সম্পাদকের পাতা

ম্যানচেস্টারের ফারহানার বিষণ্ণ বিদায়

নজরুল মিন্টো

ফারহানা আক্তারের কল্পিত ছবি

উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডের এক মহানগরের নাম ম্যানচেস্টার। যেখানে ইতিহাস ও আধুনিকতা পাশাপাশি হাঁটে। আর এই শহরের হৃৎপিণ্ডে গড়ে উঠেছে অভিবাসী বাংলাদেশিদের একটি স্বতন্ত্র সম্প্রদায়।

ম্যানচেস্টারের লংসাইট, ওল্ড ট্র্যাফোর্ড, রাশুলহোম এলাকায় বাংলাদেশিদের দোকানপাট, মসজিদ, সাংস্কৃতিক সংগঠন, এমনকি বাংলা স্কুলও গড়ে উঠেছে।

এখানকার অভিবাসী সমাজ একদিকে যেমন শ্রমজীবী, ট্যাক্সি চালক, দোকানদার, ক্যাটারিং ব্যবসায়ী; অন্যদিকে তাদের পরবর্তী প্রজন্ম হয়ে উঠছে ডাক্তার, প্রকৌশলী, আইনজীবী, ও গবেষক। ঘরের ভেতরে বাংলা, আর বাইরের জগতে ইংরেজি এই দ্বৈত পরিচয়ের মধ্যে তারা টিকিয়ে রাখে এক স্নিগ্ধ অথচ টানাপোড়েনময় জীবনধারা।

বাংলাদেশ থেকে বিশেষত সিলেট অঞ্চলের মানুষ ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে শ্রমিক ভিসায় যুক্তরাজ্যে আসতে শুরু করেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এ দেশে স্থায়ী হলেও, অনেক পরিবার তাদের সামাজিক রীতিনীতি ও সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরেছে দৃঢ়ভাবে।

এই শহরের শীতল বাতাসে অনেক সময় জমে থাকে কিছু না বলা দুঃখ, কিছু চাপা কষ্ট। সেই সব গল্পের একটি চরিত্র ফারহানা আক্তার।

ফারহানা ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল শিক্ষার্থী, হাসিখুশি ও মেধাবী একটি মেয়ে। তারা ম্যানচেস্টারের লংসাইট (Longsight) এলাকায় থাকতেন। এটি একটি বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকা। তার পরিবার ছিল সিলেটের জগন্নাথপুর এলাকার বাসিন্দা। তার বাবা ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে যুক্তরাজ্যে আসেন এবং ক্যাটারিং ব্যবসার সাথে যুক্ত হন। মা ছিলেন গৃহিণী।

ফারহানা যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারে জন্মগ্রহণ করেন। ২ ভাই ও ১ বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট ছিলেন। তার বড় ভাই যুক্তরাজ্যে ইঞ্জিনিয়ারিং পেশায় কর্মরত এবং বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে।

ফারহানার জীবনে সংঘাত ছিল দু’টি ভিন্ন জগতের মধ্যে। একদিকে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে আধুনিক জ্ঞানচর্চা ও ইউরোপীয় স্বাধীনতা; অন্যদিকে বাড়ির চার দেয়ালের মধ্যে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ।

২০২০-২০২১ সালের কোভিড লকডাউনে বাড়িতে পরিবারের সাথে থাকা অবস্থায় বিয়ের প্রস্তাব আসে বাংলাদেশের এক চাচাতো ভাইয়ের সাথে। এই বিয়ে ছিল নিছক কেবল সামাজিক চুক্তি নয়; তাতে জড়িত ছিল পাত্রপক্ষের যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব পাওয়ার আশ্বাস এবং পারিবারিক অর্থনৈতিক সুবিধার লেনদেন। ফারহানার বন্ধুদের মতে, তার পরিবার ওই পাত্রের পরিবারের কাছ থেকে অর্থ নিয়েছিল।

ফারহানা শুরুতে শান্তভাবে বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চাইলেও, সময়ের সঙ্গে পারিবারিক চাপ বেড়ে যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউটর ড. এমিলি ওয়াটসন তিনবার তাকে কাউন্সেলিং সেশনে পাঠানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু প্রতিবারই তার বাবা ফোন করে বলেন, “এটি আমাদের পারিবারিক বিষয়।”

ফারহানার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। মাত্র ছয় মাসে ওজন কমে ৮ কেজি, রাতে ঘুম হয় মাত্র ৩ ঘণ্টা, সব কিছুতেই যেন এক বিপন্ন আত্মার আর্তনাদ।

২০২১ সালের জুন মাসে, ফারহানা ম্যানচেস্টার সিটি সেন্টারের একটি ব্রিজ থেকে লাফ দেন। পরদিন সকালে তার নিথর দেহ মেলে শহরের রাস্তায়। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ২০ বছর।

ফারহানার নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয় ম্যানচেস্টারের স্থানীয় একটি মসজিদে। পরে তাকে ম্যানচেস্টারের সাউথ সেমেটারি-তে দাফন করা হয়।

পুলিশ এটিকে অপ্রাকৃতিক মৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত করে। পরিবার মৃত্যুটিকে ভাগ্যের লিখন বলে অভিহিত করেন।

ফারহানার মৃত্যুর পরেও তার পরিবার আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু স্বীকার করেনি। তার চাচা এক ভিডিও বার্তায় বলেন, “ফারহানার ডিপ্রেশন ছিল, বিয়ে নিয়ে কোনো চাপ ছিল না।”

ঘটনাটি ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটিতে এখনও একটি অমীমাংসিত আলোচনার বিষয় হয়ে রয়ে গিয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০২১ সালে যুক্তরাজ্যে ১,৩৫৫টি জবরদস্তি বিয়ের রিপোর্ট করা হয়েছিল।

সূত্র:

  • ম্যানচেস্টার ইভিনিং নিউজ (১৫ জুন ২০২১)
  • BBC Asian Network (১৮ জুন ২০২১)


Back to top button
🌐 Read in Your Language