
লুটেরা বিরোধী আন্দোলনের শুরু থেকেই আমরা বলে এসেছি, এই আন্দোলন কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, বাংলাদেশ থেকে গরীবের শত শত কোটি টাকা চুরি করে আসা সকল চোর ও লুটেরাদের বিরুদ্ধে। যেখানেই এই চোরের দলের দেখা মিলবে, সেখানেই প্রতিবাদ, সেখানেই প্রতিরোধ। আমাদের প্রাণের শহীদ মিনার নির্মাণের সংগঠন IMLDM তে এমনই এক লুটেরার খোঁজ যখন পাওয়া গেলো, তখন আমরা অত্যন্ত বিনয়ের সাথে IMLDM নেতৃবৃন্দকে অনুরোধ করেছিলাম ওই বিতর্কিত ব্যাক্তিদের কমিটি থেকে বাদ দিতে। খেয়াল করে দেখবেন লুটেরা বিরোধী আন্দোলনের পক্ষ থেকে যারাই ফেসবুকে লিখেছি, প্রতিবারই কিন্তু একই সাথে IMLDM এর নেতৃবৃন্দকে শহীদ মিনার নির্মাণে তাঁদের ভূমিকার জন্য ধন্যবাদও জানিয়েছি । আমাদের এই ধরণের লেখার কারণ ছিল IMLDM নেতৃবৃন্দ যাতে বুঝতে পারেন যে আমাদের আন্দোলন তাদের বিরুদ্ধে নয়, নির্মাণাধীন শহীদমিনারের বিরুদ্ধে তো নয়ই, শুধুমাত্র চিহ্নিত লুটেরাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু বিনিময়ে আমরা IMLDM এর মেরুদন্ডহীন প্রেসিডেন্ট, চেয়ারম্যান এবং কিছু সহযোগী ডিরেক্টরের মুখে শুধু অবজ্ঞার কথা শুনেছি। আমাদের আন্দোলনকে “গুটিকয় মানুষের” কথা বলা হয়েছে, চিহ্নিত লুটেরাকে সুযোগ করে দেয়া হয়েছে কমিউনিটির নেতৃবৃন্দকে নোংরা ভাষায় আক্রমণ করার। বাংলা ভাষায় কথা বলা IMLDM এর বোর্ডকে বাংলায় চিঠি দেওয়াতে বার বার বলা হয়েছে চিঠিটি আবার ইংরেজিতে অনুবাদ করে পাঠাতে। আমরা তখনই বুঝতে পেরেছি, লুটেরা আর তাদের বেনিফিসিয়ারিদের স্বার্থ রক্ষার মাধ্যমে IMLDM নেতারা তাদের চেয়ার বাঁচাতে চেয়েছেন। শহীদমিনার গোল্লায় যাক, তাদের পদ-পদবীর লোভ সবার উপরে। এর পরেও দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া পর্যন্ত আমরা ধৈর্য ধারণ করেছিলাম।
IMLDM এর শুরু থেকে প্রতিটি পদক্ষেপে আমরা টরোন্টোবাসী নিঃশর্ত সমর্থন জানিয়েছি, তাদের আয়োজিত সভা সহ ফান্ডরাইজিঙ ডিনার সবখানেই উপস্থিত থেকে আর্থিক আর মানসিক সমর্থন দিয়েছি ( যেখানে গণহারে ডিরেক্টর পদ নিয়েও অনেকে একটা ডলার অনুদান দেয়নি বা কোনো কাজ করেনি)। অথচ ছোট্ট বাচ্চার পকেট-মানি ২০ ডলার থেকে শুরু করে ১০০ ডলারের ডিনার টিকেট অথবা কষ্টের সৎ কামাই থেকে ২০০ ডলার এভাবেই সিংহভাগ টাকা ব্যক্তিগতভাবে বা বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে আমরাই অনুদান হিসেবে ফান্ড রেইজ করে দিয়েছি। আশা করেছিলাম সেই IMLDM এর নেতৃবৃন্দ এমন কোন কাজ করবেননা যেটাতে শহীদমিনারের নির্মাণকাজ কলংকিত হয়। কিন্তু অবাক হয়ে দেখেছি যে আমাদের এতো অনুরোধ, অনুনয়, বিনয়েও কোন কাজ হচ্ছিল না।

আপনারা জানেন সংগঠনের আইনের মধ্যে থেকেই লুটেরাদের অপসারন সম্ভব ছিল, আমরাই তা বারবার মনে করিয়েও দিয়েছি। অথচ কোনো এক অজানা কারণে IMLDM নেতৃবৃন্দ কিছুতেই লুটেরাদের বাদ দিতে রাজি ছিলেন না। তবে ধীরে ধীরে আমরা বুঝলাম, সূর্যের চেয়ে বালির গরম যেমন বেশি, তেমনি লুটেরাদের চেয়ে তাদের বেনিফিসিয়ারীদের তেজ বেশি। যে আহ্বান ছিল প্রাণের শহীদমিনারকে কলঙ্কিত মানুষগুলোর থাবা থেকে বাঁচানোর, সেই আন্দোলনকেই ওই বেনিফিসিয়ারিরা শহীদ মিনারের মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা করে। ছল-চাতুরী, সময়ক্ষেপন, মিথ্যা রটনা, অসভ্য কথাবার্তা, কত রকম চেষ্টাই না করা হলো। কিন্তু কথায় বলে, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। লুটেরা আর তাদের বেনিফিসিয়ারিদের সব ছলচাতুরী, হুমকী উপেক্ষা করে আমরা লড়ে গিয়েছি। অবশেষে লুটেরা আর তাদের বেনিফিসিয়ারিরা ন্যায্য গণদাবীর কাছে মাথা নোয়াতে বাধ্য হয়েছে। সত্যের পথে থেকে এই পথ পেরুতে গিয়ে IMLDM থেকে বিদায় নিয়েছেন অনেক নিবেদিতপ্রাণ পরিচালক। হ্যা, IMLDM এর ডিরেক্টর পদ হয়তো উনারা স্বেচ্ছায় হারিছেন, কিন্তু তারা সাধারন মানুষের হৃদয়ে যে স্থান করে নিয়েছেন সেটা নিশ্চিত করে বলা যায় । সেটা আজকের বিজয়ের কার ৱ্যালিতে অগনিত মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই প্রমান করে দেয় I

৭ জনের বর্তমান কমিটি একটা হাস্যকর পদক্ষেপ। আর যে সময়ে এসে উনারা এই ৭ সদস্যের কমিটি করেছেন, সেটাও উনাদের সৎ উদ্দেশ্যের অভাবকেই আরো পরিষ্কারভাবে সামনে নিয়ে এসেছে । এব্যাপারে দুইটা কারণ সংক্ষেপে বলি, কারণ মানুষের জানা দরকার।
(১) যতদূর জানি IMLDM শুরু হয় ৩ জন ডিরেক্টর নিয়ে। এক বছর পর সেটা ৯ জনে দাড়ায়। এভাবে চলে ৩/৪ বছর। এর পর ১৭ জন। টাকা পয়সাও উঠেছিল লাখের কাছাকাছি। এর পরই শুরু হয় ঠেলাঠেলি। ২০১৬/১৭ সালের কথা, IMLDM এর প্রতিষ্ঠাতা সাধারন সম্পাদক ব্যারিস্টার রিজুয়ানের বাসায় এক নৈশভোজে রিজুয়ান উপস্থিত সাংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দকে IMLDM সংগঠনে পরিচালক পদে যোগ দেবার উদাত্ত আহ্বান জানায়, যেখানে আমিও উপস্তিত ছিলাম । তখন IMLDM এর পরিচালক ছিলেন ১৫/১৬ জন। রিজুয়ান বলেছিল যে শহীদমিনার নির্মাণের মতো কাজে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সরাসরি যুক্ত থাকা উচিৎ। কিন্তু উপস্থিত ১৪ টি সংগঠনের নেতৃবৃন্দ মত দেন যে শহীদমিনার নির্মাণে IMLDM এর বর্তমান ১৫/১৬ সদস্যের কমিটিই যথেষ্ট। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলি বরং বাহিরে থেকে সহায়তা করে যাবে। কিন্তু পরবর্তীতে কেন বা কিভাবে এই IMLDM বোর্ড ২১, ৩৭ ইত্যাদি নানান সংখ্যার হলো, সেটাই এক অবাক করা ব্যাপার।

আমাদের আন্দোলনের সময় IMLDM এর যে দুই একজন বলদ টাইপের মানুষ বলেছেন যে পদ পদবীর লোভে IMLDM কে টার্গেট করা হচ্ছে। তাদেরকে বলি, অরে ভাই আমরা তো ২০১৬ তেই পদের ব্যাপারে না করে দিয়েছি। আপনাদের মতো রাতের আধারে জিম্মি করে পদ দখল করা, আর ওই পদ ধরে রাখতে শহীদমিনার কলংকিত করা আমাদের খাইসলত না। সেইতো ঘুরে ফিরে আবার ৭ জনেই এলেন, তাহলে মাঝের এই দুই বছরে এতো ঠেলা-ঠেলি কি জন্য, কার বা কাদের চাপে, সেটা জানার অপেক্ষায় থাকলাম।
(২) আজকে উনারা যেভাবে গঠনতন্ত্রের মধ্যে থেকেই (উনাদের ভাষায় সর্বস্মতিক্রমে) এই কমিটিকে ৭ সদস্যে নামিয়ে আনলেন, এই কাজটা ২/৩ মাস আগে করলেননা কেন? এটা কি প্রমান করেনা যে আসলে উনাদের সদিচ্ছার প্রচন্ড অভাব ছিল? আমরা এতো “জ্ঞানী” না, সেই আমরাই তো মাসের পর মাস ধরে উনাদের বোঝাতে চাইলাম যে আপনারা চাইলেই পারেন। আমাদের আন্দোলন করার, চাপ তৈরির দরকারই হতো না। সেটা না করে উনারা আমাদের ব্যক্তিগত আক্রমণ করলেন, ভাড়ার টাট্টু আনলেন আমাদের অপমান করতে, গুজব ছড়াতে। তাহলে কি ব্যাপারটা ঐরকম যে “কেউ করে মিষ্টি কথায়, কেউ করে তেতো কথায়”।

এতো কিছুর পরও আমরা চাই ওনারা আর কোনো রকম ছলচাতুরী বা সময়ক্ষেপণ না করে যত দ্রুত সম্ভব শহীদ মিনারটি সিটি অফ টরন্টোর কাছে হস্তান্তর করবেন। আর আমরা সবাই মিলে একটি সাবর্জনীন কমিটির নেতৃত্বে একুশের আয়োজন করবো। এই কমিটিতে টরোন্টোর প্রতিটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। তবে একথা ভুলে গেলে চলবেনা যে লুটেরাদের বেনিফিসিয়ারিরা এখনো দলবল নিয়ে আছে, কেউ প্রকাশ্যে, কেউ ঘাপটি মেরে। IMLDM এর বর্তমানের ৭ সদস্যের কমিটিতেও তাদের চেহারা বা ছায়া দেখি। তবে আপনারা ভুলে যাবেন না, টরোন্টবাসি লুটেরাদের সহযোগীদের এখন ঠিকই চিনে নিয়েছে । যতই রং মাখেন, মুখোশ পরেন, আপনাদের আসল চেহারা আর আড়াল করতে পারবেন না।
লুটেরা বিরোধী আন্দোলনের এই বিজয় সৎ আর সুন্দরের পক্ষের প্রতিটি মানুষের বিজয়। তাই এই আন্দোলনের সাথে যারা প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ, ও মৌনভাবে সমর্থন দিয়েছেন তাদের সবাইকে ধন্যবাদ , অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা !
লুটেরা বিরোধী আন্দোলন একটি চলমান প্রক্রিয়া, আমাদের এই সংগ্রাম চলবেই । শুধু টরন্টো না, এই কানাডার যে কোণায়-ই লুটেরা আর তাদের বেনিফিসিয়ারিরা লুকিয়ে থাকুকনা কেন, তাদের খুঁজে বের করা হবে, সমাজে তাদের মুখোশ খুলে দেয়া হবে। আগামীতে আমার সোনার বাংলার অসহায় মানুষের টাকা চুরি করে আসা কোনো কুলাঙ্গার যাতে কানাডায় আসার আগে দশবার চিন্তা করে, সেই পরিবেশ তৈরী করা হবে। ওরা এতদিন ওদের টাকার জোর দেখেছে, এখন দেখবে সাধারন মানুষের একতার জোর। ওদের দশ দিন শেষ, এখন গৃহস্তের এক দিন শুরু।
আসুন আমরা লুটেরাদের দেখলেই বলি “তুই লুটেরা” এবং তাদের চিহ্নিত সহযোগীদের না বলি ।
নওশের আলী, টরন্টো









