সম্পাদকের পাতা

আকাশপথে শিষ্টাচার ও উচ্ছৃঙ্খলতার সংঘাত

নজরুল মিন্টো

আকাশপথের যাত্রা এক সময় ছিল আভিজাত্য এবং পরম শৃঙ্খলার প্রতীক। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে যাত্রীদের উচ্ছৃঙ্খল আচরণ বা ‘এয়ার রেজ’ (Air Rage) এক উদ্বেগজনক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি হিথ্রো বিমানবন্দরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ঢাকা গামী ফ্লাইট BG202-এ ব্রিটিশ বাংলাদেশি যুবক মমনুন আহমেদের অসদাচরণ ও দণ্ডাদেশ বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে স্থান পেয়েছে।

পূর্ব লন্ডনের বাসিন্দা মমনুন আহমেদ (৩৫)-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, ৬ জুলাই ২০২৫ তিনি বিমানে মদ্যপ অবস্থায় ভিডিও ধারণ করছিলেন এবং কেবিন ক্রুদের নিরাপত্তা নির্দেশনা মানতে অস্বীকৃতি জানান। পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় যখন তিনি ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট ফিরোজ আবিরের প্রতি আক্রমণাত্মক আচরণ করেন এবং নিজের ব্রিটিশ নাগরিকত্বের দাপট দেখিয়ে ক্রুদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি আদালতে গড়ায় এবং ১৬ মার্চ ২০২৬ আক্সব্রিজ ম্যাজিস্ট্রেটস কোর্ট তাকে ১,৯৮৩ পাউন্ড জরিমানা করে। আদালতের পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট করা হয়, কোনো বিশেষ দেশের পাসপোর্ট বা নাগরিকত্ব কাউকে বিমানের শৃঙ্খলা ভাঙার অধিকার দেয় না।

বিমানে উঠে ক্রুদের সঙ্গে অসদাচরণের ঘটনা এখন আর বিরল নয়। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা আইকাও (ICAO) এবং আন্তর্জাতিক এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (IATA) বহুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছে যে উচ্ছৃঙ্খল যাত্রীদের আচরণ বিমান নিরাপত্তার জন্য বাস্তব হুমকি। এসব ঘটনার মধ্যে থাকে মৌখিক গালাগাল, শারীরিক হামলা, যৌন হয়রানি, ধূমপান, নিরাপত্তা নির্দেশ না মানা, মদ্যপ অবস্থায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, এমনকি জরুরি দরজার কাছে সন্দেহজনক আচরণও। সংখ্যায় এসব ঘটনা কম হলেও এর প্রভাব বিশাল, কারণ এতে ফ্লাইট বিলম্বিত হয়, কখনও ডাইভার্ট করতে হয়, ক্রু সদস্যরা আহত হন, অন্য যাত্রীরা আতঙ্কে পড়েন এবং পুরো ফ্লাইট পরিচালনায় বিঘ্ন ঘটে।

যুক্তরাষ্ট্রে এই ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বিশেষভাবে চোখে পড়ে। দেশটির ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FAA) উচ্ছৃঙ্খল যাত্রীদের বিরুদ্ধে তদন্ত, জরিমানা এবং প্রয়োজন হলে ফৌজদারি ব্যবস্থাও নিয়ে থাকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভিযোগের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পর সংস্থাটি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি আরও জোরালোভাবে প্রয়োগ করতে শুরু করে, যাতে বিমানে কর্মরত ক্রু এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।

২০২১ সালে সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইন্স (যুক্তরাষ্ট্র) এর এক নারী যাত্রী কেবিন ক্রুর মুখে ঘুষি মেরে তাঁর দুটি দাঁত ভেঙে ফেলেন। অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় সেই যাত্রীকে ১৫ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি তাকে ২৫,৯৮১.৫৭ ডলার ক্ষতিপূরণ এবং ৭,৫০০ ডলার জরিমানাও গুনতে হয়।

আরেকটি আলোচিত ঘটনা ঘটে ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের এক ফ্লাইটে। ২০২৩ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে বোস্টনগামী একটি বিমানে এক যাত্রী প্রথমে জরুরি দরজার কাছে সন্দেহজনক আচরণ করেন। পরে ভাঙা ধাতব চামচ দিয়ে এক ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টের গলায় আঘাতের চেষ্টা চালান। শেষ পর্যন্ত যাত্রী ও ক্রুরা মিলে তাকে নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরে আদালতে তিনি দোষ স্বীকার করেন এবং ২০২৫ সালে ২৬ মাসের কারাদণ্ড পান।

যৌন হয়রানিও এই সমস্যার একটি ভয়ংকর দিক। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এক কানাডীয় নাগরিককে একটি আমেরিকান এয়ারলাইন্স ফ্লাইটে ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্টকে অশোভনভাবে স্পর্শ করার দায়ে ৬ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আদালত এ ঘটনাকে সাধারণ অসভ্যতা হিসেবে দেখেনি; বরং কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনরত এক বিমানকর্মীর নিরাপত্তা ও মর্যাদার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করেছে।

২০২২ সালের নভেম্বরে নিউইয়র্ক থেকে দিল্লিগামী ফ্লাইটের বিজনেস ক্লাসে এক মদ্যপ যাত্রী সহযাত্রীর ওপর প্রস্রাব করার মতো জঘন্য ঘটনা ঘটান। এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসকে ৩০ লাখ রুপি জরিমানা গুণতে হয় এবং অভিযুক্ত যাত্রীকে চার মাসের জন্য ‘নো ফ্লাই’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ইউরোপের বিভিন্ন রুটেও মাস্ক পরা, সিটবেল্ট বাঁধা বা ক্রুদের সাধারণ নিরাপত্তা নির্দেশনা মানতে অস্বীকৃতি জানিয়ে যাত্রীদের পুলিশের হাতে সোপর্দ করার ঘটনা বেড়েছে। এতে বোঝা যায়, বিমানযাত্রায় মৌলিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের বিষয়টিকেও এখন অনেক দেশ আর হালকাভাবে নিচ্ছে না। বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক মহল এখন বিমানে বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের কথা ভাবছে, যাতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে অকাট্য প্রমাণ সংগ্রহ করা সহজ হয়।

অনেক অভিবাসী বাংলাদেশি যাত্রী মনে করেন, তারা ব্রিটিশ, আমেরিকান বা কানাডীয় নাগরিকত্ব অর্জন করেছেন মানেই তারা ক্রুদের ওপর খবরদারি করার অধিকারও অর্জন করেছেন। তারা ক্রুদের তাদের অধীনস্থ চাকর-বাকর মনে করেন। বিমানবন্দরে দীর্ঘ অপেক্ষা, লাগেজ সমস্যা, আসন নিয়ে অসন্তোষ, ক্লান্তি বা ব্যক্তিগত রাগ কোনোভাবেই কেবিন ক্রুদের ওপর ঝেড়ে ফেলার অজুহাত হতে পারে না।

মনে রাখতে হবে, বিমানে কেবিন ক্রুরা কেবল খাবার পরিবেশনকারী নন। তারা জরুরি পরিস্থিতিতে প্রথম সাড়া দেওয়া প্রশিক্ষিত নিরাপত্তাকর্মীও বটে। আগুন লাগা, ধোঁয়া, চিকিৎসা জরুরি অবস্থা, টার্বুলেন্স, জরুরি অবতরণ, যাত্রী নিয়ন্ত্রণ, দরজা সুরক্ষা, শিশু ও বৃদ্ধদের নিরাপত্তা, এমন বহু সংবেদনশীল দায়িত্ব তাদের কাঁধে থাকে। যে যাত্রী কেবিন ক্রুকে হেয় করে, সে আসলে নিজেরসহ পুরো বিমানের সব যাত্রীর নিরাপত্তাকেই ঝুঁকির মুখে ফেলে।

তাই সময়ের জরুরি বার্তা একটাই। আকাশে ওঠার আগে মানুষকে শুধু পাসপোর্ট আর বোর্ডিং পাস নয়, ভদ্রতাবোধও সঙ্গে নিতে হবে। কারণ বিমানের ভেতরে অসভ্যতা কোনো ব্যক্তিগত রাগের সাধারণ বহিঃপ্রকাশ নয়, এটি আইনত শাস্তিযোগ্য সামাজিক অপরাধ।

একজন যাত্রীর উগ্র আচরণ অনেক সময় শুধু তার ব্যক্তিগত ব্যর্থতায় সীমাবদ্ধ থাকে না, তা গোটা জাতির ভাবমূর্তিকেও ক্ষুণ্ণ করে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে কোনো বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যাত্রীর অসংযত আচরণ অন্যদের চোখে অযাচিত প্রশ্নের জন্ম দেয়। তাই আসুন, আমরা আকাশপথে শিষ্টাচারকে অভ্যাসে পরিণত করি।

তথ্যসূত্র:
MyLondon (৬ জুলাই ২০২৫)
Uxbridge Magistrates’ Court (১৬ মার্চ ২০২৬)


Back to top button
🌐 Read in Your Language