কানাডা

টরন্টোতে উচ্চারণ-এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন

টরেন্টো ,৩০ মার্চ – গত ২৯ মার্চ নগরীর বাংলাদেশ সেন্টার মিলনায়তনে আবৃত্তি সংগঠন “উচ্চারণ” তাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করল “আনন্দধারা বহিছে ভুবনে” শিরোনামে। কিন্তু এটিকে কেবল একটি আয়োজন বলা ঠিক হবে না; এটি ছিল একসঙ্গে থাকার, একে অন্যকে অনুভব করার, আর ভাষাকে নতুন করে ভালোবাসার এক উপলক্ষ।

শুরুটা হয়েছিল শিশুদের দিয়ে। ছোট ছোট কণ্ঠ, কিন্তু সেই কণ্ঠের ভেতরে ছিল অদ্ভুত এক উজ্জ্বলতা। “উচ্চারণ উচ্ছ্বাস” বিভাগের ১১ জন শিশু যখন মঞ্চে উঠল, তখন তারা কেবল একটি পরিবেশনা উপস্থাপন করেনি। তারা যেন পুরো মিলনায়তনের বাতাস বদলে দিল। “হাসির সুতোয় বোনা” শিরোনামের সেই পরিবেশনায় ছিল শিশুসুলভ সরলতা, ছিল নির্মল আনন্দ, আর ছিল শেখার নির্ভার আনন্দময়তা। তাদের চোখে কোনো দ্বিধা ছিল না, কণ্ঠে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না। দর্শকদের করতালি যেন থামতেই চাইছিল না। আরিয়ান হকের নির্দেশনায় এই পর্বটি হয়ে উঠেছিল এমন এক মুহূর্ত, যেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেখে ভরসা জন্মায়।

এরপর অনুষ্ঠান ধীরে ধীরে প্রবেশ করে আরেকটি স্তরে। মম কাজীর সঞ্চালনায় দ্বিতীয় পর্বের শুরুতেই এক নীরব মুহূর্ত। উচ্চারণ সদস্য শামীমা হুমায়রার মায়ের প্রয়াণে এক মিনিট দাঁড়িয়ে সবাই শ্রদ্ধা জানালেন। সেই এক মিনিটে কোনো শব্দ ছিল না, কিন্তু ছিল গভীর সংযোগ। যেন সবাই নিজের ভেতরের অনুভূতিকে একটু ছুঁয়ে দেখলেন।

স্বাগত বক্তব্যে রাশীদা মুনীর যখন উচ্চারণের কথা বলছিলেন, তখন বোঝা যাচ্ছিল এটি কেবল একটি সংগঠন নয়। এটি একটি পরিবার, যেখানে শব্দ মানুষকে যুক্ত করে। নাজমা কাজী গত এক বছরের কর্মকাণ্ড তুলে ধরলেন এমনভাবে, যেন প্রতিটি উদ্যোগের পেছনে একটি গল্প আছে, একটি চেষ্টার ইতিহাস আছে।

এরপর মঞ্চে আসে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা। থিম কবিতাকে সুরের সঙ্গে বেঁধে, তার সঙ্গে নৃত্যের প্রকাশ যোগ করে পারমিতা তিন্নি এক ধরনের আবেশ তৈরি করলেন। মনে হচ্ছিল কবিতা আর কেবল শব্দে সীমাবদ্ধ নেই, এটি দেহভাষায় ছড়িয়ে পড়েছে, দৃশ্য হয়ে উঠেছে।

ফ্লোরা নাসরিন ইভা, নাজমা রাজী ও তানিয়া নূর পুঁথির সুরে যখন একে একে সদস্যদের নাম ধরে স্বাগত জানালেন, তখন সেটি আনুষ্ঠানিকতা ছাপিয়ে এক ধরনের আন্তরিকতায় রূপ নেয়। প্রত্যেকেই যেন নিজেকে আলাদাভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করলেন সেই মুহূর্তে।

অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার মাসের আবহে শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। সেই আবেগ আরও গভীর হয়ে ওঠে সৈয়দা রোকসানা বেগমের কণ্ঠে “এক নদী রক্ত পেরিয়ে” গানটির মাধ্যমে। গানটি মিলনায়তনের ভেতরে এক ধরনের ইতিহাসের অনুরণন তৈরি করে, যেখানে ব্যক্তিগত আনন্দও সাময়িকভাবে থেমে গিয়ে জায়গা করে দেয় সম্মিলিত স্মরণে।

কেক কাটার সময়টা ছিল পুরো অনুষ্ঠানের সবচেয়ে উচ্ছ্বসিত অংশগুলোর একটি। সবাই যেন হঠাৎ করে আরেকটু কাছাকাছি চলে আসে। হাসি, গান, নাচ একসঙ্গে মিশে গিয়ে একটি সহজ আনন্দ তৈরি করে। এরপর শুরু হয় একের পর এক মজার আয়োজন। ফানবক্স, আবৃত্তি সংবাদ, স্মৃতিশক্তি পরীক্ষা, তাৎক্ষণিক বক্তব্য, দলীয় ছড়া প্রতিযোগিতা।

অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে তাৎক্ষণিক পরিবেশনায় অংশ নেন শিখা আখতারি আহমাদ, মারুফ হোসেন ও ফারজানা মনি। তাঁদের পরিবেশনা অনুষ্ঠানে যুক্ত করে নতুন মাত্রা। পাশাপাশি আইন, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁদের অনুভূতি ব্যক্ত করেন। উপস্থিত ছিলেন শওগাত আলী সাগর, আসমা আহমেদ মাসুদ, নজরুল মিন্টো, সালমা বানী, ব্যারিস্টার জয়ন্ত সিনহা, আহমেদ হোসেন, মাহমুদুল ইসলাম সেলিম, রফিক আলম, শারমিনা নাসরিন, ফজলুল হক সৈকত, কবি বাদল ঘোষ, মির্জা রহমান, নুসরাত জাহান চৌধুরী, মুনিরা সুলতানা মিলিসহ আরও অনেকে।

প্রতিটি অংশেই অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের ভেতরের আনন্দকে মুক্তভাবে প্রকাশ করেন।

সবশেষে ছিল র‍্যাফল ড্র। পুরো আয়োজনের নেপথ্যে ছিলেন জামিল বিন খলিল। তাঁর পরিকল্পনা ও পরিচালনায় অনুষ্ঠানটি ছিল সুসংগঠিত, স্বাভাবিক এবং প্রাণময়।

কিছু আয়োজন শেষ হয় না। তারা মানুষের মনে থেকে যায়, বারবার ফিরে আসে, আর ধীরে ধীরে একদিন নিজেই হয়ে ওঠে একটি উচ্চারণ।


Back to top button
🌐 Read in Your Language