
ভার্জিনিয়া—যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলের এক অদ্ভুত মিশ্রণের রাজ্য। এখানে সকাল আসে পাহাড়ের মাথা ছুঁয়ে, আবার সমুদ্রের নোনাজলে ভিজে যায় বিকেল। স্টাফোর্ড কাউন্টি তারই এক নিভৃত কোণে, ওয়াশিংটন ডিসি থেকে কিছু দূরেই, যেন শহরের ব্যস্ততা থেকে পালিয়ে যাওয়া ক্লান্ত মানুষের জন্য তৈরি এক আশ্রয়। এখানে বাতাসে থাকে বসন্তকালের ডগউড ফুলের নরম সুবাস।
২০১২ সালের ২৭ মে—মেমোরিয়াল ডে উইকএন্ড। অনেকেই হয়তো পিকনিকে বেরোতে প্রস্তুত হচ্ছিল, কেউ কেউ হয়তো বার্গার প্যাটির পাশে বারবিকিউ সস মাখাচ্ছিল। কিন্তু স্টাফোর্ডের গ্যারিসনভিল রোডের একটি তিন শয়নকক্ষের টাউনহাউসে তখন সময় গড়িয়ে যাচ্ছিল এক বিভীষিকার দিকে।
ঘরের প্রতিটি দেয়াল যেন শোষণ করেছিল বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা মানসিক অস্থিরতা, অভিবাসী জীবনের নিঃশব্দ হতাশা ও অর্থনৈতিক ভয়। আর সেই অদৃশ্য বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছিল শুধু তিনটি শিশু, যারা বোঝে না কেন হঠাৎ নিঃশব্দ হয়ে গেল তাদের পুরো জগৎ।
নাসিম খান—জন্মেছিলেন সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে।ছোটবেলা থেকেই নাসিম ছিলেন চুপচাপ, নিজের দুনিয়ায় গুটিয়ে থাকা এক কিশোর, যার চোখে ছিল কম্পিউটার প্রকৌশলী হবার স্বপ্ন। ১৯৯৮ সালে স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে ভার্জিনিয়ায় পাড়ি জমান। তার অধ্যয়ন ছিল সফল, ২০০৫ সালে পেলেন গ্রিন কার্ড, সাথে চাকরি এক সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানে।
ফারিয়া চৌধুরি—জন্ম সিলেট শহরের শিবগঞ্জে, এক মধ্যবিত্ত শিক্ষিত পরিবারে। অর্থনীতিতে স্নাতক শেষ করার পর ২০০৬ সালে তার বিয়ে হয় মোহাম্মদ নাসিম খানের সঙ্গে। পরের বছর, ২০০৭ সালে, তিনি ‘CR-1’ ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। ভালোবাসা, বিশ্বাস ও স্বপ্নে গড়া ছিল তাদের সংসার। একে একে তাদের ঘরে আসে তিনটি সন্তান—সেই পরিবার যেন ছিল নিখাদ এক সুখের আলপনা।
২০১২ সালের মে মাস। যুক্তরাষ্ট্র তখন গ্রীষ্মের আলোয় আলোকিত, আর নাসিম খানের মন তখন অন্ধকারে নিমজ্জিত। চাকরি চলে গেছে এক বছর হলো। ক্রেডিট কার্ডের ঋণ আর বাড়ির মর্টগেজ যেন প্রতিদিন তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। ট্যাক্সি চালিয়ে সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছিল না, তিনি দিনদিন মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছিলেন।
২৭ মে দুপুর ২টা ১৫ মিনিট। স্টাফোর্ড মলে শিশুদের নিয়ে গিয়েছিলেন তারা। সিসিটিভিতে দেখা যায়—তারা একটি জুতার দোকানে দাঁড়িয়ে, কিন্তু নাসিমের মুখ গম্ভীর। ফারিয়া একটি নীল স্যান্ডেল তুলে হাসছিলেন, আর নাসিম তাকিয়ে ছিলেন—যেন তাঁর চোখে ছিল কোনও গন্তব্যহীন অন্ধকার।
বিকেল ৬:৪৫ মিনিটে প্রতিবেশীরা চিৎকার শুনতে পান: “আমাকে মারবেন না!”
৮:৩০ মিনিটে পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ঢোকে। দৃশ্যটি ছিল যেন কোনও কসাইখানা। ফারিয়ার দেহে ছিল ৩টি ছুরিকাঘাত—তিনটিই হৃৎপিণ্ডে। নাসিম নিজে নিজের কব্জি কেটে আত্মহত্যা করেছেন।
স্টাফোর্ড কাউন্টির পুলিশ যখন দরজা ভেঙে ঢুকল, তখন ঘরের পাশের রুমে তিনটি শিশু চুপ করে বসে ছিল। বড় মেয়ে—৭ বছরের; স্কুলে ‘Honor Roll’-এ নাম আসে তার। মধ্যম সন্তান—৫ বছরের ছেলে, যে ছবি আঁকতে ভালোবাসে; আর সবচেয়ে ছোটটি—মাত্র ১ বছরের—মায়ের বুকের দুধ খেতে চায়, কিন্তু তখন আর মা নেই।
এই শিশুদের কেউ জানে না “মৃত্যু” মানে কী। তারা শুধু জানে মা আর ওঠেন না, বাবা রক্তে ভেজা… আর আশপাশে সব কেমন গন্ধে ভরে গেছে—ভয় আর অচেনা এক কষ্টের গন্ধে।
একজন পুলিশ অফিসার পরে বলেছিলেন, “আমি আমার জীবনে অনেক খুনের দৃশ্য দেখেছি, কিন্তু এই শিশুগুলোর চোখ আমাকে এখনও তাড়িয়ে বেড়ায়।”
দুই পরিবারের, দুটি প্রতিক্রিয়া ছিল। ফারিয়ার পরিবার বলেছিল, “আমরা বহুবার বলেছিলাম—ফিরে এসো। কিন্তু ও বলত, ‘সন্তানদের ছাড়া ফিরব না।’ এখন সে-ও নেই, ওর সন্তানরাও এতিম।”
অন্যদিকে, নাসিমের পরিবার বাংলাদেশে সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেন: “আমাদের ছেলে মানসিকভাবে অসুস্থ ছিল। আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি।”
তারা ক্ষতিপূরণ হিসেবে অর্থ সহায়তা করতে চেয়েছিল ফারিয়ার পরিবারকে, যা প্রত্যাখ্যান করা হয়। কানাডা থেকে ফারিয়ার ছোট বোন বলেছিলেন, ‘আমাদের বোনের জীবনের মূল্য কোনো টাকায় মাপা যাবে না।’
বাচ্চারা আশ্রয় নেয় নিউইয়র্কে, ফারিয়ার ভাই মো. আলমগীরের কাছে। তিন শিশুর মধ্যে বড় মেয়ে এখন ভার্জিনিয়া টেকে পড়ছে। মাঝের ছেলে হাই স্কুলে আর ছোটটি—বিশেষ স্নেহে বড় হচ্ছে, এখনও জানে না পুরো সত্যি।
এই ঘটনা শুধু একটি হত্যা-আত্মহত্যার গল্প নয়। এটি এক অভিবাসী পরিবারের অদৃশ্য যুদ্ধের দলিল। যেখানে আমেরিকার আলো-ঝলমলে রাস্তায় এক নারী হারিয়ে ফেলেন তার কণ্ঠস্বর, এক পুরুষ হারিয়ে ফেলেন নিজের বোধ, আর তিনটি শিশু দাঁড়িয়ে থাকে ইতিহাসের এক অসমাপ্ত পৃষ্ঠায়।









