান ঘুরলেই বুঝবেন, শিকার ধরার জন্যই সাজানো কি সুন্দর তাদের কৌশল।

অনেক সময় কার ডিলাররা বলে, ‘আজই কিনতে হবে, নইলে অফার শেষ!’ কিন্তু দুই সপ্তাহ পরে গিয়েও দেখবেন, সেই একই গাড়ি একই দাম লেখা আছে!

কানাডায় বহু ধরনের স্কুল কলেজ আছে যেগুলোকে সাইনবোর্ড সর্বস্ব বলা হয়ে থাকে। পর্দার আড়ালে তাদের আসল ধান্দা আদম ব্যবসা। আগেও ছিল, এখনও আছে। স্কুল ব্যবসার সময় ছিল নব্বই দশক। ঐ সময়ে কানাডার বিভিন্ন শহরে-বন্দরে ব্যাঙের ছাতার মতো স্কুল গজাতে শুরু করে। বেশির ভাগই ল্যাংগুয়েজ, কম্পিউটার এবং ভকেশনাল শিক্ষার নামে। বাহারি নামের একেকটি স্কুল। কোথাও কোথাও লিখা হতো কলেজ।

‘কলেজ’ শব্দটি কানাডার স্বীকৃত কোন শিক্ষা স্তর নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এশীয়দের আকৃষ্ট করার জন্যই শব্দটি ব্যবহৃত হয়। আবার এমন সব নামসর্বস্ব বিশ্ববিদ্যালয় আছে যেখান থেকে কয়েকশত ডলারের বিনিময়ে ডক্টরেট ডিগ্রী পাওয়া যায়।

বিদেশী শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করার জন্য এইসব প্রতিষ্ঠান নানান ধরনের বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রলোভিত করে। এমনকি চাকুরীর নিশ্চয়তা, মোটা বেতনের কথাও ঐসব বিজ্ঞাপনে উল্লেখ থাকে। বাস্তবে দেখা গেছে তাদের সবকিছু ভূয়া এবং এসব স্কুল থেকে যে সার্টিফিকেট দেয়া হয় তার কোন মূল্য কোথাও নেই।

চুটিয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছিল এসব প্রতিষ্ঠান। অবশেষে তাদের প্রতারণা ধরা পড়ে এবং জারিজুরি ফাঁস হয়ে যায়। অনেক প্রতিষ্ঠান আপনা-আপনি বন্ধ হয়ে যায়। জানা গেছে, বহু শিক্ষার্থী এভাবে প্রতারিত হয়ে অর্থ ও জীবনের অনেক মূল্যবান সময় অপচয় করেছেন।

১৯৮৯ সালে আমি নিজে এ ধরনের এক চক্করে পড়েছিলাম। ডাউন টাউনের একটি বিজনেস স্কুলের বিজ্ঞাপন আমার দৃষ্টি আকর্ষন করে। পরদিনই কো-অর্ডিনেটর-এর সাথে আলাপ করতে গেলাম।

স্কুল থেকে যে ব্রোশিওর ছাপা হয়েছে তাতে প্রতিটি কোর্সের সময় সীমা, ফী, চাকুরীর বাজার ইত্যাদি সম্পর্কে তথ্য দেয়া আছে। আমার পছন্দকৃত বিষয় ‘সাউন্ড টেকনিশিয়ান’ কোর্সটি ঐ বছরই তারা শুরু করতে যাচ্ছে বলে জানা গেলো। দেখলাম চাকুরির বাজারে এর ভাল চাহিদাও রয়েছে। মাত্র ৩০টি সিট। দেরি না করে সেদিনই প্রথম টার্মের ফী জমা দিয়ে ঘরে ফিরলাম। সে যে কত প্রস্তুতি! কত রকমের স্বপ্ন দেখা শুরু!

ক্লাশ শুরুর নির্দিষ্ট দিন স্কুলে গিয়ে শুনি পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী না পাওয়ায় এ কোর্স বাতিল করা হয়েছে। কোন চিঠি নেই, কোন নোটিশ নেই এ কেমন কথা! আমাকে বলা হলো অন্য একটি বিষয় পছন্দ করতে।

আমি তাদের এহেন ব্যবহারে এতই রুষ্ট হয়েছি যে ফ্রি শিখালেও সেখানে থাকতাম না। কোর্স ফি বাবদ দেয়া অর্থ ফেরত চাইলাম। রিফান্ড দেয়ার নিয়ম নেই, আগামী সেমিষ্টারে ক্লাস শুরু হবে গ্যারান্টি ইত্যাদি বলে তারা অর্থ না দেয়ার নানান টাল বাহানা শুরু করলো। আমিও নাছোড় বান্দার মতো ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে সে টাকার একাংশ আদায় করতে সক্ষম হই।

বলা যায়- এটাও এক ধরনের শিক্ষা!


Back to top button
🌐 Read in Your Language