আইইএলটিএসের ভুল ফলাফলে যুক্তরাজ্যের ভিসা সংকট: প্রযুক্তিগত ত্রুটি, প্রশ্নফাঁস ও আন্তর্জাতিক আস্থার বড় ধাক্কা
নজরুল মিন্টো

ইংরেজি ভাষা পরীক্ষা আইইএলটিএস দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বজুড়ে উচ্চশিক্ষা, অভিবাসন ও পেশাগত সুযোগের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচিত। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী, স্বাস্থ্যকর্মী ও দক্ষ পেশাজীবী এই পরীক্ষার ফলের ওপর নির্ভর করেই নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করেন।
কিন্তু আইইএলটিএসকে ঘিরে সম্প্রতি সামনে আসা একাধিক গুরুতর তথ্য কেবল একটি পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতাই নয়, বরং বৈশ্বিক অভিবাসন ও উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। দীর্ঘদিন অচিহ্নিত থাকা প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে হাজার হাজার পরীক্ষার্থী ভুল ফলাফল পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশে সংঘবদ্ধভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও পরীক্ষাবাণিজ্যের প্রমাণ মিলেছে। এসব অনিয়ম একত্রে আইইএলটিএসের ওপর গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক আস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে এবং এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে যুক্তরাজ্যের ভিসা ব্যবস্থায়।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশিসহ বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮০ হাজার পরীক্ষার্থী ভুল আইইএলটিএস ফলাফল পেয়েছেন। এই পরীক্ষার্থীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রকৃতপক্ষে অকৃতকার্য হওয়া সত্ত্বেও পাস নম্বর পেয়েছেন। সেই ভুল ফলাফলের ভিত্তিতে বহু মানুষ যুক্তরাজ্যে পড়াশোনা ও কাজের ভিসা পেয়েছেন, যাদের আদতে সেই ভিসা পাওয়ার যোগ্যতা ছিল না।
আইইএলটিএস কর্তৃপক্ষ এই সমস্যার জন্য একটি প্রযুক্তিগত ত্রুটিকে দায়ী করেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরীক্ষার লিসেনিং ও রিডিং অংশের মূল্যায়নে একটি সফটওয়্যারজনিত সমস্যার কারণে মোট পরীক্ষার প্রায় এক শতাংশ ফলাফল প্রভাবিত হয়েছে। সংখ্যার হিসাবে এই এক শতাংশই দাঁড়ায় প্রায় ৭৮ হাজার পরীক্ষার্থী।
প্রশ্ন উঠছে, একটি বৈশ্বিক পরীক্ষায় এত বড় ধরনের ত্রুটি কীভাবে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে অচিহ্নিত রইল। এই সময়ে হাজার হাজার পরীক্ষার্থী সেই ফলাফল ব্যবহার করে ভিসা আবেদন করেছেন, দেশ ছেড়েছেন এবং নতুন জীবন শুরু করেছেন। কয়েক সপ্তাহ আগে ভুলটি ধরা পড়ার পর আইইএলটিএস কর্তৃপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সংশোধিত ফলাফল জানানো, পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ এবং কিছু ক্ষেত্রে অর্থ ফেরতের ঘোষণা দেয়।
কিন্তু এরই মধ্যে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে বিষয়টি আর কেবল একটি পরীক্ষার সীমায় নেই। বহু মানুষ ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন। ফলে এই ত্রুটি এখন পরিণত হয়েছে অভিবাসন ব্যবস্থার জটিলতা, জননিরাপত্তা ও নীতিনির্ধারণী সংকটে।
ভুল ফলাফলের পাশাপাশি আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে আইইএলটিএস পরীক্ষার নিরাপত্তা ঘিরে। বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম ও চীনে প্রশ্নফাঁস ও সংঘবদ্ধ জালিয়াতির প্রমাণ সামনে এসেছে। বাংলাদেশে পুলিশ এমন একটি চক্রকে গ্রেপ্তার করেছে, যারা ঘুষের মাধ্যমে পরীক্ষার প্রশ্ন সংগ্রহ করে পরীক্ষার্থীদের কাছে বিক্রি করছিল। প্রতিটি প্রশ্নপত্রের জন্য নেওয়া হচ্ছিল বিপুল অঙ্কের অর্থ।
দেশি ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বাংলাদেশে আইইএলটিএস পরীক্ষাকে ঘিরে একটি সংঘবদ্ধ অসাধু চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা দুই বাংলাদেশি হলেন মো. মামুন খান ও পান্না পুনম হালদার ওরফে কেয়া। গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তাঁরা পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষার আগের রাতেই নির্দিষ্ট হোটেলে রাখতেন। সেখানে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র দেখিয়ে রাতভর মুখস্থ করানো হতো এবং পরদিন পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া হতো। অভিযানে পুলিশ নগদ অর্থ ও একাধিক মোবাইল ফোন জব্দ করে।
ইংরেজি দৈনিক ডেইলি সানের মাসব্যাপী অনুসন্ধান এই চিত্রকে আরও স্পষ্ট ও ভয়াবহ করে তোলে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, অন্তত পাঁচজনের একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত। এপ্রিল ও মে মাসে ছদ্মবেশে একজন প্রতিবেদক রাজধানীর একাধিক হোটেলে গিয়ে প্রত্যক্ষ করেন, কীভাবে শতাধিক শিক্ষার্থীকে রাতভর রেখে প্রশ্ন ও উত্তর মুখস্থ করানো হচ্ছে। ২৫ এপ্রিল উত্তরার একটি হোটেলে প্রায় ১০০ শিক্ষার্থীকে রাখা হয়। ২৩ মে মতিঝিলের একটি হোটেলে একইভাবে ১২০ থেকে ১৩০ জন শিক্ষার্থী প্রস্তুতি নেয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, ২৪ মে সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে, অর্থাৎ পরীক্ষার প্রায় তিন ঘণ্টা আগেই প্রতিবেদক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র হাতে পান। পরীক্ষার্থীদের অনেকেই পরে জানিয়েছেন, তাঁদের উত্তর পরীক্ষার প্রশ্নের সঙ্গে শতভাগ মিলে গেছে।
এই অবৈধ সুবিধা নিতে শিক্ষার্থীদের গুনতে হয়েছে বিপুল অর্থ। একজন পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত। অনেক ক্ষেত্রে অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে পরীক্ষার পর। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, শুধু শিক্ষার্থী নয়, সরকারি চাকরিজীবীরাও এই প্রশ্নফাঁসের সুবিধা নিয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কিছু কোচিং সেন্টার ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং শিক্ষার্থী সরবরাহ করে কমিশন আদায় করত।
চক্রটির কার্যপদ্ধতি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত ও গোপন। প্রথমে পরীক্ষার্থীরা আইইএলটিএসের অফিসিয়াল ফি দিয়ে নিবন্ধন করত। পরীক্ষার আগের দিন তাঁদের সব ইলেকট্রনিক ডিভাইস রেখে একটি গোপন হোটেলে রাখা হতো। রাত দেড়টা থেকে ভোর পর্যন্ত রাইটিং, রিডিং ও লিসেনিংয়ের ফাঁস হওয়া প্রশ্ন ও উত্তর দেখানো হতো। সকালে নির্দিষ্ট গাড়িতে করে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া হতো। পরীক্ষার পর উত্তর মিলিয়ে দেখে সন্তুষ্ট হলে অভিভাবকদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হতো।
এই চক্রের প্রধান ব্যক্তি দাবি করেছেন, তিনি ২০১৯ সাল থেকে প্রশ্নপত্র বিক্রি করে আসছেন এবং একজন পরীক্ষার্থীর জন্য নেন ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা। তাঁর আরও দাবি, প্রশ্নপত্র সংগ্রহে তিনি বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন এবং এই কাজে পরীক্ষা গ্রহণকারী কর্তৃপক্ষের ভেতরের কিছু লোকের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। যদিও এসব দাবি এখনো তদন্তাধীন এবং যাচাইসাপেক্ষ, তবুও তা পুরো পরীক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে গভীর প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সতর্ক করে বলেছে, যদি আইইএলটিএস প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে বাংলাদেশে আইইএলটিএস সেন্টার বন্ধ করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ ধরনের অনিয়ম বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সুনামের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হবে।
এই সংকটের প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয় ও স্বাস্থ্যখাতে। যুক্তরাজ্যের কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশ থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। অন্যদিকে, এনএইচএসে কর্মরত অনেক অভিবাসী কর্মীর ইংরেজি দক্ষতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চিকিৎসক ও তদন্তকারী কর্মকর্তারা। কিছু প্রতিবেদনে ভাষাগত দুর্বলতাকে রোগীর নিরাপত্তা ঝুঁকির একটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একটি ঘটনায় দেখা যায়, এক কেয়ার কর্মী ‘breathing’ ও ‘bleeding’ শব্দের পার্থক্য বুঝতে পারেননি, যা রোগীর জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই তথ্য প্রকাশের পর যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কনজারভেটিভ পার্টির নেতারা বলছেন, ভুল ফলাফলের ভিত্তিতে যারা ভিসা পেয়েছেন, তাদের মামলাগুলো পুনরায় পর্যালোচনা করা উচিত। অন্যদিকে মানবাধিকারকর্মী ও অভিবাসন বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, অনেকেই এখানে ব্যবস্থাগত ব্যর্থতার শিকার এবং একতরফা শাস্তিমূলক পদক্ষেপ মানবিক ও আইনগত জটিলতা তৈরি করতে পারে।
আইইএলটিএস কেবল একটি ভাষা পরীক্ষা নয়। এটি আন্তর্জাতিক আস্থার প্রতীক। এই পরীক্ষার একটি ভুল স্কোর বা একটি প্রশ্নফাঁস হাজারো মানুষের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। তাই পরীক্ষাব্যবস্থায় ত্রুটি ধরা পড়ামাত্র দ্রুত পদক্ষেপ, কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
তবে দায় কেবল পরীক্ষাকেন্দ্র বা বিদেশি সংস্থার নয়। দায় আমাদের সমাজেরও, যেখানে শর্টকাট সফলতা ও অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার সংস্কৃতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। এই মানসিকতা না বদলালে যেকোনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডই ঝুঁকির মুখে পড়বে।
দিন শেষে হতাশা একটাই। যে পরীক্ষার ফল দিয়ে একটি দেশের দরজা খুলে যায়, সেই পরীক্ষার সততা নিশ্চিত করা না গেলে ভিসার স্বপ্ন তো দূরের কথা, আন্তর্জাতিক বিশ্বাসের স্তম্ভই নড়বড়ে হয়ে যায়।









