মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়াল, দেশে শঙ্কা

তেহরান, ১০ মার্চ – মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম দ্রুতগতিতে বাড়ছে। এশিয়ার বাজারে কেনাবেচা শুরু হওয়ার পর সোমবার দিনেই দাম ১৩ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। গত এক সপ্তাহে এই দাম বেড়েছে প্রায় ৩৮ শতাংশ। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসি ও জ্বালানি বিভাগের সূত্রমতে, বর্তমানে আসা ডিজেলে প্রতি লিটারে খরচ পড়ছে প্রায় ১৪২ টাকা। অথচ দেশে তা বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়। দেশে প্রতি মাসে ১৫ জাহাজ তেলের চাহিদা রয়েছে।
বিশ্ববাজারে দাম না কমলে মাসে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা বাড়তি খরচ হবে, যা সরকারকে ভর্তুকি দিয়ে মেটাতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের ফলে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানি নির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতে। জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়ছে। এতে সরকারের ভর্তুকির অঙ্কও বাড়ছে। বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের কাছে এরই মধ্যে দেশি বিদেশি কোম্পানিগুলোর পাওনা দাঁড়িয়েছে ৪৬ হাজার কোটি টাকা।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত অনুযায়ী ভর্তুকি কমানোর চাপে রয়েছে সরকার। এই অবস্থায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের নীতিগত চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। যদি হরমুজ প্রণালি মার্চের শেষ পর্যন্ত বন্ধ থাকে, তবে ১৯৭০ দশকের মতো জ্বালানি সংকটের পুনরাবৃত্তি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। দেশের বছরে ছয় থেকে সাত মিলিয়ন টন জ্বালানি তেলের বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। তেলের দাম ১৫০ ডলারে উঠলে আমদানি ব্যয় কয়েক বিলিয়ন ডলার বেড়ে যাবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় চাপ পড়বে।
ভিয়েতনাম, চীন, জাপান, ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে বা বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এদিকে দেশে গ্যাসের উৎপাদন কমায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। গত সাত বছরে এলএনজি আমদানিতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে এবং প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি অনিশ্চিত থাকায় শেষ না হওয়া পর্যন্ত জ্বালানি তেলের রেশনিং ব্যবস্থা চালু থাকবে। আপাতত দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা নেই। বিপিসির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজানুর রহমান আশ্বস্ত করে জানান, আগামী জুন পর্যন্ত তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। চীন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া থেকে তেল আসবে, তাই তাৎক্ষণিক বিঘ্নের আশঙ্কা কম।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম এবং ড. ইজাজ হোসেন সতর্ক করে বলেছেন, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠবে। জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ব্যয় বহুগুণ বাড়বে। এদিকে বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার খবরে দেশের ভেতরে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। সম্ভাব্য সংকট এড়াতে অনেকেই পেট্রল পাম্পগুলোতে ভিড় করছেন এবং অতিরিক্ত জ্বালানি কিনে রাখছেন। এতে কিছু স্থানে কৃত্রিম সংকটের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলারস, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক জানান, মানুষ অযথা উত্তেজনা ছড়িয়ে বাড়তি তেল কিনছে। সরকার ও বিপিসির পক্ষ থেকে বারবার জানানো হয়েছে যে দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রয়েছে এবং আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে পাম্পগুলোতে নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে।
এস এম/ ১০ মার্চ ২০২৬









