
সেপ্টেম্বরের শুরুতে অস্ট্রেলিয়ার আকাশ থাকে কিছুটা রৌদ্র-আলসেমি মাখানো—রোদের মাঝে নেই তীব্রতা, বাতাসে মিশে থাকে বসন্তের মতো এক নরম পরশ। সিডনির স্মিথফিল্ড তখন যেন এক নিঃশব্দ শান্তির শহরতলি—যেখানে জীবন চলে ধীরে, নিয়মমতো। রাস্তার ধারে সারি সারি গাছের পাতায় পড়ন্ত রোদের ঝিলিক, পাশের পার্কে ছেলেমেয়েদের খিলখিল হাসি, দূর পাহাড়ের ঢালে হেলান দিয়ে থাকা নীল মেঘের পর্দা—সব মিলিয়ে যেন একটি নিখুঁত দিন। আর সেই দিনটিই ছিল ‘ফাদারস ডে’—অস্ট্রেলিয়ার ক্যালেন্ডারে পিতৃস্নেহ উদ্যাপনের একটি বিশেষ ক্ষণ।
শিশুরা তাদের বাবার জন্য আঁকে কার্ড, গিফট প্যাকেটের ভেতরে ভালোবাসা জড়ানো চকলেট রাখে, কেউ কেউ ছোট্ট হাতে লেখে—‘আই লাভ ইউ ড্যাড’। সবার ঘরে খুশির রং, ভালোবাসার গল্প। কিন্তু সেই দিনই—এই নিটোল ছবির ফ্রেম থেকে আচমকা ছিঁড়ে পড়ে যায় এক অদৃশ্য কান্না। সিডনির একটি ঘরের ভেতর থেমে যায় নিঃশ্বাস, নিভে যায় দুটি প্রবাসী প্রাণ। আর সেই দিনটিই হয়ে ওঠে এক ছোট্ট মেয়ের জীবনের সবচেয়ে শোকাবহ অধ্যায়।
ঘটনাস্থল একটি পরিচিত ভাড়া বাড়ি—যেখানে একসময় ভালোবাসার সংসার গড়ে তুলেছিলেন তাসমিন বাহার ও ডেভ পিল্লাই। ছয় বছরের সম্পর্কে নানা ওঠানামা থাকলেও, শেষমেশ তা ভেঙে পড়ে। তাসমিন তাদের তিন বছরের মেয়েকে নিয়ে আলাদা থাকতে শুরু করেন। কিন্তু ফাদারস ডের আবেগ, সন্তানের মুখে বাবার জন্য ভালোবাসার ছবি আঁকার সহজ সরল আকাঙ্ক্ষা হয়তো একজন মায়ের হৃদয়ে ভিন্নরকম দ্বিধা ছড়ায়।
তাসমিন ঠিক করেন, মেয়েকে তার বাবার সঙ্গে দেখা করাবেন। রোববার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬—তারা আবার ফিরে যান স্মিথফিল্ডের সেই পুরনো ঠিকানায়। কেউ জানতো না, সেটাই হবে তাদের শেষ যাত্রা।
দুপুর পেরিয়ে গেলে একজন আত্মীয় এসে দরজায় কড়া নাড়েন। কোনো সাড়া নেই। এক সময় ভেতরে প্রবেশ করে সবাইকে স্তব্ধ করে দেয়ার মতো দৃশ্যের মুখোমুখি হন তিনি। বাথরুমে পড়ে আছে তাসনিম ও ডেভ পিল্লাইয়ের নিথর দেহ। পাশে অন্য ঘরে শান্ত নিদ্রায় তাসমিনের তিন বছরের মেয়ে—যে জানেই না, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনাটি তার জীবনের ওপরে ছায়ার মতো নেমে এসেছে।
পুলিশ এসে লাশ দুটি উদ্ধার করে। প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে তারা ধারণা করে, এটি একটি ‘মার্ডার-সুইসাইড’ কেস।
তাসমিনের বড় বোন শারজিন বাহার, যিনি তখন নিউ ইয়র্কে, সংবাদটি পেয়ে প্রথমে উড়াল দেন বাংলাদেশে, তারপর সিডনির পথে। নিউজিল্যান্ডের ‘স্টাফ’ পত্রিকাকে তিনি বলেন, “দুই দিন আগেই তাসমিনের সঙ্গে আমার কথা হয়েছিল, সে একেবারে স্বাভাবিক ছিল। আমি ওকে বলেছিলাম, ওই বাড়িতে আর না যেতে। কিন্তু ফাদারস ডে বলে সে মেয়েকে নিয়ে সেখানে গেল, কারণ সে চাইত ডেভ তার মেয়েকে দেখুক।”
তাসমিনের খালাতো বোন সিফাত শারমিন রূপন্তির কথায় উঠে আসে আরও এক টুকরো গল্প। তিনি জানান, ডেভ এর আগেও হুমকি দিতেন, তাসমিন তাকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন।
২০০৯ সালে উচ্চশিক্ষার স্বপ্নে তাসমিন পাড়ি জমিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে থেকে গিয়েছিলেন সিডনিতে—যেখানে গড়ে তুলেছিলেন এক নতুন জীবন, এক নতুন সংসার। কিন্তু দূর প্রবাসের মাটিতে সেই সংসারের ভিত নড়ে যায়—ভেঙে যায় সম্পর্ক, বদলে যায় ঠিকানা। আর বাংলাদেশে কোথায় ছিল তার শেকড়, কেমন ছিল সেই পেছনের গল্প—তা হারিয়ে যায় নিঃশব্দে।
ঘটনার তদন্তে সিডনি পুলিশ জানিয়েছে, তারা আর কাউকে সন্দেহ করছে না। সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে, এটি নিছক একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি—একটি সম্পর্কের করুণ পরিণতি, যেখানে প্রশ্ন আছে, উত্তর নেই।
আর এই নির্মম পরিণতির চিহ্ন যেন চিরকাল গেঁথে থাকবে সেই ঘুমন্ত শিশুটির হৃদয়ে—যার ছোট্ট জীবন একদিন জানবে, উৎসবের দিনও কতটা নিঃস্ব হতে পারে। ভালোবাসা না থাকলে কোনো দিনই আসলে আনন্দ নিয়ে আসে না—ফাদারস ডের মতো একটি দিনও হয়ে ওঠে ভয়াবহ স্মৃতির এক কালো রেখা, যা আলো নয়, কেবল ছায়া বয়ে আনে।









