মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন মোড়: একজোট হচ্ছে পাকিস্তান, তুরস্ক, মিশর ও সৌদি আরব

ইসলামাবাদ, ৯ এপ্রিল – আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সম্প্রতি এক নতুন মেরুকরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা নিরসনের লক্ষ্যে পাকিস্তান, তুরস্ক, মিশর এবং সৌদি আরব একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক ব্লক হিসেবে আত্মপ্রকাশের চেষ্টা করছে। গত মাসে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত এই চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ইসলামাবাদে ওই বৈঠকের মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা বৈশ্বিক কূটনীতির একটি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ গত ৮ এপ্রিল এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। উভয় পক্ষ পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে আবারও ইসলামাবাদে আলোচনায় বসতে যাচ্ছে। কূটনৈতিক এই তৎপরতা মূলত ইরান ও ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া আঞ্চলিক মেরুকরণের বাইরে একটি বিকল্প ব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে। এক সময়কার প্রভাবশালী দেশ ইরান ও ইসরায়েল বর্তমানে এই অঞ্চলে অনেকটাই একাকী হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে তুরস্ক ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলো নতুন করে নেতৃত্বের সুযোগ পাচ্ছে।
২০২০ সালে স্বাক্ষরিত আব্রাহাম অ্যাকর্ডের মাধ্যমে যে স্থিতিশীলতার স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, তা এখন অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের দাবিতে সৌদি আরবের অনড় অবস্থান এবং ইসরায়েলি পার্লামেন্টের বিরোধিতার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নিয়েছে। নতুন এই জোট গঠনের পেছনে তুরস্কের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কের অবনতি বড় একটি প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। গাজা সংঘাতের জের ধরে ২০২৪ সাল থেকে তুরস্ক ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। পাশাপাশি কাতারও পশ্চিমা বিশ্বের কাছে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আগের অবস্থান হারিয়েছে।
অন্যদিকে ইরান ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। সৌদি আরব ও কাতারের জ্বালানি স্থাপনায় হামলার অভিযোগ ওঠার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে তেহরানের গ্রহণযোগ্যতা তলানিতে নেমেছে। রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় থাকলেও চীন ও হুথিদের কাছ থেকে ইরান আগের মতো জোরালো সমর্থন পাচ্ছে না। অস্থিতিশীল এই পরিস্থিতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক এবং মিশর নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করার মধ্য দিয়ে নতুন আঞ্চলিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছে। এই চারটি রাষ্ট্রই ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিষ্ঠিত ‘বোর্ড অফ পিস’ এর সদস্য।
ঐতিহাসিকভাবে এসব দেশের মধ্যে নানা মতপার্থক্য থাকলেও বর্তমান বাস্তবতায় তারা একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অর্থনৈতিক এবং সামরিক নিরাপত্তার অভিন্ন স্বার্থে তারা এখন এক ছাতার নিচে অবস্থান নিয়েছে। ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে এই চার দেশের ঐক্যবদ্ধ হওয়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পাকিস্তানের কাছে রয়েছে পারমাণবিক সক্ষমতা ও বিশাল সেনাবাহিনী, আর সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি তেলের মজুদদার। একইভাবে মিশর সুয়েজ খালের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে এবং ন্যাটোর সদস্য তুরস্কের রয়েছে অত্যন্ত উন্নত সামরিক শিল্প।
এই চার দেশের সম্মিলিত জনসংখ্যা প্রায় ৫০ কোটি, যার ফলে তারা মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায়, সৌদি আরব ও মিশরের মধ্যে আদর্শগত লড়াই এক সময় অত্যন্ত প্রকট ছিল। প্যান-আরব জাতীয়তাবাদ বনাম রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার সেই দ্বন্দ্ব বর্তমানে প্রেসিডেন্ট সিসি এবং যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মাধ্যমে দূর হয়েছে।
একইভাবে সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে তৈরি হওয়া চরম উত্তেজনা ২০২২ সালের পর থেকে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে প্রশমিত হয়। দেশগুলো এখন নিজেদের দ্বিপাক্ষিক তিক্ততা ভুলে বৃহত্তর আঞ্চলিক স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান এশিয়া ও ইউরোপকে সংযুক্ত করার জন্য বেশ কিছু ভূ-অর্থনৈতিক প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। মিডল ইস্ট করিডোর প্রকল্পের মাধ্যমে পারস্য উপসাগর থেকে ইউরোপ পর্যন্ত অর্থনৈতিক সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা চলছে। পাকিস্তান ও সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে কিছু প্রশ্ন থাকলেও, বর্তমান যুদ্ধাবস্থায় পাকিস্তান যেভাবে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে, তা তাদের পারস্পরিক বিশ্বাসের জায়গাকে আরও মজবুত করেছে।
এস এম/ ৯ এপ্রিল ২০২৬









