সম্পাদকের পাতা

সংবাদপত্র থেকে সমাজসেবায়

নজরুল মিন্টো

শীত নেমে এলে টরন্টো শহর বদলে যায়। ফুটপাত, ছাদ আর গাছের ডালে জমে ওঠে বরফের স্তর। সন্ধ্যা নামতেই জানালার ওপারে জ্বলে ওঠে রঙিন আলো, ঘরে ঘরে শোনা যায় উৎসবের সুর। ঠিক এমনই এক তীব্র শীতের রাতে জানালার কাচে মুখ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ছয় বছরের ছোট্ট এমিলি। বাইরে প্রতিবেশীদের বাড়িতে ক্রিসমাস ট্রির নিচে সাজানো উপহার, হাসি আর ব্যস্ততার ঝলকানি। কিন্তু এমিলির ঘরটিতে উৎসবের সেই আলো পৌঁছায় না। সেখানে আছে কেবল অপেক্ষা। একটি খেলনা, একটি নতুন পোশাক, কিংবা কাউকে নিজের কথা বলার মতো সামান্য আনন্দের স্বপ্ন।

এমিলি জানে না, টরন্টোসহ পৃথিবীর বহু শহরে তার মতো হাজার হাজার শিশু একই অপেক্ষায় থাকে। উৎসব আসে, ক্যালেন্ডারে তারিখ বদলায়, আলো ঝলমল করে শহর। তবু তাদের জীবনে আনন্দ এসে ধরা দেয় না। এমিলির মা একবার খুব সাধারণ ভঙ্গিতে বলেছিলেন, তাদের ঘরে সান্তাক্লজ আসেন না। কারণ তারা গরিব। আর সান্তাক্লজ গরিবের ঘরে আসতে পছন্দ করেন না। কথাগুলো বলার সময় তাঁর কণ্ঠে অভিযোগ ছিল না, ছিল না রাগ। ছিল কেবল বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার এক ধরনের ক্লান্ত স্বীকারোক্তি। সেই কথা এমিলি পুরোপুরি বোঝে না, কিন্তু অনুভব করে। উৎসবের আলো যে সবার জানালায় সমানভাবে পৌঁছায় না, এই বোধ তার শৈশবেই ধীরে ধীরে গেঁথে যায়।

এই ধরনের কথাই অনেক শিশুর জীবনের প্রথম উপলব্ধি হয়ে ওঠে। তারা ধীরে ধীরে বুঝে নেয়, কিছু আনন্দ যেন সবার জন্য নয়। সেই উপলব্ধির সঙ্গে সঙ্গে একটি অদৃশ্য ব্যবধান তৈরি হয়, যা শৈশবের আনন্দকে অসমভাবে ভাগ করে দেয়। ঠিক এই জায়গায় সমাজের একটি গভীর প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়। এই ব্যবধান কি চুপচাপ মেনে নেওয়ার বিষয়, নাকি কোথাও কেউ আছে, যে এই গল্প বদলে দিতে পারে।

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই একসময় মানুষের দৃষ্টি গিয়ে পড়ে ভিন্ন এক শক্তির দিকে। সেই শক্তি কেবল খবর জানায় না, গল্পের দায়ও বহন করে। তখন সংবাদ আর শুধু ঘটনা বর্ণনার জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে না। মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সেটি নতুন ভূমিকা নিতে শুরু করে। কানাডার প্রখ্যাত দৈনিক ‘টরন্টো স্টার’ সেই ধরনের এক মানবিক ধারার উদাহরণ।

এই মানবিক অভিযাত্রার সূচনা হয়েছিল ১৯০৬ সালে। প্রকাশক জোসেফ এটিকসন তখনও জানতেন না, তাঁর জীবনের একটি ছোট্ট স্মৃতি একদিন হাজার হাজার শিশুর জীবনের গল্প বদলে দেবে। তাঁর বয়স যখন মাত্র ছয় মাস, তখন বাবা মারা যান। আটটি সন্তানকে নিয়ে সংগ্রামী জীবন শুরু করেন তাঁর মা। শৈশব থেকেই অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী।

ক্রিসমাসের ঠিক আগে আগে এক শীতের দিনে বন্ধুরা যখন বরফে ঢাকা মাঠে স্কেটিং খেলায় মেতে ওঠে, বালক এটিকসন তখন মাঠের এক পাশে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। খেলায় নামতে পারে না, কারণ তার পায়ে স্কেটিং জুতা নেই। বিষয়টি লক্ষ্য করেন প্রতিবেশি এক বয়স্কা নারী। তিনি তার কাছে এসে জিজ্ঞেস করেন, সে কেন খেলছে না। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই এটিকসন বলে, তার স্কেটিং জুতা নেই, আর সেটি কেনার সামর্থ্য তার মায়ের নেই।

মহিলাটি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। তারপর তিনি তাকে বলেন, সান্তাক্লজের কাছে তার ইচ্ছে পাঠিয়ে দিতে। বালক এটিকসন তখন চোখ নামিয়ে বলে, সে জানে তাদের ঘরে সান্তাক্লজ আসেন না। কথাটিতে কোনো অভিযোগ ছিল না, ছিল না হতাশার প্রকাশ। ছিল বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার শিশুসুলভ স্বীকৃতি। মহিলার চোখ তখন ছলছলিয়ে ওঠে, যদিও তিনি তা আড়াল করার চেষ্টা করেন।

সেই কথোপকথন সেদিন সেখানেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু স্মৃতিটি রয়ে যায়। ক্রিসমাসের সকালে দরজার সামনে একটি প্যাকেট পড়ে থাকতে দেখে এটিকসন। ভেতরে ছিল একজোড়া নতুন স্কেটিং জুতা। কে রেখে গেছে, কেন রেখে গেছে, তা আর কোনোদিন জানা হয়নি। সেই অনুভব তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলে এবং বহু বছর পর অন্য রূপে ফিরে আসে।

বছর পেরিয়ে তিনি যখন সমাজে প্রতিষ্ঠিত, তখন এক ধর্মীয় নেতা তাঁকে ত্রিশজন দরিদ্র শিশুকে সাহায্য করার অনুরোধ জানান। সেই মুহূর্তে নিজের শৈশবের স্মৃতি আবার সামনে এসে দাঁড়ায়। তখনই তিনি উপলব্ধি করেন, দুঃখ ভাগ হলে তা হালকা হয়, আর আনন্দ ভাগ হলে তা বিস্তৃত হয়। সেই ভাবনা থেকেই সিদ্ধান্ত নেন, ত্রিশে থেমে না থেকে যত বেশি সম্ভব শিশুর জীবনে আনন্দ পৌঁছে দেওয়ার। এই সিদ্ধান্ত থেকেই জন্ম নেয় ‘স্টার সান্তাক্লজ ফান্ড’।

এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই ফান্ড টরন্টো শহরের মানবিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে। প্রতি বছর ক্রিসমাসের আগে ‘টরন্টো স্টার’ তাদের পাঠকদের কাছে উদ্যোগটির কথা তুলে ধরে। পাঠকরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ সহায়তা পাঠান। কেউ অল্প দেন, কেউ বেশি। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ফান্ড পরিচালনার সব প্রশাসনিক ব্যয় পত্রিকাটি নিজেই বহন করে। ফলে দাতাদের দেওয়া প্রতিটি ডলার সরাসরি শিশুদের জন্য ব্যবহৃত হয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই উদ্যোগের পরিসর আরও সুস্পষ্ট ও সংগঠিত রূপ পেয়েছে। প্রতি বছর এই ফান্ডের মাধ্যমে কয়েক মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা হয়, যার সহায়তা আর কেবল খেলনা বা চকলেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। উষ্ণ শীতের পোশাক, বই, শিক্ষাসামগ্রী এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় নানা সামগ্রীও এর অন্তর্ভুক্ত হয়। স্থানীয় সামাজিক সংস্থা ও স্কুলগুলোর সহযোগিতায় শিশুদের প্রকৃত প্রয়োজন নির্ধারণ করা হয়, এবং সেই অনুযায়ী এসব সহায়তা সময়মতো হাজার হাজার শিশুর কাছে পৌঁছে যায়।

এই উদ্যোগ স্পষ্ট করে দেয় যে সংবাদমাধ্যম কেবল সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যম নয়; প্রয়োজন হলে তা সমাজসেবার একটি কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য প্ল্যাটফর্মেও রূপ নিতে পারে। আর বিশ্বজুড়ে এমন মানবিক ভূমিকায় টরন্টো স্টার একক নয়। ব্রিটেনের ‘দ্য গার্ডিয়ান’ নিয়মিতভাবে শরণার্থী ও অভিবাসীদের সহায়তায় পাঠকভিত্তিক তহবিল সংগ্রহ করে। যুক্তরাষ্ট্রে সিএনএন দুর্যোগ ও মানবিক সংকটের সময় ত্রাণ সহায়তা ও জনসচেতনতা গড়ে তোলার জন্য বিশেষ প্রচারণা চালায়। ভারতের ‘দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া’ তাদের ‘টাইমস রিলিফ ফান্ড’-এর মাধ্যমে বন্যা, ভূমিকম্প ও মহামারির মতো দুর্যোগে দীর্ঘদিন ধরে সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছে। এ ছাড়া জাপানের ‘আসাহি শিম্বুন’ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বিশেষ তহবিল পরিচালনা করে, আর অস্ট্রেলিয়ার ‘দ্য সিডনি মর্নিং হেরাল্ড’ বিভিন্ন সামাজিক সংকটে কমিউনিটি-ভিত্তিক সহায়তা কার্যক্রমে যুক্ত থাকে।

এই সব উদাহরণ দেখায়, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সংবাদপত্র সমাজের সংকটকে কেবল তুলে ধরেই থেমে থাকে না, বরং সেই সংকটের সঙ্গে মানুষের জীবনকে যুক্ত করে দেয়। এই ধারার উদ্যোগগুলো গণমাধ্যমকে তথ্য পরিবেশনের সীমা ছাড়িয়ে সামাজিক দায়িত্বের এক ভিন্ন স্তরে নিয়ে গেছে।

সমাজে বিশ্বাসের ঘাটতি অনেক সময় মানুষকে থামিয়ে দেয়। সাহায্য করলে অপব্যবহার হবে কি না, সেই আশঙ্কাও কাজ করে। তবু টরন্টো স্টারের পাঠকদের দানের ক্ষেত্রে ভিন্ন একটি চিত্র দেখা যায়। তাদের সহায়তার কথা প্রকাশ্যে না এলেও, দাতাদের পরিচয় সামনে না এলেও, সেই সহানুভূতির প্রভাব সময়ের সঙ্গে আরও বিস্তৃত হচ্ছে।

বি. দ্র. টরন্টো স্টারের এই মানবিক উদ্যোগ আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। সেই অনুপ্রেরণার ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে ‘দেশে বিদেশে ফাউন্ডেশন’ নামে একটি চ্যারিটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করি। বাংলাদেশে পরিচালিত এই সংগঠনের মাধ্যমে প্রতিবছর বিশেষ বিশেষ উপলক্ষে অসহায় ও বঞ্চিত শিশুদের জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়।


Back to top button
🌐 Read in Your Language