সম্পাদকের পাতা

স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট উপনির্বাচন নিয়ে ব্যাপক হইচই

নজরুল মিন্টো

কানাডার অন্টারিও প্রদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত ছক ভেঙে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত স্পষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট আসনটি এখন প্রাদেশিক ও ফেডারেল রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। সাত বছরের বেশি সময় ধরে এই জনপদের পরিচিত মুখ ডলি বেগম অন্টারিও এনডিপি (NDP) ছেড়ে লিবারেল (Liberal) শিবিরে যোগ দিয়ে প্রাদেশিক পরিষদ থেকে পদত্যাগ করে ফেডারেল উপনির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি অন্টারিও নয়, বরং জাতীয় রাজনীতিতেও একটি বড় বার্তা, কারণ একই ভূগোলে একসঙ্গে দুটি উপনির্বাচনের বাস্তবতা দলগুলোর কৌশলকে নতুনভাবে সাজাতে বাধ্য করছে।

ডলি বেগমের পদত্যাগের পর প্রাদেশিক আসন Scarborough Southwest, Electoral District 098 এ কে প্রার্থী হবেন, তা নিয়ে উত্তেজনা তুঙ্গে। লিবারেল শিবিরে ফেডারেল এমপি নাথানিয়াল এরস্কিন স্মিথ মনোনয়ন দৌড়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন সূত্রে আরও কয়েকজন নাম আলোচনায় আছে, যাদের মধ্যে Ali Demircan এবং Qadira Jackson রয়েছেন, আর সিটি কাউন্সিলর Parthi Kandavel এর নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ঘুরছে। অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যাচ্ছে প্রগ্রেসিভ কনজারভেটিভ শিবিরে। বিশেষ করে বাংলাদেশি কমিউনিটির চারজন ব্যক্তি যথাক্রমে মহসীন ভূঁইয়া, ডা. নুরুল্লাহ তরুণ, মোর্শেদ নিজাম এবং গাজী সিজান এবার মনোনয়ন লড়াইয়ের অবতীর্ণ হয়েছেন। গত নির্বাচনে দল মনোনয়ন দিয়েছিল অ্যাড্ডি ড্যারামোলা (Addie Daramola) নামে এক কৃষ্ণাঙ্গ নারীকে, যিনি এবারও মনোনয়ন দৌড়ে থাকতে চান বলে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে।

গত বৃহষ্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) এক বৈঠকে বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত মনোনয়ন প্রত্যাশীরা প্রগ্রেসিভ কনজারভেটিভ পার্টির প্রাদেশিক পর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দেখা করেছেন। দলীয় নীতিনির্ধারকরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এখানে কেন্দ্র থেকে কোনো প্রার্থী চাপিয়ে দেওয়া হবে না। বরং স্থানীয় রাইডিং অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সদস্যরা মনোনয়ন সভা বা ভোটের মাধ্যমে যাকে বেছে নেবেন, তাকেই চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করা হবে। ফলে বাংলাদেশি মনোনয়নপ্রত্যাশীদের জন্য সুযোগটা বাস্তব, কারণ এই দৌড়ে এগিয়ে দেবে বেশি করে দলীয় সদস্য সংগ্রহ, স্থানীয় সদস্যদের মধ্যে সমর্থক বাড়ানো, এবং মনোনয়ন ভোটের দিন নিজেদের ভোটারদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার সক্ষমতা।

স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট প্রাদেশিক আসনে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার থেকে ৮২ হাজারের মধ্যে। বিগত নির্বাচনগুলোর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিজয়ী হতে হলে কমপক্ষে ১৪ থেকে ১৭ হাজার ভোটের প্রয়োজন হয়।

২০১৮ সালে যখন ডলি বেগম প্রথম নির্বাচিত হন, তখন তিনি কেবল একজন তরুণী রাজনীতিক ছিলেন না, অনেক ভোটারের চোখে তিনি ছিলেন পরিবর্তনের প্রতীক। এরপর ২০২২ সালের নির্বাচনে এবং ২০২৫ সালের সর্বশেষ নির্বাচনে তাঁর ধারাবাহিক জয় দেখিয়েছে যে স্কারবোরো সাউথওয়েস্টে ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, মাঠের কাজ এবং কমিউনিটি সংযোগ প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। তাঁর সমর্থকেরা বলেন, সময়ের সঙ্গে এই এলাকাতে “ডলি বেগম” নামটি একটি নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে।

২০২৫ সালের অন্টারিও নির্বাচনে এই আসনে এনডিপি প্রার্থী হিসেবে ডলি বেগম ১৪,৫৫৭ ভোট পেয়ে জয়ী হন। একই নির্বাচনে প্রগ্রেসিভ কনজারভেটিভ প্রার্থী পেয়েছিলেন ১০,৪০০ ভোট এবং লিবারেল প্রার্থী পেয়েছিলেন ৭,৭৮৬ ভোট। মোট বৈধ ভোট ছিল ৩৩,৯৩৭। তবে উপ-নির্বাচনে সাধারণত ভোটার উপস্থিতি কিছুটা কম থাকে, সেক্ষেত্রে ১২-১৩ হাজার ভোট পেলেই জয়ের মালা পরার সম্ভাবনা থাকে।

স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার ২০২১ সালের জনগণনায় এই এলাকাটিতে বাংলা ভাষাভাষী জনসংখ্যা ৭,৯৮০ দেখানো হয়েছে। এখানে একটি বাস্তবতা মাথায় রাখতে হয়। জনসংখ্যা আর ভোটার সংখ্যা এক নয়। নাগরিকত্ব, বয়স এবং ভোটার নিবন্ধনের কারণে এই ৭,৯৮০ জনের সবাই ভোটার নাও হতে পারেন। তবে কমিউনিটির নেটওয়ার্ক, মসজিদ, মন্দির, সামাজিক সংগঠন, ব্যবসায়ী প্ল্যাটফর্ম এবং পারিবারিক সম্পর্কের ঘনত্বের কারণে নির্বাচনের দিনে কয়েক হাজার ভোট একটি নির্দিষ্ট দিকে একত্র হলে তার প্রভাব বড় হয়।

কমিউনিটির ভাবনা একরকম নয়। অনেকের কাছে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রার্থী কতটা দক্ষ, এলাকায় কী কাজ করেছেন, এবং সরকারি দপ্তরে কথা বলার কতটা যোগ্যতা ও সক্ষমতা আছে। আরেকদল জাতীয় রাজনীতির হাওয়া ও দলটির জয়ের সম্ভাবনা দেখে সিদ্ধান্ত নিতে চায়। আবার অনেকে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কমিউনিটির সম্মান, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং জনসম্পৃক্ততাকে প্রধান মানদণ্ড হিসেবে দেখেন। এই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিগুলোই মনোনয়ন দৌড়কে ক্রমেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করে তুলছে।

অন্টারিওর এই পুননির্বাচন কেবল একটি আসন দখলের লড়াই নয়, এটি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রাজনীতিকদের সক্ষমতা প্রমাণের এক অগ্নিপরীক্ষা। ডলি বেগম তাঁর ব্যক্তিগত ইমেজ এবং ক্যারিশমায় ফেডারেল জয় নিশ্চিত করবেন বলে যেমন ধারণা করা হচ্ছে, তেমনি প্রাদেশিক আসনে কনজারভেটিভ পার্টির বাংলাদেশি মনোনয়নপ্রত্যাশীরা যদি ঐকবদ্ধ থাকতে পারেন, তবে কানাডার রাজনীতিতে এক নতুন ইতিহাস রচিত হতে পারে।


Back to top button
🌐 Read in Your Language