
মাদ্রিদ, ১১ ফেব্রুয়ারি – স্পেন সরকার তাদের অভিবাসন নীতিতে এক আমূল পরিবর্তন এনে প্রায় ৫ লক্ষ অবৈধ অভিবাসীকে নিয়মিত করার ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছে। ইউরোপের শ্রমবাজারে জনশক্তির অভাব পূরণ এবং মানবিক দিক বিবেচনায় নেওয়া এই উদ্যোগটি গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সাধারণ ক্ষমা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এই সুবর্ণ সুযোগের সামনে বাংলাদেশিদের জন্য পাহাড়সম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। বিশেষ করে পাসপোর্ট এবং পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সংক্রান্ত সমস্যায় প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশি প্রবাসী এই সুযোগ হারানোর শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।
স্পেন সরকারের নতুন গেজেট অনুযায়ী, যারা ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ সালের আগে স্পেনে প্রবেশ করেছেন, তারা এই নিয়মিতকরণ প্রক্রিয়ার আওতায় আসবেন। ২০০১ এবং ২০০৫ সালের সাধারণ ক্ষমার চেয়েও এবারের নিয়ম অনেক বেশি শিথিল। আগে যেখানে বৈধ হওয়ার জন্য কাজের চুক্তিনামা (Work Contract) বাধ্যতামূলক ছিল, এবার সেই শর্তটি শিথিল করা হয়েছে। এর ফলে সাধারণ কর্মজীবী থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীরাও সহজে নাগরিকত্বের পথে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
স্পেন সরকারের লক্ষ্য হলো, অনিয়মিত অবস্থায় থাকা বিশাল এই জনগোষ্ঠীকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনা এবং তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু এই সহজ প্রক্রিয়ার মাঝেও বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রয়োজনীয় নথিপত্রের অভাব।
স্পেনে নিয়মিত হওয়ার প্রাথমিক শর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো নিজ দেশ থেকে ইস্যুকৃত ‘পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট’ এবং একটি সচল বা বৈধ মেয়াদের পাসপোর্ট। কিন্তু বর্তমানে স্পেনে বসবাসরত প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশি এই দুটি নথির জন্য চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
পাসপোর্ট নবায়নে দীর্ঘসূত্রতা: অনেক প্রবাসীর পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও দূতাবাস থেকে তা সময়মতো রিনিউ করা সম্ভব হচ্ছে না। ঢাকাস্থ পাসপোর্ট অফিস এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ধীরগতির কারণে প্রবাসীদের দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
পুলিশ ক্লিয়ারেন্সের জটিলতা: নিয়মিতকরণের আবেদনের জন্য প্রবাসীদের প্রমাণ করতে হয় যে তাদের কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড নেই। এই সনদ সংগ্রহের জন্য বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় পুলিশ স্টেশনের সমন্বয়ে যে ডিজিটাল বা এনালগ প্রক্রিয়া রয়েছে, তা প্রবাসীদের জন্য অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্পেন সরকার ঘোষিত সময়সীমা অনুযায়ী, আগামী এপ্রিল ২০২৬ থেকে এই আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং তা চলবে ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত। হাতে মাত্র কয়েক মাস সময় থাকলেও নথিপত্র হাতে না পাওয়ায় প্রবাসীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে।
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। স্পেনে এই ৫ লক্ষ মানুষের নিয়মিত হওয়া মানে বাংলাদেশের জন্য বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের স্থায়ী পথ তৈরি হওয়া। তাই এই জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় বাংলাদেশ সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে হবে।
১. বিশেষ সেল গঠন: স্পেন দূতাবাস এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এই সংক্রান্ত একটি বিশেষ ডেস্ক স্থাপন করতে হবে, যারা শুধুমাত্র নিয়মিতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় নথি দ্রুততার সাথে যাচাই করবে।
২. পাসপোর্ট ডেলিভারিতে গতি: যারা স্পেনে অনিয়মিত অবস্থায় আছেন, তাদের পাসপোর্ট অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রিন্ট করে দ্রুত স্পেনে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. ডিজিটাল ক্লিয়ারেন্স: পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট যেন সরাসরি অনলাইনে বা দূতাবাসের মাধ্যমে দ্রুত পাওয়া যায়, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
মাদ্রিদ এবং বার্সেলোনায় বসবাসরত অনেক প্রবাসী জানিয়েছেন, তারা বছরের পর বছর এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। অনেকেই বৈধ হওয়ার আশায় পরিবার ছেড়ে প্রবাসে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এখন যখন সুযোগ এসেছে, তখন নিজেদের দেশের দাপ্তরিক অবহেলার কারণে সেই সুযোগ হারানো হবে তাদের জন্য চরম কষ্টের।
বিশ্লেষকদের মতে, স্পেন সরকারের এই উদ্যোগ কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, এটি হাজার হাজার পরিবারের স্বপ্ন। ৩০ জুন ২০২৬-এর মধ্যে যদি এসব নথিপত্র দাখিল করা না যায়, তবে এই বিশাল সংখ্যক বাংলাদেশি আবার অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবেন।
স্পেনের এই সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হওয়া মানে কেবল ১০ হাজার ব্যক্তির ক্ষতি নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স থেকে বঞ্চিত হওয়া। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং স্পেনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস যদি সমন্বিতভাবে কাজ করে, তবেই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। সময় বয়ে যাচ্ছে, এখন বল পুরোপুরি বাংলাদেশ সরকারের কোর্টে। প্রবাসীদের দীর্ঘশ্বাসের অবসান ঘটিয়ে এই ঐতিহাসিক সুযোগটি কাজে লাগানোই এখন সময়ের দাবি।



