
পঁচিশ বছর আগে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর থেকে তরুণ বুরহান উদ্দিন শফি লন্ডনের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছিলেন স্বপ্নের ভার কাঁধে। কঠোর পরিশ্রম আর সততায় তিনি লন্ডনের ব্যস্ত জীবনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে। ইলফোর্ডের ‘হক অ্যান্ড ঈগল’ নামে একটি প্রপার্টি ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। লন্ডনের রাজপথে যিনি হাজারো মানুষের ভিড়ে নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন, দেশে ফিরে তিনি যে এমন নৃশংস পরিণতির শিকার হবেন, তা কেউ ভাবেনি। গত ৩ ফেব্রুয়ারি সিলেটের জকিগঞ্জের একটি হাওর থেকে উদ্ধার হওয়া তাঁর মরদেহ ঘিরে এখন প্রশ্নের পর প্রশ্ন। এটি শুধু একটি মৃত্যুসংবাদ নয়, প্রবাসজীবনের অর্জন আর পরিবারের স্বপ্নের ওপর নেমে আসা এক করুণ ধাক্কা।
তদন্তে সবচেয়ে বড় মোড় এনে দিয়েছে একটি সিসিটিভি ফুটেজ। ৩০ জানুয়ারি রাতে সিলেট নগরীর আম্বরখানার বাসা থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হন শফি। মাথায় ছিল হেলমেট, কিন্তু তাঁর পেছনে বসা একজন অজ্ঞাত যুবকের মাথায় কোনো হেলমেট ছিল না। পরিবারের দাবি, যুবকটিকে তারা আগে কখনো দেখেনি।
প্রশ্ন উঠেছে, ২৮ জানুয়ারি দেশে ফেরার মাত্র দুই দিনের মাথায় ৩০ জানুয়ারি কুলাউড়া যাওয়ার কথা বলে তিনি কার সঙ্গে বের হয়েছিলেন। ওই যুবক কি পূর্বপরিচিত, নাকি কোনো প্রলোভন বা ফাঁদে শফিকে বাইরে বের করা হয়েছিল। তদন্তকারীদের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সিসিটিভিতে দেখা ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করা। পুলিশ মনে করছে, তাকে শনাক্ত করা গেলে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্টদের সূত্রও স্পষ্ট হবে।
জকিগঞ্জের সুলতানপুর ইউনিয়নের কোনারবন্দ হাওর থেকে যখন শফির মরদেহ উদ্ধার করা হয়, তখন পুলিশ ঘটনাস্থলের আলামত দেখে হতবাক হয়। প্রাথমিকভাবে দেখা যায়, মরদেহে আঘাত ও পোড়ানোর চিহ্ন রয়েছে, এবং কিছু অংশ বাঁধা অবস্থায় ছিল। মরদেহের পাশে একটি লবণের প্যাকেটও পড়ে ছিল। পুলিশের ধারণা, পরিচয় আড়াল করা ও আলামত নষ্ট করার উদ্দেশ্যেই এমন চেষ্টা করা হয়েছে। পিবিআই ও সিআইডি জানায়, যাচাই প্রক্রিয়া শেষে মরদেহটি নিখোঁজ বুরহান উদ্দিন শফির বলেই নিশ্চিত হওয়া গেছে।
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর পৌর শহরের হবিবপুর আশিঘর গ্রামের মৃত সমছু মিয়ার ছেলে বুরহান উদ্দিন শফি (৫৪) লন্ডনের প্রবাসী কমিউনিটিতে বহুল পরিচিত ছিলেন। তিনি পূর্ব লন্ডনের লিটন (Leyton) এলাকায় বসবাস করতেন। স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে ছিল তাঁর পরিবার। সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করে তোলা এবং প্রবাসে থেকেও পারিবারিক মূল্যবোধে তাদের বড় করার স্বপ্ন ছিল তাঁর। ২৭ জানুয়ারি লন্ডনের বাসা থেকে বের হওয়ার সময় পরিবারের সঙ্গে সেই বিদায় যে শেষ বিদায় হয়ে থাকবে, তা তারা কল্পনাও করতে পারেনি।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা কয়েকটি সম্ভাব্য মোটিভ সামনে রেখে এগোচ্ছেন।
১) জগন্নাথপুরের পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে কি কোনো স্থানীয় বিরোধ ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
২) মরদেহে আলামত নষ্ট করার যে চেষ্টা দেখা যাচ্ছে, তা পরিকল্পিততার ইঙ্গিত দেয়। এই ঘটনায় পেশাদার সহায়তা ছিল কি না, সেই সম্ভাবনাও তদন্তে আছে।
৩) কেন তিনি নিজের গ্রামে না গিয়ে সিলেটে ভাড়া বাসায় উঠেছিলেন, এবং সেই বাসার আশপাশে কারা যাতায়াত করত, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) ময়নাতদন্ত শেষে শফির মরদেহ তাঁর গ্রামের বাড়ি হবিবপুর আশিঘরে নেওয়া হয়। সেখানে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা জকিগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
একজন প্রতিষ্ঠিত প্রবাসীর এই নৃশংস মৃত্যু শুধু তাঁর পরিবারকে ভেঙে দেয়নি, প্রবাসফেরত মানুষদের নিরাপত্তা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। তদন্ত দ্রুত এগোলে যেমন অপরাধীরা শনাক্ত হবে, তেমনি ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সমাজ ও প্রশাসনের সতর্কতার জায়গাগুলোও স্পষ্ট হবে।









