সম্পাদকের পাতা

কানাডার ‘স্নো-ওয়াশিং’ সিন্ডিকেটের সন্ধানে

নজরুল মিন্টো

কানাডার পিয়ারসন এয়ারপোর্টের বাইরে যখন বরফ পড়ে, তখন সব ধবধবে সাদা দেখায়। এই শুভ্রতার আড়ালেই ধুয়েমুছে সাফ করা হচ্ছে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লুণ্ঠিত কোটি কোটি কালো টাকা। আন্তর্জাতিক অপরাধ বিশেষজ্ঞরা এর নাম দিয়েছেন ‘স্নো ওয়াশিং’।

সাদা বরফের দেশে কালো টাকা সাদা করার এই মহোৎসব এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়। টরন্টো কিংবা ভ্যাঙ্কুভারের আকাশচুম্বী কন্ডোগুলোর ইটের খাঁজে মিশে আছে হাজারো মানুষের ঘাম আর বঞ্চনার গল্প।

এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কীভাবে রিয়েলটর, আইনজীবী, মর্টগেজ এজেন্ট ও আর্থিক মধ্যস্থতাকারীদের সমন্বয়ে গঠিত একটি শক্তিশালী গোপন সিন্ডিকেট কানাডাকে ধীরে ধীরে বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ অর্থ পাচারের কেন্দ্রে পরিণত করেছে। নথি, আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন ও মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই অদৃশ্য নেটওয়ার্কের কার্যপ্রণালি উন্মোচনের চেষ্টা করা হয়েছে।

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, এই হাজার কোটি ডলারের লেনদেনে কোনো প্রথাগত ব্যাংকিং নথি থাকে না। পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রিত হয় ‘হুন্ডি’ বা ‘হাওয়ালার’ মাধ্যমে। ঢাকার কোনো এক অন্ধকার ঘরে একজন এজেন্ট যখন টাকা বুঝে নেয়, ঠিক তার কয়েক মুহূর্ত পরেই টরন্টোর কোনো এক কফি শপে বসে অন্য একজন এজেন্ট পাচারকারীর হাতে তুলে দেয় সমপরিমাণ ডলার। মাঝপথে কোনো অর্থ সীমান্ত পার হয় না, হাতবদল হয় শুধু তথ্যের। এই অদৃশ্য রাজপথ দিয়েই বছরের পর বছর ধরে পাচার হচ্ছে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের সম্পদ।

কানাডায় এই কালো টাকাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য একটি সুসংগঠিত পেশাদার বাহিনী কাজ করে, যাদের বলা হয় ‘গেটকিপার’। এই চেইনের প্রথম ধাপ হলো রিয়েলটর। তারা পাচারকারীদের এমন সব প্রপার্টি খুঁজে দেয় যেখানে আয়ের উৎস নিয়ে খুব বেশি প্রশ্ন করা হয় না। অনেক সময় বাজার মূল্যের চেয়ে কয়েক লাখ ডলার বেশি দিয়ে তারা বাড়ি কেনেন, যাতে বড় অংকের টাকা একবারে সিস্টেমে ঢুকিয়ে দেওয়া যায়। এরপর আসেন মর্টগেজ এজেন্টরা। তারা ভুয়া আয়ের নথিপত্র তৈরি করে ব্যাংক থেকে ঋণের ব্যবস্থা করে দেন। পাচারকারীরা তখন তাদের অবৈধ অর্থ দিয়ে সেই ঋণের কিস্তি শোধ করেন, যা ব্যাংকের চোখে সম্পূর্ণ বৈধ আয় হিসেবে গণ্য হয়।

এই সিন্ডিকেটের সবচেয়ে শক্তিশালী খুঁটি হলো একদল অসাধু আইনজীবী। কানাডার আইনে আইনজীবীর সাথে মক্কেলের কথোপকথন এবং লেনদেন অত্যন্ত গোপনীয়। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে আইনজীবীরা তাদের নিজস্ব ‘ট্রাস্ট অ্যাকাউন্ট’ ব্যবহার করেন। যখন একজন আইনজীবী তার ট্রাস্ট অ্যাকাউন্ট থেকে কোনো বাড়ির পেমেন্ট করেন, ব্যাংক ধরে নেয় যে আইনজীবী অলরেডি সেই টাকার উৎস যাচাই করেছেন। ব্যাংক তখন আর আলাদা করে তদন্ত করে না। পাচারকারীরা আইনজীবীদের মোটা অংকের ফি দিয়ে এই সুযোগটি গ্রহণ করে। আইনজীবীরা বিভিন্ন ‘শেল কোম্পানি’ বা কাগুজে প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন যার মালিকানার আসল হদিস পাওয়া প্রায় অসম্ভব। এভাবেই আইনি মারপ্যাঁচের ভেতর দিয়ে অপরাধের টাকা ধীরে ধীরে রূপ নেয় সামাজিক মর্যাদা ও আভিজাত্যের প্রতীকে।

অনেক সময় পাচারকারীরা মূল ধারার ব্যাংক এড়িয়ে ‘প্রাইভেট লেন্ডার’দের কাছ থেকে ঋণ নেয়। এই লেন্ডাররা মূলত পাচারকারী সিন্ডিকেটেরই অংশ। তারা পাচার করা টাকা দিয়েই লোন প্রদান করে এবং সেই লোনের কিস্তি হিসেবে পাচারকারীর অন্য কোনো অবৈধ ক্যাশ টাকা সংগ্রহ করে।এভাবে ব্যাংকিং ব্যবস্থার সমান্তরালে একটি অদৃশ্য অর্থব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।

কানাডার বড় ব্যাংকগুলো (যেমন TD, RBC, Scotiabank) সরাসরি পাচারে অংশ না নিলেও তাদের নজরদারির ফাঁকফোকর সিন্ডিকেটগুলো ব্যবহার করে। ছোট দেশগুলোর ব্যাংক যখন কানাডার বড় ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন করে, তখন সেই অর্থের মূল উৎস যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। অপরাধীরা তৃতীয় কোনো দেশের (যেমন পানামা বা কেম্যান আইল্যান্ড) ব্যাংক ব্যবহার করে কানাডায় টাকা পাঠায়। এই কাঠামোগত দুর্বলতার সুযোগেই জন্ম নিয়েছে আরও সূক্ষ্ম ও কৌশলী পদ্ধতি।

সম্প্রতি টিডি ব্যাংকের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রমাণ করে যে, সিস্টেমের ভেতরেই ঘুণ ধরেছে। পাচারকারীরা ‘স্মার্ফিং’ নামক এক চতুর কৌশল ব্যবহার করে। তারা ১০ হাজার ডলারের নিচের ছোট ছোট অংকে অসংখ্য মানুষের মাধ্যমে টাকা জমা দেয়, যাতে স্বয়ংক্রিয় নজরদারি এড়ানো যায়। অনেক সময় ব্যাংক কর্মকর্তারা নিজেদের ব্যবসার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে গিয়ে এই বিশাল লেনদেনগুলোকে এড়িয়ে যান।

কানাডায় সক্রিয় এই পাচারকারী চক্রগুলো কোনো নির্দিষ্ট অফিসের অধীনে চলে না; বরং এগুলো গড়ে উঠেছে অত্যন্ত সুসংগঠিত ‘ডি-সেন্ট্রালাইজড সেল’ বা বিকেন্দ্রীভূত নেটওয়ার্কের ওপর ভিত্তি করে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মূলত উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরাই এই অর্থ পাচার প্রক্রিয়ার নেপথ্য কারিগর। পরিচয় গোপন রাখতে তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্ত্রী বা সন্তানদের নামে কানাডায় স্থাবর সম্পদ ক্রয় করেন। গ্লোবাল নিউজের আলোচিত ‘দ্য প্রাইস অফ প্রপার্টি’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সেই ভয়াবহ চিত্র, যেখানে দেখা যায় কীভাবে ক্যাসিনোগুলোকে ব্যবহার করে দুর্নীতির কালো টাকাকে অনায়াসেই বৈধ সম্পদে রূপান্তর করা হচ্ছে।

নিজেদের অস্তিত্ব আড়াল করতে এই সিন্ডিকেটগুলো কানাডায় ‘কনসালটেন্সি’ বা ‘ইম্পোর্ট-এক্সপোর্ট’ ব্যবসার আড়ালে অসংখ্য ‘শেল কোম্পানি’ বা নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান খুলে রাখে। যখনই বড় অংকের টাকা পাচারের প্রয়োজন পড়ে, তখনই এই কাগুজে প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ভুয়া ইনভয়েস বা বাণিজ্যিক রসিদ তৈরি করা হয়। এভাবে ব্যবসার ভুয়া খরচ দেখিয়ে একদিকে যেমন অর্থ স্থানান্তর সহজ হয়, তেমনি নজরদারি সংস্থাগুলোর চোখ ফাঁকি দিয়ে পাচারকৃত টাকা বিদেশের মাটিতে বিনিয়োগ করা সম্ভব হয়।

কানাডার এই অন্ধকার জগত কেবল লোকমুখে শোনা গল্প নয়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নথিতে এর অকাট্য প্রমাণ মিলেছে। ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার আলোচিত Cullen Commission Report হলো কানাডার ইতিহাসে এ বিষয়ক সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল, যেখানে স্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছে কীভাবে সরকারি কর্মকর্তাদের নাকের ডগায় ক্যাসিনো ও রিয়েল এস্টেট ব্যবহার করে বিলিয়ন ডলার লন্ডারিং করা হয়েছে।

অন্যদিকে Panama Papers & Pandora Papers লিক হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। সেখানে উঠে আসে অনেক বাংলাদেশি ও আন্তর্জাতিক পাচারকারীর নাম যারা অফশোর কোম্পানির আড়ালে কানাডায় বিপুল সম্পদ পাহাড় গড়েছেন।

Transparency International Canada-র ‘স্নো ওয়াশিং’ রিপোর্টেও উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। তারা দেখিয়েছে যে টরন্টোর শীর্ষ প্রপার্টিগুলোর একটি বিশাল অংশের প্রকৃত মালিকের কোনো হদিস নেই, যা এই শহরকে অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে।

বৃহত্তর টরন্টোর স্কারবোরো, মিসিসাগা কিংবা ব্রাম্পটনের মতো শহরগুলোতে এই নেটওয়ার্ক অত্যন্ত গভীরে প্রোথিত। ছোট ছোট কারেন্সি এক্সচেঞ্জ হাউসগুলো অনেক সময় এই হুন্ডি সিন্ডিকেটের ফ্রন্ট হিসেবে কাজ করে। এরা বাইরে সাধারণ মুদ্রা বিনিময় করলেও আড়ালে চলে আন্তর্জাতিক অর্থ হস্তান্তরের বিশাল কারবার। অনেক সময় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কিছু কমিশনের বিনিময়ে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে দেওয়া হয়, যারা অবুঝের মতো এই ‘মানি মিউলিং’ এর শিকার হন।

সম্প্রতি কানাডা সরকার “Canada Business Corporations Act” সংশোধন করেছে। এখন থেকে যেকোনো কোম্পানিকে তাদের ‘বেনিফিশিয়াল ওনার’ (প্রকৃত মালিক)-এর তথ্য প্রকাশ করতে হবে। ব্রিটিশ কলম্বিয়ার কালেন কমিশনের রিপোর্ট ইতিমধ্যেই এই অন্ধকার জগতের অনেক তথ্য ফাঁস করে দিয়েছে। আন-এক্সপ্লেইন্ড ওয়েলথ অর্ডার বা ইউডব্লিউও এর মাধ্যমে এখন যে কাউকে তার আয়ের অতিরিক্ত সম্পদের কৈফিয়ত দিতে বাধ্য করা যাবে।

কানাডার অর্থনীতিতে এই পাচার করা টাকার প্রবাহ যেমন ঘরবাড়ির দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে, তেমনি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে। এটি কেবল বাংলাদেশের মতো দেশের ক্ষতি নয়, বরং কানাডার আবাসন খাতের জন্যও এক বড় বিপর্যয়। এই গেটকিপার সিন্ডিকেট যতক্ষণ পর্যন্ত ভাঙা না যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সাদা বরফের শুভ্রতায় কালো টাকার দাগ মুছে যাবে না। আন্তঃদেশীয় আইনি সহযোগিতা এবং ব্যাংকিং নজরদারি আরও কঠোর করাই এখন সময়ের দাবি।

বি. দ্র. কতিপয় রিয়েলটর, মর্টগেজ এজেন্ট, আইনজীবী ও কারেন্সি এক্সচেঞ্জ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পৃক্ততার বিষয়ে নির্ভরযোগ্য অভিযোগ আমাদের হাতে এসেছে। প্রাপ্ত তথ্য ও নথি যাচাই করে চলমান অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। তদন্ত সম্পন্ন হলে এবং তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পর সংশ্লিষ্টদের পরিচয় জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে।

তথ্যসু্ত্র:

Global News Investigation: “The Price of Property” series
Cullen Commission Report
FINTRAC Annual Report 2024-25
The Toronto Star: “The Snow-washing Files”.
Bangladesh Financial Intelligence Unit


Back to top button
🌐 Read in Your Language