
একটি দেশের শ্রেষ্ঠ সম্পদ তার মেধাবী তরুণ প্রজন্ম। সেই সম্পদ যখন সুদূর প্রবাসে উচ্চশিক্ষার পাঠ চুকিয়ে জীবনের সোনালি ভোরে পা রাখার মুহূর্তে ঝরে যায়, তখন তা কেবল একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ নয়, সমাজের জন্যও এক অপূরণীয় ক্ষতি। সম্প্রতি মোহাম্মদ সাফওয়ান জাহিদের আকস্মিক মৃত্যু এবং তার কয়েক মাস আগে সিফাত শারহান খান লোদীর প্রস্থান অভিবাসী কমিউনিটিসহ অসংখ্য ঘরে গভীর শোক ও আতঙ্কের ছায়া ফেলেছে।
ফেব্রুয়ারির শুরুতেই টরন্টোতে একটি শোকের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। গত ২ ফেব্রুয়ারি সকালে মোহাম্মদ সাফওয়ান জাহিদকে তার নিজ অ্যাপার্টমেন্টে নিথর অবস্থায় পাওয়া যায়। ২৫ বছর বয়সী এই তরুণের মৃত্যু শিক্ষাঙ্গন ও টরন্টোর উদ্যোক্তা পরিসরে গভীর আলোড়ন তোলে, কারণ তাকে ঘিরে ছিল বড় সম্ভাবনা।
সাফওয়ান ছিলেন বাংলাদেশের মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসির ডিএমডি ও সিবিও ডা. জাহিদ হোসেন এবং কানিতা রহমানের একমাত্র পুত্র। একমাত্র সন্তানকে ঘিরে যে পরিকল্পনা ও আশা ছিল, মুহূর্তে তা ভেঙে পড়ে পরিবারটি গভীর শোকে আচ্ছন্ন হয়ে যায়।
উচ্চশিক্ষার উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে বছর পাঁচেক আগে সাফওয়ান কানাডায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। তিনি ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোতে (UofT) একই সঙ্গে এমবিএ এবং এমএ ডিগ্রির শেষ টার্মে অধ্যয়ন করছিলেন। সাফওয়ান কেবল একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন না; তিনি ছিলেন টরন্টো ভিত্তিক এআই স্টার্টআপ ‘ম্যাট্রা’ (MATRA)-এর প্রতিষ্ঠাতা। তার মেধার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘ক্রিয়েটিভ ডেস্ট্রাকশন ল্যাব’-এর স্কলার নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং শোয়ার্টজ রেইসম্যান ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে কানাডা সরকারের ‘সেইফ এআই’ নীতিনির্ধারণে উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন। এর বাইরেও তিনি কানাডার শীর্ষস্থানীয় নীতি-গবেষকদের সাথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক ব্যবহার নিয়ে কাজ করে আসছিলেন, যা তাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত করে তুলেছিল। তিনি তার স্টার্টআপ ‘ম্যাট্রা’-র মাধ্যমে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য অনুপ্রেরণা ছিলেন।
সাফওয়ানের মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে এখনো চূড়ান্ত ফরেনসিক বা ময়নাতদন্তের রিপোর্ট প্রকাশ হয়নি। চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী এটি ‘সাডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট’ (Sudden Cardiac Arrest) হতে পারে। পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে সন্দেহজনক কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। তবে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এলে প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হবে।
সাফওয়ানের মৃত্যুসংবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্টরা তাকে ব্যতিক্রমী মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে স্মরণ করেন। ৬ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার জুমার নামাজের পর টরন্টোর বায়তুল আমান মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সতীর্থদের পাশাপাশি বাংলাদেশি কমিউনিটির বিপুল সংখ্যক মানুষ অংশগ্রহণ করেন। ভিসা জটিলতা এবং আকস্মিক শোকের ধাক্কায় সাফওয়ানের বাবা মা বাংলাদেশ থেকে এসে সশরীরে উপস্থিত থাকতে পারেননি। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ১১ ফেব্রুয়ারি সাফওয়ানের লাশ দেশে পৌছুবে এবং ১৩ ফেব্রুয়ারি গুলশান মসিজদে নামাজে জানাযা শেষে বনানী কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হবে।

২.
গত বছরের ২০ নভেম্বর লন্ডন, অন্টারিওতে সিফাত শারহান খান লোদী নামে আরেক মেধাবী শিক্ষার্থীর আকস্মিক মৃত্যুতে কমিউনিটিতে শোকের ছায়া নেমে আসে। সিফাত ছিলেন ঢাকার নামী ইংরেজি মাধ্যম স্কুল ‘স্কলাস্টিকা’র মেধাবী ছাত্র। সেখান থেকে ও লেভেল শেষ করার পর তিনি পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়ায়। অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব ক্যানবেরা থেকে এ লেভেল ডিপ্লোমা এবং পরে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মার্কেটিং ও বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে ব্যাচেলর্স ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার পাঠ চুকিয়ে স্থায়ী হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে চলে আসেন কানাডায়। এখানেও তিনি মেধার স্বাক্ষর রাখেন এবং অন্টারিওর লন্ডনস্থ ‘ফ্যানশ কলেজ’ থেকে সফলভাবে মাস্টার্স শেষ করেন।
সিফাতের পরিবার আগে থেকেই শোকের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল। ২০২১ সালের ১৮ এপ্রিল তার বাবা করোনায় আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন। স্বামীকে হারানোর পর একমাত্র ছেলেকে ঘিরে যে মা বেঁচে থাকার শক্তি খুঁজছিলেন, সিফাতের মৃত্যু সেই আশ্রয়টিও কেড়ে নেয়। কোনো শারীরিক অসুস্থতার কথা জানা যায়নি। অফিস থেকে ফিরে তিনি রাতে ঘুমান, কিন্তু সেই ঘুম আর ভাঙেনি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়, ঘুমের মধ্যেই হৃদযন্ত্রের জটিলতায় তার মৃত্যু ঘটে। ভিসা জটিলতায় শেষ দেখাটাও দেখতে পারেননি তার মা। তবে তার দুই বোন কানাডায় পৌঁছে জানাজায় অংশ নেন। অন্টারিও লন্ডন মসজিদে জানাজা শেষে তাকে লন্ডন মুসলিম কবরস্থানে দাফন করা হয়।
৩.
গত এক দশকে কানাডায় অন্তত ২৫ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর অকাল মৃত্যু ঘটেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মৃত্যুর মিছিল’ এর পেছনে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ কাজ করতে পারে। এক, পড়াশোনার ব্যয়, কাজের চাপ, পিআর পাওয়ার অনিশ্চয়তা এবং পরিবারের প্রত্যাশা তরুণদের মানসিক চাপ বাড়ায়। দুই, দীর্ঘ সময় একা থাকা, সামাজিক সহায়তা কমে যাওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্লান্তি অনেককে ভেতরে ভেতরে দুর্বল করে দেয়। তিন, অধিকাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহের জন্য যে কঠোর পরিশ্রম করে, তাতে অনেক সময় তারা নিজেদের স্বাস্থ্যের খবর নেওয়ার সুযোগ পায় না। চার, হাড়কাঁপানো শীত এবং সূর্যের আলোর অভাব অনেক সময় মানসিক অবসাদ (Seasonal Affective Disorder) তৈরি করে, যা পরোক্ষভাবে শারীরিক জটিলতা বাড়ায়।
সিফাতের মা প্রতিদিন আল্লাহর দরবারে কান্নাভেজা হৃদয় নিয়ে দোয়া করেন, যেন আর কোনো মায়ের বুক এভাবে শূন্য হয়ে না যায়। স্বামীকে হারানোর পর যে মানুষটি একমাত্র ছেলেকে আঁকড়ে বেঁচে থাকার শক্তি খুঁজেছিলেন, সেই আশ্রয়টিও হঠাৎ করে হারিয়ে যাওয়ায় তার জীবন যেন এক দীর্ঘ প্রার্থনায় পরিণত হয়েছে। গভীর রাতে যখন চারপাশ নীরব হয়ে আসে, তখন তিনি বারবার একই কথা ভাবেন, একই দোয়া করেন, একই অনুরোধ রাখেন। সেই দোয়ার ভেতর শুধু নিজের সন্তানের জন্য আহাজারি নেই, আছে অন্য সব মায়েদের জন্যও আকুতি, যেন কারও ঘরে এমন অকাল শোক নেমে না আসে। তিনি বলেন, “নিশ্চয় দয়াময় আল্লাহ মেহেরবানি করে সদ্য স্বামীহারা আমি এক বিধবা, পুত্রহারা মায়ের চোখের পানির দোয়া কবুল করবেন।”
স্বপ্ন যখন কফিনবন্দি হয়, তখন সেই ভার বহন করা পৃথিবীর সবচাইতে কঠিন কাজ। কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও মানসিক অবস্থার দিকে এখন আরও দায়িত্বশীল নজর প্রয়োজন। সন্তানদের কেবল সাফল্য আর বড় ডিগ্রির পেছনে দৌড়াতে না শিখিয়ে, তাদের একাকীত্ব ভাগ করে নেওয়ার এবং নিরাপদ যাপনের পথগুলোও অভিভাবকদের বাতলে দিতে হবে। বাংলার মায়েরা আর কফিনবন্দি সন্তান দেখতে চায় না। প্রবাসের বরফশীতল মাটিতে আর কোনো মেধাবী প্রাণ যেন অকালে ঝরে না পড়ে, এটাই আজ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সকল বাংলাদেশির প্রার্থনা।









