
২০১৭ সালের ডিসেম্বর। ব্রুকলিন জেলা অ্যাটর্নির কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক ঘোষণায় হঠাৎ করেই আলোড়ন সৃষ্টি হয় নিউইয়র্কের স্বাস্থ্যসেবা অঙ্গনে। অভিযোগ ওঠে, মাত্র তিন বছরে মেডিকেইড ও মেডিকেয়ারসহ সরকারি স্বাস্থ্যবীমা কর্মসূচি থেকে প্রায় ১৪৬ মিলিয়ন ডলার আত্মসাৎ করা হয়েছে। সেই অভিযোগপত্রে অভিযুক্তদের তালিকার প্রথমেই ছিল একজন বাংলাদেশি অভিবাসী চিকিৎসকের নাম।
ডা. হামিদ আলম যুক্তরাষ্ট্রের লাইসেন্সপ্রাপ্ত একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত চিকিৎসক। তিনি নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের জেরিকো এলাকায় বসবাস করতেন এবং পেশায় ছিলেন ডায়াগনস্টিক রেডিওলজিস্ট ও নিউরোরেডিওলজিস্ট। সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চতর চিকিৎসা শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে রেডিওলজি ও নিউরোরেডিওলজি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিভিন্ন হাসপাতাল ও মেডিকেল প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থেকে দীর্ঘদিন ডায়াগনস্টিক ইমেজিং সেবার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
নিউইয়র্কে প্রকাশিত স্বাস্থ্যসেবা জালিয়াতি মামলার অভিযোগপত্রে তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর তিনি জনআলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন। প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ডা. হামিদ আলম ছিলেন এমন কয়েকজন চিকিৎসকের একজন, যাঁরা বাস্তবে রোগী না দেখেই হাজার হাজার মেডিক্যাল পরীক্ষার কাগজে স্বাক্ষর দিয়েছেন। এসব পরীক্ষার অনেকগুলোর অস্তিত্বই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।
এই মামলার সবচেয়ে আলোচিত ও বিস্ময়কর অংশটি আসে একটি গোপনে ধারণ করা ফোনালাপ থেকে। অভিযোগপত্রে বলা হয়, এক কথোপকথনে ডা. হামিদ আলমকে বলতে শোনা যায় যে তিনি ১৫ হাজারের বেশি পরীক্ষার রিপোর্টে স্বাক্ষর দিতে গিয়ে পিছিয়ে পড়ছেন।
এই ফোনালাপটি তদন্তকারীদের সামনে এক উদ্বেগজনক বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। কারণ কোনো চিকিৎসকের পক্ষে রোগী পরীক্ষা করা, রিপোর্ট বিশ্লেষণ করা এবং পেশাগত দায়িত্ব পালন করে এত বিপুল সংখ্যক পরীক্ষায় স্বাক্ষর দেওয়া বাস্তবে প্রায় অসম্ভব।
প্রসিকিউশনের ভাষায়, এটি ছিল এমন এক ব্যবস্থা যেখানে কাগজে চিকিৎসা দেখিয়ে বাস্তবে অর্থ উপার্জনের একটি যান্ত্রিক প্রক্রিয়া গড়ে তোলা হয়েছিল।
তদন্তে উঠে আসে আরও উদ্বেগজনক চিত্র। নিম্ন আয়ের এলাকা, গৃহহীন মানুষের অবস্থান কিংবা চাকরিপ্রার্থীদের ভিড় থেকে কিছু লোককে সামান্য নগদ অর্থের বিনিময়ে মেডিকেইড বা মেডিকেয়ার কার্ডসহ ক্লিনিকে নিয়ে আসা হতো। সেখানে তাঁদের ওপর একের পর এক পরীক্ষা করা হতো, অথবা কাগজে পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে বলে দেখানো হতো। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব কার্যক্রমের সঙ্গে প্রকৃত রোগীসেবার কোনো বাস্তব সম্পর্ক ছিল না। মূল উদ্দেশ্য ছিল সরকারি স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থায় বিল পাঠানো।
এই পুরো ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন চিকিৎসকেরা। কারণ তাঁদের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো মেডিক্যাল বিল সরকারি স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থায় গ্রহণযোগ্য হয় না। তদন্তকারীদের মতে, ডা. হামিদ আলমের মতো চিকিৎসকদের স্বাক্ষরই এই জালিয়াতিকে আইনসম্মত রূপ দিয়েছিল।
একজন চিকিৎসকের দায়িত্ব যেখানে রোগীর কল্যাণ নিশ্চিত করা, সেখানে সেই দায়িত্ব যদি কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সেটি শুধু আইনি অপরাধ নয়, নৈতিক বিপর্যয়ও।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, এই জালিয়াতি থেকে অর্জিত অর্থ বিভিন্ন শেল কোম্পানির মাধ্যমে দেশের বাইরে পাঠানো হয়। সেই অর্থ দিয়ে বিভিন্ন শহরে কেনা হয় দামী অ্যাপার্টমেন্ট এবং বিলাসবহুল পণ্য।
যুক্তরাষ্ট্রে গুরুতর অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আদালত অনেক সময় জামিনের শর্ত হিসেবে পায়ের গোড়ালিতে একটি ছোট ডিভাইস পরানোর নির্দেশ দেয়। এই ডিভাইসটি সাধারণভাবে ‘ইলেকট্রনিক শেকল’ নামে পরিচিত এবং জিপিএস প্রযুক্তির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থান নজরদারি করে।
এই মামলায় অভিযোগ আনার পর ডা. হামিদ আলমের চলাচলও আদালতের নির্ধারিত নজরদারির আওতায় ছিল। লং আইল্যান্ডের নিজ বাসভবনে অবস্থান করে তিনি যখন বিচারের দিন গুনছিলেন, তখন তাঁর স্বাধীনতা ছিল শর্তসাপেক্ষ ও নিয়ন্ত্রিত। আইনি অর্থে তিনি কারাগারের বাইরে থাকলেও পুরোপুরি মুক্ত ছিলেন না; তিনি ছিলেন আদালতের আরোপিত বিধিনিষেধের এক সূক্ষ্ম কাঠামোর ভেতরে।
এই ঘটনা কেবল একজন বাংলাদেশি চিকিৎসককে ঘিরে নয়। এটি চিকিৎসা পেশার নৈতিকতার প্রশ্ন। এটি সেইসব অসহায় মানুষের প্রশ্ন, যাদের নাম ব্যবহার করে কোটি কোটি ডলারের হিসাব তৈরি হয়েছে, অথচ তাঁরা প্রকৃত চিকিৎসা সেবাই পাননি। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর মানুষের যে আস্থা রয়েছে, এমন অভিযোগ সেই আস্থাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। তাই এই ধরনের ঘটনার অনুসন্ধান ও উন্মোচন কেবল আইনি প্রক্রিয়ার বিষয় নয়, সমাজের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।
তথ্যসূত্র:
U.S. Department of Justice (ডিসেম্বর ৫, ২০১৭)
Brooklyn District Attorney’s Office (ডিসেম্বর ৫, ২০১৭)
New York Post (ডিসেম্বর ৫, ২০১৭)
The New York Times (ডিসেম্বর ৬, ২০১৭)









