
শহরের নাম হ্যামিল্টন। যার পরিচয় কেবল তার ধাতব শিল্প বা নিওন আলোয় ঝলমলে স্কাইলাইন দিয়ে নয়, বরং বহুজাতিক অভিবাসীদের এক বর্ণময় সমাজ হিসেবে গড়ে উঠা এক আধুনিক কানাডিয়ান শহর। টরন্টো থেকে মাত্র এক ঘণ্টার পথ। এখানকার রাস্তায় হেঁটে গেলে চোখে পড়ে বাংলাদেশি মালিকানাধীন রেস্টুরেন্ট, গ্রোসারি শপ, মসজিদ; কান পাতালে শোনা যায় বাংলা কথাবার্তা।
ডিসেম্বরের শেষভাগ। বরফে মোড়া হ্যামিল্টন শহরের অলিগলি তখন রঙিন আলোয় সেজেছে—ক্রিসমাসের ছুটিতে জীবন যেন একটু বেশি আনন্দময়। ক্রিসমাস ট্রির আলো, শিশুর হাসি, আর দূরের চার্চ থেকে ভেসে আসা ঘণ্টার শব্দ মিলে যেন শহরটিকে একটি শান্ত, জাদুময় দৃশ্যপটে রূপান্তর করেছে। কিন্তু সেই ১৯৯৯ সালের ২৪ ডিসেম্বরের ক্রিসমাস ইভ ছিল ব্যতিক্রম। সেই রাতে, হ্যামিল্টনের ইতিহাসে লেখা হলো এক করুণ অধ্যায়।
কাজী নজরুল মিয়া সুইট। ১৯৮৯ সালে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে পাড়ি জমান এই দেশে। প্রথমে মন্ট্রিয়ল, তারপর লন্ডন—অন্টারিও ঘুরে হ্যামিল্টনে থিতু হন। “শাহজালাল ভ্যারাইটি” নামে একটি কনভিনিয়েন্স স্টোর চালাতেন, যা শুধু দোকান ছিল না, বরং হয়ে উঠেছিল স্থানীয় অভিবাসীদের মিলনকেন্দ্র। গল্প, আর জীবনের সুখ—দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার একটি জায়গা।
তার ভাইয়ের ছেলে, কাজী কামরুল ইসলাম, ছিল পরবর্তী প্রজন্মের প্রতীক। মাত্র ২০ বছর বয়সি, ওয়াটারলু বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োলজির ছাত্র, চোখে স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার। ছুটিতে হ্যামিল্টন এসেছিল চাচার বাসায়, পরিবার আর ভালোবাসার ছায়ায় কিছুদিন কাটাতে। কে জানত, সেটাই হবে তার জীবনের শেষ সফর?
২৪ ডিসেম্বরের সেই রাতের কুয়াশায় মোড়া বাতাস যেন আগেই আগুনের পূর্বাভাস দিচ্ছিল। শহরের অন্যত্র ক্রিসমাস গান বেজে চলেছে, কেউ কেক বানাচ্ছে, কেউ উপহারের মোড়ক খুলছে। আর ২৪০ গিবসন নর্থের সেই বাড়ির ভেতরে, অদৃশ্য আগুনের শিখা অপেক্ষা করছিল—ভয়াল এক বিস্ফোরণের জন্য।
রাত তখন প্রায় একটা। বাইরে তুষারপাতের ধীর লয়ে রাস্তা ঢাকা পড়ছে। বাড়ির বেসমেন্টের ঘরে ছিলেন নজরুল মিয়া ও তার ভাতিজা কামরুল। দুজনেই ক্রিসমাসের এই ছুটিতে বেসমেন্টটাকে সাজাতে চাচ্ছিলেন। উপরের তলায় শুয়েছিলেন স্ত্রী, তার জা (ছোটো ভাইয়ের স্ত্রী), সাড়ে তিন বছরের মেয়ে সুমা এবং চার বছরের ভাতিজা রাহাত। নিস্তব্ধ রাত হঠাৎ কেঁপে উঠলো–এক প্রচণ্ড শব্দে।
কাজী নজরুল মিয়ার স্ত্রী হঠাৎ শুনলেন–স্বামী কলেমা পড়ছেন উচ্চস্বরে–“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু…” যেন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রিয় শব্দে মন শান্ত করতে চাইছেন। ভয় চেপে ধরলো স্ত্রীকে, তিনি দরজা খুলে নিচে তাকাতেই দেখলেন–কালো ধোঁয়া উথলে উঠছে বেসমেন্ট থেকে। মুহূর্তেই তিনি দরজা বন্ধ করে চিৎকার শুরু করলেন— “হেল্প! হেল্প! আগুন! হেল্প!”
তখনি ঘরের কাচের জানালা ভেঙে নিজের মেয়েকে প্রতিবেশীর দিকে ছুঁড়ে দিলেন–এক মা তার প্রাণের টুকরোকে যেভাবে বাঁচাতে জান কোরবানি দেয়, সেই দৃশ্য আজও প্রতিবেশী ছেলেটির চোখে ভাসে। তিনি নিজেও কাচের ধারের তোয়াক্কা না কেও জানালার গর্ত দিয়ে বেরিয়ে আসেন। কাচে হাত কেটে গিয়েছিল, রক্তে ভিজে যাচ্ছিল তার শাড়ির আঁচল। বের হয়েই তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন।
এই সময় এসে হাজির হয় ফায়ার সার্ভিস। তারা একের পর এক ঘর ভেঙে উদ্ধার করে নজরুল মিয়ার ভাইয়ের স্ত্রী এবং শিশু রাহাতকে–দুজনেই ধোঁয়ায় অচেতন।
কিন্তু নিচতলার আগুন তখন এমন ভয়ংকর রূপ নিয়েছে যে, নজরুল মিয়া ও কামরুলকে বের করতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসকেও হিমশিম খেতে হয়। ধোঁয়ার গভীরতা ভেদ করে তাদের খুঁজে বের করে আনে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। দুজনের শরীরই মারাত্মক দগ্ধ। জরুরি ভিত্তিতে তাদেরকে হ্যামিল্টন জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
খবর পেয়ে হাসপাতালে ভিড় করতে থাকেন পরিবারের আত্মীয়স্বজন, বন্ধু—বান্ধব ও পরিচিতজনেরা। কারও চোখে ছিল অশ্রু, কারও মুখে নিঃশব্দ বিস্ময়। সবাই কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করছিলেন–“হে আল্লাহ, তাদেরকে সুস্থ করে তোলো!”
শনিবার, ২৫ ডিসেম্বর। দিনটি ক্রিসমাসের আনন্দে ভরে উঠলেও, কাজী পরিবারের জন্য ছিল এক অন্ধকার দিনের সূর্যোদয়। বিকেল ২টা ৫৫ মিনিটে চিকিৎসকেরা ঘোষণা করেন—কাজী নজরুল মিয়া আর নেই। তারপর ৫টা ৩০ মিনিটে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তরুণ কামরুল। পুরো হাসপাতাল কান্নায় ভেসে যায়। সিলেট থেকে হাজার মাইল দূরের এই কানাডায়, এক বাংলাদেশি পরিবারের জীবনে এতটা শোক একসাথে কখনও নেমে আসেনি।
হ্যামিল্টনের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে নেমে এলো এক নিস্তব্ধতা। যারা কাজী নজরুল মিয়াকে চিনতেন, বলছিলেন—“এমন ভদ্র, বিনয়ী মানুষ খুব কম দেখা যায়।”
নজরুল মিয়ার স্ত্রী, হাসপাতালে শুয়ে চোখ খুলে প্রথম যে প্রশ্ন করেছিলেন, তা ছিল—“তারা কোথায়?” কিন্তু উত্তর কেউ দিতে পারেনি। রাহাত শিশুটি চোখ মেলে তাকালেও বুঝতে পারছিল না–চাচা আর ভাই কোথায়। কাচের জানালা ভেঙে সেদিন বেঁচে যাওয়া ছোট্ট সুমা, হয়তো সারাজীবন মনে রাখবে মায়ের সেই ছুঁড়ে দেওয়ার মুহূর্ত।
নজরুল মিয়া ছিলেন নয় ভাইবোনের মধ্যে অষ্টম, প্রবাসে প্রতিষ্ঠিত এক নীরব সংগ্রামী। তাঁর ভাতিজা কামরুল ছিল তাদের গর্ব। ওয়াটারলু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, যে ডাক্তার হতে চেয়েছিল।
হ্যামিল্টন মাউন্টেন মসজিদে জানাজার দিন, রাস্তাজুড়ে ছিল শতশত মানুষ। সবার চোখে জল। এমন এক জানাজা, যেখানে কানাডার ঠান্ডাও গলেছে মানুষের শোকে। এরপর চ্যাপেল হিল সেমিটারিতে দাফন করা হয় দুই কফিন–একজন অভিভাবক, একজন ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
ঘটনারও পেছনে থাকে গল্প, আর কিছু গল্প হয়— সম্পর্কের, আত্মত্যাগের, ভালোবাসার। জানা যায়, আগুন লাগার পর প্রথম দফার ধোঁয়ার ছায়া কাটিয়ে নজরুল মিয়া বাইরে বেরিয়ে আসেন। কিন্তু বাড়ির বাইরে এসে চারদিক তাকিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, কামরুল বের হতে পারেনি। সঙ্গে সঙ্গেই বলে ওঠেন—“আমার ভাতিজা তো এখনো ভেতরে!”
চোখেমুখে আতঙ্ক, অথচ সিদ্ধান্তের ছিল দৃঢ়তা। কোনো দ্বিধা করেননি। বুকের সমস্ত সাহস নিয়ে পা বাড়ান সেই বেসমেন্টে। কিন্তু ভাগ্য তার জন্য অপেক্ষায় ছিল এক কঠিন পরিণতির।
বেসমেন্টে যাওয়ার সিঁড়ির ধাপ তখন আগুনে প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। একটি পা রাখা মাত্রই ক্ষতবিক্ষত কাঠের সিঁড়ি ভেঙে পড়ে যান নিচে। একেবারে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে, যে আগুন কিছুক্ষণ আগেও কেবল আশঙ্কা ছিল, তখন তা হয়ে ওঠে মৃত্যু নিশ্চিত করার নির্মম হাতিয়ার। তিনি আর উঠতে পারেননি।
হ্যামিল্টনের সেই শীতের রাতটির কথা অনেকেরই মনে আছে। এখনও অনেকে স্মরণ করেন সে মর্মান্তিক ঘটনাটির কথা। কানাডার অভিবাসী জীবনে আমরা অনেককে অকালে হারিয়েছি। যারা হারিয়ে যান, তাদের আমরা ফেরাতে পারি না কিন্তু তাদের গল্প আমরা বাঁচিয়ে রাখি—লেখায়, স্মৃতিতে, আর আমাদের অনন্ত ভালোবাসায়।









