
অটোয়ার রাজনীতিতে কখনও কখনও এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরে ইতিহাসের ভাষ্যে শুধু একটি দৈনিক ঘটনার বিবরণ হয়ে থাকে না, বরং একটি যুগবদলের চিহ্ন হয়ে ওঠে। কানাডার ফেডারেল রাজনীতিতে এখন তেমনই এক সময়। এখানে কেবল সরকার ও বিরোধী দলের টানাপোড়েন চলছে না, বরং পাল্টে যাচ্ছে ক্ষমতার গাণিতিক কাঠামো, রাজনৈতিক আনুগত্যের মানচিত্র এবং নেতৃত্বের চরিত্রও। যে সংসদ কয়েক মাস আগেও সংখ্যালঘু সরকারের অনিশ্চয়তায় আবদ্ধ ছিল, সেই সংসদ এখন দ্রুত এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি নিজের পক্ষে একটি দৃঢ়, আত্মবিশ্বাসী এবং কার্যকর রাজনৈতিক অবস্থান গড়ে তুলতে চলেছেন।
কানাডার ২০২৫ সালের ফেডারেল নির্বাচনের পর হাউস অব কমন্সে মোট আসনসংখ্যা দাঁড়ায় ৩৪৩। এই কক্ষে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা গঠনের জন্য প্রয়োজন ১৭২টি আসন। ২০২৫ সালের নির্বাচনে লিবারেলরা ১৬৯টি আসন নিয়ে সরকার গঠন করেছিল, অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠতার থেকে তিন আসন কম নিয়ে। কিন্তু সাম্প্রতিক দলবদল এবং নতুন রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের ফলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে গেছে। নুনাভুটের এনডিপি এমপি লরি ইডলাউট লিবারেল দলে যোগ দেওয়ার পর লিবারেলদের আসনসংখ্যা ১৭০-এ পৌঁছেছে। অর্থাৎ এখন তারা মাত্র দুই আসন দূরে দাঁড়িয়ে আছে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে।
লরি ইডলাউটের এই সিদ্ধান্ত নিছক ব্যক্তিগত দলবদল নয়, বরং এটি বর্তমান কানাডীয় রাজনীতির এক প্রতীকী ঘটনা। কারণ এই পদক্ষেপ দেখিয়ে দিল, মার্ক কার্নির নেতৃত্ব এখন কেবল মধ্যপন্থি লিবারেল ভোটারদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। তার রাজনৈতিক প্রভাব এখন বিরোধী শিবিরের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যেও সাড়া ফেলছে। বিষয়টিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে এই সত্য যে, গত নির্বাচনে ইডলাউট তার লিবারেল প্রতিদ্বন্দ্বীকে মাত্র ৪১ ভোটে হারিয়েছিলেন। ফলে তার দলবদলকে শুধু ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, বরং সূক্ষ্ম নির্বাচনী বাস্তবতার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বরের পর তিনিই চতুর্থ বিরোধী এমপি, যিনি কার্নির শিবিরে এলেন। এটিকে কেউ কেউ কৌশলগত পুনর্বিন্যাস বলছেন, কেউ বলছেন বাস্তববাদী রাজনীতি, আবার সমালোচকেরা একে সুবিধাবাদী পদক্ষেপ হিসেবেও দেখছেন। কিন্তু সংসদীয় রাজনীতিতে শেষ পর্যন্ত যে বিষয়টি মুখ্য হয়ে ওঠে, তা হলো ক্ষমতার সংখ্যা এবং আইন পাসের সামর্থ্য। সেই দিক থেকে কার্নি নিঃসন্দেহে এগিয়ে আছেন।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সাধারণভাবে কানাডার রাজনীতিকে অনেকেই স্থিতিশীল, প্রাতিষ্ঠানিক এবং কম নাটকীয় বলে ভাবেন। কিন্তু বাস্তবে ওয়েস্টমিনস্টার ধাঁচের সংসদীয় ব্যবস্থায় সংখ্যার রাজনীতি কখনোই পুরোপুরি শান্ত থাকে না। যখন বিরোধী দলের একজন সদস্য ক্ষমতাসীন দলে যোগ দেন, তখন সেটি কেবল একটি আসনের হিসাব বদলায় না, বরং জনমনে একটি বার্তাও পাঠায় যে রাজনৈতিক বাতাস কোন দিকে বইছে। কার্নি সেই বাতাসকে নিজের অনুকূলে নিতে পেরেছেন। একজন সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংকার ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদ হিসেবে তার ভাবমূর্তি প্রথম থেকেই ছিল দক্ষ, সংযত এবং বাস্তব ফল অর্জনে মনোযোগী। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সংসদীয় কৌশল প্রয়োগের ক্ষমতাও। এ কারণেই অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, তিনি শুধু প্রশাসনিকভাবে নয়, রাজনৈতিক বিচক্ষণতার দিক থেকেও নিজেকে দ্রুত প্রতিষ্ঠিত করছেন।
মার্ক কার্নির শক্তির জায়গা আসলে কয়েকটি স্তরে গড়ে উঠেছে। প্রথমত, তিনি অর্থনীতি বোঝেন, এবং এমন এক সময়ে বোঝেন যখন মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্যমূল্য, বাণিজ্যচাপ ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কানাডার ভোটারদের মানসিকতা নির্ধারণ করছে। দ্বিতীয়ত, তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্য একজন নেতা। তৃতীয়ত, তিনি নিজের দলকে এমন এক মধ্যপন্থি রাজনৈতিক অবস্থানে নিয়ে গেছেন, যা বাম ও ডান, উভয় দিক থেকেই ভিন্ন রাজনৈতিক বলয়ের মানুষকেও আকৃষ্ট করছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জানুয়ারি মাসে মার্ক কার্নির প্রতি জনসমর্থন ৬০ শতাংশে পৌঁছায়। এই পরিসংখ্যান তার নেতৃত্বের প্রতি ব্যাপক আস্থার প্রতিফলন। কিন্তু সেই আস্থার পাশাপাশি বাস্তবতাও রয়েছে। খাদ্যমূল্য, মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয় তার সরকারের জন্য এখনও বড় পরীক্ষা। সে কারণে কার্নির নেতৃত্ব এখন শুধু জনপ্রিয়তার প্রশ্নে নয়, কার্যকারিতা ও প্রত্যাশার পরীক্ষাতেও দাঁড়িয়ে আছে।
এখন দৃষ্টি ১৩ এপ্রিল ২০২৬-এর তিনটি ফেডারেল উপনির্বাচনের দিকে। নির্বাচন কানাডার তথ্য অনুযায়ী, এদিন স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট, ইউনিভার্সিটি রোজডেল এবং কুইবেকের টেরবোনে ভোট অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে দুটি টরন্টো আসন আগে লিবারেলদের দখলে ছিল এবং বিশ্লেষকেরা সেগুলোকে তুলনামূলক নিরাপদ আসন হিসেবে দেখছেন। যদি লিবারেলরা তিনটির মধ্যে অন্তত দুটি জিতে নেয়, তাহলে ১৭২ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতার সীমা অতিক্রম করা তাদের জন্য সম্ভব হবে। তখন কার্নির সরকার আর গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের জন্য বিরোধীদের সদিচ্ছার অপেক্ষায় থাকবে না। বাজেট, অর্থনৈতিক সংস্কার, প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ, এমনকি দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতি বাস্তবায়নেও তার হাত অনেকখানি মুক্ত হয়ে যাবে। তবে সংসদীয় বাস্তবতায় সংখ্যার এই অঙ্ক কেবল কাগুজে নয়, কার্যকর ক্ষমতারও প্রশ্ন। কারণ অতি স্বল্প ব্যবধানে পাওয়া সংখ্যাগরিষ্ঠতাও কখনো কখনো সরকারের জন্য কঠিন ভারসাম্যের পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে। কারণ এই আসনে লিবারেল প্রার্থী হয়েছেন ডলি বেগম, যিনি অন্টারিও প্রাদেশিক রাজনীতির একটি পরিচিত মুখ এবং স্কারবোরো সাউথওয়েস্টের এমপিপি হিসেবে বহু বছর ধরে কাজ করেছেন। ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তাকে এই ফেডারেল উপনির্বাচনের প্রার্থী ঘোষণা করার পর তার নাম এখন শুধু অভিবাসী জনগোষ্ঠীর আগ্রহের জায়গায় নয়, বরং ফেডারেল ক্ষমতার রাজনীতির সম্ভাব্য নতুন অধ্যায় হিসেবেও আলোচিত হচ্ছে।
ডলি বেগমকে নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন এখন বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তাদের অনেকে মনে করছেন, তিনি যদি ফেডারেল রাজনীতিতে জয়ী হয়ে সংসদে প্রবেশ করেন, তবে মার্ক কার্নির মন্ত্রিসভায় তার অন্তর্ভুক্তি কেবল সম্ভাবনা নয়, বরং খুবই বাস্তব এক আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠবে। এর পেছনে রয়েছে তার তৃণমূলভিত্তিক জনপ্রিয়তা, বহুসাংস্কৃতিক সমাজে গ্রহণযোগ্যতা এবং স্কারবোরোর অভিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন বাস্তবতা সম্পর্কে তার গভীর বোঝাপড়া। সে কারণে ডলি বেগমের সম্ভাব্য মন্ত্রিত্বকে অনেকে কানাডার রাজনীতিতে বৈচিত্র্যময় প্রতিনিধিত্বের এক তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন।
কানাডার রাজনীতি এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই নতুন সমীকরণ তৈরিতে বিরোধী শিবিরের দুর্বলতা বড় ভূমিকা রাখছে। কনজারভেটিভদের ভেতরে নেতৃত্ব ও কৌশল নিয়ে অস্বস্তি, এনডিপির ক্রমহ্রাসমান জনসমর্থন, সব মিলিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। মার্ক কার্নি সেই শূন্যতাকেই দক্ষতার সঙ্গে নিজের অনুকূলে কাজে লাগাচ্ছেন। ফলে তার সামনে এখন শুধু বিরোধীদের পরাজিত করার সুযোগই নেই, বরং তাদের সমর্থকগোষ্ঠী, প্রভাববলয় এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের একাংশকেও নিজের রাজনৈতিক বলয়ে টেনে আনার বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়াকে ঘিরে গণতান্ত্রিক প্রশ্নও উঠেছে। এনডিপির বক্তব্য হলো, কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি দলবদল করলে সেই সিদ্ধান্তের বৈধতা শেষ পর্যন্ত ভোটারদের কাছ থেকেই নেওয়া উচিত।
বর্তমানে হাউস অব কমন্সে লিবারেলদের আসনসংখ্যা ১৭০, কনজারভেটিভদের ১৪১, ব্লক কুইবেকোয়ার ২২, এনডিপির ৬ এবং গ্রিন পার্টির ১; আরও ৩টি আসন শূন্য রয়েছে। তবে গণতন্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে এখানে সতর্কতার জায়গাও আছে। একটি শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার নীতিনির্ধারণে গতি আনে, কিন্তু একই সঙ্গে বিরোধী কণ্ঠের প্রভাব কমিয়ে দিতে পারে। কানাডার মতো পরিণত গণতন্ত্রে এই ভারসাম্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কার্নি যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পান, তাহলে তার সামনে ঐতিহাসিক সুযোগ থাকবে। কিন্তু সেই সঙ্গে ঐতিহাসিক দায়ও থাকবে। কারণ তখন আর অজুহাত হিসেবে সংখ্যালঘু সরকারের সীমাবদ্ধতাকে সামনে আনা যাবে না। সাফল্য যেমন পুরোপুরি তার হবে, ব্যর্থতার দায়ও তেমনই সরাসরি তার ওপর বর্তাবে।
ইডলাউটের এই দলবদল শুধু লিবারেলদের শক্তি বাড়ায়নি, দুর্বল হয়ে পড়া এনডিপির সংকটকেও আরও উন্মোচিত করেছে। এমন এক সময়ে এই ঘটনা ঘটল, যখন দলটি নতুন নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার প্রস্তুতিতে রয়েছে। ফলে এটি কেবল একটি সাংসদ হারানোর ঘটনা নয়, বরং বিরোধী রাজনীতির ভেতরের অনিশ্চয়তারও প্রতিফলন।
সব মিলিয়ে কানাডার রাজনীতি আজ এক নতুন বিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছে। এখানে মার্ক কার্নি শুধু একজন প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি এখন এক নতুন রাজনৈতিক শৈলীর প্রতীক। দক্ষতা, সংযম, আন্তর্জাতিক মর্যাদা, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং সংসদীয় সংখ্যার রাজনীতি, এই পাঁচটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি নিজের নেতৃত্বকে শক্তিশালী করছেন। সমর্থকেরা তাকে আজকের বিশ্বের সবচেয়ে সক্ষম সরকারপ্রধানদের একজন হিসেবে দেখতে চাইতেই পারেন, যদিও ইতিহাস সেই রায় দেবে আরও পরে। কিন্তু এটুকু এখনই বলা যায়, অটোয়ার ক্ষমতার মানচিত্রে তার ছাপ দ্রুত গভীর হচ্ছে। আর ১৩ এপ্রিলের উপনির্বাচন সেই ছাপকে সাময়িক সাফল্য বানাবে, নাকি স্থায়ী আধিপত্যে রূপ দেবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
তথ্যসূত্র:
Reuters (১১ মার্চ ২০২৬)
Toronto Star (১১ মার্চ ২০২৬)
Elections Canada (৮ মার্চ ২০২৬)









