সম্পাদকের পাতা

কানাডায় গণ-ডিপোর্টেশন: ঝুঁকিতে হাজারো বাংলাদেশিও!

নজরুল মিন্টো

কানাডাকে একসময় অভিবাসীদের স্বর্গরাজ্য বলা হতো, সেই দেশের অভিবাসন নীতিতে এখন বইছে পরিবর্তনের উত্তাল হাওয়া। সাম্প্রতিককালে কানাডার বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সি (CBSA) যে তৎপরতা দেখাচ্ছে, তা গত এক দশকের সকল রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। বর্তমানে কানাডা থেকে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৪০০ জন বিদেশি নাগরিককে বহিষ্কার করা হচ্ছে। আবাসন সংকট, স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির লাগাম টেনে ধরতে লিবারেল সরকার এখন ‘কঠোর অভিবাসন নীতি’র পথে হাঁটছে।

সিবিএসএ-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে প্রায় ১৮,০০০ থেকে ১৯,০০০ মানুষকে কানাডা থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এই বহিষ্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে সরকার প্রায় ৭৮ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। সিবিএসএ জানিয়েছে, ২০২৬ সালে এই সংখ্যা আরও বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে অবৈধ বা অনিয়মিত অবস্থানকারীদের ফেরত পাঠাতে সরকার এখন যেকোনো পর্যায়ে যেতে প্রস্তুত।

সরকারের কঠোর অবস্থানের পেছনের কারণ:

১. কানাডার সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি বড় অংশের ধারণা জন্মেছে যে, অতিরিক্ত অভিবাসনের কারণেই বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি এবং আবাসন সংকট প্রকট হয়েছে। ফলে সরকার জনমত রক্ষায় অস্থায়ী বাসিন্দাদের সংখ্যা ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে।

২. ২০২৩ সাল থেকে রেকর্ড সংখ্যক মানুষ ভিজিট ভিসায় এসে এসাইলাম দাবি করেছেন। এদের মধ্যে অনেকের আবেদন রিফিউজি প্রটেকশন ডিভিশন (RPD) থেকে নাকচ হচ্ছে। আগে আবেদন বাতিল হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় কানাডায় অবস্থানের সুযোগ থাকত। কিন্তু এখন ‘ফাস্ট-ট্র্যাক’ পদ্ধতিতে এসব আবেদনকারীকে দ্রুত বহিষ্কার করা হচ্ছে।

৩. আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী এবং বিদেশি কর্মীদের ওপর নজরদারি বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। অফ-ক্যাম্পাস কাজ, পারমিটের শর্ত, এবং মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থান নিয়ে এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নজর আরও কড়া। যারা নিয়ম ভঙ্গ করছেন কিংবা পারমিটের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবস্থান করছেন, সিবিএসএ ডিজিটাল ট্র্যাকিংসহ বিভিন্ন উপায়ে তাদের শনাক্ত করছে।

৪. কানাডায় অনিয়মিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ার অন্যতম কারণ হলো ‘ভিজিটর টু ওয়ার্ক পারমিট’ পলিসিটি আকস্মিকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া। এই সুযোগটি বাতিল করায় যারা ভিজিটর ভিসায় এসে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখছিলেন, তাদের সামনে এখন আইনি কোনো সহজ পথ খোলা নেই।

বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য বর্তমান সময়টি বেশ চ্যালেঞ্জিং। ২০২৪ সালের তথ্যানুযায়ী, অনেক বাংলাদেশি ভিজিট ভিসায় এসে রিফিউজি ক্লেইম করেছেন। কিন্তু আইনি জটিলতা এবং প্রমাণের অভাবে অনেকের আবেদন রিফিউজি প্রটেকশন ডিভিশন (RPD) থেকে নাকচ হচ্ছে।

বাংলাদেশ ওয়েলকাম সেন্টার কানাডা-এর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, স্কারবরোসহ বিভিন্ন এলাকায় আসা নতুন অভিবাসীরা এখন তীব্র অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।

আইনি প্রক্রিয়া ও সুরক্ষার সুযোগ:

কানাডার আইন অনুযায়ী, কাউকে সরাসরি তুলে নিয়ে বিমানে উঠিয়ে দেওয়া হয় না। এর একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া আছে।

Departure Order: এটি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে দেশ ছাড়লে ভবিষ্যতে ফেরার পথ খোলা থাকে।

Deportation Order: এটি সবচেয়ে কঠোর আদেশ। এটি কার্যকর হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দীর্ঘ সময়ের জন্য বা স্থায়ীভাবে কানাডায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারেন।

যদি কেউ মনে করেন নিজ দেশে ফিরলে তার প্রাণহানির ঝুঁকি আছে, তবে তিনি ‘Pre-Removal Risk Assessment’ বা পিআরআরএ (PRRA)-এর আবেদন করতে পারেন। তবে এর সাফল্যের হার বর্তমানে খুবই সীমিত।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, ঢালাওভাবে বহিষ্কারের ফলে অনেক পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে যারা কানাডায় শিশু জন্ম দিয়েছেন, সেই শিশুদের ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়ছে। সিবিসি নিউজ-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “দ্রুত বহিষ্কারের লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে মানবিক বিবেচনাগুলো উপেক্ষিত হচ্ছে।”

ইমিগ্রেশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কানাডা সরকার এখন ‘অভিবাসন বান্ধব’ ভাবমূর্তি থেকে সরে এসে ‘নিয়ন্ত্রিত অভিবাসন’ নীতিতে বিশ্বাসী হয়ে উঠছে। ২০২৫ সালে জনমতের চাপের মুখে যে কড়াকড়ি শুরু হয়েছিল, ২০২৬ সাল জুড়েও তা আরও কঠোর রূপ নিতে যাচ্ছে। বর্তমানে যারা অনিয়মিত অবস্থায় আছেন, তাদের জন্য লুকিয়ে থাকা বা তথ্য গোপন করা কোনো সমাধান নয়, কারণ সিবিএসএ-এর গোয়েন্দা বিভাগ এখন অনেক বেশি সক্রিয়।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, সিবিএসএ থেকে কোনো চিঠি আসলে তা অবহেলা না করে সাথে সাথে দক্ষ কোনো ইমিগ্রেশন আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া। নির্দিষ্ট তারিখে হাজিরা না দিলে সরাসরি ‘Arrest Warrant’ জারি হতে পারে। যাদের আবেদন নাকচ হয়েছে কিন্তু কানাডায় শক্ত সামাজিক বা পারিবারিক বন্ধন তৈরি হয়েছে (যেমন: এখানে সন্তান জন্ম নিয়েছে বা বড় হচ্ছে), তারা ‘Humanitarian and Compassionate’ (H&C) গ্রাউন্ডে স্থায়ী বসবাসের আবেদন করার সুযোগ পান কি না, তা আইনজীবীর মাধ্যমে যাচাই করতে হবে।

সবশেষে, কারো ঠিকানা বা ফোন নম্বর পরিবর্তন হলে তা অবিলম্বে ইমিগ্রেশন বিভাগকে জানাতে হবে। ভুল ঠিকানায় চিঠি যাওয়ার কারণে অনেকে সময়মতো আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেন না, ফলে অজান্তেই ডিপোর্টেশন অর্ডার কার্যকর হয়ে যেতে পারে। সিবিএসএ যেভাবে সক্রিয় হয়েছে, তাতে আতঙ্কিত হওয়ার চেয়ে সচেতন থাকা জরুরি। একই সঙ্গে কমিউনিটিতে ‘লাইসেন্সবিহীন’ এজেন্টদের প্রলোভন থেকে দূরে থাকাও এখন সময়ের দাবি।

তথ্য সূত্র:

Government of Canada: (Dec 20, 2025)
IRCC Data Portal: (Dec 9, 2025)
CBSA Official Report: (Nov 7, 2025)
CBC News: (Nov 3, 2025)


Back to top button
🌐 Read in Your Language