সম্পাদকের পাতা

মাত্র দুই মাসে পাওয়া যায় যে দেশের নাগরিকত্ব

নজরুল মিন্টো

প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণ অংশে, অস্ট্রেলিয়া আর ফিজির মাঝামাঝি মেলানেশীয় দ্বীপমালার একটি দেশ ভানুয়াতু (Vanuatu)। আয়তনে ছোট হলেও দেশটির নাম আন্তর্জাতিক আলোচনায় বারবার উঠে আসছে এক বিশেষ কারণে। নাগরিকত্ব বিনিয়োগ কর্মসূচি, যাকে সাধারণভাবে অনেকে বলেন সোনালি পাসপোর্ট। অর্থাৎ নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ রাষ্ট্রীয় তহবিলে জমা দিয়ে তুলনামূলক দ্রুত নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট পাওয়া। এই ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে বিশ্বের নানা দেশের বিতর্কিত ধনকুবের, পলাতক আসামি, নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা ব্যক্তি কিংবা অর্থপাচারে অভিযুক্তরা ভানুয়াতুর পাসপোর্টধারী হয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমে উদ্বেগ প্রকাশিত হয়েছে।

ভানুয়াতু একটি দ্বীপমালা রাষ্ট্র। বড় দ্বীপগুলোর পাশাপাশি অসংখ্য ছোট দ্বীপ মিলিয়ে এর দ্বীপসংখ্যা ৮৩টি। দেশটির ভাষাগত বৈচিত্র্যও চোখে পড়ার মতো। বিসলামা, ইংরেজি ও ফরাসি অফিসিয়াল ভাষা। ২০০৬ সালে ‘হ্যাপি প্ল্যানেট ইনডেক্স’ ভানুয়াতুকে বিশ্বের সবচেয়ে সুখী মানুষের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল।

ভানুয়াতুর পুরোনো নাম নিউ হেব্রিডিস। দীর্ঘ সময় ব্রিটেন ও ফ্রান্স যৌথভাবে এখানে শাসন চালিয়েছে, যে যুগ্ম শাসন ব্যবস্থাকে কন্ডোমিনিয়াম বলা হয়। ১৯৮০ সালের ৩০ জুলাই দেশটি স্বাধীন হয়। রাজধানী পোর্ট ভিলা, যা আজও প্রশাসন ও বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র।

এই ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রটি বাংলাদেশের আলোচনাতেও ঢুকে পড়েছে, বিশেষ করে বিদেশি নাগরিকত্ব তথা দ্বিতীয় পাসপোর্টকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কের কারণে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী অঙ্গনের একাংশের মধ্যে ভানুয়াতুর দ্বিতীয় পাসপোর্ট নিয়ে আগ্রহের আলোচনা শোনা যায়। তবে ভানুয়াতুর নাগরিকত্বপ্রাপ্তদের তালিকা সার্বজনীনভাবে উন্মুক্ত নয়, ফলে বাংলাদেশি কারা নিশ্চিতভাবে নাগরিকত্ব পেয়েছেন তা নথিভিত্তিকভাবে যাচাই করা কঠিন। এই বাস্তবতার মধ্যেও বাংলাদেশের কয়েকজন আলোচিত ব্যক্তিকে ঘিরে বিদেশে সম্পদ ও আর্থিক অনিয়ম সংক্রান্ত অভিযোগ, তদন্ত এবং ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কিত খবর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এসেছে।

এই তালিকায় সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশের সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল (লোটাস কামাল)। সমালোচকদের দাবি, লোটাস কামাল এবং তার পরিবারের সদস্যরা ভানুয়াতুর নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন।

ড. এম এ কাইয়ুমের রিপাবলিক অব ভানুয়াতুর পাসপোর্টের কপি

একইভাবে, সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইনে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভানুয়াতু নিয়ে ব্যাপক আলোচনার সূত্রপাত হয় ঢাকা-১১ আসনের বিএনপি মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী ড. এম এ কাইয়ুমকে ঘিরে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি কেবল ভানুয়াতুর নাগরিকত্বই নেননি, বরং সেখানে বিপুল সম্পত্তিও গড়ে তুলেছেন। যদিও তিনি সংবাদমাধ্যমে এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার বলে দাবি করেছেন।

এই দুই প্রভাবশালী নাম ছাড়াও বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত থেকে হাজার কোটি টাকা লোপাটকারী বিভিন্ন মাফিয়া ডন এবং শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারির সাথে যুক্ত রাঘববোয়ালদের অনেকেই ভানুয়াতুর দ্বিতীয় পাসপোর্টের সুবিধা নিয়েছেন বলে জানা যায়। আন্তর্জাতিক তদন্ত সংস্থাগুলোর মতে, বাংলাদেশের দুর্নীতিবাজ আমলা এবং লুটেরা ধনিক শ্রেণী এই ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ কিনছে, যাতে করে সংকটের সময় দ্রুত দেশ ত্যাগ এবং বিদেশে পাচারকৃত অর্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়। সবচে বড় সুবিধা হচ্ছে ভানুয়াতুর পাসপোর্টে নাম ও পরিচয় আংশিক পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যেহেতু বাংলাদেশের সাথে ভানুয়াতুর কোনো অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই; ফলে বাংলাদেশে কোনো বড় অপরাধ করে কেউ সেখানে আশ্রয় নিলে তাকে আইনি প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব। এছাড়া কঠোর ব্যাংকিং গোপনীয়তা আইন থাকায় পাচারকৃত টাকা সেখানে জমা রাখা বা অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়াও সহজ।

ভানুয়াতু দেশটি মূলত তার ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ প্রকল্পের মাধ্যমে নাগরিকত্ব বিক্রি করে থাকে, যেখানে মাত্র ১ লক্ষ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার খরচ করলে ১ থেকে ২ মাসের মধ্যেই একজন ব্যক্তি ভানুয়াতুর পাসপোর্ট হাতে পেতে পারেন। দ্য গার্ডিয়ানের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সালেই দেশটি প্রায় ২,২০০ মানুষের কাছে এই পাসপোর্ট বিক্রি করেছে। নিজের মূল দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করলে আন্তর্জাতিক নজরদারি সংস্থাগুলোর চোখে পড়ার ভয় থাকে। কিন্তু ভানুয়াতুর পাসপোর্টে তারা সহজেই বিশ্বভ্রমণ করতে পারে। ভানুয়াতুকে ‘ট্যাক্স হ্যাভেন’ বা কর স্বর্গ বলা হয় কারণ এখানে কোনো আয়কর, কর্পোরেট কর কিংবা সম্পদের ওপর কর দিতে হয় না।

ভানুয়াতু পাসপোর্টের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল ইউরোপের শেনজেনভুক্ত দেশগুলোতে এবং যুক্তরাজ্যে ভিসা ছাড়া যাতায়াতের সুবিধা। তবে এই সুবিধার সুযোগ নিয়ে যখন বিশ্বের দাগি অপরাধীরা ইউরোপে ঢুকতে শুরু করল, তখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) নড়েচড়ে বসে। অপরাধীদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ায় ২০২২ সালে EU এই সুবিধা স্থগিত করে এবং ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর তা পুরোপুরি বাতিল করে দেয়।

এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশসহ অনেক দেশ থেকে যারা ভানুয়াতুর পাসপোর্টকে ইউরোপে যাওয়ার সহজ দরজা মনে করতেন, তাদের সেই হিসাব বদলে গেছে। তবু দ্বিতীয় পাসপোর্ট, অফশোর কাঠামো এবং সম্পদ সুরক্ষার ধারণা নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে বাজার তৈরি হয়েছে, তার ছায়ায় ভানুয়াতুর নাম এখনো আলোচনায় আছে।

তথ্যসূত্র:

Government of Vanuatu (২৬ জানুয়ারি ২০২৬)
World Bank Data, Vanuatu (২৬ জানুয়ারি ২০২৬)
BBC (২৫ জানুয়ারি ২০২৬)
The Guardian (২০ জানুয়ারি ২০২৬)
Al Jazeera (২০ জানুয়ারি ২০২৬)


Back to top button
🌐 Read in Your Language