এশিয়া

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে সবচেয়ে বেশি কৌশলগত সুবিধা পাচ্ছে রাশিয়া

তেহরান, ২৩ মার্চ – মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ইরান সংকট ও যুদ্ধাবস্থাকে কেন্দ্র করে বিশ্বরাজনীতির সমীকরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৌশলগত বিশেষজ্ঞ ড. অ্যান্ড্রু এ. মিকটার মতে, এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে রাশিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ ও সামরিক শক্তি যখন মধ্যপ্রাচ্যের দিকে স্থানান্তরিত হয়েছে, তখন ভ্লাদিমির পুতিন ইউরোপে নিজের অবস্থান আরও সংহত করার সুযোগ পেয়েছেন। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ যখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের আড়ালে চলে গেছে, তখন কিয়েভের প্রতিরোধ ভেঙে দেওয়ার জন্য সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি নিচ্ছে মস্কো। মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পদ ইরানি ফ্রন্টে ব্যবহৃত হওয়ায় ইউক্রেনের জন্য বরাদ্দকৃত সমরাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতি কাজে লাগিয়ে রাশিয়া চলতি বসন্তেই ইউক্রেনীয় রক্ষণব্যূহ ভেদ করে বড় সামরিক সাফল্যের অপেক্ষায় রয়েছে।

পাশাপাশি মস্কো সক্রিয়ভাবে ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য ও স্যাটেলাইট ডেটা দিয়ে সহায়তা করছে, যাতে মার্কিন বাহিনীর গতিবিধি নজরদারি করা যায়। রাশিয়ার মূল লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রকে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল যুদ্ধে আটকে রেখে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থ হাসিল করা। কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও মস্কো কৌশলী ভূমিকা পালন করছে। তারা প্রস্তাব দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে গোয়েন্দা ও স্যাটেলাইট সহায়তা বন্ধ করলে রাশিয়াও ইরানকে তথ্য দেওয়া বন্ধ করবে। ওয়াশিংটন এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও এটি ন্যাটো জোটের ভেতরে একধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। এই কূটনৈতিক চাপ ন্যাটোর ঐক্যকে দুর্বল করার পাশাপাশি ইউক্রেন শান্তি প্রক্রিয়ার সম্ভাবনাকে দীর্ঘমেয়াদে অনিশ্চিত করে তুলেছে। অর্থনৈতিক দিক দিয়েও এই সংকট রাশিয়ার জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে। হরমুজ প্রণালী কার্যত অবরুদ্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম হুহু করে বাড়ছে।

এর ফলে ক্রেমলিনের রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তেল রপ্তানি করে রাশিয়া প্রতিদিন প্রায় ১৫০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত আয় করছে। এই বিপুল অর্থ পুতিন তার সামরিক রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং নতুন সেনা সমাবেশের কাজে ব্যবহার করছেন। একই সঙ্গে ভারত ও চীনের মতো দেশগুলো রাশিয়ার জ্বালানির ওপর আগের চেয়ে বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। রণক্ষেত্রের বাইরে ইউরোপজুড়ে মনস্তাত্ত্বিক ও তথ্যযুদ্ধেও রাশিয়া আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাশিয়ার তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। পুতিনের অন্যতম লক্ষ্য হলো ট্রান্স আটলান্টিক সম্পর্কের মধ্যে ফাটল ধরানো এবং ন্যাটোর যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করা। মার্কিন সহায়তা ছাড়া রাশিয়ার মোকাবিলা করা কঠিন হবে ভেবে ইউরোপীয় দেশগুলো এখন নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সামরিক সক্ষমতা নিয়েও বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।

ড. মিকটা সতর্ক করেছেন, ওয়াশিংটন একই সঙ্গে দুটি বড় ফ্রন্টে যুদ্ধ করার মতো অবস্থায় নেই। মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করতে গিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার মতো অঞ্চল থেকে সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নিতে হয়েছে। এর ফলে এশিয়ায় চীন এবং কোরীয় উপদ্বীপে উত্তর কোরিয়া নতুন করে অস্থিরতা তৈরির সুযোগ পেতে পারে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েনও রাশিয়াকে রাজনৈতিক সুবিধা দিচ্ছে। ওয়াশিংটনের মনোযোগ মধ্যপ্রাচ্যে থাকায় ইউরোপীয় দেশগুলো এখন রাশিয়ার চাপের মুখে অসহায় বোধ করছে। সামরিক পুনর্গঠনের জন্য ইউরোপের আরও অন্তত এক দশক সময়ের প্রয়োজন। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দীর্ঘায়িত হলে এবং যুক্তরাষ্ট্র সেখানে পুরোপুরি জড়িয়ে পড়লে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা আমূল বদলে যেতে পারে। রাশিয়ার এই কৌশলগত অবস্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ। মস্কো চায় যুক্তরাষ্ট্রকে একাধিক ফ্রন্টে ক্লান্ত করে দিতে, যাতে ইউক্রেনসহ পুরো পূর্ব ইউরোপে রাশিয়ার একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

এস এম/ ২৩ মার্চ ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language