সম্পাদকের পাতা

কানাডায় রিফুউজিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল চার্চ

নজরুল মিন্টো

বিশ্বের এক অপূর্ব সুন্দর দেশ কানাডা। এর প্রাকৃতিক নিসর্গ যেমন যে কাউকে মুগ্ধ করে, তেমনি দেশটি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত তার মানবিক নীতিমালার জন্য। যুদ্ধ, রাজনৈতিক নিপীড়ন আর সামাজিক বৈষম্যের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে যারা নিজ দেশ ছাড়তে বাধ্য হন, তাদের কাছে কানাডা আজও এক আশ্রয়ের নাম। দুই দশক আগেও এই বাস্তবতা যেমন সত্য ছিল, ২০২৫ সালেও তার কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি; বরং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে কানাডার ভূমিকা আরও সুসংহত হয়েছে।

বর্তমানে কানাডা প্রতি বছর গড়ে ৬০ হাজারেরও বেশি শরণার্থী (রিফুউজি) ও আশ্রয়প্রার্থীকে সাদরে গ্রহণ করছে। ২০১৫ সাল থেকে সিরিয়া, আফগানিস্তান, ইউক্রেন ও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মতো বিপন্ন মানুষের জন্য কানাডা বিশেষ মানবিক কর্মসূচি চালু করেছে, যা এখন বিশ্বে উদাহরণস্বরূপ। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার শরণার্থী কানাডায় স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পেয়েছেন। কেবল ইউক্রেন যুদ্ধের সংকটকালীন সময়ে বিশেষ কর্মসূচির আওতায় ২ লক্ষাধিক মানুষকে জরুরি আশ্রয় দেওয়া হয়েছে।

এই বিশাল কর্মযজ্ঞে বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীদের সংখ্যাও বাড়ছে অভাবনীয় হারে। ২০২৪ সালের প্রথম ছয় মাসেই কানাডার ‘রিফিউজি প্রোটেকশন ডিভিশন’ (RPD)-এ প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশির আবেদন জমা পড়ে। বর্তমানে প্রায় ২৩ হাজার বাংলাদেশির আবেদনের নিষ্পত্তি অপেক্ষায় রয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। এই বিপুলসংখ্যক আবেদন স্পষ্ট করে দেয়, বৈশ্বিক অস্থিরতার মাঝে বাংলাদেশিদের কাছে কানাডাই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল।

কানাডার শরণার্থী আশ্রয়নীতির এই মানবিক ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। ২০০৪ সালে বাংলাদেশি নাগরিক শামসু মিয়ার অটোয়ার একটি গির্জায় আশ্রয় নেওয়ার ঘটনা জাতীয় পত্রিকার শিরোনামে উঠে আসে। শামসু মিয়া অটোয়ার First United Church-এ প্রায় ৮ মাস (জুন ২০০৪ থেকে মার্চ ২০০৫ পর্যন্ত) আশ্রয়ে ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা তাঁকে সেখান থেকেই গ্রেপ্তার করেন, যা নিয়ে সে সময় মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভের জন্ম হয়।

আজও যখন আইনি জটিলতায় কারও আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়, তখন চার্চের পবিত্র প্রাঙ্গণই হয়ে ওঠে তাদের শেষ ভরসা। টরন্টো স্টারের এক সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১৯টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে বহু পরিবার ‘স্যাঙ্কচুয়ারি’ বা আশ্রয়ে রয়েছে। চার্চ নেতৃবৃন্দের বক্তব্য স্পষ্ট; যাদের স্বদেশে ফিরে যাওয়া মানেই নিশ্চিত মৃত্যু বা বন্দিত্ব, তাদের জন্য গির্জার দরজা সবসময় খোলা থাকবে।

তবে এই মানবিকতার আড়ালে কিছু অমীমাংসিত সংকটও রয়েছে। কানাডার কেন্দ্রীয় ইমিগ্রেশন আইন অনুযায়ী, স্থানীয় পুলিশ বা সিটি কর্তৃপক্ষ কারও ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাস যাচাইতে বাধ্য নয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে স্ট্যাটাস না থাকার সুযোগ নিয়ে চলে নানান হয়রানি। টরন্টো, ভ্যাঙ্কুভার বা মন্ট্রিয়লের মতো অন্তত ১২টি শহর এখন ‘স্যাঙ্কচুয়ারি সিটি’ নীতি অনুসরণ করছে, যার মূল মন্ত্র হলো:‘ভয়হীন সেবা’। এই নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো, কেউ যেন স্ট্যাটাসের কারণে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা বা আশ্রয়সেবা থেকে বঞ্চিত না হন। বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে এই নীতির প্রয়োগে ফাঁকফোকর রয়ে গেছে, যা শরণার্থীদের জন্য হয়রানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বাস্তবতা হলো, প্রায় ২০ হাজার থেকে ৫ লক্ষ ‘নথিবিহীন’ মানুষ বর্তমানে কানাডায় বসবাস করছেন। তারা দেশটির নির্মাণ শিল্প, কৃষি কিংবা রেস্টুরেন্টে হাড়ভাঙা শ্রম দিচ্ছেন, অথচ নিজেরা নূন্যতম নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

বিশেষ করে স্ট্যাটাসবিহীন নারীরা ঘরোয়া সহিংসতার শিকার হলেও পুলিশের কাছে যেতে ভয় পান। নেলিস (Nellie’s) বা ওকাসি (OCASI)-র মতো সংগঠনগুলো দাবি করে আসছে, নির্যাতিতদের স্ট্যাটাস না জিজ্ঞেস করলে অপরাধীরা পার পাবে না এবং সমাজ আরও নিরাপদ হবে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও স্ট্যাটাস নিয়ে মাঝে মাঝে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। অনেক শিশুই এখনো স্কুলে যেতে পারছে না শুধুমাত্র অভিভাবকের স্ট্যাটাস নিয়ে প্রশাসনিক অনীহার কারণে। অথচ অন্টারিও শিক্ষা আইন প্রত্যেক শিশুর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করেছে।

এই বৈষম্য ঘোচাতে কানাডার শহরগুলো প্রাদেশিক আইনের সংস্কার চাইছে। আদালতও ধীরে ধীরে স্থানীয় সরকারকে বিশেষ উপ-আইন (By-law) তৈরির স্বাধীনতা দেওয়ার দিকেই অগ্রসর হচ্ছে।

অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, “শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া কি নাগরিকদের ওপর বোঝা নয়?” কানাডার চার্চ, আশ্রয়কেন্দ্র আর সচেতন নাগরিক সমাজ একবাক্যে জবাব দেয়, “এটি বোঝা নয়, এটি আমাদের নৈতিক দায়বদ্ধতা।” বিশ্বজুড়ে নিপীড়িত মানুষের চোখে কানাডা আজও সেই পরম নির্ভরতার নাম, যেখানে মানুষের জীবন, নিরাপত্তা এবং মর্যাদা অন্য কিছুর চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়।

References:

✔️ Immigration and Refugee Board of Canada (IRB)
✔️ Immigration, Refugees and Citizenship Canada (IRCC)
✔️ The Globe and Mail, CBC News, and Toronto Star (archives and investigative reports)


Back to top button
🌐 Read in Your Language